বিশ্বের সেরা নতুন ভবনের জন্য রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্টস (RIBA) তাদের ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজের শর্টলিস্ট প্রকাশ করেছে। তালিকায় স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ ও বেলজিয়ামের দুটি করে মোট চারটি প্রকল্প।
শর্টলিস্টেড ভবনগুলো হলো —
- রয়্যাল বেলজ, ব্রাসেলস — ক্যারুসো সেন্ট জনের ডিজাইনে ১৯৬০-এর দশকের একটি অফিস ভবনকে অফিস, হোটেল, রেস্তোরাঁ ও হেলথ ক্লাবসহ মিশ্র-ব্যবহারের স্থাপনায় রূপান্তর।
- গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি, রংপুর — নকশাবিদ আর্কিটেক্টসের ডিজাইনে একটি বস্ত্র কারখানা, যেখানে প্রায় ৫,০০০ (অধিকাংশ নারী) শ্রমিকের সুস্থতা বিবেচনায় কুলিং পুল ও উন্মুক্ত আঙিনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
- জাদুঘর সম্প্রসারণ, হাসেল্ট — ফ্রান্সেস্কো তোরজো আর্কিটেত্তোর ডিজাইনে ১৯৫০-এর দশকের একটি জাদুঘরের সম্প্রসারণ।
- বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, ঢাকা — WOHA-র ডিজাইনে ১৩-তলা একটি ক্যাম্পাস।
আরআইবিএ অ্যাওয়ার্ডস গ্রুপের চেয়ারম্যান নিল গিলেস্পি বলেন, শর্টলিস্টভুক্ত ভবনগুলো “রিগরাসলি ডিজাইনড, গভীর চিন্তাপ্রসূত এবং মানুষ ও স্থানের জন্য সত্যিকার অর্থে তাৎপর্যপূর্ণ।”
আগামী ১৫ অক্টোবর ২০২৬ লন্ডনে স্টার্লিং প্রাইজ অনুষ্ঠানে বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে।

চলুন প্রকল্পটি সম্পর্কে বিস্তারিত একটি ধারণা নেওয়া যাক-
সাধারণত শিল্প-কারখানা মানেই বোঝায় একঘেয়ে, যান্ত্রিক ও কর্মমুখী এক পরিবেশ যেখানে কাজ ছাড়া অন্য কোনো অনুভূতির জায়গা থাকে না। কিন্তু রংপুরে অবস্থিত কারুপণ্য রংপুর লিমিটেডের গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি এই প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে।
নকশাবিদ আর্কিটেক্টস-এর ডিজাইন করা এই কারখানাটি এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে কর্মীরা ছুটির দিনেও নিছক বিশ্রাম ও আনন্দের জন্য এখানে ফিরে আসেন। ২০১৬ সালে নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়া প্রায় ১৪,৪৫০ বর্গমিটার আয়তনের এই স্থাপনাটি একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ডিজাইন করা হয়েছে। যেখানে কর্মক্ষেত্র শুধু উৎপাদনের জায়গা নয়, বরং আপন করে নেওয়ার মতো এক পরিবেশ।

প্রকল্প-তথ্য ও নির্মাণ পরিকল্পনা
গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরির প্রধান স্থপতি বায়েজিদ মাহবুব খন্দকার। প্রকল্পের ল্যান্ডস্কেপ ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনের দায়িত্বে ছিলেন সাইদুল হক,, স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার সাব্বির সিদ্দিক, বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী সুবোধ চন্দ্র বিশ্বাস এবং প্লাম্বিং ইঞ্জিনিয়ার প্রদীপ কুমার হালদার। নির্মাণে মূলত কংক্রিট ও ইট ব্যবহার করা হয়েছে, যা এই ধরনের শিল্প-স্থাপনার জন্য প্রচলিত ও টেকসই উপকরণ। প্রকল্পটির ছবি তুলেছেন বায়েজিদ মাহবুব খন্দকার, Prantography এবং City Syntax।

ডিজাইনের মূল ধারণা
স্থপতিদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই কারখানার সামগ্রিক কম্পাউন্ড ও কর্মস্থল এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে কর্মীরা একধরনের ঘরোয়া অনুভূতি (homeliness) পান। কম্পাউন্ডের চারপাশে কাজ করা মানুষজন সবসময় একধরনের স্বস্তিবোধ অনুভব করেন, যা মূলত এর ডিজাইনের প্রকৃতি থেকেই উৎসারিত। এখানকার মূল ডিজাইন-ভাবনা ছিল এমন একটি কর্মক্ষেত্র তৈরি করা, যা মাটির খুব কাছাকাছি এবং যেখানে জলবায়ুগত সম্পদকে সর্বোচ্চ মাত্রায় পুরো কম্পাউন্ডের সঙ্গে একীভূত করা যায়।

গ্রিন ফিল্ড অব কারুপণ্য রংপুর ফ্যাক্টরি প্রমাণ করে, শিল্প-স্থাপত্যও মানবিক ও প্রকৃতিঘনিষ্ঠ চিন্তার আধার হতে পারে। প্রচলিত কারখানা-ধারণার বাইরে গিয়ে নকশাবিদ আর্কিটেক্টস এমন একটি কর্মপরিবেশ গড়ে তুলেছেন, যেখানে উৎপাদনের পাশাপাশি কর্মীদের মানসিক স্বস্তি ও প্রকৃতির সান্নিধ্যকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গিই সম্ভবত কারণ, কেন এই প্রকল্পটি পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দৌড়ে জায়গা করে নিয়েছে।
তথ্যসূত্র:
RIBA, আর্কডেইলি

























