• Home
  • নগরায়ন
  • ঘনবসতির আবাসন ও আধুনিক স্থাপত্য পরিকল্পনা
highrise

ঘনবসতির আবাসন ও আধুনিক স্থাপত্য পরিকল্পনা

শহরে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে না আবাসনের জমি। এই বাস্তবতায় ঘনবসতিপূর্ণ নগরে সবার জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন তৈরি করা স্থপতিদের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক আবাসন বা Social Housing পরিকল্পনায় জায়গার সর্বোচ্চ ব্যবহার, প্রাকৃতিক আলো-বাতাস, নির্মাণ ব্যয় এবং সামাজিক পরিসর—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে আধুনিক স্থাপত্যের বেশ কিছু পুরোনো ধারণা এখনো নতুনভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মডুলার নির্মাণ, প্রিফ্যাব্রিকেশন, উন্মুক্ত পরিকল্পনা, সমান সুযোগে আলো-বাতাস এবং যৌথ ব্যবহারের জায়গা—এসব ধারণা আধুনিক উচ্চঘনত্বের আবাসন পরিকল্পনায় নতুন মাত্রা পেয়েছে। আর্কডেইলির সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও দেখা যায়, ইউরোপের প্রাথমিক আধুনিকতাবাদী আবাসন থেকে পূর্ব এশিয়ার বর্তমান সামাজিক আবাসন পর্যন্ত এই ধারার প্রভাব রয়েছে।

আধুনিকতাবাদ ও ঘনবসতির সম্পর্ক

আধুনিকতাবাদী স্থাপত্যের লক্ষ্য শুধু ভবনের বাহ্যিক সৌন্দর্য পরিবর্তন করা ছিলো না। নতুন নির্মাণ প্রযুক্তি, উপকরণ এবং পরিকল্পনার মাধ্যমে বেশি মানুষের জন্য উন্নত আবাসন তৈরি করাও এর গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিলো।

বিশেষ করে আবাসিক স্থাপত্যে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জায়গার সম্পর্ক, মডুলার নির্মাণ এবং প্রিফ্যাব্রিকেশনের ধারণা পরবর্তীতে উচ্চঘনত্বের আবাসনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর মাধ্যমে একই ধরণের আবাসিক ইউনিট বারবার ব্যবহার করে দ্রুত ও তুলনামূলক কম খরচে বড় আবাসন প্রকল্প তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।

সিমেন্সস্টাট: সমতার একটি প্রাথমিক মডেল

জার্মানির বার্লিনে ১৯৩১ সালে সম্পন্ন সিমেন্সস্টাড্ট বসতি  আধুনিকতাবাদী সামাজিক আবাসনের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ওয়াল্টার গ্রোপিয়াস, হান্স শারুনসহ একাধিক স্থপতি এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এখানে ১,৩৫০টিরও বেশি সাশ্রয়ী অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি করা হয়েছিলো।

এই প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিলো প্রচলিত ঘন ব্লক ও অন্ধকার উঠানের পরিবর্তে খোলা বিন্যাস তৈরি করা। একই ধরণের আকারের আবাসন এবং আলো-বাতাসে সমান প্রবেশাধিকারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ স্থাপত্যকে সামাজিক সমতার একটি মাধ্যম হিসেবেও দেখা হয়েছিল।

এই ধারণাটি আজকের সামাজিক আবাসনেও গুরুত্বপূর্ণ। একই ভবনে বসবাস করলেও প্রত্যেক পরিবারের যেন পর্যাপ্ত আলো, বাতাস এবং মৌলিক বাসযোগ্যতা থাকে—এটি শুধু স্থাপত্যগত বিষয় নয়, সামাজিক ন্যায্যতার সঙ্গেও যুক্ত।

লে করবুসিয়ের ও ইউনাইট দ্য হ্যাবিটেশন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে আবাসনের ব্যাপক সংকট তৈরি হয়। এই পরিস্থিতিতে লে করবুসিয়েরের-ইউনাইট দ্য হ্যাবিটেশন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য পরীক্ষায় পরিণত হয়।

মার্সেইয়ের এই আবাসন প্রকল্পে উল্লম্বভাবে বহু পরিবারকে বসবাসের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি যৌথ ব্যবহারের জায়গা রাখা হয়েছিলো। ভবনের কেন্দ্রীয় সার্কুলেশন সিস্টেম দক্ষভাবে পরিকল্পনা করা হয় এবং আবাসিক ইউনিটগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছিলো যাতে আলো ও বাতাসের সুযোগ থাকে।

ছাদও শুধু ভবনের শেষ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়নি। এটিকে যৌথ স্থান হিসেবে ব্যবহার করার ধারণা ছিলো। ফলে ভবনটি শুধু একগুচ্ছ অ্যাপার্টমেন্ট নয়, বরং একটি উল্লম্ব এলাকা -এর ধারণা প্রকাশ করে।

পূর্ব এশিয়ায় আধুনিকতাবাদের নতুন রূপ

বর্তমানে সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান ও হংকংয়ের মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে আধুনিকতাবাদী আবাসন ধারণার প্রভাব বিশেষভাবে দেখা যায়। এসব শহরে জমির সংকট ও জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে বেশি উচ্চতার আবাসন প্রয়োজন হয়েছে।

হংকংয়ে দীর্ঘ সময় ধরে প্রমিত বহুতল ভবন বা পুনরাবৃত্ত টাওয়ার টাইপের আবাসন ব্যবহার করা হয়েছে। একই ধরণের ভবন বিভিন্ন এলাকায় পুনরায় ব্যবহার করে বড় পরিসরে আবাসন তৈরি করা হয়েছে। এর পেছনে ছিলো নির্মাণের দক্ষতা, খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং সীমিত জমিতে বেশি মানুষকে আবাসন দেওয়ার প্রয়োজন।

তবে শুধু ভবন পুনরাবৃত্তি করলেই ভালো সামাজিক আবাসন তৈরি হয় না। বিভিন্ন এলাকার জলবায়ু, মানুষের প্রয়োজন এবং সাইটের অবস্থা আলাদা। ফলে আধুনিক সামাজিক আবাসন এখন মানসম্মত টাওয়ারের পাশাপাশি অভিযোজনযোগ্য ইউনিট এবং নমনীয় পরিকল্পনার দিকে এগোচ্ছে।

আলো ও বায়ু: ঘন ভবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

উচ্চঘনত্বের আবাসনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো ছোট জায়গার মধ্যে থেকেও মানুষ কীভাবে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো ও বাতাস পাবে?

হংকংয়ের কিছু ধরণের গণ-আবাসনে বাথরুমকে এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে যাতে সরাসরি জানালার মাধ্যমে বায়ু চলাচল সম্ভব হয়। এর ফলে ভবনে মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশনের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা কমানো যায়। তবে এর কারণে ভবনের সম্মুখভাগ অনেক সময় অনিয়মিত বা অমসৃণ ও খাঁজকাটা আকার ধারণ করেছে।

তাই ঘনবসতির স্থাপত্যে সম্মুখভাগ শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়। জানালা, বায়ু চলাচলের পথ, বারান্দা এবং ভবনের ওরিয়েন্টেশন সবকিছু পরিবেশগত কর্মক্ষমতার অংশ।

মডুলার আবাসন থেকে অভিযোজনযোগ্য আবাসন

আধুনিকতাবাদী আবাসনে পুনরাবৃত্তি ছিলো একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। কিন্তু বর্তমান সময়ে একই নকশা সব জায়গায় প্রয়োগের পরিবর্তে জায়গা অনুযায়ী কিছু পরিবর্তনই  বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সিঙ্গাপুরের HDB এবং তাইওয়ানের সামাজিক আবাসনের কিছু উদাহরণে ব্যক্তিগত আবাসন ইউনিটকে একটি পরিবর্তনযোগ্য মডিউল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে সাইটের আকার, পরিবেশ ও মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী একই মূল ধারণাকে পরিবর্তন করা সম্ভব হয়।

এটি ভবিষ্যতের সামাজিক আবাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। কারণ একটি শহরের সব মানুষের জীবনযাপন একই নয়। পরিবারের আকার, বয়স, কাজ এবং সামাজিক প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে। তাই নমনীয় ফ্লোর প্ল্যান ভবনকে দীর্ঘ সময় ব্যবহারযোগ্য রাখতে পারে।

ভবনের ভেতরেও প্রয়োজন সামাজিক পরিসর

ঘনবসতিতে ব্যক্তিগত জায়গার পাশাপাশি সম্মিলিত খোলামেলা জায়গা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিঁড়িঘর, লবি, উঠান, ছাদ, সাম্প্রদায়িক হল এগুলো মানুষের সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্র হতে পারে।

তাইওয়ানের কিছু সামাজিক আবাসন প্রকল্পে সিঁড়িঘর ও লিফট লবির মতো অভ্যন্তরীণ সার্কুলেশন স্পেসকে বাইরের খোলা জায়গার কাছাকাছি রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। উলম্ব ফাকা জায়গার মাধ্যমে ভবনের গভীরে আলো ও বাতাস পৌঁছানোর ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যায়, স্থাপত্য আর শুধু “কয়েকটি ইউনিটেই তৈরি করা যাবে” এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এই ইউনিটগুলোর মানুষ কীভাবে একসঙ্গে বসবাস করবে সেটিও নকশার অংশ।

বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা কী?

ঢাকার মতো ঘনবসতির শহরে এই ধারণাগুলো বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তবে ইউরোপ বা পূর্ব এশিয়ার কোনো আবাসন মডেল সরাসরি বাংলাদেশে কপি করা একদমই উচিত হবে না। বাংলাদেশের জলবায়ু, পরিবারের আকার, সামাজিক কাঠামো, জমির ধরন এবং স্থানীয় নির্মাণপ্রযুক্তি বিবেচনায় নিয়ে মডেলগুলোকে পরিবর্তন করতে হবে।

বাংলাদেশের ঘন আবাসনে উঠান, ছায়াঘেরা বারান্দা, বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা, প্রাকৃতিক দিনের আলো, নমনীয় অ্যাপার্টমেন্ট বিন্যাস এবং সকলের জন্য উন্মুক্ত স্থান একসঙ্গে ব্যবহার করা যেতে পারে। একই সঙ্গে অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি প্রবেশপথ এবং পর্যাপ্ত খোলা জায়গাকে শুরু থেকেই পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।

ঘনবসতির জন্য আধুনিক স্থাপত্যের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো ঘনত্ব ও বাসযোগ্যতা একে অপরের বিপরীত নয়। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে সীমিত জায়গায়ও বেশি মানুষকে উন্নত আবাসন দেওয়া সম্ভব।

ভবিষ্যতের ঘনবসতি তাই শুধু উঁচু ভবনের শহর হবে না। এটি হতে পারে পরিকল্পিত, নমনীয়, পরিবেশবান্ধব এবং মানুষের জীবনকে কেন্দ্র করে তৈরি একটি উল্লম্ব নগরব্যবস্থা।

সূত্র: আর্কডেইলি

ছবি: আর্কডেইলি

https://www.archdaily.com/1026428/designing-for-density-how-modernist-principles-continue-to-shape-social-housing-solutions-today

Related Posts

অস্ট্রিয়ার আল্পসে জলের আয়না: স্নোহেটার “লেখ মাউন্টেন মিরর”

পাহাড়ের চূড়ায় উঠে চারপাশের দৃশ্য দেখতে আমরা সবাই পছন্দ করি। কিন্তু সেই দৃশ্যকে যদি পায়ের নিচে জলের ওপর…

চারদিকে পানি: বাংলাদেশের আবাসন কোন পথে?

একটি দেশের ভবিষ্যৎ অনেক সময় তার মানচিত্রেই লেখা থাকে। সেই লেখা বুঝতে হলে তাকাতে হয় পরিসংখ্যানের দিকে, নদীর…

ফর্ম, অর্ডার ও জীবন: বিংশ শতকের স্থাপত্যভাবনা

২০ শতকের স্থাপত্য কেমন হবে বা হওয়া উচিত তা নিয়ে অনেক আগেই দর্শনচর্চায় সাড়া ফেলেছে নানা তত্ত্ব। তারই…

নির্মাণ শ্রমিকের নিরাপত্তার জরুরি ১১ পদক্ষেপ

আমাদের চারপামে কত সুন্দর বাড়ি, ল্যান্ডস্কেপ আর নান্দনিক স্থাপনা। এর পেছ কার হাত? নি:সন্দেহে ইঞ্জিনিয়ার এবং আর্কিটেক্টদের নামই…