দক্ষ নির্মাণ ব্যবস্থাপক হতে…

নির্মাণে এগিয়ে চলেছে বিশ্ব। নির্মাণ মানেই গড়া। বিশাল কর্মযজ্ঞ যেখানে অসংখ্য মানুষ, প্রতিষ্ঠান, উপকরণ ও আনুষঙ্গিক অনুষঙ্গ জড়িত। প্রতিটি নির্মাণকেই একটি প্রকল্প ধরে কাজ সম্পন্ন হয়। সাধারণত একটি নির্মাণ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকেন ডেভেলপার বা প্রকল্প নির্মাতা, বড় প্রকল্প হলে পরিকল্পনাকারী, ডিজাইনার হিসেবে স্থপতি, স্ট্রাকচারাল ডিজাইনার হিসেবে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার, কারিগরি দিক বাস্তবায়নে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, শ্রমিকের সাহায্যে কাজ সম্পন্ন করতে ঠিকাদার, নির্মাণপণ্য সরবরাহকারী, টাইলস, বিদ্যুৎ, প্লাম্বিং, স্যানিটারিসহ নানা কাজের মিস্ত্রি। এমনই অসংখ্য শ্রমিকের সমনি¦ত প্রচেষ্টার ফলেই নির্মিত হয় একটি প্রকল্প। এখানেই শেষ নয়, নির্মাণ সম্পন্ন হলেও এত সম্পৃক্ত থাকে জমির মালিক, গ্রাহক বা ব্যবহারকারী। এসব প্রক্রিয়া ছাড়াও আরও কিছু বিষয় প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত। তবে বিশাল এ কর্মযজ্ঞের প্রধান বা নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন একজন নির্মাণ ব্যবস্থাপক বা নির্মাণ প্রকল্প ব্যবস্থাপক। ডেভেলপার বা বিল্ডার্সের প্রধান এজেন্ট হিসেবেই যাঁর পরিচিতি। তবে নির্মাতার এজেন্ট হলেও সব পক্ষ যেন লাভবান হয়, এটি তাঁকেই নিশ্চিত করতে হয়, সম্পন্ন করতে হয় একটি সফল নির্মাণ প্রকল্প।

প্রকল্প ব্যবস্থাপনা
সুনির্দিষ্ট একটি কাজ লক্ষ্য ঠিক রেখে বৈজ্ঞানিক ও সুসংঘবদ্ধভাবে ধাপে ধাপে সফলভাবে শেষ করাটাই প্রকল্প ব্যবস্থাপনা। প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় রয়েছে মৌলিক কিছু বিষয়। এর মধ্যে অন্যতম নির্ধারিত বাজেট ও সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি সফলভাবে সম্পন্ন করা। প্রকল্পেরও রয়েছে রকমফের। যেমন- সড়ক, সেতু, রেললাইন প্রভৃতির মতো বড় সরকারি ভৌত অবকাঠামো, আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন কিংবা শিল্প-কলকারখানা। এগুলোর নির্মাণপ্রক্রিয়া ও কার্যপরিধি ভিন্নতর হলেও নির্মাণ ব্যবস্থাপককে তাঁর দক্ষতা ও যোগ্যতা দিয়ে তা সুসম্পন্ন করতে হয়। যদিও বড় প্রকল্পের দায়িত্বে থাকেন প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ (পিসি- Project Controllar), প্রকল্প নেতা (পিএল- Project Leader) ও প্রকল্প পরিচালক (পিডি- Project Director) তবে প্রায় সব ধরনের প্রকল্প নেতাই মূলত একজন নির্মাণ ব্যবস্থাপক। বহুমাত্রিক নির্মাণের মধ্যে রয়েছে-

নির্মাণ প্রকল্প ব্যবস্থাপক
একজন নির্মাণ ব্যবস্থাপক প্রকল্পের পরিচালক হলেও ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এবং সমন¦য়ের মাধ্যমেই নির্মাণকাজ পরিচালনা করেন। তাঁকে যেমন স্থপতি, কাঠামো প্রকৌশলী, পরিকল্পনাকারী, নির্মাণ বিশেষজ্ঞসহ নানা ব্যক্তির ফরমায়েশ মেনে কাজ করতে হয়, তেমনি পুরকৌশলী, ঠিকাদার, মিস্ত্রি, শ্রমিকসহ সবাইকে সঙ্গে নিয়ে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করতে হয়। একজন প্রকল্প ব্যবস্থাপকের সঙ্গে যাঁরা সম্পৃক্ত, তাঁরা হলেন

নির্মাণ ব্যবস্থাপকের দরকারি সরঞ্জাম

নির্মাণ ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব ও কার্যাবলি
একটি নির্মাণ প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট সবার কাজ নির্ধারিত হলেও একজন প্রকল্প ব্যবস্থাপকের ধরাবাঁধা কোনো কাজ নেই। তাকে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট প্রতিটি কাজই তদারক ও পরিচালনা করতে হয়। প্রকল্প ব্যবস্থাপনার কিছু মৌলিক বিষয় রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম নির্ধারিত বাজেট ও সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি সফলভাবে সম্পন্ন করা। এ জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে পরিকল্পনা, সমন্বয় ও সার্বিক তদারকি ঠিক রেখে নির্দিষ্ট বাজেট ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা। তবে তাঁর বিস্তৃত দায়িত্ব ও কার্যাবলির মধ্যে আরও রয়েছে-

  • নির্মাণ পরিসর অনুযায়ী পরিকল্পনা প্রণয়ন
  • সম্পদের পরিকল্পনা
  • কার্য পরিকল্পনা
  • সময়সূচি নির্ধারণ
  • সময় ও খরচ অনুমান
  • বাজেট তৈরি
  • ঝুঁকি নির্ধারণ
  • প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্র ও লাইসেন্স সংগ্রহ এবং তা যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ
  • পারিপার্শ্বিক অবস্থা জরিপ
  • মাটি পরীক্ষা (সয়েল টেস্ট)
  • স্থপতি, প্রকৌশলী এবং অন্যান্য নির্মাণ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সমন¦য় সাধন
  • নির্মাণ ও কারিগরি বিষয় নিয়ে বিভিন্ন পেশাদার ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি
  • উপযুক্ত নির্মাণপদ্ধতি এবং কৌশল নির্বাচন
  • প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি জোগাড়
  • অভিজ্ঞ ও দক্ষ জনবল নিয়োগ
  • ঠিকাদারকে সময়সূচি অনুযায়ী কাজের ধারণা প্রদানসহ দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া
  • নির্মাণকাজে ব্যবহৃত কাঁচামাল নিরীক্ষণ ও সংগ্রহ
  • ক্লায়েন্টকে কাজের অগ্রগতি এবং বাজেট বিষয়ে প্রতিবেদন দেওয়া।

নির্মাণ ব্যবস্থাপকের কর্মপরিসর
একটি প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয় নির্মাণ ব্যবস্থাপককের কাজের পরিসর। প্রকল্পের সাইট নির্ধারণ, স্থপতির সাহায্যে সাইটের স্থাপনা ডিজাইন, বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে চুক্তি এবং নির্মাণকাজ শুরু করে সফলভাবে শেষ করার মাধ্যমে খাতওয়ারি কাজগুলো সম্পন্ন করতে হয়। এর মধ্যে অন্যতম-

নির্মাণ প্রস্তুতি
যেকোনো নির্মাণকাজ সুষ্ঠু ও সফলভাবে সম্পন্ন করতে নির্মাণপূর্ব প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে ক্ষেত্রে প্রাথমিক কাজ হলো পারিপার্শ্বিক অবস্থা জরিপ করা। এই জরিপের মাধ্যমে আশপাশে অবস্থিত ভৌত অবকাঠামোসমূহের সার্বিক অবস্থাসহ পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইনের বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধার বিষয়গুলো সবিস্তারে জানা যায়। এ ছাড়া প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, পরিকল্পিত নকশা, আনুমানিক বাজেট ইত্যাদি বিষয় নিয়ে মালিকপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়। এরপর সব পক্ষের মধ্যে প্রয়োজনীয় চুক্তি এবং বিভিন্ন দপ্তর থেকে অনুমোদন সংগ্রহ করা হয়। প্রকল্পের স্থাপনা ডিজাইন যদি না করা থাকে, তাহলে স্থপতির সাহায্যে ডিজাইন করতে হয় এবং কাঠামো প্রকৌশলীর সাহায্যে স্থাপনার ডাইমেনশন, রড, সিমেন্ট ও অন্যান্য নির্মাণ উপকরণের অনুপাত হিসাব অনুযায়ী বের নিতে হয়। এরপর প্রকল্পের ধরন বিবেচনায় পুরকৌশলীকে প্রকল্পের কারিগরি দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। এরপর ওয়ার্কার দিয়ে কাজটি ভালোভাবে সম্পন্ন করতে ঠিকাদার নিয়োগ করতে হয়। নিয়োগে সাধারণত সর্বনিম্ন দরদাতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, তবে ব্যবস্থাপকের উচিত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দিয়ে ঠিকাদার নির্ধারণ করা। প্রকল্পের মাটি পরীক্ষা, মাটি দৃঢ়করণ, নির্মাণ উপকরণ ও যন্ত্রপাতিসমূহ রাখার স্থান তৈরি, অস্থায়ী বাউন্ডারি নির্মাণ, সেখানে যেন যানবাহন আসতে পারে সে জন্য রাস্তা নির্মাণ অর্থাৎ নির্মাণ সাইটের মবিলাইজেশন কাজগুলো সম্পন্ন করতে হয়। এ ছাড়া অফিসকর্মী, ঠিকাদার, ফোরম্যান, লেবার ও প্রহরীদের থাকা, খাওয়া, গোসল বা বাথরুমের জন্য উত্তম পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ
একটি প্রকল্পে অনেক ভারী ভারী নির্মাণ উপকরণ ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়। এগুলো পরিচালনা করা সত্যিই বিপজ্জনক। নির্মাণ প্রকল্পে প্রায়ই শ্রমিক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটে। নির্মাণশ্রমিক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, নিরাপত্তার কাজ ও বিভিন্ন রকম দুর্ঘটনাজনিত কারণে বিপুল পরিমাণে জানমালের ক্ষতিসাধিত হতে পারে। এ জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ জরুরি। যেমন নিরাপত্তা বুট, হেলমেট, নিরাপদ চশমা, হাতমোজা, নিরাপদ কোমর বন্ধনী, গামবুট, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

বিশেজ্ঞদের প্রকল্প পরিদর্শন

নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ
নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একজন কর্মী তাঁর কর্মের খুঁটিনাটি দিক জানতে পারেন। কর্মী যদি আগেই জানতে পারেন রোলারে হাত দিলে আঙুল কাটা পড়বে, ইলেকট্রিক তার স্পর্শ করলে বৈদ্যুতিক শক খেতে হবে, তখন তিনি খুব সতর্কতার সঙ্গে এবং নিরাপদ সামগ্রীর সহায়তায় কাজ করবেন। ফলে দুর্ঘটনাও ঘটবে কম। এটাই প্রশিক্ষণের সুফল। কর্মীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য প্রশিক্ষণদান খুবই প্রয়োজন। এ প্রশিক্ষণ কর্মীকে বাস্তব জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জনে সহায়তা করে। জানমালের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার লক্ষ্যে বিভিন্ন রকমের দুর্ঘটনা ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করার জ্ঞান অর্জনের জন্য পদ্ধতিগত নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ একান্ত প্রয়োজন।

সার্বক্ষণিক যোগাযোগ
একজন নির্মাণ ব্যবস্থাপককে যেমন সাইটে থাকতে হয়, তেমনি ব্যস্ত থাকতে হয় অফিশিয়াল কাজেও। এতে অনেক সময় প্রকল্পের কাজ ব্যাহত হয়। এ ছাড়া নির্মাণপণ্য সরবরাহ অনেক সময় ঠিকমতো হয় না। এ কারণে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ আবশ্যক। এতে কাজের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত হয়। সে কারণে সুপারভাইজার, অধস্তন ব্যক্তিদের সঙ্গে সরাসরি না পারলেও ফোনে বা ই-মেইলে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতে হয়।

প্রকল্প নকশা ও কার্যপ্রণালি বিষয়ে তথ্য বিশ্লেষণ
একটি নির্মাণ প্রকল্প গড়ে ওঠে স্থপতির ড্রয়িংয়ের ওপর ভিত্তি করে। স্থপতি তাঁর নিজস্ব দর্শনে ডিজাইন করে থাকেন। অনেক সময় দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী, ঠিকাদার ও শ্রমিকেরা ডিজাইনের অনেক দিক বুঝতে পারেন না। সে ক্ষেত্রে নির্মাণ ব্যবস্থাপক ডিজাইন সম্পর্কে সবাইকে পরিপূর্ণ ধারণা দেন এবং অত্যন্ত সহজভাবে তা বিশ্লেষণ করে যেন তা সবাই বুঝতে পারেন। একজন ব্যবস্থাপকের এ গুণটি থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নির্মাণ কার্যকলাপ লিপিবদ্ধকরণ
একটি প্রকল্পে অনেক মানুষ তাঁদের নিজ নিজ কাজ সম্পাদন করে থাকেন। তবে প্রকল্পের কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করতে দৈনন্দিন কার্যকলাপে নজরদারি জরুরি। প্রকল্পে চলমান ঘটনা পর্যবেক্ষণ, সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত, দাবি, সমস্যা, উদ্বেগ, আলোচনা ও মতবিনিময় সভায় প্রণীত কোনো সিদ্ধান্ত নথিভুক্ত করা উচিত এবং প্রয়োজনে তা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা প্রয়োজন।

বিরোধ মীমাংসা ও সমস্যা নিরসন
প্রকল্পে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে। মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসা করে যত দ্রæত সম্ভব পারস্পরিক দ্বন্দ¦ নিরসন করা দরকার। এ ছাড়া প্রয়োজন প্রকল্পের যেকোনো সমস্যা ও জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক সাড়ার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা।

নির্মাণকাজের মান নিয়ন্ত্রণ
নির্মাণকাজের মান নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি। যেকোনো জায়গায় ভুল হলেই পুরো প্রকল্প হুমকির মুখে পড়ে। এ জন্য কাজের মানের ক্ষেত্রে কোনো আপস নয়। এ ছাড়া নির্মাণের ক্ষেত্রে ভবন নির্মাণ আইন, কোড এবং অন্যান্য নিয়মকানুন মানা প্রকল্প পরিচালনার অন্যতম লক্ষ্য।

প্রকল্প সংশ্লিদের কথোপকথন

পরিবেশগত সুরক্ষা
নির্মাণ প্রকল্পে বহুমুখী কর্মযজ্ঞে পরিবেশ দূষিত হয়। তবে সচেতন ও কৌশলী হলে পরিবেশদূষণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তাই ব্যবস্থাপককে পরিবেশ সুরক্ষায় প্রাধান্য দিতে হবে।

নির্মাণ ব্যবস্থাপকের কাজের দক্ষতা ও গুণাবলি
প্রকল্প ব্যবস্থাপকের কিছু সাধারণ গুণাবলি ও দক্ষতা ছাড়াও নির্মাণসংশ্লিষ্ট অনুষঙ্গিক বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা থাকতে হয়। সময় ব্যবস্থাপনা, ব্যয় ব্যবস্থাপনা, মান ব্যবস্থাপনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, যেকোনো ধরনের নকশা বোঝার ক্ষমতাসহ নানা গুণের সমাহার তাঁর মধ্যে থাকতে হয়। এ ছাড়া যা থাকা উচিত-

বহুমুখী শিক্ষা
একজন নির্মাণ ব্যবস্থাপক সাধারণত প্রকৌশলবিদ্যায় পারদর্শী হলেও তাঁকে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখতে হয়। যেমন- নির্মাণবিজ্ঞান, নির্মাণ ব্যবস্থাপনা, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি, স্থাপত্য, গণিত, পরিসংখ্যান, ইংরেজি, নির্মাণ উপকরণ, মেকানিক্যালের মতো বিষয়ে। অনেক ব্যবস্থাপক আছেন, যাঁরা স্থপতির নকশা যথাযথভাবে বুঝতে পারেন না। ফলে নির্মাণকাজ সঠিকভাবে হয় না। এ জন্য ভালো ব্যবস্থাপকের অন্যতম গুণ সব ধরনের ডিজাইন ও ড্রয়িং সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ও তা প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বোঝানোর সক্ষমতা। এ ছাড়া অর্থনীতি, অ্যাকাউন্টিং, আর্থিক বাজার, ব্যাংকিং জ্ঞানও থাকা দরকার।

ব্যবসায়িক দক্ষতা
একজন নির্মাণ ব্যবস্থাপক প্রকৌশল বা অন্য যেকোনো বিষয়ে পারদর্শী হোন না কেন, তাঁকে অবশ্যই ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। সম্ভাব্য বাজেট নির্ণয় এবং সে অনুযায়ী প্রকল্প সম্পন্ন করাই তাঁর বড় চ্যালেঞ্জ।

নেতৃত্বের দক্ষতা
নেতৃত্বদানের ক্ষমতা নির্মাণ ব্যবস্থাপকের অন্যতম দক্ষতা। একজন ব্যবস্থাপককে পুরকৌশলী, ঠিকাদার, মিস্ত্রি, নির্মাণশ্রমিক এবং অন্যান্য পেশাদারকে কাজ বুঝিয়ে তা যথাযথভাবে আদায় করতে হয়। এ জন্য যথাযথ নেতৃত্ব খুবই দরকার। আদেশ, নির্দেশ, অনুরোধ, বুঝিয়ে বা অনুপ্রাণিত করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করাই একজন ব্যবস্থাপকের অন্যতম সফলতা।

সময় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা
সময় ব্যবস্থাপনা এমন একটি প্রক্রিয়া, যা ব্যবহার করে প্রকল্প ঠিক সময়ে শেষ করা হয়। ব্যবস্থাপকের অন্যতম দায়িত্ব টাইম শিডিউল তৈরি করা এবং সে অনুসারে কাজ হচ্ছে কি না তা মনিটর করা। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কাজ বাছাই, ক্রম অনুসারে সাজানো, সঠিক নির্মাণ উপকরণ বাছাই, উপযুক্ত কর্মপন্থা নির্বাচনের মাধ্যমেই সময় ব্যবস্থাপনার দক্ষতা প্রকাশ পায়।

সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা
একটি সিদ্ধান্ত যেমন কাজকে খুব দ্রুতগতিতে এগিয়ে নেয়, আবার অনেক সময় তা প্রকল্পের ক্ষতির কারণও হতে পারে। এ জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা একজন ব্যবস্থাপকের অন্যতম গুণ। যেকোনো পরিস্থিতিতে বিবেচকের মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়।

কথা বলার দক্ষতা
নির্মাণ ব্যবস্থাপককে মালিকপক্ষ, স্থপতি, প্রকৌশলী, নির্মাণশ্রমিক, গ্রাহক, পণ্য সরবরাহকারীসহ বিভিন্ন মহলের সঙ্গে নিয়মিত আলাপচারিতা করতে হয়। তাই কথা বলার দক্ষতা জরুরি। স্পষ্ট আদেশ, নির্দেশনা, জটিল বিষয়গুলো সহজভাবে বুঝিয়ে বলতে সাবলীল ভাষা, বাচনভঙ্গির মাধ্যমে প্রকল্প পরিচালনা করাই তাঁর অন্যতম দক্ষতা।

লেখার দক্ষতা
নির্মাণ প্রস্তাব, বাজেট পরিকল্পনা, কর্মপরিকল্পনা, প্রকল্পের চলমান অবস্থা, কাজের অগ্রগতি ইত্যাদি প্রতিনিয়ত লিখে রাখা এবং বিস্তারিত বিষয় লিখিত আকারে প্রকাশ করার দক্ষতাও থাকতে হয় প্রকল্প ব্যবস্থাপকের।

প্রযুক্তিগত দক্ষতা
প্রযুক্তিময় বিশ্বে প্রতিটি ক্ষেত্রের মতো নির্মাণেও লেগেছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন মেশিনারিজ ও যন্ত্রপাতি, আধুনিক নির্মাণ সফটওয়্যার, এমনকি রোবট প্রযুক্তিও নির্মাণ প্রকল্পের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ছে। ব্যবস্থাপককে এসব নির্মাণপদ্ধতি ও প্রযুক্তি সম্পর্কে জানতে হবে। প্রযুক্তিগত দক্ষতা ছাড়া আধুনিক নির্মাণে টিকে থাকা সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিবর্তিত দুর্যোগসহনীয় অবকাঠামোর নির্মাণকৌশল সম্পর্কে শেখাটাও জরুরি।

পেশা যখন প্রকল্প ব্যবস্থাপনা
বিশ্বব্যাপী উন্নত দেশগুলোতে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা খুবই আকর্ষণীয় পেশা। বাংলাদেশে স্বতন্ত্র পেশা হিসেবে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এখনো তেমন জনপ্রিয় নয়। বর্তমানে পৃথিবীর দুই শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি চালু রয়েছে। উন্নত বিশ্বে প্রকল্প ব্যবস্থাপনার সম্ভাবনাকে বিশেষ গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম অনেক আগ থেকেই চালু আছে। এ ছাড়া এ বিষয়ে শিক্ষা ও গবেষণার জন্য আলাদাভাবে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ইনস্টিটিউট। প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ১৯৬৭ সালে ইউরোপে International Project Management Association (IPMA) গঠিত হয়। ১৯৬৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে Project Management Institution (PMI) গঠিত হয়। উভয় প্রতিষ্ঠান থেকেই প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ওপর পেশাগত দক্ষতার সনদ দেওয়া হয়। বর্তমান বিশ্বে Project Management Professional (PMP) থেকে প্রদত্ত প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত ডিগ্রি বা সনদ হিসেবে মূল্যায়িত। The Construction Management Association of America প্রতিষ্ঠানটি সনদধারী কনস্ট্রাকশন ম্যানেজারদের (CCM) অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে থাকে। বিশ্বব্যাপী দ্রুত বর্ধমান নির্মাণ কর্মকান্ডের সঙ্গে বাড়ছে প্রকল্প ব্যবস্থাপকের চাহিদা। বাংলাদেশেও সাংগঠনিক কাঠামোয় প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পরিচালিত না হলেও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থাতেই প্রকল্প ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব ও প্রকল্প সম্পৃক্ততা দ্রæতই বাড়ছে। এ ছাড়া এডিবি, ইউএনডিপি, জাইকার মতো উন্নয়ন সহযোগী, এনজিও ও দাতাগোষ্ঠীরা বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালনা করায় এসব সংস্থায় প্রকল্প ব্যবস্থাপকদের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে।

চলছে প্রকল্পের নির্মাণযজ্ঞ

প্রকল্প ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা
প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে দ্রুত দক্ষতার সঙ্গে ফলপ্রসূভাবে কাজ শেষ করাই মূল চ্যালেঞ্জ। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা করলে একজন প্রকল্প ব্যবস্থাপক অনেক আগে থেকেই খুঁটিনাটি বিভিন্ন বিষয়ে সচেতন থাকেন। প্রকল্প ব্যবস্থাপনার সঠিক জ্ঞান পারে প্রকল্পের খরচ কমাতে, সঠিক সময়ে প্রকল্প শেষ করতে। ভুলের সংখ্যা আর কাজের পুনরাবৃত্তি কমিয়ে কাজের গতি ধরে রাখতেও সাহায্য করে সঠিক কর্মপরিকল্পনা জ্ঞান। একটি প্রকল্পের দালিলিক ব্যবস্থাপনাও উন্নত করতে সঠিক জ্ঞান বিশেষভাবে সাহায্য করে। স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির ক্ষেত্রেও প্রকল্প ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব অপরিসীম। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সমন্বয়ের ওপর প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় বিশেষ জোর দেওয়া হয়, যা প্রকল্পের সব সদস্যের সম্পর্কোন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

সম্প্রতি বাংলাদেশেও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য ও প্রকৌশলবিদ্যার পাশাপাশি নির্মাণ-বিষয়ক পড়ালেখার বিষয় চালু হয়েছে কিংবা হতে যাচ্ছে। এ ছাড়া প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট, কস্ট ম্যানেজমেন্ট, টাইম ম্যানেজমেন্ট, কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট, রিয়েল এস্টেট ইত্যাদি বিষয়ে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কোর্সও কিছু প্রতিষ্ঠানে চালু রয়েছে। তবে তা চাহিদার তুলনায় নগণ্য। সব বিশ্ববিদ্যালয় এবং ভবন নির্মাণের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠান যেমন, হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিচার্স ইনস্টিটিউট, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট, স্থাপত্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানে নির্মাণ ব্যবস্থাপনার নানা দিক নিয়ে যদি প্রশিক্ষণ কোর্স ও ডিগ্রির ব্যবস্থা করা যায়, তবে দেশের চাহিদা মিটিয়েও বহির্বিশ্বে অবদান রাখতে পারবেন দেশীয় নির্মাণ ব্যবস্থাপকেরা।

প্রকৌশলী সুবীর কুমার সাহা

প্রকাশকাল: বন্ধন ৭১ তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৬

+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top