নিউইয়র্ক সিটির এখন যে জেলে (রাইকার্স আইল্যান্ড) বন্দিদের রাখা হয়, সেটি বন্ধ করে দেওয়া হবে। তার বদলে শহরের চারটি এলাকা কুইন্স, ব্রুকলিন, ম্যানহাটন ও ব্রঙ্কসে নতুন চারটি জেল তৈরি হচ্ছে। (নিউইয়র্ক সিটি মূলত পাঁচটি বড় অঞ্চল নিয়ে গঠিত, যাদের বলা হয় “বারো”—এখানে চারটি বারোতেই একটি করে জেল হচ্ছে।)
এই কর্মসূচির নাম “বারো-বেজড জেল প্রোগ্রাম” (BBJ), যা শুরু হয় ২০১৭ সালে। এটি দেখভাল করছে নিউইয়র্ক সিটির নির্মাণ বিভাগ, ডিপার্টমেন্ট অব ডিজাইন অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন (DDC)। এই প্রকল্পে কাজ করছে HOK, CetraRuddy ও মাইকেল গ্রেভসসহ বেশ কয়েকটি স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান।
সম্প্রতি ম্যানহাটনের জেলের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। ফলে এখন চারটি প্রকল্পেরই নির্মাণ চলছে। এর মধ্যে ব্রুকলিনের জেলটি সবচেয়ে এগিয়ে, এটি চালু হবে ২০২৯ সালে। বাকি তিনটি শেষ হবে ২০৩০-এর দশকের শুরুতে।
জেলের ডিজাইন নিয়ে কেন বিতর্ক
জেল বা আটক কেন্দ্রের ডিজাইন করা স্থাপত্য পেশায় একটি বিতর্কিত বিষয়। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আর্কিটেক্টদের একটি সংগঠন (AIA) নিউইয়র্ক শাখা থেকে বলা হয়, স্থাপত্য প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত জেল-কারাগারের ডিজাইন থেকে দূরে থাকা। তাদের যুক্তি ছিল, এমন প্রকল্পে কাজ করা মানে একটি অন্যায্য ব্যবস্থাকে সমর্থন করা।
তবে অনেকে মনে করেন উল্টোটা, ভালো ডিজাইন বন্দিদের জীবনযাত্রা উন্নত করতে পারে। দুটি জেলের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান HOK-এর একটি আলাদা বিভাগ আছে যারা শুধু এই ধরনের প্রকল্প নিয়ে কাজ করে। তারা বলছে, এই কাজ তারা এড়িয়ে যায় না। HOK-এর নিউইয়র্ক শাখার প্রধান কেন ড্রুকার বলেন, বড় সামাজিক সমস্যা সমাধানে সাহায্য করাটাই আর্কিটেক্টের দায়িত্ব বলে তারা মনে করেন।
DDC-এর কিছু নির্দিষ্ট লক্ষ্য আছে এই জেলগুলোর ডিজাইনে যেমন, বন্দিদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন, স্টাফ ও দর্শনার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ, আর আশপাশের এলাকার সঙ্গে মানানসই স্থাপত্য। প্রতিটি সেলে থাকবে একটি জানালা (যাতে আনুভূমিক গ্রিল থাকবে), একটি বিছানা, জানালার নিচে একটি ডেস্ক, একটি টুল আর একটি টয়লেট।
ম্যানহাটনের জেলে HOK পুরনো ধাঁচের কড়া বাতির বদলে এমন আলো বসাচ্ছে যা দিনের বিভিন্ন সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলায়, অনেকটা সূর্যের আলোর মতো। কিছু সেলে বন্দিরা নিজেরাই একটি পড়ার বাতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। HOK-এর জেফ গুডেল বলেন, এই ডিজাইনের লক্ষ্য হলো, বন্দিরা যেন সবসময় সতর্ক বা আতঙ্কিত বোধ না করে, বরং সেই পরিবেশে টিকে থেকে সামনে এগোতে পারে।
দর্শনার্থীদের জন্য জায়গাগুলোও যাতে আরামদায়ক হয়, তা নিয়ে কাজ চলছে। নকশায় দেখা যায় খোলামেলা ও আরামদায়ক ওয়েটিং রুম, সহজে চলাফেরার ব্যবস্থা, আলাদা সাক্ষাতের জায়গা, আর শিশুদের জন্য রঙিন খেলার কর্নার।
তবে এসব প্রকল্পের বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষের প্রতিবাদও চলছে। গত কয়েক বছরে বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ হয়েছে, আর কুইন্সের মতো কিছু জায়গায় এখনও ডিজাইনে পরিবর্তন আনা হচ্ছে জনগণের আপত্তির কারণে।
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি সম্প্রতি বলেছেন, রাইকার্স আইল্যান্ড ছিল শহরের প্রশাসনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাগুলোর একটি। তার ভাষ্য, অবহেলার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা পুরনো ব্যবস্থার বদলে এবার এমন একটি ব্যবস্থা আনা হচ্ছে যা বন্দিদের পুনর্বাসনের ওপর জোর দেবে।

ম্যানহাটন: চায়নাটাউনের সবচেয়ে উঁচু জেল
১২৫ হোয়াইট স্ট্রিটে তৈরি হতে যাওয়া এই জেলটি সম্পন্ন হলে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু জেল ভবন হবে। ভবনটি চারটি আলাদা অংশে ভাগ করা, আর নিচে রাখা হয়েছে ৫৫ ফুট (প্রায় ১৬ মিটার) উঁচু একটি বড় হাঁটাপথ, যাতে মানুষ সহজে ভবনের ভেতর দিয়ে চলাচল করতে পারে এবং এলাকাটি চায়নাটাউন, লিটল ইতালি ও আশপাশের অন্যান্য অংশের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
আগে এই একই জায়গায় একটি আটক কেন্দ্র ছিল। নতুন জেল নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা জোরালো আপত্তি জানিয়েছেন। নির্মাণ প্রস্তুতি চলছে ঠিকই, তবে সম্প্রতি স্থানীয় নেতারা মেয়রকে চিঠি লিখে সাইটটি আবার পর্যালোচনা করার অনুরোধ জানিয়েছেন।

ব্রুকলিন: দিনের আলোকে গুরুত্ব দিয়ে ডিজাইন
২৭৫ আটলান্টিক অ্যাভিনিউতে, আগে যেখানে একটি জেল ছিল সেই জায়গাতেই তৈরি হচ্ছে ব্রুকলিনের নতুন জেল। এটিই সবচেয়ে দ্রুত এগিয়ে চলা প্রকল্প। HOK বলছে, এই ডিজাইনের মূল লক্ষ্য ছিল বন্দিদের কাছে যতটা সম্ভব বেশি সূর্যের আলো পৌঁছে দেওয়া। প্রতিটি কক্ষ সরাসরি একটি খোলা জায়গার সঙ্গে যুক্ত থাকবে, যেটি নিরাপত্তার জন্য মেটাল জাল দিয়ে ঘেরা।
জেফ গুডেল ব্যাখ্যা করেন, যেসব জেলে বন্দিদের খোলা জায়গায় যেতে হলে অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়া লাগে, সেখানে অনেকেই সেখানে যান না। কিন্তু খোলা জায়গা যদি থাকার ঘরের সঙ্গেই লাগোয়া থাকে, তাহলে মানুষ প্রতিদিন বাইরে যেতে পারবে। ভবনের বাইরের দেয়ালে রোদ নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষ ফিন বসানো হয়েছে। আর এলাকার অন্যান্য ভবনের সঙ্গে মিলিয়ে টেরাকোটা রঙের উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে।

ব্রঙ্কস: প্রতিবেশীদের সঙ্গে মানানসই নকশা
১১ তলার এই জেলটি তৈরি হচ্ছে একটি পুরনো হাসপাতাল ও পুলিশের গাড়ি রাখার জায়গায়। এখানে থাকবে প্রায় ৪০ হাজার বর্গফুট জায়গা, যা কমিউনিটির কাজে ও ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ব্যবহার হবে। এছাড়া থাকবে ইনডোর-আউটডোর খেলাধুলার জায়গা, খাবারের ব্যবস্থা, স্টাফদের অফিস, আর শিশু ও নতুন মায়েদের জন্য আলাদা কক্ষ।
স্থপতিরা জানান, ভবনের নিচের তিন তলা আশপাশের বাড়িগুলোর উচ্চতার সঙ্গে মিল রেখে তৈরি, আর ওপরের মেটাল জালে মোড়া অংশটি আশপাশের কারখানার মতো ভবনগুলোর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। স্থানীয়দের প্রধান আপত্তি ছিল ভবনটি অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে। এই উদ্বেগ কমাতে স্থপতিরা ভবনটিকে ধাপে ধাপে ছোট করে ডিজাইন করেছেন।

কুইন্স: নারী বন্দিদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা
কুইন্সের এই জেলটি চারটির মধ্যে একমাত্র, যেখানে নারী ও রূপান্তরকামী বন্দিদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকবে। ডিজাইনে আছে একটি নার্সারি ও নারীদের জন্য একটি পড়াশোনার জায়গা। এখানে তিনটি আলাদা টাওয়ার থাকবে, যেগুলোর নিচের অংশে কংক্রিট আর ওপরের অংশে কাচ ও ধাতব প্যানেল ব্যবহার করা হবে।
সাম্প্রতিক এক বৈঠকে স্থপতিরা জানান, তারা কাঠের বদলে বেশি টেকসই উপকরণ ব্যবহার করার এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ভবনটি আরও সহজে ব্যবহারযোগ্য করার পরিকল্পনা করছেন।
রাইকার্স আইল্যান্ড বন্ধ হওয়ার পথে নিউ ইয়র্ক সিটির এই চার জেলের প্রকল্প স্থাপত্যের জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। একদিকে স্থপতিরা রোদ, আলো আর খোলা জায়গা দিয়ে বন্দিদের জন্য একটু মানবিক পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের আপত্তি ও উদ্বেগ প্রতিটি প্রকল্পের ডিজাইনকে প্রভাবিত করছে। ব্রুকলিনের জেলটি ২০২৯ সালে চালু হলে সেটিই হবে এই কর্মসূচির প্রথম ফল। আর তা দেখেই বোঝা যাবে বাকি তিনটি প্রকল্প কতটা সফল হতে পারে।
তথ্যসূত্র
ডিজেইন
















