একটি বাড়ির নকশায় করিডর বা চলাচলের পথকে সাধারণত খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় না। বসার ঘর, শোবার ঘর, রান্নাঘর কিংবা খাবার ঘরের মতো স্থানগুলোই নকশার প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে। অথচ ঘরের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াতের জন্য করিডর অপরিহার্য। স্থাপত্যের ইতিহাসে এই সাধারণ চলাচলের পথ বাড়ির গঠন, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং গৃহস্থালি কাজের বিন্যাসে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে।
প্রাচীন ইউরোপীয় বাড়িতে প্রতিটি ঘরে প্রবেশের জন্য আলাদা করিডর থাকত না। বিশেষ করে ইতালীয় স্থপতি আন্দ্রেয়া প্যালাডিওর নকশা করা বাড়িগুলোতে একাধিক কক্ষ পরস্পরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকত। ফলে একটি ঘরে পৌঁছাতে অন্য ঘরের ভেতর দিয়ে যেতে হতো। পরিবারের সদস্যদের বিশ্রাম, খাবার গ্রহণ কিংবা অতিথিদের সঙ্গে কথোপকথনের সময় এই চলাচল স্বাভাবিকভাবেই বাধা সৃষ্টি করত।
পরবর্তী সময়ে বাড়ির নকশায় স্বতন্ত্র চলাচলের পথ যুক্ত হওয়ায় এই সমস্যার সমাধান হতে শুরু করে।
গোপনীয়তা ও গৃহস্থালি কাজের পৃথকীকরণ
স্থাপত্যের ইতিহাসবিদ রবিন ইভান্স ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত তাঁর একটি প্রবন্ধে ঘরের দরজা, চলাচলের পথ এবং কক্ষবিন্যাসের পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি ১৫৯৭ সালের দিকে আঁকা ইংল্যান্ডের চেলসিতে অবস্থিত বিউফোর্ট হাউসের একটি নকশার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে কেন্দ্রীয় চলাচলের পথ থেকে বিভিন্ন কক্ষে প্রবেশের ব্যবস্থা দেখা যায়।

এই ধরনের নকশা বাড়ির ভেতরে চলাচলকে বসবাসের স্থান থেকে আলাদা করার সুযোগ তৈরি করে। ফলে একজন ব্যক্তি অন্যের ব্যক্তিগত পরিসরে প্রবেশ না করেও বাড়ির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে পারেন।
উনিশ শতকে ধনী পরিবারগুলোর বাড়িতে এই পৃথকীকরণ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরিবারের সদস্যদের ব্যবহারের জন্য সামনের সিঁড়ি ও কক্ষের পাশাপাশি গৃহকর্মীদের চলাচলের জন্য পেছনের সিঁড়ি এবং আলাদা পথ তৈরি করা হতো। রান্নাঘর, ধোয়ামোছার স্থান ও অন্যান্য সেবামূলক কক্ষও সাধারণত বাড়ির আড়ালে রাখা হতো।
এর পেছনে সামাজিক শ্রেণিবিভাজন ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ধারণা কাজ করেছিল। পরবর্তী সময়ে এই বিন্যাস মধ্যবিত্ত পরিবারের বাড়ি এবং ছোট আবাসিক ভবনেও ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে অনেক বাড়িতে গৃহস্থালি কাজ পরিবারের সদস্যরাই করেন। কিন্তু কাজের স্থানকে বসবাসের স্থান থেকে আলাদা রাখার পুরোনো প্রবণতা এখনো রয়ে গেছে।
করিডর যখন নিজেই হয়ে ওঠে বসবাসের স্থান
প্রচলিত বাড়ির নকশায় করিডরকে সাধারণত একটি ফাঁকা চলাচলের পথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান এমওএস আর্কিটেক্টস ২০১৫ সালে শিকাগো স্থাপত্য দ্বিবার্ষিক প্রদর্শনীর জন্য এমন একটি বাড়ির ধারণা উপস্থাপন করে, যেখানে করিডরই হয়ে ওঠে প্রধান ব্যবহারযোগ্য স্থান।
‘করিডর হাউস’ নামের এই স্থাপনায় প্রচলিত করিডরের মাপ অনুসরণ করে সরু সরু অংশ তৈরি করা হয়। এসব অংশের কোনো একটিতে বিছানা, অন্যটিতে কাজ করার টেবিল রাখা হয়। এর মাধ্যমে স্থপতিরা দেখিয়েছেন, সাধারণত যে স্থানকে কেবল চলাচলের জন্য নির্ধারণ করা হয়, সেটিও দৈনন্দিন জীবনের কার্যকর অংশ হতে পারে।

জাপানে স্থপতি তাকু সাকাউশি ও ওএফডিএর নকশা করা ‘থ্রি করিডরস হাউস’ একই ধারণাকে আরও বাস্তবসম্মতভাবে উপস্থাপন করে। একতলা বাড়িটির মাঝখান দিয়ে একটি দীর্ঘ করিডর পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তকে যুক্ত করেছে। এর দুই পাশে আরও দুটি সরু পথ রয়েছে, যেগুলো বারান্দা হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
এই তিনটি পথের মধ্যবর্তী স্থানে বসার ঘর ও খাবার ঘর অবস্থিত। করিডরের মধ্যবর্তী অব্যবহৃত অংশে পড়ার স্থান, সংরক্ষণাগার ও বাথরুমের মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ফলে চলাচলের পথটি শুধু যাতায়াতের মাধ্যম না থেকে বাড়ির সামগ্রিক বিন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
গৃহস্থালি কাজের জন্য আলাদা স্থাপত্য
পর্তুগালের গন্ডোমারে ফালা আতেলিয়ের নকশা করা ‘হাউস উইদিন থ্রি জেসচার্স’ বাড়িতে গৃহস্থালি কাজের স্থানকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এখানে কাপড় ধোয়ার ঘরটি বাড়ির মূল কাঠামো থেকে আলাদা হয়ে একটি ছোট উঁচু অংশের রূপ নিয়েছে।
সাধারণত কাপড় ধোয়ার স্থানকে দরজার আড়ালে, আলমারির ভেতরে কিংবা বাড়ির পেছনের কোনো কোণে রাখা হয়। কিন্তু এই নকশায় সেটি ভবনের বাইরের আকৃতিতেও প্রভাব ফেলেছে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, গৃহস্থালি কাজের জন্য নির্ধারিত স্থানও বাড়ির স্থাপত্যের দৃশ্যমান ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
বার্সেলোনায় মেসুরার নকশা করা ‘ভাস্তো গ্যালারি’ নামের একটি রূপান্তরিত শিল্পকারখানার আবাসিক প্রকল্পেও একই প্রবণতা দেখা যায়। এখানে কাঠের তৈরি একটি স্বতন্ত্র সেবাকেন্দ্র বাড়ির অভ্যন্তরে স্থাপন করা হয়েছে। দীর্ঘ স্টেইনলেস স্টিলের রান্নাঘরের কাউন্টারটি মূল কক্ষে উন্মুক্ত অবস্থায় রয়েছে। ফলে রান্না ও অন্যান্য দৈনন্দিন কাজকে আর সম্পূর্ণভাবে আড়াল করে রাখতে হয় না।
কোস্টারিকায় এ-০১-এর ‘নো ফুটপ্রিন্ট হাউস’ প্রকল্পে বাড়ির বিভিন্ন সেবামূলক ব্যবস্থা একটি কেন্দ্রীয় অংশে একত্র করা হয়েছে। এতে বাড়ির বাকি অংশ তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত ও পরিবর্তনযোগ্য থাকে। বিদ্যুৎ, পানি, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাও এই কেন্দ্রীয় বিন্যাসের অন্তর্ভুক্ত।

ভবিষ্যতের বাড়ির নকশায় নতুন চিন্তা
আধুনিক বাড়ির করিডর, রান্নাঘর, কাপড় ধোয়ার স্থান কিংবা যন্ত্রপাতি রাখার ছোট কক্ষগুলোকে আমরা প্রায়ই গৌণ বলে মনে করি। অথচ এসব স্থান ছাড়া একটি বাড়ির দৈনন্দিন জীবন সচল রাখা কঠিন।
স্থাপত্যের পুরোনো ধারণাগুলো দীর্ঘদিন টিকে থাকে, এমনকি সেগুলোর পেছনের সামাজিক বাস্তবতা বদলে গেলেও। একসময় গৃহকর্মী ও পরিবারের সদস্যদের আলাদা রাখার জন্য ব্যবহৃত বিন্যাস আজ সাধারণ পরিবারের বাড়িতেও দেখা যায়।
তাই ভবিষ্যতের আবাসিক স্থাপত্যে শুধু ঘরের সংখ্যা কিংবা আকার নির্ধারণ করাই যথেষ্ট নয়। বরং কীভাবে মানুষ চলাচল করবে, কোথায় কাজ করবে, কীভাবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় থাকবে এবং কীভাবে একই স্থান বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যবহার করা যাবে, সেসব বিষয়ও গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
বাড়ি কেবল কয়েকটি নির্দিষ্ট কাজের জন্য তৈরি ঘরের সমষ্টি নয়। এটি মানুষের অভ্যাস, সম্পর্ক ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে পরিবর্তিত হওয়া একটি পরিসর। করিডর ও গৃহস্থালি কাজের স্থানকে নতুনভাবে বিবেচনা করার মধ্য দিয়ে স্থাপত্য সেই পরিবর্তনশীল জীবনকে আরও কার্যকরভাবে ধারণ করতে পারে।
সূত্র: ডিজাইনবুম



















