দিন বদলেছে, বদলেছে মানুষের চাহিদা, অভ্যাস আর রুচি। তেমনি সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে প্রযুক্তির সেবা। শিল্প আজ শুধু সৌন্দর্যের ফ্রেমেই আটকে নেই। বাণিজ্যের বন্দরে পৌঁছে গেছে শিল্পের জাহাজ। স্থাপত্যশৈলীতে এমনি অভূতপূর্ব সব পরিবর্তন এনেছে বিভিন্ন প্রযুক্তি। নির্মাণসংক্রান্ত যেকোনো কাজের সহজবোধ্যতা এবং নির্মাণশিল্পের বাণিজ্যিক প্রসারে বিরাট অবদান রাখছে রুচিশীল, নান্দনিক ও অত্যাধুনিক স্থাপত্যশৈলী। এ রকম স্থাপত্যশৈলীর পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে নানা ধরনের কারিগরি টুলস। এ টুলসগুলোর অন্যতম আর্কিটেকচারাল ডিজাইন সফটওয়্যার। একজন স্থপতির ভাবনা আজকাল বাস্তবে রূপ দিতে সফটওয়্যারের কোনো বিকল্প নেই। গত পর্বের ধারাবাহিকতা এ লেখায়।
স্কেচ আপ
থ্রিডি (3D) ডিজাইন তৈরিতে স্কেচআপ অন্যান্য সফটওয়্যারের পাশাপাশি এখন দারুণ জনপ্রিয়। গুগল থেকে ফ্রি ডাউনলোড করে যে কেউ এই সফটওয়্যারটি ব্যবহার করতে পারে। থ্রিডি তৈরিতে সবচেয়ে দ্রুত কাজ করতে প্রকৌশলী ও স্থপতিদের কাছে থ্রিডি মডেলার সফটওয়্যারটির রয়েছে বেশ কদর। তবে শিক্ষার্থী কিংবা প্রশিক্ষণার্থীদের কাছে এ সফটওয়্যারের কদর সবচেয়ে বেশি। অল্প সময়ে থ্রিডি রেন্ডার দেওয়া যায় বলে শিক্ষার্থীরা সময় বাঁচাতে এ সফটওয়্যারটি বেশি পছন্দ করে। এ ছাড়া সদ্য স্থপতি ও প্রকৌশলীদের সহায়ক হতে পারে স্কেচআপ সফটওয়্যারটি।
এটি ওপেন করার সঙ্গে সঙ্গে ট্রায়াঙ্গেল লাইনসংবলিত হোমস্ক্রিন পাওয়া যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম হলে ভিউ মেন্যু থেকে লার্জ টুল সেট করে নিলেই প্রফেশনাল হোমস্ক্রিন পাওয়া যাবে। ইচ্ছামতো ড্রয়িংয়ের জন্য রয়েছে বিভিন্ন জ্যামিতিক টুল এবং যেকোনো স্কেচের প্রয়োজনমাফিক আকার-আকৃতি পরিবর্তন করার জন্য ভেল্যু কন্ট্রোল বক্স তো রয়েছেই। অজস্র কালার, শেড ব্যবহার করে সব ধরনের থ্রিডি স্টাইলকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করা যায়।
রিভিট
স্থাপত্যশৈলীর জগতে অন্যান্য বৃহৎ সফটওয়্যারের পাশাপাশি রিভিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সফটওয়্যার। অগণিত টুলস এবং অপশন রয়েছে এ সফটওয়্যারটির। রিভিট আয়ত্ত করা একটু কঠিন হলেও তা করতে পারলে স্থাপত্যশৈলী, স্ট্রাকচারাল ড্রয়িং, থ্রিডি এবং কোনো কিছুর জন্য অন্য সফটওয়্যারের সাহায্য ছাড়াও যেকোনো প্রজেক্ট সম্পন্ন করা সম্ভব। বিশাল টুলবারকে কাজের সুবিধার জন্য ইচ্ছেমতো সাজিয়ে-গুছিয়ে নেওয়া যায়। ফলে সময় বাঁচে, কাজে কোনো জটিলতা সৃষ্টি হয় না। জটিল পরিকল্পনাকে সহজে রূপ দেওয়ার জন্য অনেক কঠিন এবং নিখুঁত আর্কিটেকচারাল ডিজাইনের ক্ষেত্রে রিভিট ব্যবহৃত হয়। বাজারে প্রচলিত অন্য সব সফটওয়্যারের চেয়ে এই সফটওয়্যারের শেয়ার অনেক বেশি।
প্যারাম্যাট্রিক থ্রিডি মডেলের জন্য রিভিট অনেক জনপ্রিয়। কল্পনা অনুযায়ী যেকোনো ডিজাইন করা যায় রিভিট ব্যবহার করে। তা ছাড়া রিভিট ব্যবহার করে যত দ্রুত ড্রয়িং করা যায়, অন্য সফটওয়্যার দিয়ে অতটা সহজে করা যায় না। এই সফটওয়্যারটির বিশেষত্ব হলো যেকোনো ডিজাইনের ফ্লোর প্ল্যানের জন্য খসড়া লে-আউট করতে ব্যস্ত ইঞ্জিনিয়ার ও স্থপতিদের পরম বন্ধু হিসেবে এটি কাজ করে। এ ছাড়া নতুন নতুন ডিজাইনের ধারাণা পাওয়া এবং যেকোনো কঠিন হিসাবনিকাশের দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিশেষ এক ব্যবস্থা আছে রিভিটে। রিভিট একটি পরিপূর্ণ সফটওয়্যার, যেখানে টুলের কোনো ঘাটতি নেই। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ডিজাইনের যেকোনো অংশ নিখুঁতভাবে এডিট করা অন্য সফটওয়্যারে যতই কঠিন হোক না কেন রিভিট ব্যবহারে তা অনায়াসেই সেরে ফেলা যায়। তা ছাড়া যে কেউ যেকোনো জটিল জ্যামিতিক ড্রয়িং এডিট করতে পারবে রিভিট ব্যবহার করে। সুনির্দিষ্ট বাজেট তৈরিতে রিভিট দিচ্ছে বাড়তি সুবিধা। এর এস্টিমেশন টুলস ব্যবহার করে সেকশনভিত্তিক ব্যয় নিরূপণ সম্ভব, তাই মালিক ও ঠিকাদারদের সম্ভাব্য ব্যয় নির্ণয় করতে রিভিট দারুণ কার্যকর। সবচেয়ে বড় কথা হলো, রিভিট মূলত বিল্ডিং ইনফরমেশন মডেলিংয়ের (বিআইএম) জন্যই তৈরি। একমাত্র রিভিটেই এররবিহীন ডিজাইন করা সম্ভব। এটি উইন্ডোজ ভিসতা ও এক্সপিতে ব্যবহারের উপযোগী।
সফটপ্ল্যান
বাড়ির অটোমেটিক ডিজাইন করতে চান? সফটপ্ল্যান, আপনার অটোমেটিক ডিজাইনের জগতে অনবদ্য এক উদ্ভাবন। এখন পর্যন্ত এটি পরিপূর্ণ একটি ক্যাড প্যাকেজ। সহজে, কম চিন্তায়, কম শ্রমের বিনিময়ে কোনো ডিজাইন করতে হলে সফটপ্ল্যানের কোনো বিকল্প নেই। কনস্ট্রাকশনের ডিজাইন কিংবা ডকুমেন্ট প্রকৌশলীরা যা হাতে তৈরি করে থাকেন, সফটপ্ল্যান ব্যবহার করে অনায়াসেই তা করতে পারবেন। ড্রয়িংকে ইচ্ছামতো কাস্টমাইজ করার জন্য এর আগে ছিল রিভিট; এরপরই স্থান করে নিয়েছে সফটপ্ল্যান। নতুনদের জন্য সফটপ্ল্যানে আছে বিশাল এক দিগন্ত। সহজ পদ্ধতিতে এর ফিচারগুলো সাজানো সফটওয়্যারের হেল্প মেন্যুতে। সফটপ্ল্যানে আছে বিশাল এক অবজেক্ট লাইব্রেরি। তাই ইচ্ছামতো প্রয়োজনীয় অবজেক্ট ব্যবহার করে যে কেউ কাঙ্খিত ডিজাইন করতে পারে। আরও সহজ একটি পদ্ধতিতে ফ্লোর প্ল্যানে সব তথ্য-উপাত্ত দিলে সে অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে মডেল তৈরি করতে পারে সফটপ্ল্যান। সফটপ্ল্যান ব্যবহার করে উল্লেখযোগ্য যে কাজগুলো করা যায় তা হলো, এলিভেশন, ফ্লোর প্ল্যান, ক্রস সেকশন, রোফ প্ল্যান, ফ্রেমিং ডায়াগ্রাম, ইলেকট্রিক্যাল প্ল্যান, সাইট প্ল্যান, ডিজিটাল ড্রয়িং প্রভৃতি। সফটপ্ল্যানের বাড়তি ব্যবহারিক সুবিধার মধ্যে রয়েছে, অন্যান্য সফটওয়্যারের মতো এটিতে অতি সহজে থ্রিডি রেন্ডারিং করা যায়। আধুনিক প্রতিযোগিতামূলক নির্মাণশিল্পে এর বিভিন্ন টুল খুব বেশি দরকারি। অন্যান্য সফটওয়্যারের তুলনায় সফটপ্ল্যানের মাধ্যমে থ্রিডি করার সময় অ্যাডভান্সড শ্যাডো, রিফ্লেকশন, সান স্টাডিজ এবং ফটোরিয়েলাস্টিক গ্রাফিক্স সবচেয়ে সহজে কোনো ঝামেলা ছাড়াই ব্যবহার করা যায়। গ্রাহকদের আকৃষ্ট করার মতো দৃষ্টিনন্দন ডিজাইন করলে গ্রাহক অবশ্যই আকৃষ্ট হবে। শুধু তা-ই না, অন্যান্য সফটওয়্যারের তৈরি করা কোনো ডিজাইনের সঙ্গে তুলনা করলে খুব সহজেই সফটপ্ল্যানের ডিজাইন করা কোনো থ্রিডির গুণাগুণ বোঝা যায়।
ভেক্টরওয়ার্ক
ডিজাইন সফটওয়্যারে একাধিক লেয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। একাধিক লেয়ার নিয়ে কাজ করলে কাজে সময় কম লাগে এবং নিখুঁতভাবে কাজ করা যায়। ভেক্টরওয়ার্ক এমন একটি সফটওয়্যার, যা ব্যবহারে অনেক বেশি লেয়ার ব্যবহার করা যায়। কোনো ডিজাইন করার পর ক্লায়েন্টকে তা দেখানোর জন্য ডিজাইন অনুযায়ী মডেল তৈরি করা একান্ত প্রয়োজন। আর্কিটেকচারাল কাজের পাশাপাশি ভেক্টরওয়ার্কের জনপ্রিয়তার একটি বিশেষ কারণ সাইট মডেল তৈরিতে এটি বিশেষভাবে সহায়তা করে। বিভিন্ন পরিমাপন পদ্ধতি ও মান নির্ণয় করতে সবচেয়ে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে ভেক্টরওয়ার্ক। চলতি বছরে সফটওয়্যারটিতে নতুন কিছু মাত্রা যোগ করা হয়েছে। ফলে এখন সফটওয়্যারটি ব্যবহার করে আরও স্বাধীনভাবে কাজ করা যাবে। এ বছরই এ ধরনের সফটওয়্যারে নতুন যুক্ত হলো কিছু হাইব্রিড টুলস। ফলে এখন আর্কিটেক্ট এবং ইন্টেরিয়র ডিজাইনাররা সমানভাবে সফটওয়্যারটি ব্যবহার করতে পারবে। হাইব্রিড টুলগুলো মূলত কিছু কাজে প্রধান ভূমিকা পালন করবে। যেমন, যেকোনো রুমের দরজা, জানালা এগুলো খুব সহজেই ডিজাইন করা যাবে। কেউ কেউ ভেক্টরওয়ার্ককে মিনি ক্যাডও বলে থাকে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬১তম সংখ্যা, মে ২০১৫