আমাদের প্রত্যাহিক জীবনে আবহাওয়া ও পরিবেশ নানাভাবে ছাপ রাখে। পরিবেশ পরিস্থির সঙ্গে তাল মিলিয়েই প্রতিনিয়ত চলতে হয় আমাদের। এই যেমন, শীতকালে যে কোট প্যান্ট পরি- গরম কালে সেটাকে এড়িয়ে চলি। আবার বর্ষায় শরীর না ভেজার জন্যে ব্যবহার করি ছাতা। শীতের কম্বল গরম কালে চোখের সামনে পড়লেও যেন গরম অনুভূত হয়। ঘরের ফ্যান গরম কালে অনুষঙ্গ তো শীতের শত্রæ। আর এভাবে চারপাশের পরিবেশ ও পরিস্থিতি নিত্যনৈমিত্তিক নানা আয়োজনের প্রধান উপজীব্য। আবহাওয়াভিত্তিক পরিস্থিতির মধ্যে সবচে ভয়াবহ গ্রীষ্মের গরম। এই সময়ে তাপমাত্রা সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকে। ঘরে ফ্যান ছেড়েও শরীর জুড়ায়না বিধায় ব্যবহার করি এসি যার ফলে আশেপাশের পরিবেশ আরও ক্ষতিগ্রস্থ করে তুলি। এসির আউটডোর ইউনিট থেকে গরম হাওয়া বের হয়, এটা এসির ঠান্ডা হাওয়া বের হওয়ার সমানুপাতিক। আর এভাবে প্রতিনিয়ত আমরা পরিণত করছি গ্রিণহাউজ পরিস্থিতি। কিন্তু চাইলেই আমরা এই গরম আবহাওয়ার মধ্যেও নিজেদের শান্ত স্নিগ্ধ ও ঠান্ডা পরিবেশ উপহার দিতে পারতাম। আজকে সে বিষয়েই আলোকপাত করব।
প্রধাণত দুই উপায়ে আমরা নিজেদের বাড়ি ঠান্ডা রাখতে পারি। যেমন-
- স্থাপত্য নকশার মাধ্যমে
- পুরোনো স্থাপত্যকলায় নানা অনুষঙ্গ প্রয়োগ
সঠিক ডিজাইন অনুষঙ্গ ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা নিজেদের পরিবেশ সহজেই ঠান্ডা রাখতে পারি। এখনও যাদের বাড়ি তৈরিই হয়নি, তাদের বাড়ির ডিজাইন একজন স্থপতির মাধ্যমে করিয়ে স্থাপত্যে আনা যায় নানা শৈল্পিক ও স্থাপত্যিক অনুষঙ্গ যার মাধ্যমে ঘর থাকবে ঠান্ডা।
পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল
একটি স্থাপত্যকলার নকশায় প্রতিটি বেডরুম ও অন্যান্য ঘরে (রান্নাঘর ও বাথরুম ব্যতীত) যদি দুটি জানালা দেয়া যায়, তাহলে সেগুলো দিয়ে পর্যাপ্ত বাতাস প্রবাহিত হতে পারে। একটি ঘরে বাতাস প্রবাহিত হয় অথচ সেই ঘরটি গরম সেটা কখনোই হয় না। আমাদের দেশের পরিবেশের সাথে জানালার সম্পর্ক বেশ প্রাচীন। জানালায় আমরা বর্তমানে ¯øাইডিং গ্লাস উন্ডো ব্যবহার করি। কিন্তু একসময় কাঠের খিড়কি দেয়া জানালা ব্যবহার করা হত। সেই জানালাগুলোতে প্রচুর আলো ও বাতাস প্রবাহিত করতো বলেই সে সময় আমাদের এয়ারকন্ডিশনিং মেশিন নিয়ে ঘর ঠান্ডা রাখতে হত না। আমরা যদি প্রাচীন জানলা (সুইং উইন্ডো) ব্যবহার শুরু করি তাহলে ঘর অনেক ঠান্ডা থাকবে। একটি ¯øাইডিং উইন্ডো সবসময় অর্ধেক খোলে। আর সুইং উইন্ডো পুরোটাই খুলে যায় বলে ঘরে প্রচুর বাতাস প্রবাহিত হতে পারে।
কাচ ব্যবহার
ঘরের দরজা, জানালা, বারান্দা ইত্যাদি স্থানে কাচের ব্যবহার বেড়েছে। কাচ ভঙ্গুর, তবে সুন্দর। কাচের ব্যবহারেরর ফলে বাইরের উত্তাপ-সূর্যালোক সরাসরি ঘরে প্রবেশ করে, কিন্তু গ্রিনহাউজ ইফেক্টের কারণে সেই তাপ পুরোপুরি ঘর থেকে বের হতে পারে না। ফলে ঘরের ভেতর থেকে আলো বের হয়ে যেতে পারলেও তাপ বের না হবার কারণে উত্তপ্ত পরিবেশের তৈরি হয়। আমাদের পৃথিবীর শীতল পরিবেশের গ্রীনহাউজগুলোতে পরিণত হচ্ছে আমাদের ঘর গুলো। আমরা এ থেকে সহজেই পরিত্রাণ পেতে পারি কাচের বহুল ব্যবহার হ্রাস করার মাধ্যমে। অনেকেই কাচ দিয়ে পুরো ঘরের উন্মুক্ত অংশ মুড়ে দেন। এক্ষেত্রে কাচের অংশ কমিয়ে সলিড সারফেস বাড়ানোর মাধ্যমে ঘরে রোদ ও তাপ প্রবেশের পথে আমরা বাঁধা দিতে পারি। ডাবল গেøজ গ্লাস উইন্ডো ব্যবহার করতে পারি। ফলে ঘরে শব্দ ও তাপ প্রবেশে বাঁধা দেবে। আলো প্রবেশ করবে। কিন্তু তাপ আটকে যাবে ডাবল গেøজ এর মধ্যবর্তী আর্গন এরিয়াতে।
সূর্যের আলো প্রবেশে বাঁধা তৈরি
বাসা-বাড়ির সেই অংশগুলোই উত্তপ্ত হয় যে অঞ্চলগুলোতে বাঁধা তৈরি করে যদি বাড়ি বানাই তাহলে ঘরে তাপ প্রবেশ করতে বাঁধা পায় এবং ঘর থাকে ঠান্ডা। আর এ ধরণের অনুষঙ্গ তৈরি হয় ঘরের সানশেড, কার্নিশ, ল্যুভর তৈরির মাধ্যমে। বারান্দায় লম্বা ¯ø্যাব তৈরি করলে সূর্যালোক অনেক দূর পর্যন্ত বাঁধা পায়। সানশেড তৈরি হয়। ফলে ঘর ঠান্ডা থাকে।
বহুল ব্যবহৃত কক্ষের অবস্থান পূর্ব-দক্ষিণে স্থাপন
আমারা যেখানে থাকি-সেই ঘরের বেশ কিছু অংশ আছে যেগুলোতে আমরা একটু বেশি সময় কাটাই। আবার কিছু অংশ আছে যেগুলোতে বেশ কম সময় থাকি। যেমন, ঘরের শোয়ার অংশ এবং কাজের অংশ সমান ব্যবহার হয় না। আমাদের ঘরের নারীদের একটা বেশ বড় সময় কাটে রান্নাঘরে। আবার আরেকটা বড় সময় কাটে ড্রইং রুমে। দেখা যায় শোয়ার সময় কেবল বেডরুমে আসা হয়। কিন্তু বেড রুমে শোয়ার সময়টাতে চারপাশের পরিবেশ এমনিতেই ঠান্ডা হয়ে যায়। দখিনা বাতাস শুধু বেডরুমে না দিয়ে অন্যান্য কক্ষগুলোতেও প্রবেশাধিকার দিলে সেই কক্ষগুলো ঠান্ডা থাকে।
মোটা দেয়াল নির্মাণ
আমাদের নতুন যেসব বাড়ি আছে সেগুলোর থেকে পুরোনো বাড়িগুলো দেখা যায় তুলনামূলক ঠান্ডা। আর এর মূল কারণ সেই সব বাড়ির ঘরের দেয়াল দশ বা পনেরো ইঞ্চি মোটা। কিন্তু বর্তমানে দেখা যায় খরচ ও স্থান সংকুলান করতে গিয়ে পাঁচ ইঞ্চির ইটের গাঁথুনিা দেয়াল দিয়েই পুরো ঘর তৈরি করা হচ্ছে। যার ফলে ঘরগুলো বেশি গরম হয়ে যাচ্ছে। পুরো ঘরের না হোক- অন্তত যেসব অঞ্চল এ আমরা বেশি অবস্থান করি সে সব অঞ্চলের বহির্দেয়াল ১০ ইঞ্চি রাখলে ঘর তুলনামূলক ঠান্ডা থাকবে।
আবার ক্যাভিটি ওয়ালের ব্যবহার করে ও ঘর ঠান্ডা রাখা সম্ভব। ক্যাভিটি ওয়াল হল ঘরের বহির্দেয়াল ৫ ইঞ্চি তোলার পর একটি ফাঁক রেখে আরেকটি দেয়াল নির্মাণ। অনেক সময় এই দুই দেয়ালের মধ্যবর্তী অঞ্চলে পাথর কুচি অথবা ইন্স্যুলেটর হিসেবে ফোম, জুট ইত্যাদি দিয়ে দেয়া হয়। ফলে ঘরে তাপ প্রবেশ করতে পারেনা। বা করলেও তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারে না।
বাড়ির পূর্ব দক্ষিণে খোলামেলা রাখা
বাড়ির নকশা করার পূর্বেই যদি স্থপতি পূর্ব দক্ষিণে খোলা অংশ রেখে দেন তাহলে সেই অংশ দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঘরে প্রবেশ করতে পারে। সেই অঞ্চলে বড় গাছ লাগানোর মাধ্যমে ও সুন্দর ঠান্ডা পরিবেশ আমরা পেতে পারি।
বাড়ির সামনে বড় গাছ লাগানো অথবা গাছ না কেটে ডিজাইন
আমাদের নিজেদের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে চলেছে। এর মূল রচিত হয়েছিল যেদিন আমরা বনাঞ্চল ধ্বংস করে ফসল ফলাতে শুরু করি। আর আজকের দিনে শহরে গাছের দেখা পাওয়া বেশ কষ্টকর। বলতে গেলে দেখাই যায় না। কিন্তু আমরা যদি বাড়ির সামনে বড় গাছ রোপন করি অথবা বাড়ির ভেতর তাপ প্রবেশ এ বাঁধা দেয়ার জন্যে বড় গাছ লাগাই তাহলে সেই গাছই আমাদের শীতল ছায়া দেবে। দেখা যায় একই তাপমাত্রায় গ্রামে অনেক বেশি ঠান্ডা অনুভূত হয়। কিন্তু শহরে টিকে থাকাই যায় না। গরমকালে গাছে সব পাতা থাকে। শীতকালে পাতা ঝড়ে যায়। এরকম গাছ যদি বাড়ির আঙ্গিনায় লাগানো যায় তাহলে সহজেই শীতে গরম ও গরমে ঠান্ডা ঘর রাখা সম্ভব।
ভেন্টিলেটর ব্যবহার
আমাদের বর্তমান কালের স্থপতিরা ভেন্টিলেটর বা ঘুলঘুলির ব্যবহার করেন না বললেই চলে। কিন্তু পুরাতন বাড়িগুলোতে এখনও ভেন্টিলেটর ব্যবহার দেখা যায়। আমরা জানি গরম বাতাস খুব সহজেই ওপরের দিকে উঠে যায় এবং সেই স্থান দখল করে ঠান্ডা বাতাস। আর সেই গরম বাতাসকে বের করে দেয়ার জন্যে ঘরের ওপরের দিকে ভেন্টিলেটর ব্যবহার করলে সহজেই ঘর ঠান্ডা রাখা যায়। আধুনিক ঘর বাড়িতে ভেন্টিলেটর থাকে না। ফ্যান চলতে থাকে। ফ্যানের পাখাগুলো গরম বাতাসকেই আমাদের দিকে ছুড়ে দেয়। চলে ফ্যান চললেও গরম থেকেই যায়। আর এই অবস্থা থেকে পরিত্রান দিতে পারে কেবল ভেন্টিলেটর।
পুরোনো স্থাপত্যকলায় নানা অনুষঙ্গ প্রয়োগ
যেসব বাড়ি এর মধ্যেই তৈরি হয়ে গেছে সে সব বাড়ি নতুন করে বানানো তো সম্ভব না। সে সব বাড়ি কীভাবে ঠান্ডা রাখা যায় সে বিষয়ে আলোচনা করা হল-
জল ছাদের ব্যবহার
দেশে বহুল ব্যবহৃত জলছাদ আপনার বাড়ির জন্যে হতে পারে একটি আদর্শ ব্যবস্থা। বাড়ির ছাদের ওপর আরেকটি ছাদ তৈরি করে সহজেই জলছাদ তৈরি করা যায়, যার ফলে ছাদের গরম কমে যায়। অনেকের বাড়ির ছাদের নিচ তলায় বসবাস করা যায় না শুধু তাপমাত্রার কারণে। আর এই জলছাদ হতে পারে এর একটি স্থায়ী সমাধান। বর্তমানে অনেক উন্নত প্রযুক্তি বের হয়েছে। অনেকেই ফোম কনক্রিটের তৈরি জলছাদ ও করছেন নিজেদের বাড়ি বা অফিসের ছাদে। এতে ছাদ ও রক্ষা পাচ্ছে- গরম ও কমে আসছে। থাকার উপযোগী হচ্ছে ছাদের নিচের তলায়।
হিট প্রুফ পেইন্ট
বাড়ীর ছাদে হিট প্রুফ পেইন্ট এখন সময়ের জনপ্রিয় মাধ্যম, যার ফলে অনেক কম খরচেই ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বাড়ির ছাদ পরিষ্কার করে রঙের লেয়ার তৈরি করে সিলারসহ সুন্দর ভাবে পেইন্ট এর কাজ করা হয়। ফলে ছাদ সহজেই তাপ বিকিরণ করে দেয়। সাধারণত এগুলো সাদা রঙ এর হয়। আর আমরা জানি যে সাদা রঙের যেকোন বস্তু তাপ প্রতিফলিত করতে পারে। ফলে ঘরের ছাদে পড়া সূর্যালোক বিকিরিত হয়ে যায়। ঘর এমনিতেই ঠান্ডা থাকে।
বারান্দায় গাছ রোপন
আমাদের দেশের বাসা বাড়িতে বারান্দা মূলত কাপড় শুকানোর জন্যে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এই বারান্দায় যদি কিছু গাছ লাগাতে পারি তবে সহজেই ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। গাছ দেয় পরিশুদ্ধ বায়ু। আর পরিশুদ্ধ বায়ু সবসময় পরিবেশ ঠান্ডা ও আরামদায়ক রাখতে সাহায্য করে। বর্তমানে অনেকেই বারান্দায় ফুল ও ফলের নানা গাছ রোপন করেন। এতে তাপমাত্রা যেমন নিয়ন্ত্রণ হয়- নান্দনিকতার ছোঁয়া পায় বারান্দাগুলো।
ঘরে সাদা রঙ ব্যবহার
সাদা রঙ সবসময় কোমল ও ঠান্ডা অনুভূতি দেয়। চোখে দেখা রঙের সাথে আমাদের মস্তিষ্কে এর প্রভাব বেশ সম্পর্কযুক্ত। আমরা যদি লাল- হলুদ এই সব রঙ ঘরে দেখি তবে একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে যে এই রঙগুলো ঘরে থাকলেই গরম অনুভূত হয়। এয়ারকন্ডিশনার না থাকলে এটা বেশ ভালমত বোঝা যায়। কারণ এই সব রঙ তাপ শোষণ করে রাখে। ফলে ঘর গরম হয়ে যায়। আমরা ইন্টেরিয়র করার সময় যদি সাদা রঙের প্রাধান্য রাখতে পারি তবে আমাদের ঘর হবে অন্যান্য যেকোন ঘরের চাইতে ঠান্ডা। তবে সাদা জিনিস বেশি ময়লা হয়। আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে সাদা ব্যবহার অতটা হয়না শুধু এর দ্রুত ময়লা হয়ে যাওয়ার প্রবণতা থেকেই।
কার্পেট-পর্দার ব্যবহার
ঘরে যদি কার্পেট ব্যবহারে আমরা মিতব্যায়ী হতে পারি তবে তাপমাত্রা অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব। টাইলসের ওপর উলের কারপেট ব্যবহারে ঘরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। আবার দুই লেয়ার পর্দার ব্যবহারে ঘরের ভেতরের তাপ বাইরে বের হতে পারে না। পর্দা এমন কাপড়ের হওয়া উচিত যেন ঘরের তাপমাত্রার ওপর এর কোন প্রভাব না পড়তে পারে।
এছাড়াও ঘরের লাইটের পরিমান কমিয়ে আমরা সহজেই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। বাড়ির বাইরে সাদা রঙ করে দিলে এমনিতেই ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা কমে যায়। অনেকেই রান্নাঘরে একজস্ট ফ্যান বসান। এটি রান্নাঘরের উত্তাপ অন্যান্য ঘরে প্রবেশ করতে দেয় না। কমিয়ে রাখে উত্তাপ। সর্বোপরি ঘরের দরজা জানালা খোলা রেখে যতটা সম্ভব বাতাস প্রবেশ করতে দিলেই কেবল আমাদের ঘর এই তীব্র গরমেও ঠান্ডা থাকবে। আমরা খুব কম শক্তি খরচ করে আমাদের জীবন নির্বাহ করতে পারব শান্তিতে।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১৪১তম সংখ্যা, মে ২০২২