ভূমিকম্প উৎপত্তির কারণ ও বাংলাদেশের আশপাশের অঞ্চলের ভূমিকম্প সৃষ্টির সম্ভাব্য উৎস প্রসঙ্গে গত সংখ্যায় আলোচনা করা হয়েছে। ভূমিকম্প সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা, মাত্রা ও তীব্রতা সম্পর্কিত বিষয়াবলি এবারের আলোচ্য বিষয়। সিস্মিক চ্যুতির যে বিন্দু থেকে স্থানচ্যুতি শুরু হয়, তাকে ভূমিকম্পের কেন্দ্র বলে এবং এর ঠিক ওপরে পৃথিবীর পৃষ্ঠের ওপর উলম্বভাবে অবস্থিত বিন্দুকে উপকেন্দ্র বলা হয় (চিত্র: ১)। এই উপকেন্দ্র থেকে ভূমিকম্পের কেন্দ্র পর্যন্ত গভীরতাকে ‘কেন্দ্রিক গভীরতা’ বলে, যা ভূমিকম্পের সম্ভাব্য ক্ষতির মাত্রা নির্ণয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বেশির ভাগ ক্ষতিকর ভূমিকম্পেরই কেন্দ্র অগভীর থাকে, যার ‘কেন্দ্রিক গভীরতা’ ৭০ কিলোমিটার বা তারও কম হয়ে থাকে। উপকেন্দ্র থেকে যেকোনো স্থান বা নির্দিষ্ট বিন্দুর দূরত্বকে উপকেন্দ্রিক দূরত্ব বলা হয়। ভূতাত্ত্বিক গবেষণা থেকে অতীতে দেখা গেছে, বড় ভূমিকম্পের আগে বা পরে বেশ কিছু ছোট ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। মূল ভূমিকম্পের (Main Shock) আগে যেসব ছোট ভূমিকম্প ঘটে, সেগুলোকে Foreshocks আর মূল ভূমিকম্পের পরে ঘটা ছোট ভূমিকম্পকে Aftershocks বলা হয়।
যেকোনো ভূমিকম্পের মাত্রা হলো প্রকৃত ভূমিকম্পের একটি পরিমাণগত পরিমাপ। ১৯৩৫ সালে অধ্যাপক চার্লস রিখটার দুটি ব্যাপার লক্ষ করেন; ১. একই দূরত্বে ছোট ভূমিকম্পের তুলনায় বড় ভূমিকম্পের সিস্মোগ্রামে (ভূমিকম্পের ফলে মাটির কম্পনের রেকর্ড) তরঙ্গের বিস্তার হয় বৃহত্তর এবং ২. একটি নির্দিষ্ট ভূমিকম্পের জন্য, কম দূরত্বের চেয়ে অধিকতর দূরত্বে তরঙ্গের বিস্তার ছোট। আর এই বিষয় দুটিই তাঁকে বর্তমানে সাধারণভাবে ব্যবহৃত ভূমিকম্প মাত্রার স্কেল, রিখটার স্কেল (Richter Magnitude Scale) প্রস্তাবনায় সাহায্য করেছে। এই স্কেলের মান সিস্মোগ্রাম (ভূমিকম্পের কম্পন পরিমাপক যন্ত্র) থেকে পাওয়া যায় এবং এটি উপকেন্দ্রিক দূরত্বে ও ভূমিকম্প তরঙ্গের বিস্তারের ওপর নির্ভর করে। এই স্কেলকে স্থানীয় মাত্রার স্কেলও বলা হয়। এ রকম আরও কিছু ভূমিকম্প পরিমাপক স্কেল চালু রয়েছে। যেমন, Body Wave Magnitude, Surface Wave Magnitude এবং Wave Energy Magnitude প্রভৃতি। এই সংখ্যাসূচক মাত্রার স্কেলের ঊর্ধ্বসীমা কিংবা নিম্নসীমা নেই; একটি খুব ছোট ভূমিকম্পের মাত্রা শূন্য এমনকি ঋণাত্মকও হতে পারে। পরবর্তী সময়ে সঠিকভাবে ভূমিকম্পের ফলে উৎপন্ন শক্তির পরিমাণ হিসাব করতে এই রিখটার স্কেলের পরিবর্তে মোমেন্ট স্কেল (Moment Magnitude Scale, Mw) ব্যবহৃত হয়। এই স্কেলটি লগারিদম-ভিত্তিক, তাই প্রতি এককে ১০ গুণ পরিমাণ পরিবর্তন নির্ধারণ করে। ভূমিকম্পের মাত্রা এক একক বৃদ্ধিতে, তরঙ্গের বিস্তার ১০ গুণ বৃদ্ধি পায় এবং প্রায় ৩১ গুণ বেশি শক্তিমুক্ত হয়। উদাহরণস্বরূপ, ৭.৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্পে যে শক্তিমুক্ত হয়, তা একটি ৬.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের প্রায় ৩১ গুণ বেশি এবং একটি ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের চেয়ে প্রায় ১০০০ (≈৩১ x ৩১) গুণ বেশি শক্তিশালী। এই বেশির ভাগ শক্তি তাপে পরিণত হয় এবং ভু-অভ্যন্তরের শিলা বিচ্যুত হতে ব্যয় হয় এবং এই শক্তির মাত্র ছোট্ট একটি ভগ্নাংশ ভূমিকম্প তরঙ্গ আকারে ছড়িয়ে পড়ে ভূমিতে কম্পন সৃষ্টি করে। অতঃপর বিভিন্ন দালানকোঠাসহ অবকাঠামোর ক্ষতিসাধন করে। ভূমিকম্প সৃষ্ট শক্তির হিসাব করে দেখা গেছে যে একটি ৬.৩ মাত্রার ভূমিকম্প থেকে যে পরিমাণশক্তি মুক্ত হয় তা প্রায় ১৯৪৫ সালে হিরোশিমার ওপর ফেলা পরমাণু বোমা থেকে মুক্ত শক্তির সমতুল্য!
সৃষ্টির মাত্রার ওপর ভিত্তি করে ভূমিকম্পগুকে খুব ছোট থেকে বিশাল পর্যন্ত সাতটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। সূক্ষ্ম যন্ত্র ছাড়া সাধারণত ৪ বা তার চেয়ে বেশি মাত্রার ভূমিকম্পগুলোই শুধু অনুভূত হয়। সারা পৃথিবীতে ৪ বা তার চেয়ে বেশি মাত্রার ভূমিকম্প বছরে প্রায় সাত হাজারের মতো অনুভূত হয়ে থাকে। পৃথিবীজুড়ে বার্ষিক গড় ভূমিকম্প সংখ্যা নিচের ছক-১-এ দেখানো হয়েছে; এটা লক্ষণীয় যে প্রতিবছর গড়ে একটি অতীব বড় মাত্রার ভূমিকম্প ঘটে থাকে। অপর দিকে তীব্রতা হলো ভূমিকম্পের সময় একটি অবস্থানে প্রকৃত কম্পনের গুণগত পরিমাপ এবং এটি রোমান সংখ্যাসমূহের বড় অক্ষর দিয়ে প্রকাশ করা হয়। অনেক তীব্রতা স্কেলের মধ্যে দুটি বহুল ব্যবহৃত স্কেল হলো Modified Mercalli Intensity (MMI) Scale এবং Medvedev-Sponheuer-Karnik (MSK) Scale। উভয় স্কেলই প্রায় অনুরূপ এবং এর সীমা রোমান সংখ্যা (সবচেয়ে কম অনুভূতিশীল) থেকে ঢওও (সবচেয়ে গুরুতর)। তীব্রতা স্কেল কম্পনের তিনটি বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে করা হয় যথাক্রমে মানুষ এবং পশুর অনুভূতি, ভবনের কর্মক্ষমতা ও পারিপার্শ্বিক পরিবর্তন দিয়ে। একটি ভূমিকম্পের সময় বিভিন্ন স্থানে তীব্রতার পরিমাণ ব্যবহার করে চিত্রের মাধ্যমে যে ম্যাপ প্রদর্শিত হয়, তাকে ওংড়ংবরংসধষ ম্যাপ বলা হয়, যেখানে সমান তীব্রতার স্থানগুলো যোগ করে এক একটি রেখা কল্পনা করা হয়।
| শ্রেণিবিভাগ | মাত্রা | গড় ভূমিকম্পের সংখ্যা |
| Great (বিশাল) | ৮ এবং তদূর্ধ্ব | ১ |
| Major (বড়) | ৭-৭.৯ | ১৮ |
| Strong (শক্তিশালী) | ৬-৬.৯ | ১২০ |
| Moderate (মাঝারি) | ৫-৫.৯ | ৮০০ |
| Light (হালকা) | ৪-৪.৯ | ৬২০০ (আনুমানিক) |
| Minor (ছোট) | ৩-৩.৯ | ৪৯০০০ (আনুমানিক) |
| Very Minor (খুব ছোট) | < ৩.০ | ২-৩ মাত্রার: ~১০০০/দিন; ১-২ মাত্রার: ~৮০০০/দিন; |
ছক: ১ পৃথিবীব্যাপী বার্ষিক গড় ভূমিকম্পের চিত্র
(উৎস: যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ)
ভূমিকম্পের মাত্রা হলো ভূমিকম্পের আকারের পরিমাপ। উদাহরণস্বরূপ, ভূমিকম্পের চ্যুতির কারণে মুক্ত শক্তির পরিমাণ দিয়ে একটি ভূমিকম্পের আকার পরিমাপ করা যায়। এর অর্থ এই যে ভূমিকম্পের মাত্রা একটি নির্দিষ্ট ভূমিকম্পের জন্য একক মান। অন্যদিকে, তীব্রতা হলো একটি নির্দিষ্ট স্থানে কম্পনের প্রচণ্ডতার সূচক। স্পষ্টত, কম্পনের তীব্রতা দূরের তুলনায় উপকেন্দ্রের কাছাকাছি অনেক বেশি। এই কারণে নির্দিষ্ট মাত্রার একই ধরনের ভূমিকম্পের সময় বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন মানের তীব্রতা অনুভূত হয়। যদি একটি বৈদ্যুতিক বাল্ব বিবেচনা করা যায় তবে দেখা যাবে, একটি ১০০ ওয়াট বাল্বের কাছাকাছি অবস্থানে যে আলোক তীব্রতা থাকে, দূরের অবস্থানে এর চেয়ে কম তীব্রতা থাকে। বাল্ব যদিও ১০০ ওয়াট শক্তি মুক্ত করে, একটি নির্দিষ্ট স্থানে আলোক তীব্রতা নির্ভর করে বাল্বের ক্ষমতা (অর্থাৎ, ওয়াট) এবং বাল্ব থেকে ওই স্থানের দূরত্বের ওপর। এখানে, বাল্বের ক্ষমতা (১০০ ওয়াট) হলো ভূমিকম্পের মাত্রার মতো এবং কোনো অবস্থানে আলোক তীব্রতা সে অবস্থানে কম্পনের তীব্রতার মতো।
প্রতিনিয়ত এই প্রশ্ন করা হয়, আপনার বিল্ডিংটি ৭.০ কিংবা ৮.০ মাত্রার ভূমিকম্প প্রতিরোধী কি না অথবা বিল্ডিংটি কত মাত্রার পর্যন্ত ভূমিকম্প সহ্য করতে পারে? কিন্তু ৭.০ কিংবা ৮.০ মাত্রার কোনো একটি ভূমিকম্প বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন পরিমাণে তীব্রতার সৃষ্টি করে এবং সে কারণে একই ভূমিকম্পে সব স্থানে ঘরবাড়ির ক্ষতি এক রকম হয় না। সুতরাং, প্রকৃতপক্ষে ভবন তৈরি করার সময় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কম্পনের তীব্রতা সহনশীলতার বা প্রতিহত করার ক্ষমতার ওপর ভর করে ডিজাইন করা হয়, কিন্তু মাত্রার ওপর ভর করে নয়। ভূমিকম্পের সময় মাটির কম্পনের ফলে যে সর্বোচ্চ ত্বরণ অনুভূত হয় তাকে Peak Ground Acceleration (PGA) বা শীর্ষ ত্বরণ বলা হয়, যা ভূমিকম্পের সময় তীব্রতার পরিমাপ করার অন্যতম উপায়। এই PGA এবং MMI তীব্রতার মাঝে আনুমানিক গবেষণামূলক সম্পর্ক বিদ্যমান যা থেকে সহজেই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মাটির কম্পন পরিমাপক যন্ত্র ব্যবহার করে ভূমিকম্পের তীব্রতা পরিমাপ করা সম্ভব। যেমন ২০০১ সালের ভারতের গুজরাটে ভুজ ভূমিকম্পের Isoseismal ম্যাপ থেকে দেখা গেছে VIII তীব্রতার অঞ্চলে ০.২৫-০.৩০ম (ম = অভিকর্ষজ ত্বরণ) সমমানের PGA অনুভূত হয়েছে। PGA এবং তীব্রতার পরিমাণসংক্রান্ত বিষয়গুলো মিতব্যয়ে ভূমিকম্প প্রতিরোধী বাড়ি তৈরির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের ভূমিকম্পের উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে অধ্যাপক রিখটার ও গুটেনবার্গ ভূমিকম্পের স্থানীয় মাত্রা ও উপকেন্দ্রিক অঞ্চলের তীব্রতার মধ্যে একটি আনুমানিক সম্পর্ক প্রদান করেছেন, যা বহুল প্রচলিত। তাঁদের মতে, কোনো একটি ভূমিকম্পের স্থানীয় মাত্রা = (২/৩) X উপকেন্দ্রিক অঞ্চলের তীব্রতার + ১। ছক-২ এ বিভিন্ন MMI তীব্রতা ও PGA কম্পনের মাঝে সম্পর্ক দেখানো হয়েছে।
চিত্র: ৩ ওংড়ংবরংসধষ ম্যাপ (উঁফষবু ঊধৎঃযয়ঁধশব, ২০০২ সাল)
ছক-২ গগও তীব্রতা ও চএঅ কম্পনের মাঝে সম্পর্ক
| MMI | V | VI | VII | VII | IX | X |
| PGA (g) | ০.০৩-০.০৪ | ০.০৬-০.০৭ | ০.১০-০.১৫ | ০.২৫-০.৩০ | ০.৫০-০.৫৫ | >০.৬০ |
চলবে…
প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৮তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৫