মৃত্যু মানুষের জীবনের সবচেয়ে রহস্যময় এবং অনিবার্য অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। শিল্পে মৃত্যুকে নানা সময় নানা দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করা হয়েছে। কখনো এটি হয়ে উঠেছে শোকের প্রতীক, কখনো ভালোবাসার করুণ পরিণতি, আবার কখনো জীবনের নতুন অর্থ খোঁজার একটি মাধ্যম। সার্বিয়ান শিল্পী মারিনা আব্রামোভিচ তাঁর ‘সাত মৃত্যু’ নামের শিল্পকর্মে মৃত্যুর এই বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতাকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন। ডেনমার্কের কোপেনহেগেন শহরের একটি ঐতিহাসিক ভূগর্ভস্থ জলাধারে আয়োজিত এই শিল্পকর্মে চলচ্চিত্র, সংগীত, অভিনয়, আলোকসজ্জা এবং স্থাপত্যিক পরিবেশ একসঙ্গে মিলিত হয়েছে।
‘সাত মৃত্যু’ শিল্পকর্মের মূল ভাবনা এসেছে বিখ্যাত কয়েকটি অপেরার নারী চরিত্রের করুণ মৃত্যু থেকে। এই চরিত্রগুলোর প্রত্যেকের জীবনের গল্প আলাদা। কারও মৃত্যু হয়েছে অসুস্থতার কারণে, কেউ আত্মহত্যা করেছেন, আবার কাউকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু তাদের সবার গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, যন্ত্রণা, বিশ্বাসঘাতকতা এবং নিয়তি। আব্রামোভিচ নিজের শরীর ও অভিনয়ের মাধ্যমে এই সাতটি মৃত্যুকে নতুনভাবে দর্শকের সামনে তুলে ধরেছেন।
এই শিল্পকর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর সঙ্গে কিংবদন্তি অপেরা শিল্পী মারিয়া কালাসের কণ্ঠের ব্যবহার। মারিয়া কালাস বিশ শতকের অন্যতম বিখ্যাত অপেরা শিল্পী ছিলেন। তিনি ১৯৭৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তাঁর রেকর্ড করা কণ্ঠ এখনো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে যায়। ‘সাত মৃত্যু’তে আব্রামোভিচের দৃশ্যমান উপস্থিতির সঙ্গে কালাসের কণ্ঠ যুক্ত হওয়ায় এখানে একই সঙ্গে অতীত ও বর্তমানের উপস্থিতি তৈরি হয়েছে। একজন শিল্পী পর্দায় উপস্থিত, অন্যজন কণ্ঠের মাধ্যমে উপস্থিত। ফলে জীবন, মৃত্যু এবং স্মৃতির মধ্যে একটি অদৃশ্য সম্পর্ক তৈরি হয়।

এই শিল্পকর্মে আব্রামোভিচের সঙ্গে অভিনয় করেছেন মার্কিন অভিনেতা উইলেম ড্যাফো। দুজনের অভিনয়ের মাধ্যমে অপেরার বিখ্যাত নারী চরিত্রগুলোর আবেগ, সম্পর্ক এবং মৃত্যুর মুহূর্তগুলো পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে অভিনয় শুধু গল্প বলার মাধ্যম নয়। মানুষের শরীর, মুখের অভিব্যক্তি, নীরবতা এবং চলাফেরাও শিল্পকর্মের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
‘সাত মৃত্যু’ প্রদর্শনের স্থানটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোপেনহেগেনের সিস্টার্নে মূলত একটি বিশাল ভূগর্ভস্থ জলাধার হিসেবে নির্মিত হয়েছিল। বর্তমানে এটি শিল্প প্রদর্শনের জন্য ব্যবহৃত হয়। মাটির নিচের দীর্ঘ ও অন্ধকার কক্ষ, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, পানির ফোঁটা পড়ার শব্দ এবং প্রতিধ্বনিময় স্থাপত্য পুরো অভিজ্ঞতাকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। এটি কোনো সাধারণ প্রদর্শনী কক্ষ নয়। বরং দর্শক যখন এই ভূগর্ভস্থ স্থানে প্রবেশ করেন, তখন মনে হয় তিনি ধীরে ধীরে পরিচিত পৃথিবী থেকে দূরে সরে একটি রহস্যময় জগতে প্রবেশ করছেন।
এই পরিবেশের সঙ্গে শিল্পকর্মটির বিষয়বস্তুর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মৃত্যু নিয়ে তৈরি একটি শিল্পকর্মকে যদি উজ্জ্বল ও সাধারণ প্রদর্শনী কক্ষে উপস্থাপন করা হতো, তাহলে দর্শকের অভিজ্ঞতা হয়তো এতটা তীব্র হতো না। কিন্তু ভূগর্ভস্থ অন্ধকার, নীরবতা এবং প্রতিধ্বনি মৃত্যুর অনুভূতিকে আরও গভীর করে তোলে। দর্শকের চোখের সামনে দৃশ্য চলতে থাকে, আর চারপাশের অন্ধকার থেকে ভেসে আসে অপেরার কণ্ঠ। ফলে দর্শক শুধু একটি দৃশ্য দেখেন না; বরং পুরো শরীর দিয়ে একটি পরিবেশ অনুভব করেন।
এই শিল্পকর্মের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দর্শকের চলাচল। সাধারণ চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ক্ষেত্রে দর্শক একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বসে পুরো চলচ্চিত্র দেখেন। কিন্তু এখানে দর্শককে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে হয়। একটি দৃশ্য শেষ হলে দর্শক পরবর্তী স্থানে এগিয়ে যান। সেখানে আবার নতুন একটি দৃশ্য এবং নতুন একটি মৃত্যুর গল্প অপেক্ষা করে।

এর ফলে দর্শকের নিজের শারীরিক চলাচলও শিল্পকর্মের অংশ হয়ে ওঠে। একটি মৃত্যু দেখার পর দর্শককে থেমে থাকতে দেওয়া হয় না। তাঁকে সামনে এগিয়ে যেতে হয়। এই এগিয়ে যাওয়া প্রতীকী অর্থেও গুরুত্বপূর্ণ। জীবনে যেমন কোনো একটি ঘটনা বা শোকের মধ্যে মানুষ চিরকাল আটকে থাকতে পারে না, তেমনি এখানে একটি মৃত্যুর পর দর্শককে পরবর্তী অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে যেতে হয়।
সাতটি মৃত্যুর গল্পের মধ্যে রয়েছে অপেরার কয়েকটি বিখ্যাত নারী চরিত্র। ‘লা ত্রাভিয়াতা’-র ভায়োলেত্তার মৃত্যু অসুস্থতার কারণে ঘটে। ‘টোস্কা’-র করুণ পরিণতি আত্মহত্যার মাধ্যমে। ‘ওথেলো’-তে দেশদেমোনার মৃত্যু ঘটে হত্যার মাধ্যমে। আবার ‘কারমেন’-এর গল্পও শেষ হয় সহিংস মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। এই চরিত্রগুলোর মৃত্যুর কারণ আলাদা হলেও তাদের জীবনে ভালোবাসা এবং তার সঙ্গে যুক্ত যন্ত্রণা একটি সাধারণ সূত্র তৈরি করে।
আব্রামোভিচ এই গল্পগুলোকে শুধু পুনরায় অভিনয় করেননি। তিনি নিজের শরীরকে মৃত্যুর অভিজ্ঞতার একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর দীর্ঘ শিল্পজীবনে শরীর, সহনশীলতা, ভয়, যন্ত্রণা এবং সীমাবদ্ধতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে এসেছে। ‘সাত মৃত্যু’তেও সেই শিল্পচিন্তার ধারাবাহিকতা দেখা যায়। তবে এখানে ব্যক্তিগত শরীরের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপেরার ঐতিহাসিক স্মৃতি।
এই শিল্পকর্মে মৃত্যু তাই কেবল শেষ নয়। প্রতিটি মৃত্যু নতুন একটি দৃশ্যের সূচনা করে। একটি গল্প শেষ হলে আরেকটি গল্প শুরু হয়। একটি কণ্ঠ থেমে গেলে অন্য একটি কণ্ঠ শোনা যায়। একটি চরিত্রের জীবন শেষ হলেও তার স্মৃতি পরবর্তী দৃশ্যে থেকে যায়। এই ধারাবাহিকতা দর্শককে ভাবতে বাধ্য করে—মৃত্যু কি সত্যিই সবকিছুর সমাপ্তি, নাকি স্মৃতি ও শিল্পের মাধ্যমে মানুষ মৃত্যুর পরও কোনোভাবে বেঁচে থাকে?

সিস্টার্নের ভূগর্ভস্থ স্থাপত্য এই প্রশ্নকে আরও শক্তিশালী করে। একসময় যে জায়গাটি পানির সংরক্ষণে ব্যবহৃত হতো, সেটিই এখন শিল্পের আশ্রয়স্থল। অর্থাৎ একটি পুরোনো ব্যবহার শেষ হয়ে যাওয়ার পর সেই স্থান নতুন অর্থ পেয়েছে। এই পরিবর্তন নিজেই যেন জীবন, মৃত্যু এবং পুনর্জন্মের একটি স্থাপত্যিক প্রতীক।
মারিনা আব্রামোভিচের ‘সাত মৃত্যু’ তাই শুধু একটি চলচ্চিত্র বা অপেরা প্রদর্শনী নয়। এটি একটি সম্পূর্ণ পরিবেশগত শিল্প অভিজ্ঞতা। এখানে শিল্পী, অভিনেতা, সংগীত, কণ্ঠ, অন্ধকার, পানি, স্থাপত্য এবং দর্শকের চলাচল—সবকিছু একসঙ্গে কাজ করে। দর্শক এখানে বাইরে দাঁড়িয়ে শিল্পকর্ম দেখেন না; বরং শিল্পকর্মের ভেতর দিয়ে হাঁটেন।
শেষ পর্যন্ত ‘সাত মৃত্যু’ আমাদের জীবনের একটি চিরন্তন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। মৃত্যু অনিবার্য, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা, স্মৃতি, কণ্ঠ এবং শিল্প অনেক সময় মৃত্যুর সীমা অতিক্রম করে টিকে থাকে। কোপেনহেগেনের ভূগর্ভস্থ অন্ধকারে আব্রামোভিচের সাতটি মৃত্যু তাই শুধু সাতটি করুণ পরিণতির গল্প নয়; এটি জীবন, ভালোবাসা, স্মৃতি এবং মৃত্যুর মধ্যকার গভীর সম্পর্কের এক শক্তিশালী শিল্পভাষ্য।

















