প্রমবানন কমপ্লেক্স

ইন্দোনেশিয়ার পর্যটনপ্রিয় তীর্থস্থান

প্রমবানন মন্দির কমপ্লেক্স, ইউনেসকো স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্যের একটি ঐতিহাসিক হিন্দু পুরাকীর্তি। প্রমবানন, ইন্দোনেশিয়ার প্রাচীন জাভার সবচেয়ে বড় শিবমন্দির এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শিবমন্দির। প্রায় দেড় হাজার বছর আগে নবম শতাব্দীতে এই মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল। রাজা শৈলেন্দ্রের শাসনামলে অষ্টম শতাব্দীতে এই মন্দিরের নির্মাণকাজ শুরু হয়। হিন্দু রামায়ণেও এই মন্দিরের উল্লেখ রয়েছে। মূলত হিন্দু দেবতা শিব, বিষ্ণু ও ব্রহ্মাকে উৎসর্গ করে এই মন্দির নির্মাণ করা হয়। ইন্দোনেশিয়ার কেন্দ্রীয় জাভা ও যজ্ঞকার্তার মধ্যবর্তী স্থানে এই পুরাকীর্তির অবস্থান। স্থানীয়ভাবে এই পুরাকীর্তিটি ‘রারা জংগ্রাং’ নামে পরিচিত।

সুউচ্চ স্থাপত্যশৈলী, হিন্দু স্থাপত্যের আদর্শে নির্মিত এবং পৃথক পৃথক মন্দির এই স্থাপত্যের বিশেষত্ব। এখানে তিনটি আলাদা আলাদা বড় বড় মন্দির রয়েছে। মূল আকর্ষণ শিবমন্দির ছাড়াও সেয়ু, বুবরাহ এবং লুমবাং নামে রয়েছে তিনটি মন্দির। এ ছাড়া ২৪০টি মন্দিরস্বরূপ কুঠি বা স্তম্ভও রয়েছে। শিবমন্দিরের ভেতরের উচ্চতা ৪৭ মিটার বা ১৫৪ ফুট। হিন্দুধর্মের নিদর্শন হিসেবে গোটা বিশ্বে এই মন্দিরের রয়েছে দারুন জনপ্রিয়তা। প্রায় ৫০৮ ধরনের নানা আকৃতির পাথর দিয়ে এই মন্দিরটি নির্মিত। ইন্দোনেশিয়ার এই অঞ্চল খুব বেশি ভূমিকম্পপ্রবণ হওয়ায় বেশ কয়েকবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মন্দিরের এই নান্দনিক স্থাপত্যশৈলী। পরে সপ্তদশ শতকের দিকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় রক্ষণাবেক্ষণ শুরু হয়। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে এ বিশ্ব ঐতিহ্যের আকর্ষণ দিন দিন বেড়েই চলেছে।

মাতরাম রাজার শাসনামলে এই মন্দিরটি সংস্কার কাজ সম্পন্ন হয়। নতুন সংস্কারে কিছু সংযোজনও করেন রাজা। ডাকসা ও তুলোদং মন্দির দুটি তিনিই প্রতিষ্ঠা করেন। এ ছাড়া মূল শিবমন্দিরের চারপাশে শতাধিক পেরোয়ারা মন্দিরস্বরূপ নির্মাণ করেন। সংস্কারের ফলে প্রমবানন মাতরাম রাজার রাজমন্দিরে উন্নীত হয়। রাজ্যের বেশির ভাগ ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান ও বলিদান এই মন্দিরেই সম্পন্ন হতো। রাজ্যের পণ্ডিতগণ ধারণা করতেন, মন্দির প্রাঙ্গণের দেয়াল ঘেঁষেই বাস করতেন শতাধিক ব্রাহ্মণ। উল্লেখ্য, মাতরাম রাজদরবার ও মাতরাম নগর ছিল মন্দিরের খুব কাছাকাছি প্রমবানন সমভূমিতেই।

ষোড়শ শতাব্দীতে বড় ধরনের ভূমিকম্পের কারণে মন্দিরের অধিকাংশ স্থাপনা ভেঙে পড়েছিল। ফলে মন্দিরটি হিন্দুু ধর্মাবলম্বীদের উপাসনার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে আর ব্যবহৃত হচ্ছিল না। মন্দিরটি ধ্বংস হয়ে গেলে শুধু মন্দির এলাকার আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভগ্নাংশগুলো ছিল প্রাচীন জংগ্রাংয়ের সবচেয়ে মূল্যবান নিদর্শন।

বিভিন্ন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সংস্কারের বদৌলতে উনিশ শতকের গোড়ার দিকে মন্দিরটি পুনরায় তার ঐতিহ্য ফিরে পায় যা ঐতিহাসিক স্থাপত্যশৈলী ও সৌন্দর্যের জন্য দর্শনার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়। ১৮১১ সালে জাভা যখন ডাচ্্ ইস্ট ইন্ডিজের দখলে ছিল, তখন স্যার থমাস স্ট্যামফোর্ড রাফেলস এই মন্দিরটির ওপর একটি সমীক্ষা চালান, তবে শেষ পর্যন্ত তা আর সম্পন্ন হয়নি। সে কারণে মন্দিরটি কয়েক দশক ছিল অবহেলিত। অবহেলিত থাকার দরুন ডাচ্্ বাসিন্দারা বাগানের দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য ও স্থানীয় বাসিন্দারা নির্মাণের অনেক দামি দামি উপকরণ চুরি করে নিয়ে যায়।

দফায় দফায় ভূমিকম্পসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার এই  মন্দিরটিও দেবে যায়। ১৮৮০ সালে ডাচ্্ প্রত্নতাত্ত্বিকেরা পুনরায় খননকার্য শুরু করলেও শুরু হয় আরেক দফা লুটপাটের মচ্ছব। ১৯১৮ সালে তারা মন্দিরটির পুনরায় সংস্কার শুরু করে। ১৯৩০ সালে সংস্কার সম্পন্ন হয় এবং আগের রূপে ফিরিয়ে নিয়ে আনা হয় এই বিশ্ব ঐতিহ্যস্বীকৃত ইন্দোনেশিয়ার বৃহত্তম শিবমন্দিরটিকে। তবে পূর্ণ অবয়ব ও নকশার কিছু অংশ বিভিন্ন কারণে হারিয়ে যাওয়ায় ছোট ছোট মন্দিরসদৃশের অনেকগুলোই পুনর্নির্মাণের কোনো পরিকল্পনা সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যায়ে এখনো নেওয়া হয়নি। ১৯৫৩ সালের ইন্দোনেশিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট সুকর্ণ মন্দিরটি রাষ্ট্রীয় ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান হিসেবে উদ্বোধন করেন।

নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে মন্দির প্রাঙ্গণের নিকটবর্তী বাজারটি উচ্ছেদ করে আশপাশের গ্রাম ও ধানের জমিগুলো নিয়ে এলাকাটি রাষ্ট্রীয় প্রত্নতাত্ত্বিক উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে ইন্দোনেশিয়া সরকার। এই প্রত্নতাত্ত্বিক উদ্যানটি দক্ষিণে যজ্ঞকার্তা (সলো) প্রধান সড়ক থেকে পুরো প্রমবানন কমপ্লেক্স লুমবং ও বুব্রাহ মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ হয়ে উত্তরে সেউ মন্দির চত্বর পর্যন্ত বিস্তৃত। তবে ১৯৯২ সালে সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে উদ্যানটি রক্ষণাবেক্ষণের স্বার্থে এবং পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কাছে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। বর্তমানে প্রমবানন ইন্দোনেশিয়ার অন্যতম দর্শনীয় স্থান।

প্রাদেশিক সীমানা ভাগাভাগির পর পুরো এলাকাটি দুটি ভাগে বিভক্ত হয়। মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা ওপাক নদীর ওপারেও রয়েছে এই পুরাকীর্তির কিছু বিক্ষিপ্ত অংশ। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঐতিহ্যবাহী রামায়ণখ্যাত মহাকাব্যের মঞ্চায়নের জন্য তখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ত্রিমূর্তি মুক্তমঞ্চ। ২০০৬ সালে পুনরায় ভূমিকম্পে মন্দিরটির কিছু ক্ষয়ক্ষতি হলে ফের কয়েক মাস দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। কয়েক সপ্তাহ পর ইন্দোনেশিয়া প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্থার প্রধানের অনুমতিতে সাময়িক খোলা হলেও বেশি দিন উন্মুক্ত রাখা হয়নি। ফের ২০০৯ সালে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য তা খুলে দেওয়া হয়।

মন্দির প্রাঙ্গণের বর্ণনা

প্রকৃতপক্ষে মন্দির না হলেও মন্দিরসদৃশ ২৪০টি স্থাপনা ও অন্যান্য স্থাপত্যশৈলীতে ঘেরা ছিল প্রমবানন মন্দির প্রাঙ্গণ। মূল মন্দিরগুলো সমভূমি থেকে একটি উঁচু বেদি নির্মাণ করে তার ওপর মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল। চারপাশে খোলামেলা জায়গা পূজারি ও দর্শনার্থীদের সমাগমের জন্য উন্মুক্ত রাখা। মন্দিরের সর্বশেষ যে চিত্র দেখা যায়, তা ২০০৬ সালের ভূমিকম্পের জন্য নয়, ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহাসিক মানচিত্র থেকেই মন্দির প্রাঙ্গণে পুরাকীর্তির বিভিন্ন স্থাপনার ঘনত্ব লক্ষ করা যেত।

  • প্রমবানন মন্দির কমপ্লেক্সের মূল আকর্ষণ হলো ত্রিমূর্তি মন্দির। এশিয়া ও ভারতের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে ত্রিমূর্তি মন্দির একটি তীর্থস্থান। যে তিনটি প্রধান মন্দিরের জন্য ত্রিমূর্তি বলে এই মন্দিরের খ্যাতি আছে, সেগুলো হলো শিব, বিষ্ণু ও ব্রহ্মামন্দির। এই তিন দেবতার নামে বড় তিনটি মন্দির উৎসর্গ করা হয়েছিল।
  • বড় তিনটি মন্দিরের সামনে সমান্তরাল সারিতে আরও তিনটি আকারে ছোট মন্দির রয়েছে, যেগুলো গারুদা, নন্দী ও হামসা দেবতার নামে উৎসর্গ করা হয়েছে। এই তিনটি মন্দির বাহন মন্দির হিসেবেও পরিচিত।
  • ত্রিমূর্তি মন্দির এবং বাহন মন্দিরের মাঝখানের সারিতে উত্তর ও দক্ষিণ পাশে আরও দুটি ছোট মন্দির রয়েছে। এই দুটি মন্দির এপিট মন্দির নামে পরিচিত।
  • মূল মন্দিরের চার দেয়ালের প্রবেশমুখের ঠিক ভেতরের পাশে চারটি আরও ছোট আকারের স্তম্ভ রয়েছে। প্রবেশমুখের স্তম্ভগুলো কেলির মন্দির নামে পরিচিত।
  • মন্দির প্রাঙ্গণের চার দেয়ালের চার কোণে আরও চারটি ছোট ছোট স্তম্ভ রয়েছে, যেগুলো পাতোক মন্দির নামে পরিচিত।
  • মন্দির প্রাঙ্গণটিই প্রমবানন মন্দির কমপ্লেক্সের মূল আকর্ষণ। মন্দির প্রাঙ্গণটি ২২৪টি মন্দিরসদৃশ স্থাপত্যশৈলী দ্বারা বেষ্টিত। এই নান্দনিক মন্দিরসদৃশগুলোকে পেরোয়ারা মন্দিরও বলা হয়। মন্দির প্রাঙ্গণের চারপাশে ২২৪টি মন্দিরসদৃশ স্থাপনা ঘন বর্গাকার সারিতে চার চক্রে সারিবদ্ধভাবে সাজানো হয়েছে। চার চক্রের বর্গাকারে মন্দিরগুলোর সংখ্যা হিসেবে একেক চক্রে একেক পরিমাণের, যেমন: ৪৪, ৫২, ৬০ ও ৬৮।
উইকিপিডিয়া

প্রমবানন মন্দির কমপ্লেক্স একসময় রারা জংগ্রাং হিসেবেই স্থানীয় মানুষের কাছে পরিচিত ছিল। ইন্দোনেশিয়ার তৎকালীন জাভা অঞ্চলের কিংবদন্তি রাজা রারা জংগ্রাংয়ের নামে এর নামকরণ করা হয়েছিল। তাঁর সময়ের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য আজ না থাকলেও পুরোনো স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ রারা জংগ্রাং বলেই ডাকেন প্রমবানন মন্দির কমপ্লেক্সকে। প্রমবানন মন্দির কমপ্লেক্সের পুরো এলাকাটি তিনটি অঞ্চলে বিভক্ত। প্রথমে বাইরের অঞ্চল, যেখানে রয়েছে খোলা ময়দান এবং ছোট ছোট স্থাপত্যশৈলী; দ্বিতীয়টি মধ্য অঞ্চল, যেখানে রয়েছে ছোট ছোট মন্দিরসদৃশ ২৪০টি স্থাপত্য  (পেরোয়ারা মন্দির)। দফায় দফায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে এই স্থাপনাগুলো গুঁড়িয়ে যাওয়ার ফলে সেগুলোর ভগ্নাংশ, দামি দামি পাথর চুরি হয়ে গেছে। পরে সরকারি উদ্যোগে তা সংস্কার করা হয়, যা বর্তমানে দেখতে পাওয়া যায়। তৃতীয় অঞ্চলটি সবচেয়ে ভেতরে এবং এই অঞ্চলটিই প্রমবানন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। তা হলো মন্দিরের বেদি। এখানে রয়েছে ছোট-বড় ৮টি মন্দির এবং ৮টি স্তম্ভ।

প্রমবানন কমপ্লেক্সের নকশা তৈরি করা হয়েছিল বর্গাকার ক্ষেত্রের ওপর। মূল কমপ্লেক্সের চারপাশে চারটি দেয়াল রয়েছে। চার দেয়ালের মাঝখানে একটি করে করে ফটক বা প্রবেশদ্বার নির্মাণ করা হয়েছিল। ফটক বা প্রবেশদ্বারসহ দেয়ালের দৈর্ঘ্য ৩৯০ মিটার। দক্ষিণ ফটক ব্যতীত গোটা স্থাপনাটিই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শুধু এই ফটকটিই অক্ষত অবস্থায় টিকে ছিল, বাকি বেশির ভাগ স্থাপনাই পুনরায় সংস্কার করা হয়েছে। এ ছাড়া এই মন্দির কমপ্লেক্সটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে বড় তীর্থস্থান, আশ্রম।

শিবমন্দির

মন্দির বেদির চার দেয়াল মূল্যবান পাথর দিয়ে নির্মিত। মন্দির প্রাঙ্গণটিই এই কমপ্লেক্সের সবচেয়ে পবিত্রতম স্থান। প্রমবানন মন্দির কমপ্লেক্সের প্রধান তিনটি মন্দিরকেই ত্রিমূর্তি মন্দির বলা হয়। এই ত্রিমূর্তি মন্দিরের মূল মন্দিরটিই হলো শিবমন্দির। শিবমন্দির এই কমপ্লেক্সের সবচেয়ে বড় মন্দির, যার ভেতরের উচ্চতা ৪৭ মিটার এবং প্রস্থ ৩৪ মিটার। মন্দির বেদির পূর্ব প্রান্তে রয়েছে শিবমন্দিরে প্রবেশের সিঁড়ি। পূর্ব পাশের সিঁড়িতে প্রবেশমুখে দুটি ছোট মন্দির রয়েছে, যা অভিভাবক দেবতা মহাকাল ও নন্দিস্বরের নামে উৎসর্গ করা হয়েছে। শিবমন্দিরের পূর্ব দেয়ালে রামায়ণের কাহিনি দেয়ালচিত্রে (টেরাকোটা) চিত্রায়িত। দর্শনার্থীদের পরিষ্কার এবং ধারাবাহিকভাবে রামায়ণের কাহিনি বুঝতে হলে অবশ্যই পূর্ব ফটক দিয়ে প্রবেশ করতে হবে। প্রবেশের পর শিবমন্দিরের পূর্ব দেয়ালের বাইরের দিক থেকে ঘড়ির কাঁটার মতো ডান দিকে ঘুরলে রামায়ণের কাহিনির ধারাবাহিকতা খুঁজে পাওয়া যাবে।

উল্লেখ্য, কমপ্লেক্সটি পূর্বমুখী। তাই বলাই বাহুল্য, বেদি ও মন্দিরও পূর্বমুখী। শিবমন্দিরে রয়েছে মোট চারটি প্রকোষ্ঠ বা কক্ষ। কক্ষ চারটি ঘড়ির কাঁটার মতো চক্রাকারে সজ্জিত। অর্থাৎ একটি ঘড়ি যদি পূর্বমুখী হয়, তবে উত্তর, পূর্ব, দক্ষিণ ও পশ্চিমে চারটি কক্ষের অবস্থান। পূর্ব প্রকোষ্ঠ বা কক্ষ থেকে মধ্যখানের কক্ষের সংযোগ রয়েছে। এখানেই রয়েছে মহাদেব শিবের তিন মিটার উঁচু মূর্তি। মূর্তিতে লাকানা বা শিবের গুণাবলির নির্দেশ করা হয়েছে। যার ওপরের অংশ দেখতে মাথার খুলি, কপালে চোখ (ত্রিনয়নখ্যাত) এবং দুই পাশে অঙ্কিত চারটি সরলরেখা যা চার হাত নির্দেশ করে। মূর্তিটি একটি পদ্মের মাঝখানে স্থাপন করা হয়েছে। অনেক ঐতিহাসিকদের মতে মহাদেব হিসেবে শিবের চিত্রায়ণে রাজা বালিতুংকে শিবের পুনর্জন্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে বলে বোঝানো হয়েছে। তিনটি কক্ষে রয়েছে শিবের সঙ্গে সম্পর্কিত দেব-দেবীর মূর্তি। তাঁরা হলেন, শিবের স্ত্রী দুর্গা, ঋষি অগস্ত এবং তাঁর ছেলে গণেশ। দক্ষিণ কক্ষ দখল করেছে ঋষি অগস্তের মূর্তি, পশ্চিম কক্ষে রয়েছে গণেশের মূর্তি এবং উত্তর কক্ষে দুর্গা মহিষাসুরের মূর্তি। কিংবদন্তি রাজা রারা জাংগ্রাংয়ের শাসনাবসানের পর তাঁর কন্যার মাজার হিসেবেও এই মন্দিরটিকে মান্য করা হয়। এককালে এই কক্ষটি পরিচিত ছিল জংগ্রাংয়ের মন্দির হিসেবেও।

ব্রহ্মা ও বিষ্ণুমন্দির

শিবমন্দিরের উত্তর ও দক্ষিণ পাশে দুটি মন্দির রয়েছে। উত্তর পাশে বিষ্ণু এবং দক্ষিণ পাশে যে ছোট মন্দিরটি রয়েছে, তা হলো ব্রহ্মামন্দির। দুটি মন্দিরই পূর্বমুখী এবং এই মন্দির দুটির ভেতরে কোনো প্রকোষ্ঠ বা কক্ষ নেই। এগুলো এক কক্ষবিশিষ্ট। তবে ব্রহ্মামন্দিরে ব্রহ্মা এবং বিষ্ণুমন্দিরে বিষ্ণু দেবের মূর্তি রয়েছে। উভয় মন্দিরের ভেতরের উচ্চতা ৩৩ মিটার এবং প্রস্থ ২০ মিটার।

বাহন মন্দির

শিবমন্দিরের সামনের দিকে (পূর্ব দিকে) সমান্তরাল সারিতে আরও তিনটি আকারে ছোট মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল। এই মন্দির তিনটি হামসা, নন্দী ও গারুদার মন্দির। হামসা মানে হলো রাজহাঁস, নন্দী একটি ষাঁড়ের নাম এবং গারুদা হলো এক প্রজাতির ঈগলের নাম, যা ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এই তিনটি ছিল মূল তিন মন্দিরের দেবতাদের বাহন। শিবের বাহন ছিল নন্দী বা ষাঁড়, তাই শিবমন্দিরের সামনে নির্মাণ করা হয়েছিল নন্দীর মন্দির। এই মন্দিরের ভেতরে রয়েছে একটি ষাঁড়ের মূর্তি। এ ছাড়া অন্যান্য দেব-দেবীর মূর্তিও রয়েছে। ব্রহ্মা দেবের বাহন হলো রাজহাঁস। তাই ব্রহ্মামন্দিরের সামনে নির্মাণ করা হয়েছিল হামসা বা রাজহাঁসের মন্দির এবং বিষ্ণু দেবের মন্দিরের সামনে তাঁর বাহন গারুদার মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল। নন্দীমন্দিরে মূর্তি থাকলেও হামসা ও গারুদা মন্দিরের ভেতরে কিছুই নেই। ধারণা করা হয়, এই দুই মন্দিরেও মূর্তি ছিল, যা পরে হারিয়ে গেছে।

এপিট মন্দির

মূল মন্দির এবং বাহন মন্দিরের মাঝখানের সারিতে মন্দির চত্বরের উত্তর ও দক্ষিণ পাশে দেয়ালের পার্শ্ববর্তী দুটি মন্দির রয়েছে, যে মন্দিরগুলো এপিট মন্দির হিসেবেই পরিচিত। এপিট শব্দের অর্থ পার্শ্ববর্তী। মন্দির দুটি বেদির দেয়াল ঘেঁষে ভেতরের পাশে নির্মাণ করা হয়েছে বলে এগুলো এপিট মন্দির হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। তবে দুঃখজনক, এই দুটি এপিট মন্দিরের ভেতরে বর্তমানে ফাঁকা রয়েছে। এই মন্দির দুটিতে কোন দেবতা বা দেবীর প্রতিমা ছিল তা জানা না গেলেও মন্দিরের বাইরের দেয়ালে অঙ্কিত টেরাকোটা থেকে বোঝা যায়, দক্ষিণের এপিট মন্দিরে সরস্বতী দেবীর মূর্তি বা প্রতিমা ছিল। লক্ষণীয় বিষয় হলো, দক্ষিণের এপিট মন্দিরটি ব্রহ্মামন্দিরের সামনে সমান্তরাল সারিতে নির্মাণ করা হয়েছে এবং হিন্দু ধর্মমতে সরস্বতী ব্রহ্মারই শক্তি একইভাবে উত্তর এপিট মন্দিরের দেয়ালের টেরাকোটা স্পষ্ট বোঝা না গেলেও ঐতিহাসিকদের মতে, তাতে বিষ্ণুর শক্তি শ্রীশ্রী লক্ষ্মী দেবীর মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল।

স্তম্ভ বা কুঠি

মূল মন্দির চত্বর বা বেদিতে মোট ৮টি মন্দিরের পাশাপাশি ৮টি স্তম্ভ আকৃতির কুঠি রয়েছে। চারটি রয়েছে চারপাশের প্রবেশমুখে যেগুলোর কেলির মন্দির বলেই পরিচিতি আছে। মন্দির চত্বরের চার কোনায় দেয়ালের ভেতরের পাশে রয়েছে আরও চারটি, যেগুলো পাতোক মন্দির হিসেবে পরিচিত। মন্দির চত্বরটি বালি অঞ্চলের এলিং এলিং স্থাপত্যশৈলীর মতোই দেখতে।

পেরোয়ারা মন্দির

প্রমবানন কমপ্লেক্সটি দুটি চত্বরে বিভক্ত এবং এখানে দুটি চত্বরের আলাদা আলাদা সীমানাপ্রাচীর ও চারটি কার্ডিনাল (ঘড়ির ও চারটি কার্ডিনাল পয়েন্ট আছে যেমন: ১২, ৩, ৬, ৯ ঘণ্টা) পয়েন্টে প্রবেশপথ রয়েছে। প্রথম প্রাচীর যা বেদি বা মন্দির চত্বরের চারপাশে রয়েছে তার থেকে দুই গজ দূরত্বের পর থেকে বাইরের দিকে খোলা জায়গা রয়েছে। এই খোলা জায়গাটুকু প্রমবানন কমপ্লেক্সের মধ্য অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত। দুই প্রাচীরের মধ্যবর্তী দূরত্ব ২২৫ মিটার। বেদি বা মন্দির চত্বরের চারপাশে দুই গজ দূরত্বের পর চারপাশে চার সারিতে মন্দিরসদৃশ ২৪০ মনুমেন্ট বা স্তম্ভ ছিল, যেগুলোকে পেরোয়ারা মন্দির বলা হতো। দফায় দফায় ভূমিকম্পে পেরোয়ারা মন্দিরগুলোর অস্তিত্ব বর্তমান দৃশ্যপটে বুঝতে পারা প্রায় দুঃসাধ্য। বর্তমানে শুধু মন্দিরগুলোর ধ্বংসাবশেষ এবং খণ্ডিত অংশগুলোই লক্ষ করা যাবে। তবে কিছু মন্দির পুনরায় সংস্কার করা হয়েছিল। এই মন্দিরগুলো সমান দূরত্বে, সমান আকৃতির এবং একই শৈলীতে নির্মাণ ও স্থাপন করা হয়েছিল। অন্যান্য মন্দিরের মতো এই মন্দিরগুলো নিয়েও স্থানীয় লোকজনের মধ্যে অনেক ধারণা ও মিথ রয়েছে।

মন্দির থেকে যা পাওয়া গেছে

শিবমন্দির পুনরুদ্ধারের সময় শিবমন্দিরের কেন্দ্র্স্থল থেকে একটি পাথরের শিলালিপি পাওয়া গেছে। শিলালিপিটি একটি ৫.৭৫ মিটার গভীর কূপের মুখে স্থাপন করা ছিলা। কূপ থেকে পাওয়া গেছে বলি দেওয়া প্রাণীর হাড়ের অংশাবশেষ। পাহাড় ও সমুদ্র দেবতার শিলালিপিও পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ২০টি মুদ্রা, ১২টি সোনার পাতাসহ কিছু রূপার পাতাও পাওয়া গেছে।

স্থাপত্যশৈলী

বাস্তুশাস্ত্রের বিভিন্ন নিয়মনীতি অনুসারে প্রমবানন মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল। বাস্তুশাস্ত্রকে বলা হয়ে থাকে স্থাপত্যকলার বিজ্ঞান। প্রাচীন ভারতের বাস্তুশাস্ত্রের বিভিন্ন লিখিত বই-পুস্তক ভারতে আবিষ্কার করা গেলেও বইগুলো এবং বাস্তুশাস্ত্রের সঠিক ইতিহাস এখনো কোথাও পাওয়া যায়নি। বাস্তুশাস্ত্রের বিভিন্ন গ্রন্থে বিদ্যমান নকশা, বিন্যাস, পরিমাপ, স্থান প্রস্তুতি, স্থান ব্যবস্থাপনা এবং স্থানগত জ্যামিতিক নিয়মানুযায়ী স্থাপত্যকলার চর্চা শুরু হয় বলে জানা যায়। এই শাস্ত্রের ওপর ভিত্তি করেই প্রাগৈতিহাসিক স্থাপত্যকলা নির্মাণ করা হতো, যার সাক্ষী হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে হিন্দু ও বৌদ্ধদের বিভিন্ন পুরাকীর্তি হাজার হাজার বছর পরে আজও দাঁড়িয়ে আছে।

বাস্তুশাস্ত্রের মূল ভিত্তি হলো হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় বিশ্বাস। বাস্তুশাস্ত্রের উদ্দেশ্য হলো, প্রকৃতি ও তার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন অবয়ব, অবয়বের অংশবিশেষের জ্যামিতিক এবং দিকনির্দেশমূলক বিন্যাসের সঙ্গে সংহতি (সদৃশ/মিল) বজায় রেখে ঐশ্বরিক ক্ষমতা ও বিশ্বাসের নিদর্শন বাস্তবায়িত করা। বাস্তুবিদ্যা হলো বিভিন্ন আইডিয়া এবং কনসেপ্টের এক বিশাল সংগ্রহ। তবে সকল কনসেপ্টের লে-আউট ডায়াগ্রাম উল্লেখ নেই। এই কনসেপ্টগুলোই হলো খালি জায়গা এবং দৃশ্যমান শেপ বা আকৃতির অবয়বের ব্যবস্থাপনার সঠিক মানদণ্ড, যার নকশা বা লে-আউট থেকে অবয়ব বা স্থাপনার বিভিন্ন ফাংশন এবং গুচ্ছ স্থাপনার যৌথ ফাংশন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। আবিষ্কৃত প্রাচীন ভারতীয় বাস্তুশাস্ত্রের নীতিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, মন্দিরের নকশা, ঘরবাড়ি, শহর, নগর, উদ্যান, রাস্তাঘাট, জলের কার্যপ্রণালি বিন্যাস, দোকান এবং বিভিন্ন সরকারি দাপ্তরিক স্থাপনা বিন্যাস।

উইকিপিডিয়া

প্রমবানন কমপ্লেক্সের কনসেপ্ট

প্রাচীন বাস্তুশাস্ত্রের প্রথম আধুনিক প্রয়োগ করা হয় ভারতের জয়পুরের জওহর কালা কেন্দ্রের নকশায়। ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ চার্লস মার্ক কোরিয়া। তাঁকে স্বাধীন ভারতের আধুনিক স্থাপত্যকলার পথিকৃৎ হিসেবে মানা হয়। বাস্তুশাস্ত্রের একটি বিশেষ কনসেপ্ট হলো মাণ্ডালা। মাণ্ডালা হলো পরিপূর্ণ বর্গাকার ডায়াগ্রাম বা নকশা। এই পরিপূর্ণ ডায়াগ্রামের কেন্দ্রকে ধরা ব্রহ্মাস্থান বা ঈশ্বরের স্থান অন্য অর্থে বললে সব শক্তি বা নেভিগেশনের কেন্দ্রবিন্দু। হিন্দু ও বৌদ্ধধর্মীয় বিশ্বাসের আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণ থেকে এই কনসেপ্ট বা ধারণার উদ্ভব হয়েছে। মূলত সুষম বলয় দিয়ে বেষ্টিত এলাকাকে মাণ্ডালা বোঝানো হয়েছে। কোনো জমিতে মাণ্ডালা কনসেপ্ট অনুযায়ী স্থাপনা নির্মাণ করলে যে নীতিমালা অনুসরণ করা হয়, তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বর্গাকার ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বিভিন্ন মাণ্ডালায় বিভিন্ন মডিউল ব্যবহার করা হয়। পীঠ মাণ্ডালায় ৯ (এর বর্গমূল ৩ সারি), উপপীঠ মাণ্ডালায় ২৫ (এর বর্গমূল ৫ সারি) বর্গের মডিউল ব্যবহার করা হয়। একইভাবে মহাপীঠের ক্ষেত্রে ১৬ (এর বর্গমূল ৪ সারি), উগ্রপীঠের ক্ষেত্রে ৩৬ (এর বর্গমূল ৬ সারি), মান্দুকা মাণ্ডালার ক্ষেত্রে ৬৪ (এর বর্গমূল ৮ সারি) বর্গাকার, স্ট্যান্ডিলায় ৪৯ (এর বর্গমূল ৭ সারি) বর্গ এবং পরমশায়িকা মাণ্ডালায় ৮১ (এর বর্গমূল ৯) সারির মডিউল ব্যবহার করা হয়ে থাকে। শাস্ত্রীয় বাস্তুবিদ্যা অনুযায়ী পীঠ মাণ্ডালার কেন্দ্রবিন্দুকে পৃথিবী বিবেচনা করা হয় এবং বাকি বর্গক্ষেত্রগুলোকে বলয় বিবেচনা করা হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাণ্ডালা হলো মান্দুকা এবং পরমশায়িকা মণ্ডালা। মাণ্ডালা কনসেপ্টের ভিত্তিতেই প্রমবানন কমপ্লেক্সের ত্রিমূর্তি নির্মিত হয়েছিল। মাণ্ডালা বাস্তুশাস্ত্র বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হিন্দু ও বৌদ্ধদের ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণের কাজে প্রয়োগ করা হয়। ভারতে এ রকম অনেক আধুনিক স্থাপনাও আছে, যার ডিজাইন বাস্তুশাস্ত্রের কনসেপ্ট থেকে নেওয়া হয়েছে।

ভারতের রাজস্থানের গোলাপি শহর জয়পুরের মাস্টার পরিকল্পনা করেছিলেন রাজাপুত রাজা জয় সিংহ। ১৭২৭ খ্রিষ্টাব্দে বাস্তুশিল্পশাস্ত্রের ভিত্তিতেই তিনি এ পরিকল্পনা করেছিলেন। একইভাবে আধুনিক স্থাপত্যের দিকে তাকালেও আহমেদাবাদের গান্ধী স্মারক সংঘালয়, ভোপালের বিধান ভবন, জয়পুরের জওহর কালা কেন্দ্র এমনকি চণ্ডীগড়ের নগর পরিকল্পনাও করা হয় বাস্তুশাস্ত্রের কনসেপ্ট থেকে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৮তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০২০।

সারোয়ার আলম
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top