শ্রীলঙ্কার স্থপতি জিওফ্রি বাওয়াকে (১৯১৯–২০০৩) ধরা হয় ট্রপিক্যাল মডার্নিজমের অন্যতম অগ্রদূত। জার্মানির ভিট্রা ডিজাইন মিউজিয়ামে এখন চলছে তার কাজের প্রদর্শনী Geoffrey Bawa: Architecture for the Senses। এই প্রদর্শনীতে ভবনের পাশাপাশি একজন স্থপতি নিজের দেশকে কীভাবে দেখেছিলেন এবং সেই দেখাকে কীভাবে বাস্তব রূপ দিয়েছিলেন সেটাও ফুটে উঠেছে।
বাংলাদেশের পাঠক হিসেবে আমরাও ঔপনিবেশিক ইতিহাসের উত্তরাধিকার বয়ে বেড়াই, আর আমাদের জলবায়ুও বৃষ্টি, গরম ও আর্দ্রতার। নিজের পরিবেশের উপযোগী স্থাপত্য তাই কী হতে পারে, এই প্রশ্ন আমাদের কাছেও পুরোনো এবং প্রাসঙ্গিক।

ইউরোপ ঘুরে দেশে ফেরা
বাওয়া শ্রীলঙ্কায় জন্মেছিলেন। তার বাবা ছিলেন আইনজীবী, আর পরিবারের বংশপরিচয় ছিল মিশ্র। ১৯৩৮ সালে তিনি পড়াশোনার জন্য ইংল্যান্ডে যান এবং পরে বাবার পেশা আইনে যোগ দেন। কিন্তু এই পেশায় তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন না। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর আইনের কাজ ছেড়ে তিনি বিশ্বভ্রমণে বের হন, বিশেষ করে ইউরোপে ঘুরে বেড়ান। ইতালিতে থেকে যাওয়ার ইচ্ছাও তার হয়েছিল। তবু তিনি জন্মভূমিতে ফিরে আসেন, ব্রিটিশ শাসন থেকে শ্রীলঙ্কার স্বাধীনতার ঠিক পরপরই।

স্থপতি হওয়ার অদ্ভুত সূচনা
বাওয়ার স্থাপত্যজীবন শুরু হয় প্রায় আকস্মিকভাবে। ১৯৪৮ সালে তিনি বেন্টোটার কাছে একটি পরিত্যক্ত রাবার বাগান কেনেন। সেখানে তিনি একটি বাগান গড়তে শুরু করেন। সেটিই আজকের লুনুগাঙ্গা।
কাজ করতে গিয়ে তিনি বুঝলেন, তার কল্পনা যত বড়, কারিগরি জ্ঞান তত নেই। এক আত্মীয় পরামর্শ দিলেন স্থপতি হওয়ার প্রশিক্ষণ নিতে। তিনি লন্ডনের আর্কিটেকচারাল অ্যাসোসিয়েশন স্কুলে পড়েন (১৯৫৪–১৯৫৭) এবং ৩৮ বছর বয়সে স্থপতি হিসেবে কাজ শুরু করেন। দেরিতে আসা সত্ত্বেও তিনি হয়ে ওঠেন স্বাধীন শ্রীলঙ্কার সবচেয়ে ফলপ্রসূ ও প্রভাবশালী স্থপতিদের একজন।

সময়ের সাক্ষী এক স্থপতি
বাওয়া ছিলেন তার সময়ের ঐতিহাসিক পরিস্থিতির অন্যতম মনোযোগী এক দর্শক। প্রদর্শনীর ক্যাটালগে In Time: The Architecture of Geoffrey Bawa প্রবন্ধে শায়ারি ডি সিলভা লিখেছেন, শ্রীলঙ্কার গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে সময়ের সঙ্গে ক্ষয় স্পষ্ট ও অনিবার্য। বাওয়া এটা কর্মজীবনের শুরুতেই বুঝেছিলেন। ডি সিলভার বর্ণনায়, তার একেবারে প্রথম দিকের কাজেও ভবনগুলো দেশের বৃষ্টি ও আর্দ্রতার সঙ্গে সাড়া দিয়েছে।
ঔপনিবেশিক শাসনের পর শ্রীলঙ্কা যেমন নিজেকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছিল, বাওয়ার কাজও তেমনি এগিয়েছে। তার ভবন, বাড়ি ও হোটেলে একটি বিশেষ দৃষ্টি ফুটে ওঠে, যা লক্ষ করে দেশ কীভাবে রাজনৈতিক গোষ্ঠী, বিদেশি প্রভাব আর সামনে এগোনোর আকাঙ্ক্ষার প্রতি সাড়া দিচ্ছে।

ট্রপিক্যাল মডার্নিজম ও তার ইউরোপীয় ইতিহাস
বাওয়াকে সাধারণত ট্রপিক্যাল মডার্নিজম আন্দোলনের ধারক হিসেবে ধরা হয়। এই ধারায় দেশীয় ঐতিহ্যবাহী ধরন মিশেছে আধুনিকতাবাদী নান্দনিকতার সঙ্গে, যা ১৯২০-এর দশকে বাউহাউসের যুগে জনপ্রিয় হয়েছিল। ভিট্রার প্রদর্শনী এই বিষয়ে সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা দেয়।
স্বাধীনতার আগে শ্রীলঙ্কায় ছিল বিশাল ইংরেজ ধাঁচের ঔপনিবেশিক ভবন। সেসব চেনা যেত অতিরিক্ত অলংকরণ আর হালকা রঙের ফ্যাসাড দেখে। এই ধরন এসেছিল দখলদার শক্তির হাত ধরে। তাদের বিদায়ের পর নতুন স্থাপত্যধারার জন্য জায়গা তৈরি হয়।

তবে ট্রপিক্যাল মডার্নিজম শ্রীলঙ্কায় বা অন্য কোনো “ক্রান্তীয়” দেশে হুবহু আমদানি হয়নি। এটি ছিল ইউরোপে জনপ্রিয় হওয়া আধুনিকতাবাদী ধারার একটি অভিযোজন, যা ম্যাক্সওয়েল ফ্রাই ও তার স্ত্রী জেন ড্রুর মাধ্যমে এসব দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
ভিঅ্যান্ডএ (V&A) জাদুঘরের উদ্ধৃতিতে আরও বলা হয়েছে, “ক্রান্তীয় অঞ্চল” ধারণাটিও সমস্যাজনক। এটি ছিল নিরক্ষরেখা জুড়ে বিস্তৃত, পৃথিবীর ৪০ শতাংশ এলাকা ঢেকে থাকা একটি ঔপনিবেশিক সংজ্ঞা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বেশির ভাগ ভূখণ্ড এর আওতায় পড়ত, কিন্তু আঞ্চলিক জলবায়ুর পার্থক্য এবং স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে তা উপেক্ষা করত।

আন্দোলনে বাওয়ার অবদান
স্বাধীন শ্রীলঙ্কায় বাওয়া এই আন্দোলনের কার্যকর দিকগুলো গ্রহণ করেছিলেন, যেমন ইউরোপকেন্দ্রিক অলংকরণ বর্জন। একই সঙ্গে তিনি নিজের ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটের উপযোগী পদ্ধতি দিয়ে এই ধারাকে এগিয়ে নিয়েছেন।
এর একটি বড় অংশ ছিল স্থানীয় কারিগর ও শিল্পীদের সঙ্গে কাজ। ১৯৬০-এর দশকে আধুনিক ফিটিংস ও আমদানি করা উপকরণ দেশে সহজে পাওয়া যেত না। তাই বাওয়াকে স্থানীয় কারিগরদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে নিজেদের তৈরি বিকল্প বানাতে হতো। এতে ঐতিহ্যবাহী নির্মাণপদ্ধতি ও কারুশিল্পের সম্ভাবনার প্রতি তার আগ্রহ বেড়ে যায়। তিনি নির্মাণস্থলে বসে ডিজাইনকে বেড়ে উঠতে দেখতেন এবং কারিগরদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনে বড় পরিবর্তনও আনতেন।

প্রদর্শনীতেও এই সহযোগিতার ধারা স্পষ্ট। এনা ডি সিলভা, লাকি সেনানায়েক ও বারবারা সানসনির মতো শিল্পীদের সঙ্গে বাওয়ার ধারাবাহিক কাজ এখানে চোখে পড়ে। প্রদর্শনী জুড়ে রঙিন বাটিক শিল্পকর্ম আছে, যা বাওয়ার ভবনেও দেখা যায়। যেমন বেন্টোটা বিচ হোটেলের বিশাল, বর্ণিল ছাদ। নিবন্ধের ছবির ক্যাপশনে আরও কয়েকটি প্রকল্পের নাম আছে: ওরুওয়ালার সিলন স্টিল কর্পোরেশনের প্রশাসনিক ভবন, মিরিসার প্রদীপ জয়বর্ধনের বাড়ি এবং বেন্টোটা বিচ হোটেলের লবি, যেখানে অনুরা রত্নবিভূষণের ডিজাইন করা লিফটের দরজা রয়েছে।

জায়গা আগে, ডিজাইন পরে
বাওয়া নিজের পদ্ধতি নিয়ে খুব কম কথা বলতেন। তবু একবার বলেছিলেন, ব্রিফের পাশাপাশি জায়গাটিই ডিজাইনকে সবচেয়ে বেশি ধাক্কা দেয়, আর তাই “সেখানে উপস্থিত থাকা অপরিহার্য”। তার ভবনে প্রকৃতিও ডিজাইনের অংশ হয়ে ওঠে। ভিট্রার প্রদর্শনীর বর্ণনা অনুযায়ী, তার বিভিন্ন প্রকল্পে জায়গায় থাকা গাছ ও পাথর পরিকল্পনার অংশ হয়ে যায়, আর বাগান ভবনের দেয়ালের বাইরেও অভিজ্ঞতাকে ছড়িয়ে দেয়। তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রকল্প বলা হয় লুনুগাঙ্গার বাগান এবং কলম্বোর ব্যাগাটেল রোডে তার নিজের বাড়ি।

ভিট্রার প্রদর্শনী
ভিট্রা ডিজাইন মিউজিয়ামের প্রদর্শনীটি বাওয়ার পঞ্চাশ বছরের বেশি সময়ের কাজ ধরে এগিয়েছে। এতে ব্যক্তিগত বাড়ি থেকে শুরু করে শ্রীলঙ্কার সংসদ ভবন পর্যন্ত নানা ভবন আছে। পুরোনো ড্রয়িং ও মডেলের পাশাপাশি আছে নতুন করে করানো ছবি ও ফিল্ম, যা দেখায় এসব জায়গা আজ কেমন অনুভূতি দেয়। প্রদর্শনীতে শিল্পী ও কারিগরদের সঙ্গে বাওয়ার সহযোগিতাও তুলে ধরা হয়েছে। যাদের বোনা কাপড় ও শিল্পকর্ম তার স্থাপত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল। প্রদর্শনীর ডিজাইন করেছে লিনা ঘোতমেহ আর্কিটেক্টস।

স্বীকৃতি ও উত্তরাধিকার
২০০১ সালে বাওয়া আগা খান স্থাপত্য পুরস্কারের চেয়ারম্যান’স অ্যাওয়ার্ড পান। ১৯৯৩ সালে শ্রীলঙ্কা সরকার তাকে “দেশমান্য” উপাধি দেয়, যার অর্থ “দেশের গর্ব”। জীবদ্দশায় তিনি ডিজাইন করেছেন দেশটির নতুন সংসদ ভবন (কোত্তে) ও রুহুনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বড় প্রকল্প। সঙ্গে ছিল বাড়ি, হোটেল ও অফিসও। ২০১৯ সালে তার জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে জিওফ্রি বাওয়া ট্রাস্ট “বাওয়া ১০০” নামে একটি উদ্যোগ নেয়, যার শেষ ধাপে ছিল তার কাজের নথি নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী।
বাওয়াকে নানা নামে ডাকা হয়েছে: ট্রপিক্যাল মডার্নিস্ট, রোমান্টিক, ভার্নাকুলারিস্ট ও রিজিওনালিস্ট। কিন্তু তিনি নিজের কাজকে কোনো ছকে বাঁধতে চাননি। তিনি মনে করতেন, স্থাপত্যকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না, তাকে অনুভব করতে হয়।

বাওয়ার স্থাপত্য কেবল সুন্দর ভবনের সংগ্রহ নয়। এতে আছে জলবায়ুর সঙ্গে বোঝাপড়া, ঔপনিবেশিক অলংকরণ থেকে সরে আসা, জায়গাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং স্থানীয় কারিগর ও শিল্পীদের সঙ্গে হাত মেলানো। একই সঙ্গে ভিট্রার প্রদর্শনী একটি সতর্কবার্তাও দেয়: “ক্রান্তীয় স্থাপত্য” ধারণাটি নিজেও ঔপনিবেশিক ইতিহাস থেকে এসেছে, তাই তাকে প্রশ্ন করা দরকার।
তথ্যসূত্র
ডিজাইনবুম, জে-স্টোর ডেইলি , জেফ্রি বাওয়া ট্রাস্ট

























