৪০০ বছরের প্রাচীন নগর ঢাকা। গোড়াপত্তনের শুরু থেকেই এ নগরে গড়ে উঠেছে দৃষ্টিনন্দন সব স্থাপনা। এর অনেকগুলোই ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও এখনো কালের সাক্ষী হয়ে নিজ অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে বেশকিছু পুরোনো স্থাপনা। মোগল আমলে নির্মিত স্থাপনাসমূহের অন্যতম ধানমন্ডি শাহি ঈদগাহ ময়দান। ধানমন্ডির সাত মসজিদ রোডের ঐতিহাসিক এ ঈদগাহ ময়দানটি চার শতবর্ষী ঢাকার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। শুধু ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের জন্যই নয় প্রাচীন ঢাকার শুরুর দিককার স্থাপনা হিসেবেও এর গুরুত্ব অনেক।
ফিরে দেখা
ধানমন্ডি শাহি এ ঈদগাহটি ঢাকার সোনালি দিনের অন্যতম নিদর্শন। পুরোনো এ স্থাপনাটির বয়স প্রায় ৩৭২ বছর। ১৬৪০ খ্রিষ্টাব্দে (১০৫০ হিজরি) নির্মিত স্থাপনাটির নির্মাতা মীর আবুল কাসেম। বাংলা তখন মোগল সাম্রাজ্যের শাসনাধীন। এ সময় বাংলার সুবেদার ছিলেন সম্রাট শাহজাহানের পুত্র শাহ সুজা। মীর আবুল কাসেম ছিলেন তাঁরই দেওয়ান। ধর্মীয় সংস্কৃতির উৎকর্ষ সাধনের পাশাপাশি ঈদের আনন্দকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতেই তিনি নির্মাণ করেন এই স্থাপনাটি। তবে তৎকালীন রাজধানী শহর বলতে বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী পুরোনো ঢাকাকেই বোঝাত। এ সময়কার স্থাপনাগুলোর বেশির ভাগেরই বিস্তার এ অঞ্চলে। এ বিবেচনায় ধানমন্ডির এই ঈদগাহ ময়দানটি প্রাচীন ঢাকার কেন্দ্র থেকে বেশ দূরেই বলা চলে। তবুও এই এলাকাটিই ছিল মোগল শাসনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। এমনকি রাজ্য শাসক ও দরবারের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা শোভাযাত্রা করে এই ঈদগাহে জামাতে ঈদের নামাজ পড়তে আসতেন। ধীরে ধীরে ঢাকা ও এর আশপাশের মুসল্লিরাও এখানে নিয়মিত নামাজ পড়তে আসেন। এ সময় ঈদগাহকে ঘিরে মেলা বসত।
ঈদগাহের অভ্যন্তরে
ঈদগাহটি লম্বায় প্রায় ১৪৫ ফুট আর চওড়ায় ১৩৭ ফুট। আস্তর করা প্রাচীরটির শীর্ষ পারস্যরীতির ‘মোরলেন’ নকশাখচিত। চার কোণে অষ্টভুজাকৃতির বুরুজ। আর প্রধান মেহরাব পশ্চিম প্রাচীরের মাঝ বরাবর। এর দুই পাশে আরও দুটি ছোট আকারের মেহরাব। প্রধান মেহরাবটি অষ্টকোনাকৃতির। ভেতরের দিক সামান্য ঢালু খিলান আকৃতির। দেয়ালের ফ্রেমের (আয়তকার) ভেতরে অবস্থান মেহরাবগুলোর। বহু খাঁজবিশিষ্ট নকশা করা প্যানেল চোখে পড়ে প্রধান মেহরাবের দুই দিকে। তিন ধাপবিশিষ্ট মিম্বার রয়েছে এর উত্তরাংশে। মেহরাবের ওপর উর্দুতে লেখা পাথরের তৈরি পরিচিতি ফলক। এ ছাড়া দেখা যাবে বাইরে মেইন গেটের সামনে একটি সাইনবোর্ড, যাতে ইংরেজি ও বাংলায় এর নির্মাণ-কাহিনি লেখা। ঈদগাহটি ইটরঙা। বাইরের সবুজ গাছগাছালি আগত দর্শনার্থীদের ছায়া দেয়। বাইরে থেকে ভেতর ও ভেতর থেকে বাইরে সবকিছু দেখা যায়। চতুর্ভুজ আকারের এই ঈদগাহটি পশ্চিম দিকে ৪১ দশমিক ৭৬ মিটার লম্বা স্ক্রিন ওয়াল ঘর সমন্বিত। এই দেয়ালের মাঝামাঝি অংশে রয়েছে অষ্টকোনার মেহরাব। মেহরাবটি খাঁজকাটা। দেয়ালের অপরাংশে রয়েছে সারি সারি শিল্পভূমি। ঈদগাহটির চারদিকের দেয়ালের ওপরে রয়েছে এক সারি নকশার মেরলন। ঈদগাহের চারদিকের দেয়াল ঘিরে ৫৭টি লোহার গ্রিল দরজা। এ ছাড়া সৌন্দর্যময় ঈদগাহের প্রধান আকর্ষণ, চারদিকের ১০টি গম্বুজ। তবে এরই মধ্যে মেহরাবের ওপরে থাকা একটি গম্বুজ ভেঙে গেছে। এ ছাড়া নানামাত্রিক নকশার কারুকাজ, হালন ও বিড ধারা নকশা করে সৌন্দর্যবেষ্টিত করে রেখেছে ধানমন্ডির এই ঈদগাহটিকে। চারদিকে প্রায় ১৫ ফুট উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ঈদগাহটির পশ্চিম দিকের প্রাচীরটাই কেবল মোগল আমলের। ১৯৮৮ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ অন্য তিন দিকের প্রাচীরের সংস্কার করে। তবে বাইরেরটা নোংরা হলেও ঈদগাহের ভেতরের পরিবেশ বেশ মনোরম।
সংস্কার উদ্যোগ
দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকার পর ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর ঈদগাহটির দায়ভার গ্রহণ করে। তারাই এর দেখভাল করছে। বর্তমানে প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর এটার পুনঃপ্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী এ স্থাপনাকে আরও সুন্দর করে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে। এর চারপাশে গড়ে উঠেছে সুরম্য অট্টালিকা। রয়েছে অগণিত ছোট-বড় সব স্থাপনা। সবকিছু মিলিয়ে সৃষ্টি হয়েছে জঞ্জালের। তবে অযত্ন-অবহেলা আর সময়মতো সংস্কারের অভাবে ক্রমেই জৌলুশ হারাচ্ছে ধানমন্ডি শাহি ঈদগাহ ময়দান। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আওতাধীন হয়েও অনেক দিন ধরেই নেই যথাযথ সংস্কারের উদ্যোগ। এর নানা অংশে ফাটল ধরেছে। খসে গেছে অনেক স্থানের ইট-সুরকি। অযত্ন-অবহেলায় ক্রমেই ধর্মীয় এ ঐতিহ্য বিলীন হতে বসেছে। এর যথাযথ সংস্কার অতীব জরুরি। পশ্চিম দিকটা পাঠাগার ভবন করে দেখলে নেওয়া হয়েছে। যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী। ঈদগাহ ময়দানটির দেয়ালকে সাইড দেয়াল বানিয়ে কর্মচারীদের আবাসস্থল গড়ে উঠেছে। এখন আর ঈদগাহ মাঠের দেয়ালকে সহজেই আলাদা করা যায় না। তা ছাড়া মাঠের চারপাশ অপরিচ্ছন্ন, নোংরা আবর্জনায়পূর্ণ। বছরে দুইবার ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় বরাবরের মতো এখনো এখানে ঈদের জামাত হয়। হয় জানাজার নামাজও। এ ছাড়া মাঠসংলগ্ন মসজিদ ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ এটাকে ইসলামিক নানা কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করে। তদুপরি বিভিন্ন পত্রিকা, টেলিভিশনের সাংবাদিক, বুয়েট শিক্ষার্থী এবং প্রত্নতাত্তি¡ক অধিদপ্তরের গবেষণায় স্থান পায় প্রাচীন এ স্থাপনাটি।
বাংলাদেশকে বহির্বিশ্বে তুলে ধরতে জানতে হবে এর ফেলে আসা ইতিহাস আর ঐতিহ্য। লুপ্তপ্রায় শিকড়সন্ধানী ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে আমাদের সবাইকে এর অনুসন্ধান ও চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। নতুবা হাজার বছরের প্রাচীন এ সংস্কৃতি পড়বে সংকটে। আর তাই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে ধানমন্ডি শাহি ঈদগাহের মতো গর্বের স্থাপনাকে পর্যটকপ্রিয় স্থাপনায় রূপান্তরের মাধ্যমে দর্শনীয় স্থানে পরিণত করা সময়ের দাবি।
গোলাম রব্বানী
প্রকাশকাল: বন্ধন ৪৫ তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৪