সমুদ্রের নিচ দিয়ে টানেল খোঁড়া মানেই বিশাল পরিমাণ মাটি ও পাথর তুলে ফেলা আর এই বাড়তি মাটি সাধারণত ফেলনা বর্জ্য হিসেবেই গণ্য হয়। কিন্তু ডেনমার্কে চলমান ফেমার্নবেল্ট টানেল প্রকল্পে এই “বর্জ্য” মাটিকেই কাজে লাগিয়ে দেশের দক্ষিণ উপকূলে প্রায় ৩ লাখ বর্গমিটার, অর্থাৎ প্রায় ৪২টি ফুটবল মাঠের সমান নতুন ভূমি তৈরি করা হয়েছে।
এই কৃত্রিম ভূমিকে ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক এক দর্শনীয় স্থান হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো নদীভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে লড়াই করা দেশের জন্যও এই প্রকল্প এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হতে পারে যে কীভাবে অবকাঠামো নির্মাণের উপজাত বস্তুকে পরিবেশবান্ধব উপায়ে কাজে লাগানো যায়।
ফেমার্নবেল্ট টানেল: বিশ্বের দীর্ঘতম সড়ক-রেল টানেল
ফেমার্নবেল্ট টানেল হলো ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সড়ক ও রেলপথ সংযুক্ত টানেল। যা সম্পন্ন হলে এটি হবে এ ধরনের সবচেয়ে দীর্ঘ টানেল। এটি নির্মাণ করা হচ্ছে ডেনমার্ক ও জার্মানিকে সংযুক্ত করার জন্য, যাতে মূল ইউরোপ ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ার মধ্যে যোগাযোগ আরও সহজ হয়।
ডেনমার্কের রডবিহাভন (Rødbyhavn) থেকে জার্মানির পুটগার্ডেন (Puttgarden) পর্যন্ত এই টানেল সংযোগ স্থাপন করবে, এবং ২০২৯ সালের মধ্যে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
টানেলটি তৈরি হবে ৮৯টি বিশাল কংক্রিট উপাদান দিয়ে, প্রতিটির দৈর্ঘ্য ২১৭ মিটার এবং ওজন ৭৩ হাজার টন। এই বিশাল অংশগুলোকে সমুদ্রতলে খনন করা একটি কৃত্রিম খাঁদে ডুবিয়ে জোড়া লাগানো হবে। প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে হামবুর্গ থেকে কোপেনহেগেন পর্যন্ত ট্রেন যাত্রার সময় কমে দাঁড়াবে মাত্র আড়াই ঘণ্টায়।

সমুদ্রতলের মাটি থেকে নতুন উপকূলীয় ভূমি
টানেল নির্মাণের জন্য সমুদ্রতল থেকে যে বিপুল পরিমাণ মাটি ও পলি খনন করা হয়েছে, তা ফেলে না দিয়ে রডবিহাভন উপকূলে পুনর্ব্যবহার করে প্রায় ৩ লাখ বর্গমিটার আয়তনের একটি কৃত্রিম ভূমি গড়ে তোলা হয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন সংস্থা সুন্ড অ্যান্ড বেল্ট (Sund & Bælt), যারা এই প্রকল্পের উন্নয়নের দায়িত্বে রয়েছে, জানিয়েছে যে এই ভূমি দর্শনার্থীদের জন্য এক ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে। প্রকল্প ব্যবস্থাপক দিতে হইয়র্ত (Ditte Hjort) জানান, সমুদ্রতল থেকে তোলা উপাদান পুনর্ব্যবহার করে এমন একটি এলাকা তৈরি করা হয়েছে যেখানে দর্শনার্থীরা স্বতন্ত্র উপকূলীয় প্রকৃতি উপভোগ করতে পারবেন থাকবে হাঁটার পথ, পুকুর এবং পাখি, উভচর প্রাণী ও পোকামাকড়সহ নানা বন্যপ্রাণী।
তিনি আরও বলেন, এই নতুন এলাকার বিশেষত্ব হলো দর্শনার্থীরা একদম শুরু থেকেই প্রকৃতির ধীরে ধীরে বিকশিত হওয়ার প্রক্রিয়া নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করতে পারবেন, যেখানে লবণাক্ত জলাভূমি ও বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদ-প্রাণীজগৎ গড়ে উঠবে।
দেশীয় উদ্ভিদে ঢেকে যাবে নতুন এই ভূমি
নতুন যুক্ত হওয়া এই ৩ লাখ বর্গমিটার জমিতে ডিজাইন করা হয়েছে তিনটি পুকুর, পাশাপাশি এমন গাছপালা রোপণ করা হবে যা কঠোর উপকূলীয় আবহাওয়া সহ্য করতে সক্ষম। টানেলের জন্য একটি কারখানা নির্মাণের সময় যে মাটি খনন করা হয়েছিল, তাও এই এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই মাটিতে থাকা উদ্ভিদের বীজ থেকেই আশা করা হচ্ছে নতুন এই ভূখণ্ডে প্রাণ ফিরে আসবে।
প্রকল্পের প্রেক্ষাপট ও বিলম্ব
ডেনমার্ক ও জার্মানির মধ্যে এই টানেল নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ২০০৮ সালে। তবে ফেরি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ও পরিবেশ সংরক্ষণ সংগঠনগুলোর বিরোধিতার কারণে প্রকল্পটি দীর্ঘদিন বিলম্বিত হয়েছিল।
উল্লেখ্য, ডেনমার্কে আরও কয়েকটি কৃত্রিম দ্বীপ প্রকল্প চলমান রয়েছে কোপেনহেগেন বন্দরের কাছে লাইনেটহোলম (Lynetteholm) নামের একটি কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণাধীন, যেখানে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষের বসবাসের ব্যবস্থা হবে এবং যা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা হিসেবেও কাজ করবে।
এছাড়া আরবান পাওয়ার (Urban Power) স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান কোপেনহেগেনের কাছে হোলমেনে (Holmene) নামে নয়টি কৃত্রিম দ্বীপ ডিজাইন করছে, যা ভবিষ্যতে একটি টেকসই প্রযুক্তি হাব হয়ে উঠবে বলে পরিকল্পনা করা হয়েছে।

ফেমার্নবেল্ট টানেল প্রকল্পটি কেবল একটি যোগাযোগ অবকাঠামো নয়, এটি দেখিয়ে দিচ্ছে কীভাবে বৃহৎ নির্মাণ প্রকল্পের উপজাত উপাদানকে সৃজনশীলভাবে পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণের কাজে লাগানো যায়।
সমুদ্রতল থেকে তোলা মাটি ফেলে না দিয়ে তা দিয়ে নতুন এক প্রাকৃতিক আবাসস্থল গড়ে তোলার এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশের অবকাঠামো প্রকল্পের জন্যও একটি অনুকরণীয় মডেল হয়ে উঠতে পারে।
২০২৯ সালে টানেলটি চালু হলে ইউরোপের যোগাযোগ ব্যবস্থায় যেমন নতুন মাত্রা যোগ হবে, তেমনি রডবিহাভনের এই নতুন উপকূলীয় প্রকৃতি এলাকাও পরিণত হতে পারে এক অনন্য পর্যটন ও গবেষণাকেন্দ্রে।
তথ্যসূত্র
ডিজেইন
















