ইমারত নির্মাণ আইন ও ভবনধস; জরুরী করণীয়

পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানে ইমারত নির্মাণ নিয়ন্ত্রণে ১৯৫২ সালে ইমারত নির্মাণ আইন জারি করা হয়। আইনটির উদ্দেশ্য ছিল দেশের যেকোনো এলাকায় পরিকল্পিত উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, এ রকম এলোপাতাড়ি ইমারত নির্মাণ প্রতিরোধ ও অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভ‚মি ব্যবহার পরিকল্পনা ও বিধিবিধান অনুসারে ইমারতের নকশা অনুমোদন নিয়ন্ত্রণ করা। পরবর্তী সময়ে জলাধার ভরাট ও খনন এবং পাহাড় কর্তনের বিষয়টিও এই আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আইনটি প্রয়োগের ক্ষমতা অর্পিত হয় সরকার মনোনীত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (Authorised Officer) ওপর। কিন্তু এর বাস্তবায়নের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করা হয়নি। ফলে বিদ্যমান বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে আইনটির বাস্তবায়ন শুরু হয়। প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকায় প্রথম আইনটির প্রয়োগ শুরু হয়। তৎকালীন সিঅ্যান্ডবি ডিপার্টমেন্টের প্রধান প্রকৌশলী প্রথম দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর ১৯৫৬ সালে ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) প্রতিষ্ঠার পর সংস্থার চেয়ারম্যান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার এই দায়িত্ব পালন শুরু করেন। ১৯৫৯-৬০ সালে ঢাকার প্রথম মহাপরিকল্পনা প্রণীত হয় এবং সেই থেকে পর্যায়ক্রমে ডিআইটি পরবর্তী সময়ে রাজউক এবং অপরাপর সংস্থার কর্মকর্তাদের ওপর এই দায়িত্ব অর্পিত হতে থাকে। তন্মধ্যে রাজউকের একজন কর্মকর্তা একনাগাড়ে ১৪ বছর এই দায়িত্ব পালন করেন। প্রসঙ্গত, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগে কোনো নীতিমালা প্রণীত হয়নি। ফলে চলমান প্রক্রিয়ায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে রাজউক ও অন্যান্য দপ্তর/সংস্থার যেসব কর্মকর্তারা ইচ্ছা-অনিচ্ছায় (!) দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন, তাঁদের কারও কারও বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অনৈতিকতার অভিযোগ ওঠে।

এসব বিভিন্ন কারণে আশির দশকের শুরুতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পরিবর্তে বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন কমিটি ((Building Construction Committee) গঠন করে নকশা অনুমোদনের ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৮৩ সালে এক সামরিক ফরমানের মাধ্যমে বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন কমিটির ওপর নকশা অনুমোদনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই থেকে বর্তমানে একাধিক বিসি কমিটির মাধ্যমে ঢাকায় (বর্তমানে পাঁচটি) নকশা অনুমোদন কার্যক্রম চলছে। ১৯৫৩ সালে প্রণীত হয় প্রথম ইমারত নির্মাণ বিধিমালা। অতঃপর পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে ১৯৮৪ সালে, ১৯৯৬ সালে এবং সর্বশেষ ২০০৬-২০০৮ সালে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা সংশোধন করা হয়। প্রসঙ্গত, ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় শুধু নকশা অনুমোদনের নিয়মনীতি উল্লেখ আছে। এতে ইমারতের বিস্তারিত ডিজাইন, নির্মাণকৌশল ইত্যাদির কিছুই উল্লেখ নেই। ফলে বেশির ভাগ ইমারত বা স্থাপনা নির্মিত হতে থাকে রাজমিস্ত্রি বা ওস্তাগারের পরামর্শে। এই অবস্থায় রাজধানী ঢাকায় জনসংখ্যার আধিক্যে যত্রতত্র ও যেনতেনভাবে ইমারতের ডিজাইন, নির্মাণ ও ব্যবহারের কারণে ইমারতধস ও অগ্নিদুর্ঘটনা বাড়তে থাকে।

সাভারের রানা প্লাজায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া খন্ড চিত্র ও সাভারের রানা প্লাজায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ভবনধ্বসের চিত্র

ইমারত ও বিল্ডিং কোড 

আইনে ‘ইমারত’ বলতে যেকোনো সামগ্রী বা উপকরণ দিয়ে তৈরি স্থায়ী-অস্থায়ী যেকোনো কাঠামো বা স্থাপনাকে বোঝায়, যার আওতায় বস্তি থেকে বহুতল ইমারত সবকিছুই পড়ে। কিন্তু দেশে নিম্ন আয়ের মানুষের সামর্থ্যরে অভাব তথা নির্মাণযোগ্য জমির স্বল্পতায় সাধারণ মানুষ যিনি যেখানে যেভাবে পারছেন, সেভাবে ঘরবাড়ি বা ইমারত নির্মাণ করে বসবাস, ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন। তা ছাড়া যাঁরা অনুমোদন নিয়ে ইমারত নির্মাণ করেন, উল্লেখিত বিভিন্ন কারণে তাঁদেরও বেশির ভাগ অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় করে ইমারত নির্মাণ করেন। এ বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নগর এলাকায় খুব বেশি। আইনের ভাষায় এসব স্থাপনা ‘অবৈধ’ ও ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ইমারত। ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় ‘ঝুঁকিপূর্ণ ইমারত’ বলতে কাঠামোগত অনিরাপদ, জরাজীর্ণ, অস্বাস্থ্যকর, অগ্নি-ঝুঁকিপূর্ণ, যথাযথ জরুরি নির্গমন পথবিহীন, ভগ্নপ্রায়, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণবিহীন, পরিত্যক্ত, অধিবাসী ও সংলগ্ন এলাকার জনসাধারণের নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হিসেবে চিহ্নিত যেকোনো ইমারত বা নির্মাণকাজকে বোঝানো হয়েছে, যা কারিগরি ভাষায় অপ্রকৌশল কাঠামো (Non-Eengineered Structures) হিসেবে বিবেচিত। 

নগর এলাকায় ঘিঞ্জি পরিবেশ ও অপ্রকৌশল কাঠামো নির্মাণের কারণে দিন দিন বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি বেড়ে চলেছে। তাই এ ধরনের স্থাপনা বা ইমারত নির্মাণ রোধ বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় রেডিমেইড গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ ও হাইরাইজ বিল্ডিং নির্মাণের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় নির্মাণশিল্পে শৃঙ্খলা আনয়ন, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ ও অগ্নিদুর্ঘটনা রোধ ও নির্মাণকাজে অপচয় রোধের লক্ষ্যে নিজস্ব আঙ্গিকে বিল্ডিং কোড প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তা ছাড়া, যত্রতত্র ও অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত ভবনে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি স্থাপন ও বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা বিষয়ে নন-কমপ্লায়েন্সের (Non-Compliance) কারণে বিদেশি ক্রেতাদের পক্ষ থেকেও যথাযথভাবে গার্মেন্টস ভবন নির্মাণ/স্থাপনের চাপ আসে। এ উপলক্ষে ১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর দেশের নির্মাণশিল্পের পরিকল্পিত বিকাশ, নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় Uniform Standards of Safety, State-of-the-Art Technology & General Welfare of People-এর বিবেচনায় সামগ্রিকভাবে একটা বিল্ডিং কোড প্রণয়নের সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুসারে দেশজ জলবায়ু, পরিবেশ, নির্মাণ ঐতিহ্য, নির্মাণসামগ্রী, বিভিন্ন ঝুঁকি (অগ্নিকাণ্ড, ভূ-কম্পন ইত্যাদি) ও কারিগরি কৌশলের বিবেচনায় প্রণীত হয় ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড-১৯৯৩’ সংক্ষেপে বিএনবিসি। আর এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সম্পন্ন হয় দেশের স্থপতি-প্রকৌশলী ও অপরাপর পেশাজীবীদের সমন্বয়ে।

অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা রাজধানীর ভবনসমূহ

বিএনবিসি

বিএনবিসিতে সর্বমোট ১০টি চ্যাপ্টার রয়েছে, যা নিম্নরূপ-

  • Scope and Definitions
  • Administration and Enforcement
  • General Building Requirements, Control and Regulation
  • Fire Protection
  • Building Materials
  • Structural Design
  • Construction Practice and Safety
  • Building Services
  • Alteration, Addition to and Change of Use of Existing Building
  • Signs and Outdoor Display.

কোডটির বাস্তবায়ন ও কার্যকরণে এতে অনেক সুপারিশ ছিল। ইমারত নির্মাণ আইন-১৯৫২-এর আওতায় এটির কার্যকরণ এবং যথাযথ বাস্তবায়নে একটা কোড বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষ (Code Enforcement Authority) গঠন করা হয়। যার আওতায় এটি নগর থেকে গ্রাম সর্বত্র কার্যকরণের নির্দেশনা ছিল। ইমারত নির্মাণ আইনে বর্ণিত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পরিবর্তে ইমারতের নকশা অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব বিল্ডিং অফিশিয়ালের ওপর অর্পণের সুপারিশ ছিল। বিল্ডিং অফিশিয়াল হিসেবে নিয়োজিত হতে বিশেষ অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু এসব কোনো সুপারিশ/নির্দেশনা কার্যকর হয়নি। অর্থাৎ এ পর্যন্ত দেশের কোনো জায়গায় একজন বিল্ডিং অফিশিয়ালও নিয়োগ করা হয়নি। ফলে দেশে একটা বিল্ডিং কোড থাকা সত্ত্বেও তা ঐচ্ছিক ডকুমেন্ট (Optional Document) হিসেবে প্রযোজ্য হয়। অর্থাৎ কেউ ইচ্ছে করলে এটি অনুসরণ করলেন, আর যাঁর ইচ্ছে করলেন না, সেটা-এটি মানলেন না! 

অথচ ইমারত নির্মাণের এ টু জেট হচ্ছে বিল্ডিং কোড, যেখানে নকশা অনুমোদন থেকে নির্মাণের সব কলাকৌশল বর্ণিত আছে। ঝুঁকিমুক্ত ইমারত নির্মাণে এতে সব ধরনের নিয়মনীতি উল্লেখ করা আছে। যেকোনো ধরনের ইমারত নির্মাণের আগে Geo-Technical Investigation এবং অভিজ্ঞ ও পেশাজীবী স্থপতি বা প্রকৌশলী দ্বারা বিস্তারিত ডিজাইন প্রণয়ন করে তাঁদের তত্ত্বাবধানে উপযুক্ত নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে যথাযথ পদ্ধতিতে নির্মাণকাজ সম্পাদন করা বাধ্যতামূলক। নির্মাণের প্রতিটি স্তরে গুণগতমান নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় টেস্ট পরিচালনা, কারিগরি মান বজায় রেখে নির্মাণকাজ করা, Occupancy Certificate গ্রহণ করার, নির্ধারিত ব্যবহার অর্থাৎ যে ব্যবহার উল্লেখ করে নকশা অনুমোদন নেওয়া হয়, সেভাবে ইমারতের ব্যবহার করার এবং নিয়মিত পরিচর্যা, রক্ষণাবেক্ষণ, সংস্কারের নির্দেশনা রয়েছে। একইভাবে ইমারত ভাঙার (Demolition) বিষয়টিও সম্পূর্ণভাবে একটা কারিগরি কৌশল এবং বিল্ডিং কোডের যাবতীয় নিয়ম উল্লেখ রয়েছে।  

ঝুঁকিপূর্ণ এমন ভবন রয়েছে পুরানো ঢাকায়

কিন্তু অজ্ঞাত কারণে দেশের গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে বিএনবিসি আইনগত ভিত্তি পায়নি। বিভিন্ন আলোচনা-সমালোচনার মুখে কোড প্রণয়নের ১৩ বছর পর ২০০৬ সালের ১৫ নভেম্বর তারিখে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এটিকে ইমারত নির্মাণ আইনের আওতায় গ্যাজেট করা হয়। এ ক্ষেত্রেও অদ্যাবধি বিল্ডিং কোডের বাস্তবায়নে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গঠন করা হয়নি, ফলে বিএনবিসি আইনের অংশ হয়েও তা এখনো ঐচ্ছিক ডকুমেন্ট হিসেবে থেকে যায়। খুব কমসংখ্যক ইমারত নির্মাণের ক্ষেত্রে যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহারেও সামগ্রিকভাবে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। একইভাবে স্থপতি-প্রকৌশলীরা ইমারতের ডিজাইন করলেও তাঁরা তদারকিতে থাকেন না। ফলে সার্বিকভাবে ঢাকায় তথা দেশে আদৌ কোনো ঝুঁকিবিহীন ইমারত বা স্থাপনা আছে কি না সন্দেহ! কারণ, পান্থপথে নির্মিত ‘বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্স’ ভবনটি দেশের সব আধুনিক স্থাপনার মধ্যে অন্যতম। কিন্তু এই বহুতল ভবনটিতে আগুন লাগার পর সবাইকে অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকতে হয়। ভবনটিতে স্বয়ংক্রিয় অগ্নি-নির্বাপণব্যবস্থা থাকলেও তা কাজ করেনি এবং সেগুলো কীভাবে কাজ করে তা কারও জানা ছিল না। অনুরূপ কোড অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ ব্যতিরেকে ‘র‌্যাংগস ভবন’টি ভাঙতে গিয়ে ভবনটি ভাঙাকালীন অনেক শ্রমিক মারা যায়। অথচ এসব বিষয় কোডে বর্ণিত আছে এবং কোড অনুসরণ না করে কেউ কিছু নির্মাণ করলে বা ভাঙলে তা আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও উপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাবে অদ্যাবধি এতদ বিষয়ে কারও কোনো ধরনের শাস্তি হয়নি। শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে নয়, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বাইরে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থা/দপ্তরগুলোও এটি অনুসরণ ও ব্যবহার করে না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে সরকারি নির্মাণকাজেও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে।   

বাস্তব অবস্থা

ইমারত নির্মাণ আইনটি সমগ্র দেশের জন্য প্রণীত হলেও রাজধানী ঢাকা এবং তিনটি বিভাগীয় শহর (চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা) ব্যতীত আজ অবধি অন্য কোনো স্থানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়নি। একই অবস্থা বিল্ডিং কোডের ক্ষেত্রেও। এটি একটি জনগুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দলিল হওয়া সত্ত্বেও অদ্যাবধি আইন ও কোডটির কাঙ্খিত ব্যবহার না হওয়ার পেছনে আরও অনেক কারণ রয়েছে। যেমন- রাজধানী ঢাকার দিকে লক্ষ করলে দেখা যায় যে রাজউকের অধীনে সরকার নিয়োজিত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা/ বিসি কমিটি নকশা অনুমোদন করে। কিন্তু অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ইমারত নির্মিত হচ্ছে কি না, তা তদারকি ও মনিটর করার জন্য রাজউকে প্রয়োজনীয় জনবল নেই। ফলে খুব কম ইমারতই অনুমোদিত নকশা মোতাবেক নির্মিত হয়। প্রসঙ্গত, ১৯৫৬ সালে ডিআইটির জন্মলগ্নে (যখন ঢাকার জনসংখ্যা ছিল তিন থেকে চার লাখের মতো) যেই জনবল ছিল ৫৭ বছর পরও আজকের রাজউকে সেই একই জনবল। অথচ এর মধ্যে রাজউকের পরিধি বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ, নগরে জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে দেড় কোটির ওপর, ঘরবাড়ি ও ইমারত নির্মিত হয়েছে লক্ষাধিক। একই অবস্থা দেশের অপরাপর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ সর্বত্রই।

দ্বিতীয়ত, ঢাকার মহাপরিকল্পনাভুক্ত এলাকায় রাজউকের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানীয় কর্তৃপক্ষ যেমন- ঢাকা, মিরপুর ও সাভার ক্যান্টনমেন্ট এবং পিলখানায় বিডিআর; টঙ্গী, সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও কদমরসুল পৌরসভা; বাড্ডা, সাতারকুল, বরুরা, শ্যামপুর-কদমতলী ইত্যাদি ইউনিয়ন পরিষদ তাদের স্ব-স্ব কার্য এলাকায় স্ব-স্ব বিধিবিধান অনুসারে নকশা অনুমোদন করে। কিন্তু তারা কেউ ইমারত নির্মাণ আইন, নগর উন্নয়ন আইন, জলাধার সংরক্ষণ আইন, বিল্ডিং কোড ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুসরণ করে না। ফলে একেক প্রতিষ্ঠানের অধীনে একেকভাবে ইমারতের নকশা অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এ যুগে একটি দেশের রাজধানীতে ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক বেসরকারি উদ্যোক্তাদের হাউসিং প্রকল্প ও ইমারতের নকশা অনুমোদন করার বিষয়টি হতবাক করার মতো! রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সর্বত্র নির্মাণযোগ্য জমির স্বল্পতায় এসব স্বার্থান্বেষী মহল কর্তৃক নিচু জমি ভরাট করে, পাহাড় কেটে, অপরিকল্পিত এলাকায় বা সরকারি খাসজমি দখল করে সেখানে চলছে ‘চমকপ্রদ’ হাউসিং প্রকল্প গ্রহণ। বিগত কয়েক বছরে ঢাকার অভ্যন্তরে এবং আশপাশের নিম্নাঞ্চল ও খাল-নালা ভরাট করে এভাবে যেনতেনভাবে নরম জায়গার ওপর নির্মিত/নির্মাণাধীন অনেক ইমারত আপনাতেই ধসে পড়তে এমনকি অনেক জায়গায় ধেবে যেতেও দেখা যায়। ভূ-বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকায় ৭-৮ মাত্রার ভূমিকম্পে এসব ভবন ধসে পড়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করবে। 

বিল্ডিং কোড না মানায় ঘটছে ভয়াবহ সব অগ্নিকান্ড

তৃতীয়ত, উল্লেখিত কোনো সংস্থাই ইমারতের বিস্তারিত স্থাপত্য ও কারিগরি নকশা অনুমোদন করে না। তাই নকশা অনুমোদন লাভের পর বা অনুমোদন না নিয়ে (!) জমির মালিক বা ডেভেলপাররা নিজেদের ইচ্ছামতো ইমারত নির্মাণ করেন। ফলে একটি ইমারতের নির্মাণকাজ কখন শুরু ও শেষ হয় এবং নির্মাণোত্তর কীভাবে ইমারতটি ব্যবহৃত হয়, তা দেখার জন্য কেউ নেই। এ সুযোগে যে যেভাবে পারছেন সেভাবে ইমারত নির্মাণ ও ব্যবহার করছেন। অনেকেই স্বজ্ঞানে বা অজ্ঞানে খরচ কমানোর নামে সয়েল টেস্ট না করে ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী দিয়ে ইমারত নির্মাণ করছেন। আইনগত বাধ্যবাধকতার অভাবে যেসব ক্ষেত্রে স্থপতি-প্রকৌশলীদের সম্পৃক্ততা থাকে, সেখানেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাঁদের পরামর্শ বা ডিজাইন উপেক্ষিত। আবার অনেকে স্থপতি ও প্রকৌশলীদের ‘ফি’ দিতে হবে বিধায় বা ‘ফি’ না দেওয়ার জন্য মিস্ত্রি বা ওস্তাগারের পরামর্শে ইমারত নির্মাণ করছেন। 

চতুর্থত, ঢাকা মহানগরের কিছু এলাকায় এখনো কোনো সংস্থা বা কর্র্র্র্র্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ নেই। যেমন, সাভার এলাকাটি রাজউকের মহাপরিকল্পনাভুক্ত এলাকায় হলেও সেখানে কিছু জায়গায় সাভার ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এবং কিছু জায়গায় সাভার পৌর বা স্থানীয় ইউনিয়ন কর্তৃপক্ষ ইমারতের নকশা অনুমোদন করে থাকে। এই দোটানায় সাভার ক্যান্টনমেন্ট ও সাভার পৌর সীমানার মধ্যবর্তী স্থানে (‘বাইপাইল’ এলাকায়) মালিক তাদের প্রস্তাবিত ইমারতটির নকশা অনুমোদনের জন্য সাভার ক্যান্টনমেন্টের প্রভাবিত এলাকার বিবেচনায় সাভার ক্যান্টনমেন্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে। কিন্তু প্রভাবশালী মালিকপক্ষ অনুমোদনের অপেক্ষা না করেই তড়িঘড়ি নিচু জমিতে ইমারতটির নির্মাণ শেষ করে তাতে পেকট্রাম’ গার্মেন্টসটি চালু করে বসেন। ওই অবস্থায় আকস্মিকভাবে ইমারতটি ধসে পড়ে। ঢাকা ও মিরপুর ক্যান্টনমেন্টের আশপাশেও একই অবস্থা। এসব জায়গায় জমির মালিকেরা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড বা অপরাপর স্থানীয় কর্তৃপক্ষ থেকে নকশা অনুমোদন না পেয়ে যেনতেনভাবে (যেকোনো মূহূর্তে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ভেঙে দিতে পারে আশঙ্কায়) ইমারত নির্মাণ করে। সাভারস্থ’ পেকট্রাম’ আর তেজগাঁওস্থ’ ‘ফিনিক্স’ ভবনের ধসসহ বিভিন্ন সময় আরও যেসব ভবন ও স্থাপনা ধসে পড়ে তার তদন্তকালে দেখা যায় যে যথাযথভাবে ভবনগুলোর ডিজাইন না করা, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা, অনুমোদিত ব্যবহারের পরিবর্তন এবং মালিকের ইচ্ছা অনুসারে ইমারতের সম্প্রসারণ করার কারণে ওভারলোডিং হয়ে ভবনগুলো ধসে পড়ে।

পঞ্চমত, আবার কিছু জায়গা আছে যেখানে রাজউক বা অপরাপর স্থানীয় প্রতিষ্ঠানও নকশা অনুমোদন করে না, অথচ সেখানে লোকজন তাঁদের ইচ্ছামতো ইমারত নির্মাণ করে বসবাস করছেন, ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন। যেমন-ডিএনডি এলাকা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন ডিএনডি এলাকার উন্নয়নে অদ্যাবধি কোনো জোনাল প্ল্যান বা ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান ((Detail Area Plan-DAP) বা ড্যাপ প্রণীত না হওয়ায় সেখানে রাজউক নকশা অনুমোদন করে না, যদিও কিছু ক্ষেত্রে সেখানে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা ইমারতের নকশা অনুমোদন করে। আবার অনেকে ‘ভুয়া’ নকশা দিয়েও সেখানে ইমারত নির্মাণ করছেন। ধারণা করা হয়েছিল, ঢাকায় ড্যাপ প্রণীত হলে তা রাজধানীর পরিকল্পিত উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। কিন্তু ড্যাপ প্রণয়ন ও অনুমোদিত হওয়া সত্তে¡¡ও রাজউকের সাংগঠনিক দুর্বলতা তথা ‘ভূমিদস্যু’ খ্যাত ডেভেলপারদের বাড়াবাড়িতে এটির বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।

সঠিক দুরত্ব না রেখে গড়ে উঠছে ভবনগুলো ও বিল্ডিং কোড না মানায় পুরোনো স্থাপনা হুমকির সম্মুখীন

ষষ্ঠত, নগরের অভ্যন্তরে অপরিকল্পিত এলাকায়, সরু রাস্তার ধারে, ডিসপুটেড জমিতে, নিম্নাঞ্চলে, বন্যা প্রবাহিত এলাকায় বা মহাপরিকল্পনার ভূমি ব্যবহারের পরিপন্থী জায়গায় জমির লোকজন কিংবা দখলভোগীরা একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে ‘ভুয়া’ (জাল স্বাক্ষরযুক্ত) নকশা অনুমোদনের ব্যবস্থা করে সেখানে যেনতেনভাবে ও তড়িঘড়ি করে ইমারত নির্মাণ করেন। সচরাচর ১০-১২ ফুট চওড়ার কম প্রশস্থ’ রাস্তার ধারে নকশা অনুমোদন করা হয় না। তাই দুষ্ট চক্রটি তিন-চার ফুটের গলিকে ১২-১৪ ফুটের রাস্তা দেখিয়ে ‘ভুয়া’ নকশা অনুমোদন করে! এসব ভুয়া অনুমোদনের কোনো নথি বা কাগজপত্র রাজউকের রেকর্ডে নেই এবং কোনো ইমারতের মালিককে তাঁর নকশা দেখানোর জন্য নোটিশ দেওয়া হলে তাঁরা রাজউকে না গিয়ে হয়রানির অভিযোগ তুলে কেউ কেউ আদালতের আশ্রয় নেন। অতঃপর বছরের পর বছর ধরে আদালতে মামলা ঝুলে থেকে বিষয়গুলো অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়ে থাকে। এভাবে শুধু আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে শুধু রাজধানী ঢাকায় অলিগলিতে নির্মিত হাজার হাজার অবৈধ, জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ইমারত বা স্থাপনার অপসারণ কার্যক্রম থেমে আছে। 

সপ্তমত, আরেকটি চক্র বৈধভাবে যা অনুমোদন পায় তার ব্যত্যয় ঘটিয়ে অর্থাৎ ছয় তলার অনুমোদন নিয়ে ৯-১০ তলা বা আরও বেশি উচ্চতায় বা খোলা জায়গা (Open Space) না ছেড়ে সমগ্র জমির ওপর ইমারত নির্মাণ করে। তারা একটি ব্যবহারের জন্য অনুমোদন নিয়ে তা খেয়ালখুশিমতো অন্য ব্যবহারে নিয়ে যায় এবং সেভাবে ইমারত নির্মাণ করে। কিছু প্রভাবশালী লোকজন এভাবে গর্হিত কাজ করে বাগাড়ম্বর করেন। গুলশান-১/২ সার্কেল ও এভিনিউ সড়কের দুই ধারে কতিপয় প্রভাবশালী তো ছয়-সাততলার অনুমোদন নিয়ে তা ১৫-২০ তলা পর্যন্ত নির্মাণ করেছেন। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার সামনে ‘যমুনা ফিউচার পার্ক’ খ্যাত বিশাল ভবনটি তো নকশা অনুমোদনের অপেক্ষা না করেই নির্মিত হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, এসব লোকজন আইনবহির্ভূত কাজ করে বড় বড় আইনজীবী নিয়োগ দিয়ে রাজউক বা সরকারের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে হয়রানির অভিযোগ তোলে। যে কারণে এত দিন গুলশানে খেলার মাঠের জমিতে নির্মিত ‘ওয়ান্ডার ল্যান্ড’ পার্কটি উচ্ছেদ করা সম্ভবপর হয়নি, দেরিতে হলেও এখন সেটা সম্ভব হয়েছে। অনেক বিলম্বে হলেও বহুল আলোচিত বিতর্কিত ‘র‌্যাংগস’ ভবনটি ভাঙা সম্ভব হয়েছে। আশা করা যায় যে অচিরে হাতিরঝিলের মধ্যে অবৈধভাবে নির্মিত ‘বিজিএমইএ’ ভবনটিও ভেঙে ফেলা সম্ভব হবে। 

সর্বোপরি যে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের কোনো স্থানে উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে কোনো সমন্বয়কারী না থাকা। অনেক ক্ষেত্রে একই মন্ত্রণালয়ের অধীনের সংস্থাসমূহের মধ্যেও সমন্বয়হীনতা পরিলক্ষিত হয়। ফলে কারও কাছে নেই অনুমোদিত বা অননুমোদিত ইমারতের সঠিক সংখ্যা, ইমারতের প্রকৃত ব্যবহারের তথ্যাবলি এবং কোনো একটি ইমারতের As-Buil ড্রয়িং। ফলে যখনই কোনো ইমারতধস বা অন্য কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তখন সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে বেকায়দায় পড়তে হয়, হইচই লেগে যায়, উদ্ধারকাজ বিলম্ব হয়। এই অবস্থায় সর্বমহল থেকে দাবি উঠেছে, পরিকল্পনায় নির্ধারিত ভূমি ব্যবহার ও বিল্ডিং কোড মেনে ইমারত নির্মাণ করার, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পেশাজীবীদের তত্ত্বাবধানে ইমারত নির্মাণ করার, নির্মিত ইমারতের ব্যবহারের আগে Occupancy Certificate গ্রহণ করার এবং জান-মালের মতো ইমারতের বিমা পদ্ধতি চালু করার। এসব বিষয়ের প্রায় সবকিছুই বিএনবিসিতে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও উপযুক্ত প্রশাসনিক বাস্তবায়নের অভাব এবং সর্বপর্যায়ে কোডটির কার্যকারিতা না থাকায় দিন দিন দেশে অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ ইমারতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। 

কোডের হালনাগাদকরণ

নির্মাণশিল্পে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে নিয়মিত বিল্ডিং কোড সংশোধনের প্রয়োজন। কিন্তু উল্লেখিত বিভিন্ন কারণে বিগত ২০ বছরে কোডটির কোনো বিষয় হালনাগাদ হয়নি বা করাও যায়নি! অবশেষে এটির হালনাগাদের কাজ শুরু হয়েছে। ২০১০ সালে বুয়েটের ব্যুরো অব রিচার্স অ্যান্ড টেস্টিংয়ের (বিআরটিসি) তত্ত্বাবধানে এই কাজ আরম্ভ হলেও বুয়েটের শিক্ষকদের সময়ের অভাবে কাজটির সম্পাদনে অনেক সময় লেগে যায়। সংশোধিত কোডে আগের মতো ১০টি চ্যাপ্টার রয়েছে, তবে প্রায় ক্ষেত্রে দেশ-বিদেশের নির্মাণক্ষেত্রে নব আবিষ্কৃত সূত্রাবলি, প্রযোজ্য বিধিবিধান, টেকসই নির্মাণসামগ্রী ও অভিজ্ঞতাকে বিভিন্ন পর্যায়ে সন্নিবেশিত করে এটিকে একটি আধুনিক ও উন্নতমানের কোডে পরিণত করা হয়েছে। কোডটির যথাযথ কার্যকরণে এবার Code Enforcement Authority হিসেবে একটি Building Regulatory Authority, সংক্ষেপে ‘ইজঅ’ প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করা হয়েছে। বিআরএ প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভাগীয় বা জেলা পর্যায়ে যেখানে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আছে (যেমন ঢাকায় ‘রাজউক’, চট্টগ্রামে ‘চউক’, খুলনায় ‘খুউক’, রাজশাহীতে ‘রাউক’) সেখানে এসব সংস্থার অধীনে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে (জেলা, পৌর কর্তৃপক্ষ, উপজেলা) পর্যায়ে গণপূর্ত অধিদপ্তর বা স্থানীয় সরকার অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীদের বিল্ডিং অফিশিয়াল হিসেবে নিয়োজিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিল্ডিং অফিশিয়াল হওয়ার যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা কোডে বর্ণিত আছে।

গত ২১-২৩ মার্চ ২০১৩ তারিখে বুয়েটে বিএনবিসি হালনাগাদকরণের ওপর কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। কোডে সংযোজিত বিভিন্ন ধরনের নতুন প্রস্তাবনার ওপর অনেক আলোচনা হয়। বহুতল ভবনের সংজ্ঞা ও উচ্চতার প্রশ্ন ওঠে। স্থপতি-প্রকৌশলীরা এখন আর ২০ মিটার বা ছয়তলার ঊর্ধ্ব ভবনকে বহুতল ভবন বলতে রাজি নন! কিন্তু ফায়ার ব্রিগেডের লোকজনের মতে, তাঁদের কাছে ছয়তলা ভবনের ওপরে অগ্নিনির্বাপণের যন্ত্রপাতি নেই, কাজেই বহুতল ভবনের সংজ্ঞা আগের মতো থাকা ভালো। তা ছাড়া কোডটির এখনই কার্যকরণে অনেকে বিভিন্ন ধরনের বিকল্প সাংগঠনিক কাঠামোর কথাও বলেন। সবাই একমত যে বিআরএ বা যেকোনো একটা উপযুক্ত সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠান ব্যতিরেকে বিএনবিসির যথাযথ বাস্তবায়ন সম্ভবপর নয়। নিয়মিত কোডের হালনাগাদকরণের ওপর সবাই গুরুত্বারোপ করেন। 

পরিশেষে

১৯৯৩ সালে বিএবিসি প্রণীত হওয়ার সময় থেকেই এর সঙ্গে যুক্ত। এখন আবার শুরু হয়েছে হালনাগাদের কাজ এবারও এর সঙ্গে জড়িত। কিন্তু ওই সময় যাঁরা জড়িত ছিলেন, তাঁদের সিংহভাগই আজ আর নেই। এই প্রক্রিয়ায় ভবিষ্যতে কখন এটির হালনাগাদ হয়, কে জানে! কেননা প্রথমবার হালনাগাদ করতে ২০ বছর লেগে যায়। প্রসঙ্গক্রমে, ২০০৬ সালে অনেকটা একক প্রচেষ্টায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাকে বুঝিয়ে ‘বিএবিসি-২০১৩’-কে আইনগত ভিত্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করি। অতঃপর এক জাতীয় কর্মশালায় কীভাবে এই কোডটিকে কার্যকরণ করা যায় তার ধারণা দিই। কিন্তু বিগত সাত বছরে এর কোনো কিছু বাস্তবায়ন হয়নি। 

রাজউকের নিয়ম না মেনে গড়ে উঠেছে বিজিএমই ভবন

ধারণা ছিল, কোডটির আইনগত ভিত্তি থাকলে এটি যথাযথভাবে কার্যকর হবে, অবৈধ নির্মাণ রোধ হবে ও সবাই কোড অনুসরণে তাঁদের বিল্ডিং বানাবেন। এবারের কর্মশালায়ও অনেকে এসব বিষয়সহ বিল্ডিং কোডের আদৌ কার্যকরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অনেকের প্রশ্ন, দেশের বিরাজমান পরিস্থিতিতে বিএনবিসি যথাযথভাবে কার্যকর হবে কি না! বিআরএ প্রতিষ্ঠা করা হবে কি না? কারণ, আমাদের দেশে তো ভালো-খারাপ সবকিছু নিয়ে ‘রাজনীতি’ হয় এবং খুব কমক্ষেত্রে রাজনীতিবিদ বা নীতিনির্ধারকদের মধ্যে মতৈক্য হয়! তথাপি আশাবাদী যে বিষয়টি অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ ও স্ব-স্বার্থ বিধায় নিশ্চয় দল-মতনির্বিশেষে সবাই নিজ নিজ জান-মাল রক্ষার স্বার্থে আইন ও কোড মেনে নিজ নিজ ইমারত ও স্থাপনা নির্মাণে বিবেকবান হবেন। 

অনুরূপভাবে ইমারত নির্মাণ আইনটিরও জরুরি সংশোধন প্রয়োজন। ১৯৫২ সালে তৎকালীন প্রেক্ষাপটে আইনটি প্রণীত, যার অনেক বিধি সময়োপযোগী করা দরকার। সচরাচর যেকোনো আইন প্রণীত হলে তা কার্যকরের জন্য আলাদাভাবে একটি প্রতিষ্ঠানের সৃষ্টি হতে দেখা যায়। কিন্তু ইমারত নির্মাণ আইনের বাস্তবায়নের জন্য তা হয়নি। ফলে সমগ্র দেশের জন্য আইনটি প্রণীত হলেও অদ্যাবধি এটির কার্যক্রম শুধু গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে (ঢাকায় ‘রাজউক’, চট্টগ্রামে ‘চউক’, খুলনায় ‘খুউক’, রাজশাহীতে ‘রাউক’) সীমাবদ্ধ রয়ে যায়। ঢাকার মহাপরিকল্পনাভুক্ত এলাকাসহ দেশের অন্যান্য স্থানে বিভিন্ন সংস্থা/ প্রতিষ্ঠানের স্ব-স্ব আইনে নকশা অনুমোদিত হচ্ছে। রাজউকের বিধিবিধানের সঙ্গে এসব সংস্থা কিংবা প্রতিষ্ঠানের ইমারত নির্মাণ বিধিমালার মধ্যে মিল নেই। ফলে যে যার মতো নকশা অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণ করছে, যা কোনো অবস্থায় গ্রহণযোগ্য নয়। তাই বিআরএ প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। আর বিআরএ প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত জেলা, পৌর এলাকা, উপজেলা ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় বিল্ডিং অফিশিয়াল নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। সবাইকে অবশ্যই ইমারত নির্মাণ আইন ও বিএবিসি অনুসরণে বাধ্য করতে হবে। মোট কথা, দেশজুড়ে নিরাপদ ইমারত নির্মাণ তথা টেকসই নির্মাণশিল্পের স্বার্থে সরকারকে এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। সবকিছু নিয়েই ‘বিভক্তির খেলা’ চললেও নিরাপদ ইমারত নির্মাণ ও দেশ গঠনে দ্বিধাবিভক্ত হওয়ার অবকাশ নেই।

মোঃ এমদাদুল ইসলাম

প্রধান প্রকৌশলী, রাজউক

প্রকাশকাল: বন্ধন ৩৭ তম সংখ্যা, মে ২০১৩

+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top