তিনি ভবনের ডিজাইন করেন খুব যত্ন নিয়েই। চেষ্টা করেন প্রচলিত ডিজাইনের বাইরে নতুনত্ব আনার। ফলে সেসব ভবনের ডিজাইন দেখে অন্য নির্মাতারাও চান তাঁদের স্বপ্নের আবাসন ডিজাইনটি এ প্রকৌশলীকে দিয়েই করাতে। এভাবেই তিনি একের পর এক কাজ পেতে থাকেন। অসংখ্য প্রকল্পের কাজ পেয়ে তিনি লাভবান হলেও তাতে কৃষি ও উন্মুক্ত জমি যে উজাড় হয়ে যাচ্ছে, এ বিষয়টি তাঁকে কষ্ট দেয়। অপরিকল্পিত এসব অবকাঠামো নির্মাণের প্রবণতা কমাতে শুরু করেন কনসালট্যান্সি ব্যবসা। বহুতল ভবন নির্মাণ করা সম্ভব হলে অনেক পরিবার ওই ভবনে বাস করতে সক্ষম হবে। তা ছাড়া জমির দাম দিন দিন যে হারে বাড়ছে, তাতে ঢাকার মতো মফস্বলের মানুষও ফ্ল্যাট কিনতে বাধ্য হবে। এ ধরনের নানা পরিকল্পনা নিয়ে প্রকৌশলী চর্চা করছেন এ এইচ এম মোস্তফা কামাল (সুমন)। জামালপুর শহরের গ্রীন হাউজ কনসালট্যান্সির স্বত্বাধিকারী তিনি। এ প্রকৌশলীর জানা-অজানা কথা বন্ধনের নিয়মিত আয়োজন ‘প্রকৌশলীর গল্প’ পর্বে তুলে ধরছেন মাহফুজ ফারুক
প্রকৌশলী মোস্তফা কামাল ১৯৮১ সালের ১৪ জানুয়ারি জামালপুরে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মো. জালাল উদ্দিন ও মা মোছা. আলেয়া ফেরদৌসি। তিনি মুক্তাগাছা আর কে সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৯৬ সালে মাধ্যমিক, ময়মনসিংহ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ২০০১ সালে ডিপ্লোমা ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ থেকে ২০১২ সালে একই বিষয়ে বিএসসি সম্পন্ন করেন। পরবর্তী সময়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জিআইএস এনভায়নমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিষয়ে স্নাতোকোত্তর সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি জামালপুর পৌরসভার উপসহকারী প্রকৌশলী। পাশাপাশি নিজস্ব ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্ম গ্রীন হাউজ কনসালট্যান্সির মাধম্যে চালিয়ে যাচ্ছেন প্রকৌশল চর্চা।
ছোটকাল থেকেই প্রযুক্তির প্রতি আকর্ষণ প্রকৌশলী সুমনের। এসএসসি পাস করার পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। এই সিদ্ধান্তে তাঁর বাবাও সায় দেন। ভর্তি হন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। ডিপ্লোমা শেষ করার পর গাজীপুরের একটি কনস্ট্রাকশন ফার্মে চাকরি নেন। কয়েক মাস পর যোগ দেন আরেকটি কনসালট্যান্সি ফার্মে। এরপর চলে আসেন ঢাকায়; চাকরি নেন নামকরা একটি স্থাপত্য ফার্মে। সেখানে দেশের শীর্ষ সারির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন, যেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বসুন্ধরা সিটি, স্কয়ার হাসপাতাল, বাংলালিংক হেড অফিস, ল্যাবএইড হসপিটাল, পিপলস ইনস্যুরেন্স ভবন প্রভৃতি। এসব প্রকল্পে সাইট ও প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে জড়িত থাকার সুবাদে দেশের প্রথম সারির স্বনামধন্য স্থপতি ও প্রকৌশলীদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়। তাঁদের মূল্যবান দিকনির্দেশনা ও নিবিড় সান্নিধ্য দারুণ সহায়ক হয় তাঁর পরবর্তী কর্মজীবনে।
ঢাকার বিভিন্ন প্রকল্পে সুনামের সঙ্গে কাজ করলেও একপর্যায়ে হাঁপিয়ে ওঠেন প্রকৌশলী সুমন। কাজের ব্যস্ততার মধ্যেই বিএসসি ও মাস্টার্সও সম্পন্ন করেন। সিদ্ধান্ত নেন নিজ জেলায় ব্যক্তিগতভাবে প্রকৌশল চর্চা করবেন। কিন্তু ঢাকায় প্রচুর কাজ থাকলেও মফস্বলে ক্ষেত্রটা কম। সেখানে নতুনভাবে শুরু করাটাও অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। অন্যদিকে তাঁর সরকারি চাকরির বয়স অবশিষ্ট মাত্র ২ বছর! সাতপাঁচ ভেবে সরকারি চাকরি করাটাকেই তিনি উত্তম মনে করেন। তাই শুরু করেন কঠোর অধ্যবসায়। একের পর এক সরকারি বিভিন্ন নিয়োগে পরীক্ষা দিতে থাকেন। শেষের দিকে বেশ কয়েকটি লিখিত পরীক্ষায় টিকে যান। এর মধ্যে ২০১০ সালে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে পৌরসভার চাকরি জুটে যায়। পদ ফাঁকা থাকায় নিজ জেলা জামালপুরেই পান নিয়োগ। পরবর্তী সময়ে আরও কিছু চাকরি হলেও নিজ এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় যেতে হবে বিধায় সেগুলোতে আর যোগ দেননি।
পৌরসভার চাকরির অফিস সময়ের অবসরে প্রকৌশলী সুমন চাচ্ছিলেন ব্যক্তিগত প্রকৌশল চর্চা শুরু করতে। তাঁর নজরে আসে সে সময়ে জামালপুর এলাকায় যেসব ভবন নির্মাণ হচ্ছিল, সেগুলোর ডিজাইন বৈচিত্র্যতা নেই বললেই চলে; কাজের মানও তেমন ভালো না। তাঁর বিশ্বাস ছিল নিজের সেরাটা দিতে পারলে এ শহরে দারুণ দারুণ স্থাপনা গড়ে তোলা সম্ভব। তা ছাড়া যেহেতু তিনি স্থানীয় ছেলে, সেহেতু তাঁর ওপর সকলে আস্থা রাখবেন। সব দিক বিবেচনায় একপর্যায়ে গড়ে তোলেন নিজের কনসালট্যান্সি ফার্ম। কাজ শুরুর পর তাঁর ডিজাইন বৈচিত্র্য ভিন্ন হওয়ায় ক্লায়েন্ট ও সর্বসাধারণের মধ্যে বেশ গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া যায়। দ্রুতই তিনি ও তাঁর প্রতিষ্ঠান পরিচিত হয়ে ওঠে। এ পর্যন্ত ছোট-বড় প্রায় ৩ হাজার প্রকল্পের সাথে নিজের প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করতে পেরেছেন। আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় অবকাঠামোসহ নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান। নিজ জেলা ছাড়াও তাঁর ডিজাইন করা ভবন রয়েছে ঢাকা, গাজীপুর, শেরপুর, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, পাবনা, মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও কুমিল্লায়। তাঁর এসব প্রকল্পে স্থায়ী-অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করছে বেশ কিছু জনবল। এদের মধ্যে স্থায়ী ভিত্তিতে নিশ্চিত হয়েছে প্রায় ১৫ জন মানুষের কর্মসংস্থান।
যদিও অসংখ্য প্রকল্পের কাজ এখন প্রকৌশলী সুমনের হাতে কিন্তু শুরুটা ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। কাজ করতে গিয়ে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছেন এবং এখনো হচ্ছেন। মফস্বলের মানুষ একজন ইঞ্জিনিয়ারের কাজ সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারে না। ন্যায্য পারিশ্রমিক দিতে চাই না। অধিকাংশই সস্তা খোঁজে। ক্লায়েন্টকে বোঝাতে অনেক বেগ পেতে হয়। অসচেতন বাড়ি নির্মাতাদের কৌশলী মিস্ত্রিরা ভুলভাল বুঝিয়ে নিজেরা কাজ বাগিয়ে নিতে চাই। অনেকে নিজের মতো করে ডিজাইন পরিবর্তন করে ফেলে। এসব নানা বিড়ম্বনার মধ্যেও তিনি তাঁর কাজের মান ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর। প্রাপ্য সন্মানী না পেলেও কাজের মানে কোন সমঝোতা করেন না। নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে এলজিইডি ও বুয়েট থেকে টেস্ট করান। এমনকি সাইটে ব্লক টেস্টও করান। নিয়মিত সাইট ভিজিট করেন। বিএনবিসি কোড ও ইমরারত নির্মাণ বিধিমালা মেনে চলা ও চেষ্টা করেন ক্লায়েন্টকেও মানাতে।
প্রকৌশলী মোস্তফা কামাল সুমন বিয়ে করেন ২০০৭ সালে। স্ত্রী মার্জিয়া ইয়াসমিন। এ দম্পতির দুই মেয়ে এক ছেলে। বড় মেয়ে রুমাইসা ইয়াসমিন সোহা, ইউনাইটেড পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৯ম শ্রেণিতে পড়ছে, ছোট মেয়ে রুবাইয়া জান্নাত স্নেহা, বয়স ৫ বছর। তাঁর আরেক সন্তান রিফাত হাসনাইন তালহা এডোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ১১ বছর বয়সে মারা গিয়েছেন। প্রয়াত সন্তানের স্বরণে তিনি গড়ে তুলেছেন তালহা ফাউন্ডেশন। এই চ্যারিটি প্রতিষ্ঠানের অধীনে অসহায় দরিদ্রদের দাতব্য চিকিৎসা সহায়তা ও হিফজখানার মাধ্যমে বাচ্চাদের পড়ালেখার ব্যবস্থা করেছেন। তিনি ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ এর সদস্য, জমালপুর প্ল্যানার্স অ্যান্ড ডিজাইনার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর সাধারণ সম্পাদক এবং অ্যাপেক্স ক্লাবের সদস্য। প্রকৌশলী সুমন নির্মাতা ও মিস্ত্রিদের মধ্যে নির্মাণবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিতেও কাজ করে যাচ্ছেন। ভবিষ্যতে মিস্ত্রিদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর।
প্রকাশকাল: বন্ধন ১৬৯ তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০২৪