তেহরানের উপকণ্ঠে ফলের বাগান ঘেরা একটি ছোট্ট উইকএন্ড ভিলাকে কীভাবে ধাপে ধাপে বাড়িয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ স্থায়ী বাসগৃহে রূপান্তর করা যায়, তারই একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত তেহরান-ভিত্তিক স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান জেডএভি আর্কিটেক্টসের (ZAV Architects) সাম্প্রতিক প্রকল্প “গেলারেহ হাউস”।
মূল বাড়ির সরল রৈখিক কাঠামোকে অক্ষত রেখে তার চারপাশে বাগানের ভেতর দিয়ে বেঁকে বেঁকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে রঙিন খিলানাকৃতির একগুচ্ছ নতুন কক্ষ। যা দেখতে অনেকটা যেন বেড়ে ওঠার মাঝামাঝি অবস্থায় থমকে যাওয়া কোনো জীবন্ত কাঠামোর মতো!

মূল কাঠামো ও সম্প্রসারণের প্রেক্ষাপট
তেহরানের উপকণ্ঠে ইরানি স্থপতি ফিরুজ ফিরুজের ডিজাইন করা একটি উইকএন্ড ভিলাকে জেডএভি আর্কিটেক্টস স্থায়ী বাসগৃহে রূপান্তরিত করেছে। বাড়ির মালিকরা পাশের তিনটি বাগান-প্লট কিনে সম্পত্তির পরিধি বাড়িয়ে নেন।
যার ফলে স্থানীয়ভাবে কর্মরত এই স্টুডিওর হাতে সুযোগ আসে মূল ২০০ বর্গমিটারের কাঠামোটিকে অক্ষত রেখে তা সম্প্রসারণ করার। মূল সরলরৈখিক (অরথোগোনাল) কাঠামো থেকে বাঁকা খিলানের একটি ধারাবাহিক সারি পুরো সাইট জুড়ে বাইরের দিকে বিস্তৃত হয়ে একটি ছোট ভিলাকে এমন একটি স্থাপনায় রূপ দিয়েছে।
যা দেখতে অনেকটা নির্মাণাধীন, ক্রমবর্ধমান একটি জীবের মতো মনে হয়।

বাগানের সঙ্গে সংলাপ
নতুন অংশগুলো বসানো হয়েছে ফলের গাছেদের ফাঁকে ফাঁকা জায়গাগুলোতে। গোলাকার দেয়াল ও ধাপে ধাপে সাজানো ছাদগুলো মাটির কাছাকাছি রেখে বাগানের চারপাশ ঘুরে ঘুরে এগিয়েছে।
একই সঙ্গে বাগানের অংশবিশেষকে বাড়ির ভেতরেও টেনে এনেছে। বাইরে থেকে দেখলে পুরনো টেরাকোটা রঙের মূল কাঠামোটি সহজেই চেনা যায়। কিন্তু নতুন সংযোজনগুলো ধীরে ধীরে ফিকে গোলাপি ও নীল রঙে মিলিয়ে গেছে।
এই রঙ-পরিবর্তন খেলাচ্ছলে করা হলেও এটি সম্প্রসারিত অংশকে একটি দৃশ্যমান সময়ক্রমও দিয়েছে। স্থাপত্য যতই মূল বাড়ি থেকে দূরে সরে গেছে, তার রংও ততই বদলেছে।

“গ্রাফট” বা কলমের ধারণা
জেডএভি আর্কিটেক্টস তাদের এই হস্তক্ষেপকে ব্যাখ্যা করেছে “গ্রাফট” বা উদ্ভিদ-কলমের ধারণার মাধ্যমে। যেখানে একটি বিদ্যমান কাঠামো থেকে যেন নতুন স্থাপত্যিক শাখা-প্রশাখা গজিয়ে উঠেছে।
নকশার নকশা-পরিকল্পনায় (প্ল্যানে) এই ধারণাটি বিশেষভাবে স্পষ্ট। সরল দেয়ালের জায়গায় দেখা যায় খিলানাকৃতির জায়গার একটি প্যাঁচানো শিকল। যার প্রান্তগুলো একে অপরের ওপর ওভারল্যাপ করে ও পাশ কাটিয়ে চলে গেছে।
যা বিভিন্ন খোলসের মাঝে সরু আলোর ফাঁক তৈরি করেছে। প্রতিটি অংশের সঙ্গে ছাদের রেখাও বদলে যায়, ফলে কক্ষগুলো পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত থেকেও নিজস্ব অনুপাত ও পরিবেশ ধরে রাখে।

ভেতরের জ্যামিতি ও আলোর খেলা
বাড়ির অভ্যন্তরে মূলত জ্যামিতিই সব কাজ করে। খিলানাকৃতির দরজা-জানালার খোলা অংশ এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে পুনরাবৃত্ত হয়েছে। আর বাঁকানো সিলিংগুলো সরু স্কাইলাইট ও উঁচু জানালার দিকে বেঁকে গিয়ে ভেতরে আলো প্রবেশের পথ তৈরি করেছে।

জেডএভি আর্কিটেক্টসের গেলারেহ হাউস প্রমাণ করে, একটি বিদ্যমান কাঠামোকে সম্পূর্ণ ভেঙে না ফেলেও কীভাবে জৈব ও কাব্যিক উপায়ে তার পরিসর বাড়ানো যায়। বাগানের প্রাকৃতিক বিন্যাসকে সম্মান জানিয়ে, রঙের ক্রমান্বিত পরিবর্তনের মাধ্যমে সময়ের ধারাবাহিকতা তুলে ধরে এবং খিলান-নির্ভর জ্যামিতির ভেতর দিয়ে আলোকে নিয়ন্ত্রিতভাবে প্রবেশ করিয়ে এই প্রকল্প দেখিয়ে দেয় যে, স্থাপত্যও গাছের মতোই ধাপে ধাপে বেড়ে উঠতে পারে তার শেকড়ে অটুট থেকেও নতুন শাখা মেলে ধরতে পারে চারপাশের প্রকৃতির দিকে।
তথ্যসূত্র:
ডিজাইনবুম


















