কোনো এক লেখক বলেছেন ‘কোন্ জাতি কত সমৃদ্ধ তা জানতে আপনাকে খুব বেশি কষ্ট করতে হবে না। আপনাকে যেতে হবে শুধু তার লাইব্রেরি আর রান্নাঘরে।’ অর্থাৎ কোন্ জাতি কী পড়ে আর কী খায় তা দিয়েই বোঝা সম্ভব সে জাতি কতটা সমৃদ্ধ। এ কথা শুনে ঘাবড়ে গেলেন নাকি? ঘাবড়ানোর কিছু নেই। লেখকের মতানুসারে যদি রান্নাঘর যোগ্যতা বিচারের মাপকাঠি হয় তখন আপনার রান্নাঘরে কী রান্না হয় সে বিষয়ে গুরুত্বের পাশাপাশি একটু নজর দিন আপনার রান্নাঘরের প্রতি; যেখানে তৈরি হয় আপনার পেটপূজার সব উপাদান সে স্থানটি যদি একটু পরিপাটি ও গোছানো না হয় তা হলে কেমন হয় বলুন তো? তাই আজ থেকে খাবারের মেন্যুর পাশাপাশি নজর দিন আপনার রান্নাঘরের দিকে।
আজকাল মানুষের আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি সংকুচিত হচ্ছে রান্নাঘরের আয়তন। সংকুচিত হবেই বা না কেন? যেখানে মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু ছোট হয়ে আসছে সেখানে রান্নাঘরের আয়তন সংকোচনের ব্যাপারটি অবশ্য তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে আমাদের সাধ ও সাধ্যের মধ্যেই করতে হবে সমন্বয়।
রান্নাঘরে রাখা হয় দুনিয়ার সব জিনিসপত্র। কী থাকে না এখানে! হাঁড়ি-পাতিল, বাসনকোসন, মসলাপাতি, দা-বঁটি, ছুরি-চাকু, হালের মাইক্রোওয়েভ, ওভেন, ব্লেন্ডার মেশিন ইত্যাদি। কিন্তু যেখানে আমাদের থাকার ঘরই ক্রমে ছোট হয়ে আসছে সেখানে ছোট্ট রান্নাঘরের মধ্যে এত জিনিস রাখা আসলেই মুশকিল। কিন্তু কথায় আছে ‘যেখানেই সমস্যা সেখানেই সমাধান।’ প্রবাদের এ কথাটি অনেকটাই সত্য। আজ পর্যন্ত গুটিকয়েক সমস্যা ছাড়া বাকিগুলোতে মিলছে কোনো না কোনো সমাধান। তেমনি আপনার রান্নাঘরের এ সমস্যা মিটাতে বাজারে রয়েছে হালের নানান নকশা ও চোখ ধাঁধানো সব আকৃতির কিচেন কেবিনেট। এসব কিচেন কেবিনেটে আপনার রান্নাঘরের ছোট্ট পরিসরেই গুছিয়ে নিতে পারেন সব জিনিসপত্র। আর করতে পারেন জায়গার সর্বোত্তম ব্যবহার। যেখানে রান্নাবান্নার ঠাসা জিনিসপত্র সামলাতে গৃহিণীদের দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম কিচেন কেবিনেট আসলে তাদের জন্য সামান্য হলেও নিয়ে এসেছে স্বস্তির সংবাদ। একটি কিচেন কেবিনেটই বদলে দিতে পারে আপনার রান্নাঘরের পরিবেশ ও সেই সঙ্গে আপনার আত্মবিশ্বাসও। তো আজকেই কিনে ফেলুন একটি কিচেন কেবিনেট আর মিটিয়ে ফেলুন আপনার রান্নাঘরের সেই সনাতনী সমস্যা।
কিচেন কেবিনেটের মধ্যেও রয়েছে নকশা ও আকৃতি। কোনোটি লম্বাটে আবার কোনোটি গোলাকার। কোনোটি দেখতে ইংরেজি ‘এল’ অক্ষরের মতো আবার কোনোটি দেখতে ঠিক যেন ‘ইউ’। আবার এগুলোর রঙ ও নকশাতেও রয়েছে বেশ পরিবর্তন। বাজারে পাওয়া যায় এমন কিচেন কেবিনেটের মধ্যে রয়েছে হোম কিচেন কেবিনেট, অফিস কিচেন কেবিনেট, মডার্ন কম্পিউটার কিচেন কেবিনেট, কিচেন কেবিনেট ফার্নিচার ডেস্ক, অফিস ফার্নিচার কিচেন কেবিনেট, ওয়ার্ক স্টেশন, গ্লাস, কাঠ ও মেটাল মোবাইল মডিউলার কিচেন কেবিনেট ইত্যাদি।
কিচেন কেবিনেটের বর্তমান বেচাকেনার চালচিত্র, চাহিদা ও উৎপাদনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হয় এটির উৎপাদনকারী ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সাথে। বর্তমান সময়ে অন্যান্য ফার্নিচারের তুলনায় কিচেন কেবিনেটের বিকিকিনি বেশ ভালো বলেই জানালেন বিক্রেতারা। রাজধানীর কারওয়ান বাজারের নকশা ফার্নিচারের বিক্রয় কর্মকর্তা কলিম সারওয়ার জানান, ‘মানুষ এক সময় রান্নাঘরের দিকে নজর না দিলেও বর্তমানে রান্নাঘরের আয়তন কমে আসায় এ বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই আমরাও উৎপাদনকারীদের নিয়মিত অর্ডার নিচ্ছি। বিক্রিও হচ্ছে ভালো।’ এ প্রসঙ্গে কথা হয় ক্রেতাদের সাথেও। পান্থপথে কিচেন কেবিনেট কিনতে এসেছিলেন নবদম্পতি মাহমুদুল হাসান ও ফাহিমা সুলতানা। তারা থাকেন মিরপুরের ছোট্ট একটি ফ্ল্যাটে। ফ্ল্যাটের রান্নাঘরের আয়তন কম হওয়ায় ঝামেলায় পড়েছেন এ নবদম্পতি। পরে মাহমুদুল হাসানের ইন্টেরিয়র ডিজাইনার বন্ধুর মাধ্যমে কিচেন কেবিনেট কেনার সিদ্ধান্ত নেন তারা। ফাহিমা সুলতানা বলেন, ‘প্রথমে বাসায় উঠে রান্নাঘরের আয়তন দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। পরে হাসানের এক বন্ধুর পরামর্শে কিচেন কেবিনেটেই মিলল সমাধান। আসলে আমাদের সবারই এই একই সমস্যা। তাই আমার মনে হচ্ছে কিচেন কেবিনেটই এ সমস্যার সঠিক সমাধান।’ আর উৎপাদনকারী ডিজাইনটেক লিমিটেডের শাহজাহান সরদারের মন্তব্য অনেকটা এ রকম, ‘ক্রেতাদের আগ্রহে আমরা খুব সন্তুষ্ট। পাশাপাশি বিক্রেতাদের কাছ থেকে প্রচুর অর্ডার আসছে। তাই আমরাও উৎপাদন বাড়াচ্ছি নিয়মিত।’
কিচেন কেবিনেট স্থাপনের নিয়ম-কানুন, স্থাপনপূর্ব ও পরবর্তীকালীন নানা বিষয় নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন দেশের খ্যাতনামা ইন্টেরিয়র ডিজাইনার গুলশান নাসরিন চৌধুরী। আসুন জেনে নিই প্রখ্যাত এ ডিজাইনারের গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শগুলো।
কিচেন কেবিনেটগুলো সাধারণত মেলামাইন বোর্ড, কাঠ ও প্লেন পারটেক্স বোর্ডে তৈরি হয়। তবে কাঠের তৈরি কিচেন কেবিনেটগুলোর দাম তুলনামূলকভাবে বেশি। পারটেক্স বা মেলামাইন বোর্ডের কিচেন কেবিনেটগুলোর দাম এর তুলনায় কিছুটা কম। তাই কেনার সময় এ বিষয়টি মাথায় রাখা ভালো।
কিচেনের সাইজ বা মাপ অনুযায়ী কিচেন কেবিনেট কেনা উচিত। মূলত কিচেনের সাইজ অনুযায়ী কিচেন কেবিনেট তৈরি করা হয়। তাই অর্ডার দেওয়ার সময় সঠিক মাপ জানাটা খুব জরুরি।
কিচেন কেবিনেটের রঙ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতন না হলে রঙের অসামঞ্জস্যের কারণে আপনার পুরো প্রচেষ্টাটাই ব্যর্থ হতে পারে। তাই রঙের ব্যাপারে সচেতন হওয়া উচিত। কিচেনের দেয়ালের সাথে মিলিয়ে হতে পারে আপনার কিচেন কেবিনেটের রঙ।
কাটাকুটি, ধোয়ামোছার জন্য কেবিনেটের বেসিন মার্বেল পাথর বা টাইলসের হলে ভালো হয়। তাহলে পানি পড়ে কেবিনেট নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে না।
কেবিনেটের শেলফগুলোর নিচে চুলার উপর বাতি ব্যবহার করা উচিত। তা না হলে শেলফের কারণে চুলার উপর কিছু দেখা যাবে না। বাতির রঙের ক্ষেত্রেও কেবিনেট ও রান্নাঘরের দেয়াল এবং পারিপার্শ্বিক রঙকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।
কেবিনেট সহজেই ময়লা হয়। তাই এমন রঙ ব্যবহার করা উচিত যাতে সহজে ময়লা বোঝা না যায়। এ ক্ষেত্রে অ্যাশ, ম্যাড/মাড বা অফ হোয়াইট কালার ব্যবহার করলে আর এ সমস্যা হয় না।
কিচেন কেবিনেটের আকার বড় হলে দুটি আর ছোট হলে একটি বেসিনই যথেষ্ট। কেবিনেটের কাছে সব সময় ডিশ ওয়াশিং পাউডার রাখা উচিত। বেসিন একটা হলে এর পাশে ধোয়ার পর পানি ঝরার জন্য একটা হ্যাঙ্গার রাখা যেতে পারে।
অনেকেই রান্নাঘরে ওভেন, বেøন্ডার ইত্যাদি ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেন। তাই কেবিনেটের দেয়ালে অবশ্যই ইলেকট্রিক পয়েন্ট রাখতে হবে।
নিয়মিত পরিষ্কার না করলে ইঁদুর, তেলাপোকা ও অন্যান্য পোকামাকড় কেবিনেট নষ্ট করে ফেলতে পারে। এজন্য নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে আর শেলফগুলোয় ন্যাপথলিন ব্যবহার করা যেতে পারে।
কেবিনেট বসানোর সময় ফ্লোর থেকে চার ইঞ্চি উঁচু করে ফ্রেম বানিয়ে কেবিনেট বসানো উচিত। এতে রান্নাঘর ধোয়া মোছার সময় পানিতে ভিজে কেবিনেট নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে।
কেবিনেটের ফিনিশিং যেন ভালো হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে।
দরদাম
মেলামাইন বোর্ডের কেবিনেট প্রতি বর্গফুট ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। কাঠের প্রতি বর্গফুট ৮০০ থেকে এক হাজার টাকায় পাওয়া যাবে।
রান্নাঘরের দরকারি এ কিচেন কেবিনেট পাওয়া যাবে রাজধানী ঢাকার পান্থপথ, শেওড়াপাড়া, কল্যাণপুর, মিরপুরসহ সারা বাংলাদেশের ছোট বড় সব ফার্নিচার দোকানে। এ ছাড়া ইচ্ছা করলে আপনি বানিয়ে নিতে পারেন অর্ডার দিয়ে।
জিয়াউর রহমান চৌধুরী
প্রকাশকাল: বন্ধন ২৩ তম সংখ্যা, মার্চ ২০১২