ইতালির মিলান শহর ফ্যাশন, শিল্প ও স্থাপত্যের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এবার সেই শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনার ভেতরেই নতুন এক আকর্ষণ যোগ করেছে ইতালীয় বিলাসবহুল ফ্যাশন ব্র্যান্ড প্রাডা। প্রাডা গ্যালারিয়া নামে নতুন এই প্রকল্পটি আটটি তলা জুড়ে তৈরি করা হয়েছে।
এখানে শুধু পোশাক ও পণ্যের দোকান নেই। বরং ফ্যাশন, শিল্প, ইতিহাস, আর্কাইভ, আতিথেয়তা, খাবার এবং সমসাময়িক সংস্কৃতিকে একই অভিজ্ঞতার মধ্যে যুক্ত করা হয়েছে।
প্রাডা গ্যারারিয়ার অবস্থান মিলানের বিখ্যাত গালেরিয়া ভিত্তোরিও এমানুয়েলের ভেতরে। এই জায়গাটির সঙ্গে প্রাডার ইতিহাস সরাসরি জড়িত। ১৯১৩ সালে এখানেই ফ্রাতেল্লি প্রাডা তাদের প্রথম দোকান শুরু করেছিলো। অর্থাৎ, এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর একই ঐতিহাসিক ঠিকানাকে নতুনভাবে সাজিয়ে প্রাডা তার অতীত ও বর্তমানকে এক জায়গায় নিয়ে এসেছে। প্রকল্পটি ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য খোলার কথা রয়েছে।
আট তলায় প্রাডার সম্পূর্ণ জগৎ
প্রাডা গ্যালারিয়ার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর উল্লম্ব বিন্যাস। প্রকল্পটি শুধু ওপরের দিকে বিস্তৃত হয়নি। ভবনের নিচের অংশও ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে ঐতিহাসিক গ্যালারির ভেতরে একটি নতুন ভূগর্ভস্থ পরিসর তৈরি হয়েছে।
প্রাডা ডোনা স্টোরকে নিচের দিকে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এতে নারীদের পোশাকের পাশাপাশি ভ্রমণ, হোম ও বিউটি পণ্যের জন্য আরও বড় জায়গা তৈরি হয়েছে। ঐতিহাসিক দেয়ালচিত্র এবং আর্কাইভের বিভিন্ন উপাদানও ভেতরের নকশার সাথে যুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে গ্যালারিয়ার বিপরীত পাশে থাকা প্রাডা উওমো স্টোরের সঙ্গে ভূগর্ভস্থ একটি নতুন সংযোগ তৈরি করা হয়েছে। এই সংযোগের নাম ‘গোপন পথ’।
তবে এই পথটি শুধু এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার রাস্তা নয়। এর ভেতরেই প্রাডার ইতিহাসের কিছু কম পরিচিত অধ্যায় তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের শুরুর সময়ের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ ‘প্রথম’ উদ্যোগগুলো এখানে প্রদর্শনের মাধ্যমে ব্র্যান্ডটির দীর্ঘ যাত্রাকে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রাডাস্ফিয়ারে এক শতাব্দীর ইতিহাস
প্রাডা গ্যালারিয়ার অন্যতম আকর্ষণ হলো প্রাডাস্ফিয়ার। এটি প্রাডার ইতিহাসকে কেন্দ্র করে তৈরি প্রথম স্থায়ী প্রদর্শনী। এখানে ১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠার সময় থেকে বর্তমান পর্যন্ত ব্র্যান্ডটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ও আর্কাইভ সংরক্ষণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দর্শক শুধু প্রাডার বর্তমান ফ্যাশেই দেখবেন না। প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যাত্রার সঙ্গেও পরিচিত হতে পারবেন।
এর আগে প্রাডাস্ফিয়ারের অস্থায়ী প্রদর্শনী লন্ডন, হংকং ও সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। এবার মিলানে এটি স্থায়ী পরিসর পেয়েছে প্রাডাস্ফিয়ার। ফলে প্রাডার ইতিহাসকে একটি প্রচলিত জাদুঘরের মতো কাচের বাক্সে আটকে না রেখে বিভিন্ন কক্ষ, পথ ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ফ্যাশনের সঙ্গে মিলানের পেস্ট্রি সংস্কৃতি
প্রাডা গ্যালারিয়াতে ফ্যাশনের পাশাপাশি মিলানের স্থানীয় সংস্কৃতিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর একটি বড় উদাহরণ মার্কেসি ১৮২৪। প্রাডার ঐতিহ্যবাহী এই পেস্ট্রি ও ক্যাফে ব্র্যান্ড প্রকল্পটির অংশ হয়েছে।
এখানে দর্শক কেনাকাটার পাশাপাশি মিলানের খাবার ও ক্যাফে সংস্কৃতির স্বাদ নিতে পারবেন। ফলে প্রাডা গ্যালারিয়া কেবল একটি শপিং স্পেস হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এটি ধীরে ধীরে একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গন্তব্যে পরিণত হচ্ছে।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার জন্য স্টুডিও এবং অ্যাপার্টমেন্ট
প্রকল্পটির আরও উপরের তলাগুলোর অভিজ্ঞতা আরও ব্যক্তিগত হয়ে ওঠতে পারে। স্টুডিও অংশটি ব্যক্তিগত অ্যাপয়েন্টমেন্টের মাধ্যমে বিশেষ শপিংয়ের জন্য তৈরি করা হয়েছে। কক্ষগুলো অনেকটা ব্যক্তিগত স্যালনের মতো সাজানো এবং একটি কেন্দ্রীয় হল ব্যক্তিগত অনুষ্ঠান আয়োজনেও ব্যবহার করা যায়।
এর পরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো অ্যাপার্টমেন্ট। এখানে ১৮ শতকের ইতালীয় ঘরবাড়ির আবহ তৈরি করা হয়েছে। পুরোনো ইতালীয় আসবাবের সঙ্গে সমসাময়িক ফটোগ্রাফি যুক্ত করা হয়েছে। ফটোগ্রাফার আন্দ্রেয়াস গুরস্কি নিজের কাজের একটি প্রদর্শনীও এই জায়গার জন্য তৈরি করেছেন। ঐতিহাসিক অন্দর এবং আধুনিক শিল্পের এই সংমিশ্রণ জায়গাটিকে একটি অনন্য চরিত্র দিয়েছে। অ্যাপার্টমেন্ট মূলত আমন্ত্রিত অতিথি, ব্যক্তিগত ডিনার ও বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহৃত হবে।
শিল্প ও প্রযুক্তির দিকে নতুন দৃষ্টি
প্রাডা গ্যালারিয়ার ওপরের অংশে রয়েছে ওসেরভাতোরিও ফন্দাৎসিওনে প্রাদা। এখানে প্রযুক্তি, সমসাময়িক সংস্কৃতি এবং ভিজ্যুয়াল আর্টের সংযোগ নিয়ে কাজ করার সুযোগ থাকবে। ফলে প্রকল্পটির পরিসর শুধু ফ্যাশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বরং নতুন ধরণের শিল্প ও ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতার জন্যও একটি জায়গা তৈরি হচ্ছে।
সব মিলিয়ে প্রাডা গ্যালারিয়া একটি সাধারণ ফ্যাশন স্টোরের ধারণাকে অনেকটাই পরিবর্তন করেছে। এখানে দোকান, আর্কাইভ, প্রদর্শনী, ক্যাফে, ব্যক্তিগত স্যালন, শিল্প এবং সাংস্কৃতিক গবেষণার জায়গা একই ধারাবাহিকতায় যুক্ত হয়েছে। আটটি তলা ধরে দর্শক যেন প্রাডার অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত একটি যাত্রার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে পারেন—প্রকল্পটির মূল ধারণা অনেকটা সেদিকেই।
মিলানের ঐতিহাসিক গালেরিয়া ভিত্তোরিও এমানুয়েলের সঙ্গে প্রাডার ১৯১৩ সালের সম্পর্ককে নতুনভাবে তুলে ধরার মাধ্যমে প্রাডা গ্যালারিয়া তাই শুধু একটি নতুন বাণিজ্যিক ঠিকানা নয়। এটি একটি ব্র্যান্ড। কীভাবে তার ইতিহাস, স্থাপত্য, শিল্প ও সংস্কৃতিকে একত্র করে সমকালীন অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে, তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
সূত্র: ডিজাইনবুম
















