শহরের পার্ক, বাগান, প্লাজা, রাস্তার পাশের সবুজ এলাকা—এসবকে আমরা সাধারণত পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের অংশ হিসেবে দেখি। গাছপালা ও সবুজ জায়গা শহরের তাপ কমাতে, বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে এবং মানুষের জন্য আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু একটি ল্যান্ডস্কেপ প্রকল্প তৈরি করতে গিয়ে যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হয়, সেটি অনেক সময় আমাদের নজরের বাইরেই থেকে যায়।
এই সমস্যার দিকে এখন নতুনভাবে নজর দিচ্ছে ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেকচার ক্ষেত্র। আমেরিকান সোসাইটি অফ ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেক্টস (ASLA) ল্যান্ডস্কেপ প্রকল্পের কার্বন প্রভাব পরিমাপের জন্য একটি নতুন নির্দেশিকা তৈরি করেছে। এর উদ্দেশ্য হলো একটি প্রকল্পে কত কার্বন তৈরি হচ্ছে এবং প্রকল্পের গাছ, মাটি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান কত কার্বন ধরে রাখতে পারছে—দুই দিকই হিসাব করা।
ল্যান্ডস্কেপ প্রকল্পে কার্বন কোথা থেকে আসে?
একটি পার্ক বা বাগান তৈরি করার সময় শুধু গাছ লাগানো হয় না। সেখানে মাটি খনন, মাটি পরিবহন, পাথর ও কংক্রিট ব্যবহার, পথ তৈরি, বসার জায়গা নির্মাণ এবং বিভিন্ন অবকাঠামো স্থাপন করা হয়। এসব কাজের সঙ্গে জ্বালানি ও নির্মাণসামগ্রী জড়িত। ফলে প্রকল্পের শুরুতেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হতে পারে।
এছাড়া প্রকল্পটি তৈরি হওয়ার পরও কার্বন নিঃসরণ চলতে থাকে। ল্যান্ডস্কেপে সেচব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক আলো, ঘাস কাটার যন্ত্র এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হয়। এগুলোর জন্য বিদ্যুৎ বা জ্বালানি ব্যবহারের ফলে তৈরি হয় পরিচালনজনিত নির্গমন ।

শুধু নিঃসরণ নয়, কার্বন সংরক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ
ল্যান্ডস্কেপের একটি বিশেষ সুবিধা হলো এটি কার্বন সংরক্ষণ করতে পারে। গাছের কাণ্ড, শিকড়, পাতা এবং মাটির জৈব পদার্থে কার্বন জমা থাকে। বড় ও দীর্ঘজীবী গাছ বছরের পর বছর কার্বন ধরে রাখতে পারে।
তাই একটি প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব বুঝতে শুধু কত কার্বন নিঃসরণ হয়েছে তা দেখলে হবে না। একই সঙ্গে দেখতে হবে প্রকল্পটি কত কার্বন সংরক্ষণ করছে। নতুন কার্বন অ্যাসেসমেন্ট পদ্ধতিতে এই বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কার্বন অ্যাসেসমেন্টের নতুন নির্দেশিকার মাধ্যমে ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেক্টরা প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে কার্বন হিসাব করার সুযোগ পাবেন। নির্মাণসামগ্রী থেকে শুরু করে মাটি ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং উদ্ভিদের কার্বন সংরক্ষণ—সবকিছুকে একটি সমন্বিত হিসাবের মধ্যে আনা যায়।
এতে ডিজাইনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় স্থপতিরা আরও সচেতন হতে পারবেন। উদাহরণ হিসেবে, কোনো প্রকল্পে অতিরিক্ত কংক্রিট ব্যবহারের পরিবর্তে স্থানীয় উপকরণ বা কম কার্বনযুক্ত উপকরণ ব্যবহার করা যেতে পারে। একইভাবে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বড় লন তৈরি না করে স্থানীয় ও কম রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন এমন উদ্ভিদ ব্যবহার করা সম্ভব।
ভবিষ্যতের জন্য বড় পরিবর্তন
কার্বন পরিমাপের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইনকে শুধু সৌন্দর্যের বিষয় হিসেবে না দেখে পরিবেশগত কর্মক্ষমতার বিষয় হিসেবেও বিবেচনা করতে সাহায্য করবে। একটি পার্ক দেখতে সুন্দর হলেই সেটি সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব—এমন ধারণা ভবিষ্যতে বদলে যেতে পারে।

আগামী দিনে বিভিন্ন ল্যান্ডস্কেপ প্রকল্পের কার্বন পারফরম্যান্স তুলনা করা সম্ভব হলে ডিজাইনার, প্রকল্প মালিক এবং নগর পরিকল্পনাবিদরা আরও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। কোন উপকরণ কম কার্বন তৈরি করে, কোন ধরনের গাছ বেশি কার্বন ধরে রাখে এবং কোন ধরনের ডিজাইনে রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন কম—এসব প্রশ্নের উত্তরও আরও পরিষ্কার হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরের সবুজ জায়গার গুরুত্বও বাড়ছে। তবে শুধু গাছ লাগানোই যথেষ্ট নয়। একটি ল্যান্ডস্কেপ প্রকল্প তৈরি থেকে শুরু করে তার দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ পর্যন্ত পুরো জীবনচক্রে কত কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে, সেটিও জানা প্রয়োজন।
কার্বন পরিমাপের নতুন এই পদ্ধতি ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেক্টদের সেই হিসাব করার সুযোগ দিচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতের পার্ক, বাগান, প্লাজা ও নগর সবুজায়ন আরও সচেতনভাবে ডিজাইন করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ, ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেকচারের ভবিষ্যৎ শুধু কতটা সবুজ দেখাচ্ছে তার ওপর নির্ভর করবে না। কতটা কম কার্বন তৈরি করছে এবং কতটা কার্বন ধরে রাখছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সূত্র: আর্কিটেক্ট ম্যাগাজিন

















