শহরের বড় ভবন সাধারণত প্রকৃতিকে সরিয়ে জায়গা করে নেয়। নেদারল্যান্ডসের রটারডামে এবার উল্টো ভাবনার একটি ডিজাইন বেছে নেওয়া হয়েছে। এখানে ভবনটি নিজেই একটি ভূদৃশ্যের মতো। সামাজিক উদ্যোগ প্রতিষ্ঠান “শিফট” (Shift) আয়োজিত আন্তর্জাতিক ডিজাইন প্রতিযোগিতায় জিতেছে বিখ্যাত স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান MVRDV (এমভিআরডিভি)। তাদের প্রস্তাবিত প্রকল্পের নাম “রটারডাম রকস!” (Rotterdam ROCKS!), আর ভবনটির নাম “শিফট এমব্যাসি” (Shift Embassy)।

প্রকল্পের পরিচয় ও অবস্থান
শিফট এমব্যাসি রটারডামের গড়ে ওঠা ওয়াটারকান্ট (Waterkant) এলাকায় একটি নতুন সাংস্কৃতিক গন্তব্য হিসেবে পরিকল্পিত। ডিজাইনটি স্থাপত্য ও ভূদৃশ্যের (ল্যান্ডস্কেপ) এক অনন্য মিশ্রণ। এতে থাকছে প্রদর্শনী স্থান, আতিথেয়তার সুবিধা, শিক্ষা কার্যক্রম, জনসাধারণের জন্য সুযোগ-সুবিধা এবং পরিবেশগত অবকাঠামো। আর এ সবই থাকছে একটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ভবনে। শিফটের লক্ষ্য দর্শনার্থীদের পরিবেশ ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে সচেতন করা, আর ভবনটি সেই লক্ষ্যকে সমর্থন করবে।
ওয়াটারকান্ট নিজেও একটি বড় নগর উন্নয়ন প্রকল্প। এটি মাস (Maas) নদীর দক্ষিণ তীরে গড়ে উঠছে। সেখানে ৩,৭৫০টি বাসস্থানের পাশাপাশি স্কুল, কর্মস্থল, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও জনস্থান থাকার পরিকল্পনা আছে।

ডিজাইন ভাবনা: সাতটি “পাথর”
ডিজাইনে ভবনটি সাতটি স্তূপীকৃত, পাথরের মতো আকৃতির ভলিউম (ভবনের আলাদা আলাদা খণ্ড)। এগুলো সাজানো হয়েছে ভেতরের ও বাইরের চলাচলপথের একটি জালিকাকে ঘিরে। পাশের নদীতীরের ভূদৃশ্যকে এখানে ঊর্ধ্বমুখীভাবে, অর্থাৎ ওপরের দিকে বাড়ানো হয়েছে। এর মাধ্যমে তৈরি হয়েছে গাছপালাযুক্ত টেরাস, দৃশ্য দেখার জায়গা, জলাধার এবং সবার জন্য উন্মুক্ত পথ। সব মিলিয়ে বাইরের ও ভেতরের স্থানের একটি নিরবচ্ছিন্ন ক্রম তৈরি হয়।
ভবনের সম্মুখভাগ বা ফাসাদ সছিদ্র (porous) ধরনের। এতে থাকছে খাঁজ ও গর্ত, যেগুলো গাছপালা বাঁচিয়ে রাখা, পানি ধরে রাখা এবং শহুরে জীববৈচিত্র্যের বাসস্থান হিসেবে কাজ করার জন্য ভাবা হয়েছে।

ভেতরে কী থাকছে
ভবনের কেন্দ্রীয় আকর্ষণ “দ্য এলিসিয়াম” (The Elysium)। “এলিসিয়াম” শব্দটি এসেছে গ্রিক পুরাণ থেকে। গ্রিক বিশ্বাসে এলিসিয়াম বা “এলিসিয়ান ফিল্ডস” হলো মৃত্যুর পর বীর ও পুণ্যবান মানুষের আত্মার চিরশান্তির স্থান, অর্থাৎ এক ধরনের স্বর্গ বা পরমানন্দের লোক। ইংরেজিতে “Elysium” বলতে সাধারণভাবে আদর্শ সুখের জায়গা বা পরিপূর্ণ আনন্দের অবস্থাও বোঝায়। তাই ভবন, হোটেল বা আবাসন প্রকল্পের নাম হিসেবে “দ্য এলিসিয়াম” নামটি ইঙ্গিত দেয়: স্বর্গের মতো সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ একটি জায়গা।
এটি ৫,০০০ বর্গমিটারের একটি ইমার্সিভ প্রদর্শনী অভিজ্ঞতা। সাধারণ প্রদর্শনীর বদলে এখানে শিল্প, গল্প বলা ও ইন্টার্যাকটিভ স্থাপনার মাধ্যমে ভবিষ্যতের নানা সম্ভাব্য দৃশ্যপট তুলে ধরা হবে।
এ ছাড়া ভবনে থাকবে:
- ২০০ কক্ষের একটি হোটেল
- শিক্ষামূলক স্থান
- সম্মেলন ও অনুষ্ঠানের সুবিধা
- খাবার ও পানীয়র জায়গা
- কমিউনিটির জমায়েতের স্থান
- একটি অবজারভেশন ডেক
শিফটের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, স্থাপত্য ও জনসম্পৃক্ততাকে একসূত্রে গাঁথবে। আলোচ্য বিষয় পাঁচটি: জলবায়ু, জ্বালানি, জীববৈচিত্র্য, যাতায়াতব্যবস্থা ও সার্কুলারিটি, অর্থাৎ বর্জ্য কমিয়ে উপকরণ বারবার ব্যবহারের ধারণা।

নির্মাণ ও টেকসই প্রযুক্তি
ডিজাইনে ব্যবহারের কথা ভাবা হয়েছে পুনর্ব্যবহৃত স্টিল, কম কার্বনযুক্ত কংক্রিট, জৈব উপাদানভিত্তিক উপকরণ এবং সার্কুলার নির্মাণপদ্ধতি। পাশাপাশি রোবটিক ফ্যাব্রিকেশন ও বড় আকারের থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তিও পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।
MVRDV প্রস্তাব করেছে, নির্মাণ প্রক্রিয়াটিকে একটি চলমান পরীক্ষা হিসেবে নথিবদ্ধ করা হবে। ফলে ভবনটি কম কার্বনের নির্মাণকৌশল ও নতুন উপকরণ যাচাইয়ের একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠবে। স্থপতিরা পরিবেশগত ব্যবস্থাগুলো অবকাঠামোর ভেতরে লুকিয়ে না রেখে দর্শনার্থীদের সামনে দৃশ্যমান রাখতে চান। একটি মনিটরিং ব্যবস্থায় দেখানো হবে শক্তি ব্যবহার, পানিচক্র, জীববৈচিত্র্য, গাছপালা এবং উপকরণের কার্যকারিতার রিয়েল-টাইম তথ্য। ডিজাইন দলের মতে, এতে প্রযুক্তি, নীতিমালা ও পরিবেশজ্ঞান বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে ভবনটিও সময়ের সঙ্গে বিকশিত হতে পারবে।

প্রতিযোগিতার ধাপ
শিফট এমব্যাসির প্রতিযোগিতা শুরু হয় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে। এটি ছিল দুই ধাপের আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া। যেখানে স্থাপত্য, প্রকৌশল, বাস্তুবিদ্যা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের সমন্বয়ে প্রস্তাব দিতে বহুমুখী দলগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। প্রথম ধাপে জমা পড়ে ৮০টি প্রস্তাব। এর মধ্য থেকে পাঁচটি চূড়ান্ত দল বাছাই হয়:
- ইকোসিস্টেমা উরবানো (Ecosistema Urbano)
- হেদারউইক স্টুডিও (Heatherwick Studio)
- মেকানু (Mecanoo)
- এমভিআরডিভি (MVRDV)
- অফিস ফর পলিটিক্যাল ইনোভেশন (Office for Political Innovation)
চূড়ান্ত প্রস্তাব উপস্থাপিত হয় ২০২৬ সালের মার্চে। যাচাই প্রক্রিয়া ও প্রি-ডিজাইন পর্বের পর শিফট বিজয়ী হিসেবে বেছে নেয় এমভিআরডিভির নেতৃত্বাধীন দলটিকে। দলে আছে আরুপ (Arup), আরকাডিস (Arcadis), ডিজিএমআর (DGMR), স্টুডিও বের্টেলস (Studio Bertels) এবং যোরিস লার্মান ল্যাবস (Joris Laarman Labs)। পরিমার্জিত ডিজাইনটি এখন উপস্থাপন করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের শরৎকালে (ইউরোপের অটাম মৌসুম) একটি জনসম্পৃক্ততা প্রক্রিয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

শিফট এমব্যাসির ডিজাইনে ভবনকে শুধু ব্যবহারের জায়গা হিসেবে দেখা হয়নি। এটি একই সঙ্গে প্রকৃতির ধারক, পরীক্ষাগার এবং সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যম হিসেবে ভাবা হয়েছে। নির্মাণপ্রক্রিয়া নথিবদ্ধ করা এবং পরিবেশগত তথ্য প্রকাশ্যে দেখানোর প্রস্তাব দুটি এর বিশেষ দিক।
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও পরিবেশগত চাপে থাকা দেশের স্থপতি ও শিক্ষার্থীদের কাছে এটি একটি ভাবনার খোরাক হতে পারে। জনপরিসর, সবুজ অবকাঠামো ও নির্মাণ উপকরণের প্রশ্নে ভবনকে কীভাবে শহরের পরিবেশের অংশ করে তোলা যায়, এই প্রকল্প তার একটি আন্তর্জাতিক উদাহরণ। তবে এটি এখনো ডিজাইন পর্যায়ে আছে, নির্মিত ভবন নয়। জনমত প্রক্রিয়ার পর ডিজাইন কতটা বদলায় এবং বাস্তবে কী রূপ নেয়, তা দেখার অপেক্ষা।
তথ্যসূত্র
আর্কডেইলি

















