• Home
  • স্থাপত্য
  • বিয়ের প্রতিশ্রুতি রাখতে আকাশের নিচে নির্মিত হলো এক উন্মুক্ত মন্দির
Image

বিয়ের প্রতিশ্রুতি রাখতে আকাশের নিচে নির্মিত হলো এক উন্মুক্ত মন্দির

বিয়ের প্রতিশ্রুতি রাখতে গিয়ে কেউ যদি একটি পুরো স্থাপনা ডিজাইন করে ফেলেন, তবে সেই গল্প সহজে ভোলার নয়। আইসল্যান্ডের হভামসভিক (Hvammsvík) এলাকায় তৈরি “দ্য টেম্পল” (The Temple) ঠিক তেমনই একটি প্রকল্প। 

স্থাপনাটি এক অর্থে ভাস্কর্য, আবার এক অর্থে পবিত্র স্থান। তবে এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি ধর্ম-বিশ্বাস নির্বিশেষে সবার জন্য খোলা। নানা ধর্মের মানুষ পাশাপাশি বাস করেন, এমন সমাজের পাঠক হিসেবে বাংলাদেশিদের কাছেও এই ভাবনাটি তাই বেশ উৎসাহব্যঞ্জক।

বিয়ের প্রতিশ্রুতি রাখতে গিয়ে মন্দিরটি ডিজাইন করা হয়েছে। ছবি: আর্কডেইলি
প্রকল্পের পরিচয়

টেম্পলের আয়তন ২৫২ বর্গমিটার এবং এটি ২০২৫ সালে সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পটি ইনস্টলেশন ও স্ট্রাকচার, ধর্মীয় স্থাপত্য এবং চ্যাপেল শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। মূল উপাদান কংক্রিট, আর প্রকৌশল-পরামর্শ দিয়েছে ভেরকিস (VERKIS)।

নির্মাতাদের বর্ণনায় এটি একটি বহিরঙ্গন ভাস্কর্য, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ১৮ মিটার ও প্রস্থ প্রায় ১৪ মিটার। এটি তৈরি হয়ে কেবল কংক্রিটে, যার ওপরে আচ্ছাদন নেই, অর্থাৎ প্রকৃতির সব উপাদানের জন্য খোলা আছে।

নির্মাতাদের বর্ণনায় এটি একটি বহিরঙ্গন ভাস্কর্য। ছবি: আর্কডেইলি
একটি প্রতিশ্রুতি থেকে জন্ম

হভামসভিকের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, স্কুলি মোগেনসেন ২০২৫ সালের ১৬ আগস্ট নিজের ও গ্রিমা ব্যর্গ থোরারেনসেনের বিয়ের জন্য এই টেম্পলের ডিজাইন ও নির্মাণ করেন। সেদিন আইসল্যান্ডের বিশপ গুদ্রুন কার্লস হেলগাদোত্তির (Guðrún Karls Helgudóttir) বিয়ের অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন এবং স্থাপনাটিকে খ্রিস্টান গির্জা হিসেবে আশীর্বাদ করেন। তাই এর শুরুটা একজন মানুষের ব্যক্তিগত প্রতিশ্রুতি থেকে, কিন্তু উদ্দেশ্য শুধু সেখানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।

উন্মুক্ত স্থান থেকে ঠিকরে আসছে আলো। ছবি: আর্কডেইলি
ভাইকিং ইতিহাসের জায়গায়

টেম্পলের অবস্থান আইসল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমে, হ্বালফিওর্দুর (Hvalfjörður) বা “তিমির ফিওর্ড”-এর তীরে, রেকইয়াভিক শহরকেন্দ্র থেকে গাড়িতে প্রায় ৪৫ মিনিটের দূরত্বে। হভামসভিক এস্টেট মোট ১২০০ একর, যা রেইনিভাল্লাহাউলস পাহাড় আর সাগরের মাঝখানে অবস্থিত।

জায়গাটির ইতিহাস গভীর। হভামসভিক আইসল্যান্ডের প্রাচীনতম ভাইকিং বসতি-খামারগুলোর একটি। আইসল্যান্ডের প্রথম বসতি স্থাপনকারীদের নথি লান্দনামা (Landnáma) গ্রন্থে এর উল্লেখ আছে। সেখানে বলা হয়েছে, হভাম-থোরির নামে এক বসতি-স্থাপনকারী প্রায় ৯০০ খ্রিস্টাব্দে এখানে বসবাস শুরু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনী এই এলাকাকে আইসল্যান্ডে তাদের নৌ-সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহার করেছিল।

ভেতরের খোলামেলা স্থান ছবি: আর্কডেইলি
ধর্ম ও পবিত্র স্থানের সহাবস্থানের ভাবনা

টেম্পলের পেছনের প্রেরণা এই ইতিহাস থেকেই এসেছে। হভামসভিকে একসময় ছিল একটি “হফ” (hof), অর্থাৎ নর্স দেবদেবীর উপাসনার মন্দির, এবং পরে সেখানে একটি খ্রিস্টান গির্জা তৈরি হয়। প্রায় ১০০০ খ্রিস্টাব্দে খ্রিস্টধর্ম সরকারি ধর্ম হলে অনেক হফ গির্জার পাশাপাশি টিকে ছিল, আর কিছু হয়তো খ্রিস্টান উপাসনালয়ে রূপান্তরিত হয়েছিল। পবিত্র স্থাপনার এই ভূমিকা বদলের ইতিহাস থেকেই নতুন টেম্পলের ভাবনা এসেছে।

স্কুলি মোগেনসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, ধর্ম ও পবিত্র স্থান পাশাপাশি টিকে থাকতে পারে, এবং আজকের দিনে এই বার্তা আরও জরুরি। তিনি বলেছেন, প্রত্যেকে নিজের মতো করে টেম্পলের ব্যাখ্যা করতে পারেন। তিনি রোমের প্যান্থিয়ন ও ইস্তাম্বুলের হাজিয়া সোফিয়ার মতো স্থাপনার উদাহরণও দিয়েছেন, যেগুলো শতাব্দী ধরে নতুন ভূমিকায় পবিত্র স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তার মতে, সব ধর্মের মানুষকে স্বাগত জানানোর উদ্দেশ্যে ইচ্ছা করে তৈরি স্থাপনা খুবই কম।

ধর্ম ও পবিত্র স্থান পাশাপাশি টিকে থাকতে পারে, এবং আজকের দিনে এই বার্তা আরও জরুরি। ছবি: আর্কডেইলি
ডিজাইন: কংক্রিট, ক্রস ও আলো

টেম্পলের ডিজাইনে ধর্মীয় প্রতীকগুলো একটি ভাস্কর্যের ভাষায় এসেছে। হভামসভিকের বর্ণনা অনুযায়ী, এর ছাদ কংক্রিটের কাঠামোর ওপর “ভাসমান” এবং সেটি মাল্টিজ ক্রসের আকারে ডিজাইন করা। মেঝেতে আছে কেল্টিক ক্রসের প্রতিধ্বনি, যার কেন্দ্রে একটি বৃত্ত আছে। পৌত্তলিক ঐতিহ্য অনুযায়ী এই বৃত্তকে অগ্নিকুণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

আলোর ভূমিকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। স্থাপনার খোলা অংশগুলো দিকনির্ণায়ক চার দিক বরাবর সাজানো, ফলে সূর্যের আলো ঢোকে এবং নাটকীয় ছায়া তৈরি করে। হভামসভিকের ভাষ্যে, ডিজাইনটি চারপাশের প্রকৃতির সঙ্গে নিখুঁতভাবে মিশে যায়।

স্থাপনার খোলা অংশগুলো চার দিক বরাবর সাজানো, ফলে সূর্যের আলো ঢোকে এবং নাটকীয় ছায়া তৈরি করে। ছবি: আর্কডেইলি
বিয়ের বাইরেও ব্যবহার

হভামসভিক জানিয়েছে, টেম্পল শুধু বিয়ের স্থান নয়। বিয়ের অনুষ্ঠানের পর এটিকে জনসমাগম ও খাবারের জায়গায় বদলে ফেলা যায়, যেখানে ১৫০ জন পর্যন্ত অতিথি বসতে পারেন। বিয়ে, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, যোগ-ব্যায়াম, জন্মদিন, কনসার্টসহ নানা আয়োজনের জন্য এটি ব্যবহার করা যায়। অর্থাৎ এটি পবিত্র স্থান হয়েও একটি বহুমুখী জায়গার মতই আচরণ করে।

বিয়ের অনুষ্ঠানের পর এটিকে জনসমাগম ও খাবারের জায়গায় বদলে ফেলা যায়। ছবি: আর্কডেইলি
প্রকৃতি ও টেকসই ভাবনার প্রেক্ষাপট

টেম্পল যে এস্টেটে অবস্থিত, সেখানে টেকসই উন্নয়নকে বড় গুরুত্ব দেওয়া হয়। এস্টেটের নিজস্ব ঠান্ডা পানির কূপ আছে এবং পাহাড় থেকে নিয়মিত স্বচ্ছ পানি আসে। নিজস্ব ভূতাপীয় গরম পানির কূপ থেকে এস্টেটের সব ভবন গরম রাখা হয় এবং প্রাকৃতিক উষ্ণ প্রস্রবণ চলে। ভবিষ্যতে তারা পুরোপুরি গ্রিড-বিচ্ছিন্ন (off the grid) রিসোর্ট হওয়ার পরিকল্পনা করছে, ২০২৮ সালে হোটেল চালুর আগে বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে। অতিথিদের কাছেও তাদের আহ্বান, একে অন্যের এবং প্রকৃতির প্রতি সম্মান দেখানো।

স্থাপনা শুধু ব্যবহারের জায়গা নয়, ইতিহাস ও বিশ্বাসের সংলাপও হতে পারে। ছবি: আর্কডেইলি

টেম্পলটি দেখায়, একটি স্থাপনা শুধু ব্যবহারের জায়গা নয়, ইতিহাস ও বিশ্বাসের সংলাপও হতে পারে। একটি পুরোনো হফের স্মৃতি, পরে সেখানে গির্জার আগমন, আর এখন সব বিশ্বাসের মানুষের জন্য একটি উন্মুক্ত কংক্রিট ভাস্কর্য, এই ধারাবাহিকতাই প্রকল্পের মূল শক্তি। 

তথ্যসূত্র

আর্কডেইলি

ড্রয়িং এর ছবি

টেম্পলের প্ল্যান। ছবি: আর্কডেইলি
টেম্পলের সেকশন। ছবি: আর্কডেইলি

Related Posts

বিশ্বের প্রাচীনতম স্থাপনা: হাজার বছর টিকে থাকা স্থাপত্যের বিস্ময়

মানুষের স্থাপত্যচর্চার ইতিহাস হাজার হাজার বছরের পুরোনো। আধুনিক শহর, সুউচ্চ ভবন কিংবা অত্যাধুনিক নির্মাণ প্রযুক্তির অনেক আগে মানুষ…

রঙের ভাষায় ছয়টি ভবনের গল্প

অনেকের ধারণা, ভবনে বেশি রং ব্যবহার করলে ডিজাইনের গাম্ভীর্য আর বিশুদ্ধতা নষ্ট হয়। রং যেন কেবল সাজসজ্জা, স্থাপত্যের…

অস্ট্রিয়ার আল্পসে জলের আয়না: স্নোহেটার “লেখ মাউন্টেন মিরর”

পাহাড়ের চূড়ায় উঠে চারপাশের দৃশ্য দেখতে আমরা সবাই পছন্দ করি। কিন্তু সেই দৃশ্যকে যদি পায়ের নিচে জলের ওপর…

ঘনবসতির আবাসন ও আধুনিক স্থাপত্য পরিকল্পনা

শহরে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে না আবাসনের জমি। এই বাস্তবতায় ঘনবসতিপূর্ণ নগরে সবার জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন…

চারদিকে পানি: বাংলাদেশের আবাসন কোন পথে?

একটি দেশের ভবিষ্যৎ অনেক সময় তার মানচিত্রেই লেখা থাকে। সেই লেখা বুঝতে হলে তাকাতে হয় পরিসংখ্যানের দিকে, নদীর…

ফর্ম, অর্ডার ও জীবন: বিংশ শতকের স্থাপত্যভাবনা

২০ শতকের স্থাপত্য কেমন হবে বা হওয়া উচিত তা নিয়ে অনেক আগেই দর্শনচর্চায় সাড়া ফেলেছে নানা তত্ত্ব। তারই…

নির্মাণ শ্রমিকের নিরাপত্তার জরুরি ১১ পদক্ষেপ

আমাদের চারপামে কত সুন্দর বাড়ি, ল্যান্ডস্কেপ আর নান্দনিক স্থাপনা। এর পেছ কার হাত? নি:সন্দেহে ইঞ্জিনিয়ার এবং আর্কিটেক্টদের নামই…

অজন্তা গুহা: পাথরের বুকে আঁকা প্রাচীন বুদ্ধের অনন্য নিদর্শন

ভারতের প্রাচীন স্থাপত্যের ইতিহাসে অজন্তা গুহা একটি অসাধারণ নাম। পাহাড়ের শক্ত পাথর কেটে তৈরি করা এই গুহাগুলো শুধু…

কুসুম্বা মসজিদ: বাংলার মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন

বাংলাদেশের প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শনগুলোর মধ্যে কুসুম্বা মসজিদ একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার কুসুম্বা গ্রামে অবস্থিত…

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

বাওয়ার দৃষ্টিতে স্বভূমি শ্রীলঙ্কার স্থাপত্য
Knap-of-Howar
রঙের ভাষায় ছয়টি ভবনের গল্প
অস্ট্রিয়ার আল্পসে জলের আয়না: স্নোহেটার “লেখ মাউন্টেন মিরর”
highrise
হাওর জীবন
ফর্ম, অর্ডার ও জীবন: বিংশ শতকের স্থাপত্যভাবনা
শ্রমিক
অজন্তা গুহা