আল হামরা। স্পেনের একটি বিখ্যাত রাজ প্রাসাদ। আরবি ‘আল হমরা’ শব্দের অর্থ লাল। এই প্রাসাদের বাইরের দেয়ালও লাল মাটি দিয়ে ঠাসা। ধারণা করা হয় এই লাল মাটি থেকেই এই প্রসাদের নামকরণ আল হামরা করা হয়েছে। কেউ কেউ একে আলহাম্ব্রাও বলে থাকে। আল হামরা, ইসলামী স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। এই প্রাসাদে স্প্যানিশ রেনেসাঁ স্থাপত্যের উল্লেখযোগ্য নিদর্শন রয়েছে।
এই প্রাসাদের নির্মাণকাজ ১২৩৮ সালে নির্মিত হয়। প্রথম নাসরিদ আমির এবং আল আন্দালুসের ক্ষমতা অবসানের সময়ের একটি প্রতিচ্ছবি আল হামরা। এই স্থাপনাটি আমিরাতের সাবিকা পাড়াড়ের চূড়ায় নির্মাণ করা হয়েছিলো। সাবিকা, সিয়েরা নেভাডার একটি শৈলশিরা। আল হামরা নির্মাণের আগেও এখানে একাদশ শতাব্দীর স্যামুয়েল ইবনে নাগরিল্লাহর প্রাসাদ ছিলো। ছিলো তার এটি দুর্গ।
আল আন্দুলসের পরবর্তী নাসরিদ শাসকরা ক্রমাগত সাবিকা চূড়ার পরিবর্তন করেন। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্থাপনা ছিলো চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথম ইউসুফ এবং পঞ্চম মুহাম্মদের শাসনামলে নির্মিত প্রাসাদ। এখানে ইসাবেলার রাজদরবারও ছিলো।
রাজা পরিবর্তনের ধারায় অনেক নতুন নতুন প্রাসাদ নির্মাণ হতে থাকলে নিয়মানুযায়ীই জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে আল হামরা। জীর্ণ অবস্থায়ও ১৮১২ সালে সম্রাট নেপোলিয়েনের সৈন্যরা কিছুটা ধ্বংস করে এই প্রাসাদের। তবুও পুরনো ঐতিহ্য আ সৃজনশীলতার কারণে পরবর্তীতে ব্রিটিশ, আমেরিকান এবং ইউরোপীয় ভ্রমণকারীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে বহুবার সংস্কার করা হয় এই প্রাসাদের। দারুণ পর্যটকপ্রিয়তা আর ইসলামিক স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শনের জন্য আল হামরা এখন স্পেনের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র। শুধু তাই নয় এই প্রসাদটি ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান।
আল হামরার নিচে গ্রানাডার পাহাড়ে একটি মুসলিম শহর ছিলো। এ শহরেও ছিলো মুসলিমদের জন্য সর্বোচ্চ সুযোগ সুবিধা ছিলো। ছিলো জুমুআর মসজিদ, হাম্মামখানা (গণস্নানাগার) এবং অত্যাধুনিক জল সরবরাহ ব্যবস্থা।
আন্দালুসের শাসনের পর ইবনে আল-আহমার (প্রথম মুহাম্মদ) আইবেরীয় উপদ্বীপে শেষ এবং দীর্ঘতম সময় ধরে শাসনকারী মুসলিম রাজবংশ। তিনিই এ অঞ্চলে নাসরিদদের প্রতিষ্ঠা করেন। নাসরিদরা গ্রানাডার আমিরাত শাসন করেন। ইবনে আল-আহমার এই অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে একজন নতুন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ধারণা করা হয় তিনি অতি সাধারণ পরিবার থেকে এসেছিলেন। তবে একাধিক মুসলিম জনপদের সমর্থন পেয়েছিলেন।
১২৩৮ সালে গ্রানাডায় বসতি স্থাপনের পর, ইবনে আল-আহমার প্রাথমিকভাবে আলবাইসিন পাহাড়ের জিরিদদের পুরানো দুর্গে বাস করতেন। পরে একই বছরে তিনি নতুন বাসস্থান এবং দুর্গ হিসেবে আলহামব্রার নির্মাণ শুরু করেন।
স্থাপত্যশৈলী
বাইরে থেকে এই প্রাসাদ অত্যন্ত সাদাসিধে। তবে ভেতরে রয়েছে অনেক জটিল স্থাপত্যশৈলী। অসংখ্য কলামের উপর এই দুর্গ প্রাসাদটি দাঁড়িয়ে আছে। এতে আছে ঝর্ণা ও স্বচ্ছ পানির পুকুর। নকশায় জটিলতা থাকলে ভেতরে আলো বাতাসের কোন কমতি নেই। এই প্রাসাদের গায়ে একজন মুরিশ কবি ইবনে জামরাকের কবিতা খোঁদাই করে লেখা আছে যা আজও কালের সাক্ষী।
আল হামরার অ্যারেস্কের কাজ অত্যন্ত নান্দনিক। অ্যারাবেস্ক হচ্ছে সমতল পৃষ্ঠে ফুল, পাতার জড়াজড়ি করা রৈখিক নকশা। মুসলিম স্থাপত্যের বিভিন্ন রকমের নকশা রয়েছে আল হামরায়। এর সিলিংয়ে রয়েছে দারুণ মনোমুগ্ধকর ডিজাইন। কাঠের তৈরি গম্বুজাকৃতির সিলিংটি মাকার্নাসের নকশায় সাজানো হয়েছে।
ভেতরের বেশিরভাগ নকশাই আন্দালুসের সময়ের। বাইজেন্টাইন ও সমকালীন আব্বাসীয় শাসকদের স্থাপনা থেকে বিভিন্ন উপদান সংগ্রহ করে মুরিশ শিল্পীরা এ প্রাসাদটিকে আকর্ষণীয়ভাবে সাজিয়ে তোলে। তাদের নিজস্ব উদ্ভাবিত বিভিন্ন ডিজাই ও নকশাও এই প্রাসাদে দেখা যায়।
আল হামরা দুর্গে রয়েছে নানা ধরণের স্থাপনা। এই দুর্গের রয়েছে ১৭৩০ মিটার উঁচু দেয়াল। সীমানার ভেতরে মোট ত্রিশটি টাওয়ার এবং চারটি সদর দরজা রয়েছে। শাসকদের আবাসান, নিরাপত্তা বাহিনী, রাজদরবারসহ অনেক স্থাপনার অস্তিত্ব মেলে আধুনিক অনুসন্ধানে। তবে মূল তিনটি স্থাপনা হলো কোমারিস প্যালেস, কোর্ট অব লায়ন ও পার্টাল প্যালেস।