যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের শেরম্যান ওকস এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি ব্যতিক্রমী ব্রুটালিস্ট অফিস ভবন এবার নতুন পরিচয় পেতে যাচ্ছে। একসময় এটি ছিল সানকিস্ট গ্রোয়ার্সের প্রধান কার্যালয়। ১৯৭১ সালে স্থপতি এ.সি মার্টিনের নকশায় নির্মিত এই ভবনটি কংক্রিটের বিশাল কাঠামো এবং উল্টো পিরামিডের মতো আকৃতির জন্য দীর্ঘদিন ধরে এলাকার একটি পরিচিত স্থাপত্য নিদর্শন। বর্তমানে ভবনটিকে ভেঙে ফেলার পরিবর্তে সেখানে ৯৫টি আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে।
উল্টো পিরামিডের মতো ভবন
প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার বর্গফুট আয়তনের ভবনটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো এর আকৃতি। সাধারণ ভবনের মতো নিচ থেকে ওপরের দিকে ছোট না হয়ে এর ওপরের তলাগুলো ধীরে ধীরে বাইরের দিকে এগিয়ে এসেছে। ফলে পুরো ভবনটিকে দূর থেকে একটি উল্টো পিরামিডের মতো দেখায়।
এই নকশা শুধু সৌন্দর্যের জন্য তৈরি হয়নি। দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার তীব্র সূর্যের আলো বিবেচনা করেও ভবনটির নকশা করা হয়েছিল। ওপরের দিকে বেরিয়ে থাকা তলাগুলো নিচের জানালাগুলোকে সরাসরি সূর্যের আলো থেকে কিছুটা সুরক্ষা দেয়। একই সঙ্গে ভবনের ভেতরে প্রাকৃতিক আলো প্রবেশের সুযোগ থাকে। এ কারণে ভবনটির ব্রুটালিস্ট নকশা একই সঙ্গে শক্তিশালী ও কার্যকর।

সানকিস্টের ঐতিহাসিক সম্পর্ক
ভবনটির গুরুত্ব শুধু স্থাপত্যে সীমাবদ্ধ নয়। সানকিস্ট গ্রোয়ার্স দীর্ঘ সময় ধরে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার কৃষি ও সাইট্রাস শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে এই সদর দপ্তরটি সেই অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি ও করপোরেট ইতিহাসেরও একটি অংশ হয়ে ওঠে।
তবে সময়ের সঙ্গে ভবনটির ব্যবহার পরিবর্তিত হয়। সানকিস্ট ২০১২ সালে ভবনটি ছেড়ে যায় এবং ২০১৫ সালের পর এটি খালি পড়ে থাকে। ১৯৯৪ সালের নর্থরিজ ভূমিকম্পেও ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরবর্তীতে ভবনটির মালিক আইএমটি রেসিডেন্সিয়াল এটিকে ভেঙে ফেলার পরিবর্তে সংরক্ষণ করে নতুনভাবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করে।
ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃতি
ভবনটির স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে লস অ্যাঞ্জেলেস কর্তৃপক্ষ এটিকে ঐতিহাসিক-সাংস্কৃতিক স্মৃতিস্তম্ভ নং ১৩১৪ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর ফলে ভবনটির ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন ব্যবহার নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এ ধরনের পদ্ধতিকে বলা হয় অভিযোজিত পুনর্ব্যবহার। অর্থাৎ পুরোনো কোনো ভবন সম্পূর্ণ ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণ না করে বিদ্যমান কাঠামোকে নতুন প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা। পুরোনো অফিস ভবনকে আবাসিক ভবনে রূপান্তর এই ধারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে।
৯৫টি নতুন অ্যাপার্টমেন্ট
পরিকল্পনা অনুযায়ী ভবনটিতে মোট ৯৫টি অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি করা হবে। এসব আবাসনের আকার হবে প্রায় ৫১৬ বর্গফুটের স্টুডিও থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২,৩১৬ বর্গফুটের তিন-বেডরুমের ইউনিট পর্যন্ত। কে এফ এ এই আবাসিক রূপান্তরের নকশা করছে।
ভবনের বড় ফ্লোর প্লেট এবং অস্বাভাবিকভাবে উঁচু ছাদ নতুন আবাসিক নকশায় বিশেষ সুবিধা দেবে। নিচের একটি অংশে প্রায় ১৯ ফুট উঁচু ছাদ রয়েছে। এই জায়গায় কিছু অ্যাপার্টমেন্টে মেজানাইন লফট এবং বাইরে যাওয়ার জন্য প্যাটিও তৈরির সুযোগ থাকবে।
অর্থাৎ পুরোনো অফিস ভবনের বৈশিষ্ট্যগুলোকে ঢেকে ফেলার পরিবর্তে সেগুলোকে নতুন আবাসিক নকশার অংশ হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
নতুন সুবিধা ও অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন
ভবনটির নিচের অংশে একসময় সানস্কিটের প্রিন্ট শপ, ল্যাবরেটরি এবং ৪৫টি গাড়ির জন্য নির্বাহী পার্কিং ছিল। নতুন পরিকল্পনায় এসব জায়গার কিছু অংশ আবাসিক সুবিধায় রূপান্তর করা হবে।
পরিকল্পিত সুবিধার মধ্যে রয়েছে ওয়েলনেস স্পা, ইনফ্রারেড সনা, কোল্ড প্লাঞ্জ, কো-ওয়ার্কিং স্পেস এবং ব্যক্তিগত গ্যারেজ। ফলে ভবনটি শুধু থাকার জায়গা নয়, বরং আধুনিক আবাসিক জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সুবিধার সমন্বিত একটি কমপ্লেক্সে পরিণত হবে।
ভবনের কেন্দ্রীয় উঠানেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। সেখানে ছায়ার জন্য বিশেষ ক্যানোপি, নতুন আলো, ল্যান্ডস্কেপিং ও ফোয়ারা যুক্ত করা হয়েছে। ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় কিছু অসমমিত টেরেস বক্সকে ব্যালকনি হিসেবেও ব্যবহার করা হবে।
সংরক্ষণ ও টেকসই স্থাপত্য
এই প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো পুরোনো কাঠামো পুনর্ব্যবহার করা। একটি বড় কংক্রিট ভবন ভেঙে নতুন ভবন তৈরি করলে বিপুল পরিমাণ নির্মাণসামগ্রী অপচয় হতে পারে। বিদ্যমান কাঠামো ব্যবহার করলে সেই অপচয়ের একটি বড় অংশ এড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে ভবনে ইতিমধ্যে ব্যবহৃত উপকরণের এমবডিড কার্বনও ধরে রাখা যায়।
ভবনটির প্রাথমিক পুনর্বাসনের সময় কাঠামোর বাইরের অংশ, ভূমিকম্প-নিরাপত্তা এবং জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থা উন্নত করা হয়েছে। ফলে ঐতিহাসিক স্থাপত্য ধরে রাখার পাশাপাশি আধুনিক নিরাপত্তার প্রয়োজনও বিবেচনা করা হচ্ছে।

অভিযোজিত পুনর্ব্যবহারের নতুন উদাহরণ
লস অ্যাঞ্জেলেসের নতুন অভিযোজিত পুনর্ব্যবহার অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে শহরের ডাউনটাউনের বাইরেও পুরোনো বাণিজ্যিক ভবনকে আবাসনে রূপান্তরের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। সানস্কিট ভবনের প্রকল্পটি এই পরিবর্তিত নিয়মের অধীনে প্রথম দিকের আবাসিক রূপান্তরগুলোর একটি হতে পারে।
তবে প্রকল্পটি এখনো প্রস্তাবিত পর্যায়ে রয়েছে। আবাসিক পরিকল্পনার অনুমোদন পাওয়ার পর নির্মাণকাজ শুরু করার কথা জানিয়েছে আইএমটি আবাসিক। সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এই প্রকল্প দেখাতে পারে, কীভাবে একটি পুরোনো অফিস ভবন তার ঐতিহাসিক চরিত্র ধরে রেখেও আধুনিক আবাসিক ব্যবহারের উপযোগী হয়ে উঠতে পারে।
একসময় যে ভবন ছিল একটি কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর, ভবিষ্যতে সেটিই হতে পারে মানুষের বসবাসের ঠিকানা। এই পরিবর্তন শুধু একটি ভবনের ব্যবহার বদল নয়। পুরোনো স্থাপত্যকে নতুন জীবন দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
সূত্র: আর্কিটেক্ট ম্যাগাজিন




















