ক্রেতার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখুন

প্রাচ্যের ড্যান্ডি নারায়ণগঞ্জ। বাংলাদেশের বেশ পুরোনো শহর এটি। শীতলক্ষ্যা নদীতীরের এই শহরতলিতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ছোট-বড় শিল্পকারখানা। পাট, গার্মেন্টস, সুতা, তাঁত, সিমেন্টসহ বিভিন্ন শিল্পপণ্যের অধিকাংশ উৎপাদিত হয় এখানেই। এমনকি সারা বিশ্বে সমাদৃত দেশের ঐতিহ্যবাহী জামদানি শাড়ির সূতিকাগারও এটি। বন্ধন-এর নিয়মিত আয়োজন ‘সফল যারা কেমন তারা’ আয়োজনের এবারের সফল ব্যবসায়ী মেসার্স আর এস ট্রেডাসের্র্র স্বত্বাধিকারী রুহুল আমীন স্বপন। এলাকার একজন ব্যস্ত ব্যবসায়ী। শত ব্যস্ততার ফাঁকে বন্ধনকে বলেছেন তাঁর সাফল্যের রহস্য, জানিয়েছেন সফলতার পেছনের কাহিনি।

ব্যবসায়ী স্বপনের জন্ম ১৯৬৯ সালের ২৯ মার্চ, নারায়ণগঞ্জের ডিপি রোডের ২ নম্বর বাবুরাইলে। বাবা মৃত আশোক আলী ব্যাপারী ও মা নূরজাহান বেগম। বাবা ছিলেন আদমজী জুট মিলের একজন ঠিকাদার। মিলে দরকারি পণ্য সরবরাহ করতেন। চার ভাই এক বোনের মধ্যে স্বপনই বড়। পড়াশোনা করেছেন নারায়ণগঞ্জ জয়গোবিন্দ হাইস্কুলে। কিন্তু এসএসসি পরীক্ষার আগেই বিদ্যালয়ের পাট চুকাতে হয় তাঁকে। পরিবারের বড় ছেলে হওয়ায় সংসার সামলানোর দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল তাঁর ওপরেই বেশি। ফলে পড়ালেখার ধারাবাহিকতা রাখা আর সম্ভব হয়নি। জীবিকার তাগিদে ১৯৮৮ সালে পাড়ি জমান জাপানে। ভাষা ও সংস্কৃতি ভিন্ন হওয়ায় সেখানে তাঁকে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু দ্রুতই এসব সমস্যার সমাধান করে ফেলেন। প্রথম ছয় মাস একটি নিকেল ফ্যাক্টরিতে চাকরি করেন। এরপর প্রায় এক বছর বিখ্যাত মোটর কোম্পানি নিশানে কাজ করেন। সেখান থেকে একটি সবজি প্রক্রিয়াকরণ ফ্যাক্টরিতে চাকরি নেন। প্রায় নয় মাস কাজের পর যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানায় চাকরি নিয়ে থিতু হন। সেখানে তিনি দীর্ঘ ১২ বছর অবস্থান করেন। যত দিন জাপানে ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানটিতেই কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘ প্রবাস যাপনের পর ২০০২ সালে দেশে ফিরে আসেন। কিছুদিনের মধ্যেই ব্যবসায় সম্পৃক্ত হন। শুরু করেন স্ক্রিনপ্রিন্টের ব্যবসা। নারায়ণগঞ্জে গার্মেন্টসশিল্পের আধিক্য থাকায় বেছে নেন এই ব্যবসা। প্রায় পাঁচ বছর এই ব্যবসা করেন। এরপর রডের মাধ্যমেই নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসায় প্রবেশ করেন। বছর যেতে না-যেতেই নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসায় যোগ হয় সিমেন্ট। 

নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসার তেমন কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না তাঁর, এ ব্যবসায় একেবারেই নতুন। এ জন্য শুরুতে কিছু সমস্যায় পড়তে হয় তাঁকে। তবে প্রবাসজীবনের পরিশ্রম, সময়ানুবর্তিতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগান। শুধু তা-ই নয়, একসময় তাঁর বাড়িতেই পারিবারিক গরুর খামার ছিল। সেটাও তিনি দেখাশোনা করতেন। এ ছাড়া এলাকায় সুপরিচিত হওয়ার কারণে অনেক ক্রেতাও পেয়ে যান। পাশাপাশি কৌশল ও মেধায় ব্যবসা চালিয়ে যান। এভাবে গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য বিক্রয়, ক্রেতা সম্পর্ক, কম মুনাফা আয় সব মিলিয়ে খুব দ্রুতই ব্যবসার প্রসার ঘটতে থাকে। খুচরা ও পাইকারি উভয় ক্ষেত্রেই সীমিত লাভে পণ্য সরবরাহ করেন তিনি। পণ্যের গুণগত মান সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিয়ে ভালো পণ্য ক্রয়ে ক্রেতাকে উদ্বুদ্ধ করেন। সঠিক ওজন নিশ্চিত করতে ডিজিটাল মেশিন ব্যবহার করেন। ফলে বিক্রিও বাড়তে থাকে। আর এর স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কোম্পানি থেকে পেয়েছেন সম্মাননা ও পুরস্কার। বর্তমানে তিনি একেএস রডের পরিবেশক। এ ছাড়া আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড ও প্রাইম সিমেন্টের সর্বোচ্চ বিক্রেতা। বিভিন্ন সময়ে এসব কোম্পানি থেকে পেয়েছেন ওয়াশিং মেশিন, মোটরসাইকেল, ফ্রিজ, টেলিভিশন প্রভৃতি। বর্তমানে তাঁর রয়েছে দুটি শো-রুম। তবে এতসব সফলতা ও স্বীকৃতির পেছনে রয়েছে তাঁর অন্য দুই ভাই মোঃ সাদরুল আমীন রতন ও মোঃ নুরুল আমীন সুমনের সম্পৃক্ততা। 

বিয়ে করেছেন ২০০২ সালে। স্ত্রী নাদিয়া আক্তার ইতি। বর্তমানে তাঁদের সুখের সংসারে দুটি সন্তান। বড় মেয়ে ফাইরোজ মাসুদা ইলিন তৃতীয় শ্রেণীতে ও ছোট ছেলে ইয়াসির আমিন রাইয়ান শিশু শ্রেণীতে পড়ালেখা করে। ব্যবসায়িক ব্যস্ততার কারণে তেমন একটা সময় দিতে পারেন না পরিবারকে। শুক্রবারেও বিভিন্ন দাওয়াতে যেতে হয় তাঁকে। এ জন্য পরিবারের সবাই তাঁকে খুব কম সময়ই কাছে পায়। সামাজিক কাজেও বেশ ব্যস্ত থাকতে হয় এলাকায়। তিনি মহল্লার মসজিদ ও রড বিক্রেতা মালিক সমিতির সদস্য। তাঁর এই ব্যবসার মাধ্যমে প্রায় ৩০ জন লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। 

সপরিবারে ব্যবসায়ী রুহুল আমীন স্বপন

ছোটবেলা থেকেই সফল এ ব্যবসায়ী ছিলেন খুবই পরিশ্রমী। খেলাধুলা করার তেমন সময় বা সুযোগ হয়ে ওঠেনি। নিজেদের ডেইরি ফার্মে সময় দিতেন। তবে স্কুলজীবনে রয়েছে তাঁর অসংখ্য মজার স্মৃতি। প্রায়ই স্কুল পালিয়ে সিনেমা দেখতে যেতেন, শিখতেন সাইকেল চালানো। এর জন্য শিক্ষকের কাছে শাস্তিও পেতে হয়েছে তাঁকে। তবে ব্যবসাটাই এখন তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। তাঁর মতে, যেকোনো কিছুই শেখার একটা নির্দিষ্ট বয়স আছে। সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করতে হয়। নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসা বেশ জটিল ধরনের। এ ব্যবসায় সফলতা পেতে ভালো মূলধনের পাশাপাশি সততা ও সৎ নীতির প্রয়োজন। এখানে পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য বিক্রি করতে হবে। 

ব্যবসায়ী স্বপন কথা প্রসঙ্গে তাঁর জীবনের একটি বাস্তব কাহিনি শোনালেন। তিনি যখন জাপানে তখন শার্ট কিনতে একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে যান। শার্ট পছন্দ হলে তিনি সেটা নিয়ে কাউন্টারে যান। বিক্রয়কর্মী তাঁকে বলেন, শার্টটি তাঁর বড় হবে। এটি কিনে যেহেতু পরতে পারবেন না সেহেতু অন্য একটি শার্ট কেনার পরামর্শ দেন। বিক্রয়কর্মী তাঁকে বলেন, আমি ঠিকই অন্য কারও কাছে এটি বিক্রি করতে পারব। তাঁর ব্যবহারে ও পরামর্শে তিনি মুগ্ধ হন। পরবর্তী সময়ে যা কিনতেন সেখান থেকেই কিনতেন। কিন্তু এ দেশের ব্যবসায়ীরা পণ্য বিক্রি করতেই বেশি আগ্রহী, ক্রেতার ভালো-মন্দ দেখেন না। এই শিক্ষাটাকে নিজের ব্যবসায়ও কাজে লাগান। প্রতিদানও পান। এখন ব্যবসায় আরও উন্নতি করতে লক্ষ্য শুধুই সামনে এগিয়ে যাওয়া। 

 মাহফুজ ফারুক

প্রকাশকাল: বন্ধন ৩৫ তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৩

+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top