অনেকের ধারণা, ভবনে বেশি রং ব্যবহার করলে ডিজাইনের গাম্ভীর্য আর বিশুদ্ধতা নষ্ট হয়। রং যেন কেবল সাজসজ্জা, স্থাপত্যের মূল বিষয় নয়। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি বই এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। বইটির নাম Chromatic Architecture, লেখক ডিজাইনার অ্যাডাম ন্যাথানিয়েল ফারম্যান ও ডিজেইন ম্যাগাজিনের লেখক কেট মাজাদে। প্রকাশক RIBA Publishing।
বইটি রং-কে দেখেছে স্থাপত্যের অবিচ্ছেদ্য উপাদান হিসেবে। ইতিহাসের বিভিন্ন সময় থেকে বেছে নেওয়া ৩৪টি উদাহরণে তারা দেখিয়েছেন, রং কীভাবে আবেগ, স্মৃতি ও স্বাতন্ত্র্য প্রকাশ করেছে। এই লেখায় সেই ৩৪টির মধ্য থেকে লেখকদের নিজেদের বেছে নেওয়া ছয়টি ভবনের কথা থাকছে।

রং নিয়ে বইটির ভাবনা
কেট মাজাদের মতে, রং ব্যবহারে গুরুত্ব পায় আবেগের গভীরতা, সংস্কৃতির প্রতি বোঝাপড়া এবং যাদের জন্য ভবন, সেই মানুষ ও জায়গার প্রতি সচেতনতা। ফারম্যান বলেন, অনেক স্থপতি ও ডিজাইনার মনে মনে রং ভালোবাসলেও তা নিয়ে খুব একটা কথা হয় না।
ফলে তারা নিজেদের কাজে রং ব্যবহার করতে দ্বিধায় ভোগেন। তাই বইটিকে তিনি দেখছেন এক ধরনের নম্র ও আমন্ত্রণমূলক ঘোষণাপত্র হিসেবে। উদ্দেশ্য হলো পেশাজীবীরা যেন সুচিন্তিত ও দক্ষ হাতে রং ব্যবহার করতে পারেন।

শাহ মসজিদ, ইসফাহান, ইরান (১৬২৯)
মসজিদের স্থপতি হলেন, আলী আকবর ইসফাহানি। ফারম্যানের মতে, চকচকে গ্লেজ করা টাইলস দিয়ে স্থানের আয়তন একই সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া ও সুনির্দিষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে এটি আজও চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত।
মসজিদের ভল্ট ও গম্বুজের জটিল জ্যামিতিক আকারের গায়ে নীল টাইলস ছড়িয়ে আছে। ফারম্যানের ভাষায় এতে অসীম বিস্তারের অনুভূতি তৈরি হয়, যেন সৃষ্টির একটি পুরো মহাবিশ্ব চোখের সামনে খুলে যাচ্ছে। এই ভবন দেখায়, রং কীভাবে একটি বিশাল পরিসরে আমাদের স্থানবোধ ও আবেগকে প্রভাবিত করতে পারে।

পালাউ দে লা মুসিকা কাতালানা, বার্সেলোনা, স্পেন (১৯০৮)
ভবনটির স্থপতি লুইস দোমেনেক ই মন্তানের। এখানে তিনি মোজাইক, মাইওলিকা (রঙিন চকচকে সিরামিক), স্টেইনড গ্লাস, পাথর ও ইট একসঙ্গে ব্যবহার করেছেন। ফারম্যান একে “টোটাল ওয়ার্ক অব আর্ট” ডিজাইনের এক পাঠশালা বলেছেন। অর্থাৎ ভবনের প্রতিটি অংশ মিলে একটি সামগ্রিক শিল্পকর্ম হয়ে ওঠে।
এখানে রং কাঠামো আর অলংকরণের মাঝের সীমারেখা মুছে দিয়েছে। একটি সর্বজনীন স্থান পরিণত হয়েছে উপকরণ, কারুশিল্প, আলো ও রঙের এক গয়নার বাক্সে।

গার্ডিয়ান বিল্ডিং, ডেট্রয়েট, যুক্তরাষ্ট্র (১৯২৯)
ভবনের স্থপতি উইর্ট সি. রোল্যান্ড। ফারম্যান একে আর্ট ডেকো ধারার বহুবর্ণ সজ্জার এক অনন্য মাস্টারপিস বলেছেন। আর্ট ডেকো হলো বিংশ শতকের শুরুর দিকের একটি জনপ্রিয় ডিজাইন ধারা।
এই ভবনের ভেতরে গ্লেজ করা টেরাকোটা (চকচকে আস্তরযুক্ত পোড়ামাটি) ও পাথর ব্যবহার করে একটি স্পন্দনশীল, ছন্দময় পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ফারম্যানের মতে, এটি প্রমাণ করে রং শুধু উপরে লাগানো আবরণ নয়, ভবনের প্রাণের অংশ হিসেবেও কাজ করতে পারে।

রিভার্সিবল ডেসটিনি লফটস, টোকিও, জাপান (২০০৫)
ভবনটির স্থপতি শুসাকু আরাকাওয়া ও ম্যাডেলিন গিনস। ফারম্যান বলেন, এই লফট অ্যাপার্টমেন্টগুলো গভীরভাবে বিপ্লবী। প্রচলিত ধারণা হলো, বাড়ি হবে একটি নিরপেক্ষ, অদলবদলযোগ্য সম্পদ এবং জীবনযাপনের শান্ত পটভূমি। এই ভবন সেই ধারণাকেই প্রশ্ন করে।
এখানে বিভ্রান্তিকর ও তীব্র বৈপরীত্যের রঙের ব্যবহার বাসিন্দাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে সজাগ থাকতে বাধ্য করে। ফারম্যানের কথায়, এটি দেখায় রং মানুষের সচেতনতা ও কর্মতৎপরতা বাড়ানোর অনুঘটক হতে পারে।

নেদারল্যান্ডস ইনস্টিটিউট ফর সাউন্ড অ্যান্ড ভিশন, হিলভারসাম, নেদারল্যান্ডস (২০০৬)
এই ভবনের স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান Neutelings Riedijk Architects। এই বড় ভবনের পুরো ফ্যাসাডজুড়ে রঙিন কাচ ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে নানা রঙের অসংখ্য ছটা দেখা যায়।
ফারম্যানের মতে, এটি প্রমাণ করে একটি সমকালীন ভবনে স্থাপত্যিক রং একই সঙ্গে প্রবল প্রভাব ফেলতে পারে এবং গভীরতায় অত্যন্ত পরিশীলিতও হতে পারে।

ক্রয়ডন কলোনেড, লন্ডন, যুক্তরাজ্য (২০২৩)
এটি স্বয়ং অ্যাডাম ন্যাথানিয়েল ফারম্যানের ডিজাইন করা প্রকল্প। তার ভাষায়, এটি এই তালিকায় তার নিজের অবদান। প্রকল্পটি দেখায়, হাতে তৈরি সিরামিক কীভাবে বিশাল পরিসরে জনপরিসরে প্রাণবন্ত ও স্পর্শযোগ্য রং এনে দিতে পারে।
ফারম্যানের মতে, এটি সচেতন একটি প্রচেষ্টা। গাঢ় রং ব্যবহার করে একটি সাধারণ শহুরে চলাচলের পথকে সম্মিলিত আনন্দ আর স্পর্শকাতর স্থাপত্যিক কৌতূহলের মুহূর্তে বদলে দেওয়া হয়েছে।
ছয়টি ভবন এসেছে ইরান, স্পেন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্য থেকে। সময়কালও ১৬২৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত। তবু সবার মধ্যে একটি সাধারণ সুর আছে: রং কোথাও স্থানের অনুভূতি বদলে দিয়েছে, কোথাও কাঠামো ও অলংকরণকে এক করেছে, কোথাও মানুষকে সজাগ করেছে, আবার কোথাও সাধারণ পথকে আনন্দের জায়গা বানিয়েছে।
বইটির লেখকদের আশা, এটি নির্মিত পরিবেশের চরিত্র গড়ে তুলতে রঙের ভূমিকা সম্পর্কে মানুষের উপলব্ধি বাড়াবে। আর যেসব স্থপতি ও ডিজাইনার নিজের কাজে আরও রং আনতে চান, তাঁদের জন্য এটি হবে একটি ব্যবহারিক নির্দেশিকা।
তথ্যসূত্র
ডিজেইন

















