আমরা সবাই স্বপ্ন দেখি চমৎকার এক আবাসের। বসবাসের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় একটি গৃহ আমাদের ধারণ করে। এই বসবাস ও জীবনযাপনের মধ্যে এমন কিছু আছে, যা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনকে করে সরল, অনেক সহজ। আবার এমন কিছু ব্যবস্থা আছে, যাতে আমাদের গৃহই হয়ে ওঠে বুদ্ধিমান এক স্থাপনা! কিন্তু গৃহের কি চিন্তা করার ক্ষমতা আছে? তাহলে কীভাবে এটি হবে বুদ্ধিমান? এখন কিন্তু এটাও সম্ভব! একটা গৃহ এখন দেখতে পায়, শুনতে পায়, মানুষকে পাহারা দেয়, বিপদে পড়লে জরুরি নম্বরে ফোন করে নিজ থেকেই, আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসে কল দেয়, এমনকি নিজে থেকেই পানি ছিটিয়ে আগুন নেভানোর কাজটাও করতে পারে অনায়াসেই। আর এসবই সম্ভব কেবল অটোমেশনের মাধ্যমে।
স্মার্ট হোমের অটোমেশন সিস্টেম
বিল্ডিং অটোমেশন এমনই এক পদ্ধতি, যেখানে এমন কিছু প্রযুক্তি স্থাপন করা হয়, যার মাধ্যমে ভবনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেই অনেক কাজ করতে পারে। এতে অল্প পরিশ্রমে অনেক বেশি কাজ হয় বিধায় মানুষের জীবনযাত্রা হয় পরিপাটি-সহজ। অটোমেশন সিস্টেম একটি ভবনের প্রাণ; তা সে বাড়ি হোক আর অফিস। বাড়িতে সিসি (ক্লোজড সার্কিট) ক্যামেরা বসিয়ে পাহারা দেওয়ার সিস্টেম তো বেশ পুরোনো। এখন এসেছে খুব অল্প দামের আইপি সিসি ক্যামেরা, যেগুলো চালাতে কোনো বক্স বসানোর প্রয়োজন নেই। সেগুলো আবার মোশন সেন্সর করতে পারে সহজেই। আছে নাইট মোড। বাড়ি পাহারাদারের কাজ অনায়াসে করতে পারে সে। আর এটাকে আপনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন নিজের মোবাইল থেকে। আপনি যেকোনো জায়গায় থেকে সিসি ক্যামেরার সঙ্গে বসানো স্পিকারের মাধ্যমে কথা বলতে পারবেন সেই ভবনের বাসিন্দাদের সঙ্গে। এতে আপনি অনেক দূরে থেকেও নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে পারবেন সহজেই। আবার দেখা যায় অনেক পরিবারে বাবা-মা দুজনেই সারা দিন অফিসে থাকেন, তাঁদের জন্য এই সিসি ক্যামেরাই হয়ে ওঠে নিত্যদিনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ।
প্রাত্যহিক জীবনে আরেকটি প্রয়োজনীয় অটোমেশন সিস্টেম হিট সেন্সর। বাসায় অতিরিক্ত গরম কাটাতে আপনি এসি ব্যবহার করেন। ব্যবহার করেন ইনভার্টার এসি। কিন্তু এই এসি তো সব সময় চালানোর দরকার হয় না। এক্ষেত্রে বাড়ির তাপমাত্রা অনেক বেশি কমে গেলে কিংবা সহনীয় হয়ে এলে এসির পাওয়ার অন-অফ করার মাধ্যমে পরিবেশ ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের দায়িত্ব নেয় হিট সেন্সর। আপনি যে ঘরে আছেন সেই ঘরে লাগান একটি হিট সেন্সর। আপনার ঘর ঠান্ডা হয়ে গেলে আপনাকে তাপ প্রদানের জন্য ঘরে অটোমেটিকভাবে চলবে হিটার। আবার আপনি যেন গরমে ঘেমে না যান এ জন্য এসি চলবে অটো। আর এসব হবে শুধু ঘরে থাকলেই। আপনি ঘরে আছেন কি না এটা সে নিমেষেই বুঝে নেবে সেন্সরের মাধ্যমে। আর এই ধরনের হিট সেন্সরের ব্যবহার কিন্তু দিন দিন বাড়ছে।
ঘরের লাইট ও ফ্যানও আনা যায় অটোমেশনের আওতায়। আপনি যে ঘরে প্রবেশ করবেন সেই ঘর মুহূর্তেই হবে আলোকিত। আর এই সেন্সর দিনের আলো পরিমাপ করে আপনার জন্য আলো প্রয়োজন কি না সেটা নির্ধারণ করে দেবে সহজেই। একটি ছোট্ট লেজার সেন্সর বসিয়ে আপনি এটা করতে পারবেন অনায়াসে। তবে এটার সঙ্গে বসাতে হবে কিছু মেশিনও। এতে হয়তো আপনার খরচ হবে। তবে সেটা এক বছরের বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয়ের কারণে বিশেষ কিছু নয়।
এ ছাড়া আছে সান সেন্সরড ল্যুভর। আপনার ঘরে সূর্যালোক কোন দিক থেকে ঢুকছে, সেটা খেয়াল রেখে অটোমেশন ল্যুভর ব্যবহার করলে এটা আপনার ঘরে সূর্যালোক সরাসরি প্রবেশে বাধা দিয়ে ঘরের তাপমাত্রাকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সাহায্য করে বিদ্যুৎ ও অন্যান্য শক্তি সাশ্রয়ে। এভাবে আরও হরেক রকমের বিল্ডিং অটোমেশন সিস্টেম রয়েছে, যেগুলোর হরহামেশা ব্যবহার আমরা করে থাকি আমাদের বাসাবাড়িতে।
মোটকথা বিল্ডিং অটোমেশন হলো বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইসের সাজানো-গোছানো কম্পিউটার নেটওয়ার্কিং ডিস্ট্রিবিউটেড কন্ট্রোল সিস্টেম। এতে থাকে মনিটরিং ইউনিট। সব অটোমেশন নিয়ন্ত্রিত হয় এখান থেকেই। বিল্ডিং অটোমেশন সিস্টেম বা BAS (Building Automation System) যে বাড়িতে রয়েছে, তার পরিচিতি ‘বুদ্ধিমান বাড়ি’ বা ‘স্মার্ট বিল্ডিং’ কিংবা ‘স্মার্ট হোম’ নামে। ফিনল্যান্ডের ক্লাউক্কালা অঞ্চলে তৈরি হয় পৃথিবীর প্রথম স্মার্ট বিল্ডিং। যে বাড়িটিতে রয়েছে পাঁচটি ফ্লোর। এতে স্মার্ট ফোনটাই ব্যবহৃত হয় ঘরের তালার চাবি হিসেবে। এভাবেই প্রায় সব কটা গ্রিন আর্কিটেকচারে প্রয়োগ করা হয় ইঅঝ-কে শক্তি, বাতাস ও পানির বহুল ব্যবহারের জন্য। গ্রিন আর্কিটেকচার হলো সেই স্থাপনা, যাতে কোনো প্রকার বাহ্যিক সাহায্য ব্যতীত সেই বাড়ি নিজে থেকেই টিকতে পারে। যেমন- বিদ্যুৎ উৎপাদন, বৃষ্টির পানির পুুনর্ব্যবহার, মানবিক বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদন প্রভৃতি। একটি স্থাপনায় যদি অটোমেশন না থাকে তবে তা গ্রিন আর্কিটেকচারের ক্রাইটেরিয়া থেকে বাদ পড়ে যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা থাকে। কারণ যে অল্প পরিমাণ বিদ্যুৎ একটি বাড়ি থেকে তৈরি হয়, তার যদি সাশ্রয়ের পদ্ধতি জানা না থাকে তবে কোনোভাবেই তৈরিকৃত বিদ্যুৎ থেকে নিজের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব নয় বিধায় বাড়িটি গ্রিন আর্কিটেকচার বলে বিবেচিত হবে না। দেখা যায়, একটি গ্রিন আর্কিটেকচার হিসেবে নামাংকিত বাড়ির সামনে ফুটপাতেও ফুট সেন্সর বসানো থাকে, যাতে পথচারীদের হেঁটে যাওয়ার মাধ্যমেও কিছু বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। আর এসব কারণে দিন দিন অটোমেশন হচ্ছে আরও বেশি জনপ্রিয়।
বেশির ভাগ বিল্ডিং অটোমেশন সিস্টেম নেটওয়ার্কে প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি বাস (ইটঝ) থাকে, যেগুলোর হাই লেভেল ও লোয়ার লেভেল যুক্ত থাকে কন্ট্রোলারের সঙ্গে। আর এই যুক্ত হওয়ার ধরনটা কেব্্লের মাধ্যমে হতে পারে। আবার কেব্্লবিহীনও (ওয়াই-ফাই প্রযুক্তি) হতে পারে। কিছুদিন আগেও অপটিক্যাল ফাইবার, ইথারনেট কেব্্ল, আর্কনেট, জঝ ২৩২, জঝ-৪৮৫ দিয়ে যুক্ত হতো পুরো নেটওয়ার্ক সিস্টেম। তবে এখন ওয়্যারলেস প্রযুক্তি বেশ জনপ্রিয়। কারণ ইনপুট ডিভাইস বসানোর জটিলতার জন্যই এখন বিভিন্ন সফটওয়্যারের মাধ্যমে আপনার মোবাইলে এসে যুক্ত হতে পারে। আপনি ঘরে বসে সহজেই বাইরে কে হাঁটছে সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। আবার গরম লাগলে এসি ছেড়ে দিতে পারেন। ঠান্ডা লাগলে রুম হিটার চালাতে পারেন। আর পুরো ব্যাপারটা ঘটবে এক পলকে বা চোখের নিমেষেই।
বিদ্যুৎ ও আলো
একটি বাসা বা অফিসের আলো জ্বালানো, নেভানো ও এর উজ্জ্বলতা বাড়ানো-কমানো সবই করা সম্ভব অটোমেশনের মাধ্যমে। বর্তমানে যেসব অফিস দিন ও রাতের শিফটে কাজ করে, সেসব অফিসে রাতের বেলাও আলো জ্বালিয়ে কাজ করতে হয়। আর এর জন্য অটোমেশন সবচেয়ে বাস্তবিক উপায়। প্রায় প্রতিটি কক্ষে সব সময় আলো জ্বালিয়ে না রেখে প্রয়োজনমতো আলো নিয়ন্ত্রণে অটোমেশনের চেয়ে ভালো উপায় আর নেই। আবার পার্কিং লটে সব সময় আলোর ব্যবস্থা রাখতে খরচ হয় অনেক বিদ্যুৎ। সেক্ষেত্রে সেন্সর ব্যবহার করলে শুধু পার্কিং স্থলেই সম্ভব আলো জ্বালিয়ে বা আলো নিয়ন্ত্রণ করে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা।
অনেক সময় ওয়াক ওয়ে ও ড্রাইভ ওয়েতে লাইটের ব্যবহার থাকে। এ ছাড়া বিশাল পার্কিং লটে কোথাও কোনো আলো থাকে না। কোনো ড্রাইভার যদি লিফট দিয়ে নেমে নিজের গাড়ির চাবিতে লাগানো বাটন চেপে ধরে, তবে শব্দ তৈরি করে গাড়ির সঙ্গে থাকা অ্যালার্ম জানান দেয় গাড়িটা ঠিক কোথায় আছে। আর সঙ্গে সঙ্গে সেই গাড়ি পর্যন্ত আলো জ্বলে ওঠায় গাড়িটাকে পরিষ্কার দেখা যায়। এটা ম্যানুয়ালি করতে গেলে যে পরিমাণ শক্তি ক্ষয় হতো তার অর্ধেকের অর্ধেক শক্তিও অটোমেশনে ব্যয় হয় না। আর একেই বলে DALI (Digital Addressable Lighting interface)। বর্তমানে যেসব নতুন স্থাপনা তৈরি হচ্ছে তাতে ব্যবহৃত হচ্ছে উঅখও. এই উঅখও-এর মাধ্যমে সঙ্গে সঙ্গে কোথাও ইলেট্রিক্যাল সার্কিট নষ্ট হলে কিংবা লাইট ফিউজ হয়ে গেলেও সহজেই তা জানা যায়।
শেডিং
বিল্ডিং সিস্টেমে শেডিং ও গেøজিংয়ের ভূমিকা অনেক। একটি বাড়িতে লাইট শেডের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। অধুনা এখানকার স্থাপত্যকলা এমনভাবে বিবর্তিত হয়েছে যে একটি বাড়িকে স্থপতি আবহাওয়া-জলবায়ু ও সৌররশ্মির অবস্থান বিবেচনায় ডিজাইন করেন। কিন্তু যেহেতু সূর্যের তাপ ও আলোকে আমাদের বাদ দেওয়ার কোনো উপায় নেই, তাই ঘরের কোনো কোনো জায়গা থেকেই যায়, যেটা দিয়ে প্রখর সূর্যালোক ও তাপ প্রবেশ করেই। আর এসব জায়গাকে অনেক স্থপতি ইচ্ছে করেই কম ব্যবহার হয় এমন ফ্যাংশন দিয়ে ডিজাইন করেন। যেমন টয়লেট, সিঁড়ি ঘর, লিফট কোরÑ এসবের অবস্থান থাকে মূলত পশ্চিম দিকে, যেদিক থেকে দিনের একটা বিরাট সময় সূর্য সরাসরি তাপ ও আলো দেয়। কিন্তু তবুও স্থাপনার অন্য অংশগুলোতে তাপ ও আলো প্রবেশে বাধা পেলেই সেসব স্থানে আমাদের শেডিং ব্যবহার করতে হয়। ক্ষেত্রবিশেষে ল্যুভর ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু সেই ল্যুভর বা শেড তো আর সূর্যের অবস্থান পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয় না। আর এ জন্যই এসেছে অটোমেশন প্রযুক্তি। সূর্যের আলোক রশ্মি যেভাবে সরে যায়, সেভাবে অটোমেটেড ল্যুভরও সরে যায় যদি আমরা এর সঙ্গে অটোমেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করি। এ ছাড়া অনেক অফিস ও বাসায় এখন অটোমেটেড কার্টেইন ব্যবহার করা হচ্ছে। ঘরে রোদের আসা-যাওয়াভেদে কার্টেইন বা পর্দা বিভিন্ন দিকে সরে যায় নিজে থেকেই। ফলে আলো ও তাপের দারুণ এক সমন্বয় ঘটে। ঘরে তাপমাত্রার বৃদ্ধি ঠেকানো যায়, ফলে এয়ারকন্ডিশনার ব্যবহারের মাত্রা কমানো যায় সহজেই, যেটা পরিবেশরক্ষায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এয়ার হ্যান্ডেলার
ঘরের তাপমাত্রার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এয়ার হ্যান্ডেলার ইউনিট ঘরে বাইরের বাতাস প্রবেশ করায়, যাতে ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা থাকে নিয়ন্ত্রণে। এয়ার হ্যান্ডেলিং ইউনিট বাড়ির ভেতরে বাতাসের আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা পরিমাপের মাধ্যমে বাড়ির আবহাওয়াগত অবস্থা টের পায়, যা বাইরে থেকে বাতাস প্রবেশ করিয়ে বাড়ির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে।
চিল্ড ওয়াটার সিস্টেম
চিলারের মাধ্যমে ঠান্ডা পানি প্রবাহে ঘরের তাপমাত্রা কমিয়ে রাখার প্রক্রিয়াকে চিল্ড ওয়াটার সিস্টেম বলা হয়। এটি কাজ করে একটা বিশালাকার ফ্রিজের মতো। চিলারের মাধ্যমে ঘরে থাকা থার্মাল কয়েলের ভেতর ঠান্ডা পানি প্রবেশ করানো হয়। এই পানি প্রবাহকালে ঘরের ভেতরকার তাপমাত্রা কমিয়ে ফেলে। ফলে ঘরে তৈরি হয় মনোরম শীতল পরিবেশ।
রুমের ভেতর পানির প্রবাহ তৈরি করার জন্য বাড়ির ছাদে একটি কনডেনসার বসানো হয়। এই কনডেনসার ওয়াটার সিস্টেমকে সব সময় চালু রাখতে একে অটোমেশন প্রযুক্তির আওতায় আনা হয়। ঘরের তাপমাত্রা ওঠানামার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এটি এয়ার হ্যান্ডেলিং ইউনিটে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করে। ঘরের তাপমাত্রা মাপার জন্য রয়েছে থার্মোমিটার। সেই থার্মোমিটারের সঙ্গে সংযোগ থাকে সেন্ট্রাল কুলিং ফ্যানের। তাপ বেড়ে গেলে পানির পরিমাণ বেড়ে যায়। বাড়ির প্রতিটি রুমের তাপমাত্রা তখন কমতে থাকে।
হট ওয়াটার সিস্টেম
হট ওয়াটার সিস্টেম বাড়ির এয়ার হ্যান্ডেলার ইউনিটে ঠঅঠ ইঙঢ-এর হিটিং কয়েলে গরম পানি প্রবাহ তৈরির মাধ্যমে বাড়ির তাপমাত্রা বাড়ায়। শীতপ্রধান দেশগুলোতে আগে সেন্ট্রাল চিমনি ব্যবহার করা হতো। সেই সব চিমনিতে প্রতিনিয়ত কাঠ পুড়িয়ে ঘরের তাপ ধরে রাখা হতো। কিন্তু এতে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ায় এটা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। প্রচুর কাঠ কাটার ফলে বন ধ্বংসের পাশাপাশি একই সঙ্গে প্রচুর কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরির ফলে পৃথিবীর চারদিকে গ্রিন হাউস বেল্ট ধীরে ধীরে ঘন বা পুরু হওয়ার দরুন তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় দুই ডিগ্রি, যা প্রভাব ফেলেছে পুরো পৃথিবীর ইকোসিস্টেমের ওপর। আর এ জন্যই এখন হিটিং কয়েলের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক উপায়ে অটোমেশনের মাধ্যমে পুরো বাড়িতে গরম পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা হয়। এই পানিপ্রবাহের ফলে বাড়ির তাপমাত্রা থাকে সহনীয় পর্যায়ে।
সিকিউরিটি অ্যালার্ম সিস্টেম
এখন সব বাড়ির অ্যালার্ম সিকিউরিটি সিস্টেমে অ্যালার্ম ক্যাপাবিলিটি আছে। বাড়ির ভেতর যেকোনো অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটলে এটি বাড়ির বাসিন্দাদের জানান দেয়। অনেক সময় বাড়ির বাসিন্দা বাইরে থাকলে তাদের মোবাইলে সেই তথ্য জানিয়ে দেয়। বাড়ির ইন্স্যুরেন্স করা থাকলে তৎক্ষণাৎ সহায়তা পাওয়া যায়। এই অ্যালার্ম সিস্টেমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো আগুন লাগলে অ্যালার্ম বাজানো। আর একই সঙ্গে ওয়াটার স্প্রিংকলারগুলোকে অ্যাক্টিভেট বা সক্রিয় করা। একটি ডেডিকেটেড ওয়াটার ট্যাংকের সঙ্গে সংযোগ থাকে এই পানির লাইনের। যেকোনো ফায়ার হ্যাজার্ড হলে এই স্প্রিংকলারের ভেতর থাকা ছোট্ট কয়েলটি ছিঁড়ে যায়। এর ফলে এটি অন হয়। আশপাশে পানি ছিটিয়ে সাহায্য করে আগুন নিভিয়ে ফেলতে। বাংলাদেশে এখন এ ধরনের আগুন নিয়ন্ত্রণের স্প্রিংকলার সিস্টেম বসানো আছে বড় বড় স্থাপনাগুলোতে। এ ছাড়া নতুন স্থাপনাগুলোতে এটি আর্কিটেকচারাল ডিজাইনের সঙ্গেই ডিজাইন করা হয়। কোনোভাবে ফায়ার ডিটেক্টরে ধোঁয়া শনাক্ত করলেই ফায়ার অ্যালার্মের সঙ্গে সঙ্গে স্প্রিংকলার অন হয়ে যায়। ফলে সেই স্থানের আগুন নিভে যায় দ্রুতই।
আগুন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অন্য একটি সিস্টেম আধুনিক স্থাপনাগুলোতে থাকে আর তা হলো থেফট ডিটেক্টর। বাড়িতে বাইরে অনাকাঙ্খিত কেউ প্রবেশ করলেই অ্যালার্ম বেজে ওঠে। অনেকেই বাড়িতে সিসি ক্যামেরা লাগান। কিন্তু ক্যামেরা দিয়ে হয়তো পুরো বাড়ির সিকিউরিটির নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন। কিন্তু থেফট ডিটেক্টর দিয়ে পুরো বাড়ি দিনে ও রাতে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। থেফট ডিটেক্টর হিসেবে কাজ করে পুরো বাড়ির সব সিসি ক্যামেরা। এগুলো যেকোনো অপরিচিত লোকের অ্যাক্সেস দেখলেই বাড়ির সেন্ট্রাল এন্ট্রি সিস্টেম বন্ধ করে দেয়। এ ছাড়া আছে থার্মাল স্ক্যানার। বাড়িতে প্রবেশ করার মুহূর্তে যে কেউ আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করলেই এটি মুহূর্তেই জেনে যায়। এ ছাড়া এয়ারপোর্ট বা শপিং মল কিংবা হোটেলে কেউ মাদক অথবা অস্ত্রসহ প্রবেশ করলেই নিমেষে থার্মাল ও মেটাল ডিটেক্টর স্বয়ংক্রিয়ভাবে জানিয়ে দেয় অ্যালার্মের মাধ্যমে। সিকিউরিটি সিস্টেমের জন্য যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া অ্যালার্ম সিস্টেম যুক্ত থাকে ওয়াটার পাম্প ও আন্ডারগ্রাউন্ড-ওভারহেড ওয়াটার ট্যাংকের সঙ্গে। পানি ওভারফ্লো হলেই অ্যালার্মের মাধ্যমে জানিয়ে দেয় যে পাম্প বন্ধ করতে হবে। অনেক সময় এটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাম্প বন্ধও করে দেয়। বাড়ির গ্যারেজে থাকা গাড়ি ধোয়ার জন্য যে পাইপলাইন থাকে, সেটা থেকে পানি নির্গমনের পথেও এটা নিয়ন্ত্রক হিসেবে বসিয়ে দেওয়া হয়। অতিরিক্ত পানি যেন গাড়ি ধোয়ার মতো কাজে ব্যবহার না হয়, এ জন্য এটাকে নিয়ন্ত্রক হিসেবে অটোমেশন করা থাকে।
রুম অটোমেশন
রুম অটোমেশন মূলত কোনো একটি রুম বা পুরো বাড়ির প্রতিটি ঘরকে অটোমেশনের আওতায় আনা। একটি বাসায় ইচ্ছেমতো এদিক-সেদিক যাতায়াত করলে ঘরের বিভিন্ন ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি বন্ধ করতে ভুলে যাওয়ার কারণে অতিরিক্ত বিদ্যুতের ব্যবহার হয়। এটা পুরো ইলেকট্রিক গ্রিডের ওপর প্রভাব ফেলে। এ জন্য বাড়িতে সেন্সরের মাধ্যমে ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলোতে অটোমেশন করা হয়। আপনি হয়তো বসার ঘরে আছেন, সঙ্গে সঙ্গে সেই ঘর বাদে অন্য ঘরগুলো বা অফিসের অন্য কক্ষগুলোর লাইট বন্ধ অথবা আলো স্বল্প হয়ে গেল। ফ্যান বন্ধ করা, রান্নাঘর ও ডাইনিংয়ের চুলা ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইস বন্ধ করা, বাথরুম ও অন্যান্য ঘরের গিজার ও কুলার বন্ধ করার মতো কাজ করে থাকে এটি।
প্রাত্যহিক জীবনে অটোমেশনের গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের অজান্তেই আমরা রয়েছি হোম অটোমেশনে। অনেকের অফিস ভার্টিক্যাল ব্লাইন্ড অটোমেটেড। আলো কমে গেলে এটা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যায়। আবার প্রখর সূর্যালোকে এটা নিজ থেকেই খুলে গিয়ে তাপ ও আলো প্রবেশে বাধা দেয়। আমরা কিন্তু এটিকে অজান্তে ব্যবহার করলেও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অন্য অটোমেশনের সঙ্গে ব্যবহার করি না। সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করলেও কে ফেস ডিটেকশনের মাধ্যমে প্রবেশ করল আর কে করল না, এটা আমরা অনেকেই ব্যবহার করি না বা ব্যবহার করলেও তা জানি না। এসব অজ্ঞতার কিংবা অজানার কারণে আমাদের প্রতিদিনের জীবন হয়তো আরও সহজ-সরল হতে পারত কিন্তু আমাদের জন্যই তা আর হয়ে ওঠে না। সিসি ক্যামেরাকে যদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করানো যায় তাহলে স্থাপনার অনেক ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। কিন্তু এটা হয়ে ওঠে না শুধু আমাদের অটোমেশন-বিষয়ক অজ্ঞতার কারণে।
ঘরের তাপমাত্রা পরিমাপের জন্য অনেকেই ঘরে থার্মোমিটার ব্যবহার করেন। কিন্তু এটাকে অটোমেশনের আওতায় নিয়ে এলে এই থার্মোমিটারই আপনাকে ঘরে এয়ারকন্ডিশনার ব্যবহার বাড়িয়ে বা কমিয়ে ঘরের পরিবেশ আপনার জন্য শীতল বা গরম রেখে কাজ ও বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে পারত। আমরা এখন অনেকেই ভিডিও ডোরবেল ব্যবহারের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছি। আর এটা হোম অটোমেশনের গুরুত্বপূর্ণ এক অনুষঙ্গ। ভিডিও ডোরবেলের মাধ্যমে কে বাসায় এসেছে এটা আপনি আপনার অফিসে থেকেও জানতে পারবেন, আপনি আগন্তুকের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন, এমনকি আপনি চাইলে অনাকাঙ্খিত আগন্তুককে ঘরে প্রবেশে বাধাও দিতে পারবেন। যা আধুনিক জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনি চাইলেই আপনার বাসায় চোর এল নাকি আপনার পরম আত্মীয় এল, এটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। এখনকার দিনের সিসি ক্যামেরাগুলোর অ্যাক্সেস ও কন্ট্রোল মোবাইল ডিভাইসে চলে এসেছে। আপনি চাইলেই ঘরের যেকোনো কাজের লোক অথবা বাসায় থাকা অন্যদের কাজকর্ম দেখতে পারবেন। অফিসে কর্মচারীদের কাজ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। আবার প্রয়োজনে সিসি ক্যামেরা দিয়ে বাইরে বসেই অফিস বা বাসায় কথা বলতে পারবেন। আর এসবই সম্ভব কেবল অটোমেশনের মাধ্যমে। হোম অটোমেশন তাই আমাদের এখানে এই মুহূর্তে সময়ের দাবি। উন্নত বিশ্বে যার প্রচলন অনেক আগ থেকেই।
ক্যাপশন
বিল্ডিং অটোমেশন কীভাবে বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে কাজ করে
অটোমেশনের ফ্লো চার্ট
বিল্ডিং অটোমেশনের ফ্লো চার্ট। এভাবেই একটি বাড়িতে অটোমেশন কাজ করে।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১৩০তম সংখ্যা, জুন ২০২১