সম্ভাবনাময় ইকোট্যুরিজম

বিশ্বজুড়ে অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে মানুষ ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে প্রকৃতি থেকে। প্রকৃতি উজাড় করে গড়ে উঠছে আবাসন, কলকারখানা, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো। আধুনিকতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে মানুষ এখন শারীরিক পরিশ্রমের থেকে মানসিক পরিশ্রমই করছে বেশি। ফলে মস্তিকের ওপর পড়ছে বাড়তি চাপ। আর চাপ থেকে রেহাই পেতে ও মানসিক প্রশান্তির জন্য প্রয়োজন প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্য। কিন্তু মানুষ প্রকৃতিকেও ঠেলে দিচ্ছে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। সেই অবস্থা থেকে উত্তরণে উদ্ভব হয়েছে ইকোট্যুরিজমের ধারণা। টেকসই পর্যটন নিশ্চিত করতে ইকোট্যুরিজমের ধারণা এনে দিয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। তা ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে ইকোট্যুরিজমের ধারণা বিশ্বব্যাপী পেয়েছে গ্রহণযোগ্যতা। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, প্রকৃতির সান্নিধ্যে বিনোদনের সুযোগ, সংস্কৃতির মিলন, প্রাকৃতিক সম্পদের বৈচিত্র্য রক্ষা, পরিবেশদূষণ রোধ, পরিবেশবান্ধব টেকসই পর্যটনের বিকাশ ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সাধনে ইকোট্যুরিজম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইকোট্যুরিজমের আদ্যোপান্ত তুলে ধরেছেন গোলাম মোর্শেদ

ইকোট্যুরিজম-কথন
ইকোট্যুরিজম হলো টেকসই ভ্রমণের একটি রূপ, যার লক্ষ্য পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের মঙ্গলকে সমর্থন করা। পরিবেশবান্ধব পর্যটন এলাকায় প্রকৃতি-পরিবেশের, জীববৈচিত্র্যের কোনো ক্ষতি না করে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ, উপলব্ধি ও অধ্যয়ন করাই মূলত ইকোট্যুরিজম। ইন্টারন্যাশনাল ইকোট্যুরিজম সোসাইটি (১৯৯১)-এর মতে, ইকোট্যুরিজম হলো প্রাকৃতিক অঞ্চলে দায়িত্বশীল ভ্রমণ; যা পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় মানুষের মঙ্গল সাধন করে। ল্যারমান ও ডাস্ট (Laarman & Dust) ইকোট্যুরিজমকে প্রকৃতি ভ্রমণ বলে ব্যক্ত করেছেন, যেখানে পর্যটক তার গন্তব্যস্থলের এক বা একাধিক প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সেখানে ভ্রমণ করে। সেই ভ্রমণটি শিক্ষা, বিনোদন এমনকি দুঃসাহসিক অভিযানমূলকও হতে পারে। পরিবেশগত পর্যটনের মাধ্যমে প্রকৃতিকে গভীরভাবে জানার ও বোঝার সুযোগ দেয়। পর্যটনের এই ধারণা এসেছে পরিবেশের যথার্থ রক্ষণাবেক্ষণের ভাবনা থেকেই। পর্যটনকে শুধু বিনোদনের খোরাক না ভেবে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার ধারণার শিক্ষা দেয়। এটি পর্যটনের এমন একটি উন্নয়ন ধারণা, যা স্থানীয় পরিবেশের সুরক্ষা ও সংরক্ষণ, পরিবেশগত ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ও স্থানীয়দের অনুপম অর্থনৈতিক-সামাজিক বিকাশ নিশ্চিত করে। স্থানীয় জনগণ, প্রকৃতিপ্রেমী, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষার সংগঠন ও সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রকৃতি সংরক্ষণ তথা উন্নয়নের ধারণাই ইকোট্যুরিজম। ইকোট্যুরিজম ক্রিয়াকলাপের উদাহরণের মধ্যে রয়েছে বন্য প্রাণী সাফারি, পাখি দেখা, হাইকিং, ডাইভিং এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের দ্বারা পরিচালিত পরিবেশবান্ধব লজ বা হোমস্টেতে থাকা। ইকোট্যুরিজম সংরক্ষণ প্রকল্পগুলোতেও অংশগ্রহণ করতে পারে, যেমন বৃক্ষরোপণ, বন্য প্রাণী পর্যবেক্ষণ বা সৈকত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা। 


ওয়ে রেবো ভিলেজ, ইন্দোনেশিয়া

ইকোট্যুরিজম ধারণার উদ্ভব
হেক্টর সেবালাস ল্যাসকুরেন ১৯৮৩ সালে মেক্সিকোতে ‘প্রোন্যাচারা’ (Pronatura) নামক এনজিও প্রতিষ্ঠার সময় ইকোট্যুরিজম শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। হেক্টর লক্ষ করেন, পর্যটক, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির মধ্যে এক জটিল সম্পর্ক বিদ্যমান। হেক্টরের মতে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদ এবং সর্বোপরি বিদ্যমান সংস্কৃতির (অতীত ও বর্তমান) উপভোগের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে অপেক্ষাকৃত শান্ত বা অনিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে পর্যটনকে ইকোট্যুরিজম বলে।

তবে কিছু সূত্র থেকে পাওয়া যায়, ইকোট্যুরিজমের ধারণা আসে আরও আগে ক্লজ-ডিয়েটার (নিক) হেটজার, বার্কলে-এর কাছ থেকে। তিনি সিএ-তে ফোরাম ইন্টারন্যাশনালের একজন একাডেমিক এবং অ্যাডভেঞ্চারার, কন্ট্রা কোস্টা টাইমস অনুসারে, ১৯৬৫ সালে ইকোট্যুরিজম ধারণা উদ্ভব করেছিলেন এবং ১৯৭০-এর দশকের প্রথম দিকে ইউকাটানে প্রথম ইকোট্যুর পরিচালনা করেছিলেন। তিনি ইকো-ট্যুরিজমের চারটি স্তম্ভের কথা বলেন। সেগুলো হচ্ছে-

  • ন্যূনতম পরিবেশগত প্রভাব
  • স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি সর্বাধিক শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে প্রভাবিত না করা
  • ভ্রমণকারী দেশের সর্বনি¤œস্তর থেকে আর্থিক বিকাশ সাধন
  • পর্যটকদের সর্বাধিক বিনোদনের সযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া


ইকোট্যুরিজমের মূলনীতি
ইকোট্যুরিজমের মূল নীতিগুলোর মধ্যে রয়েছে

  • সংরক্ষণ: প্রাকৃতিক আবাসস্থল, বন্য প্রাণী এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা করা
  • সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা: অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে স্থানীয় সম্প্রদায়কে জড়িত এবং উপকৃত করা
  • শিক্ষা: পরিবেশগত এবং সাংস্কৃতিক বিষয় সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, বোঝাপড়া এবং উপলব্ধি বৃদ্ধি
  • টেকসই: পর্যটন কার্যক্রম এমনভাবে পরিচালিত হয়, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সম্পদ সংরক্ষণ করে
  • দায়িত্বশীল ভ্রমণ: পরিবেশ, বন্য প্রাণী এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব কমিয়ে আনা


ইকোট্যুরিজমের উদ্দেশ্য
ইকোট্যুরিজমের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো স্থানীয় অর্থনৈতিক-সামাজিক বিকাশ সাধন ও প্রকৃতি-পরিবেশ সংরক্ষণ। বর্তমান সময়ে পরিবেশগত পর্যটন এলাকায় পর্যটক আকর্ষণ করে ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে সবুজ প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখার ব্যাপক সুযোগ তৈরি হয়েছে। ইকোট্যুরিজমের আরও যেসব উদ্দেশ্য রয়েছে, সেগুলো হলো-

  • সুসংগত ও স্থিতিশীল পর্যটন সরবরাহ করা
  • দর্শনার্থীদের ভিন্ন ভিন্ন বন্য উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতি এবং স্থানীয় বাসিন্দা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা প্রদান
  • সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে পর্যটকদের সচেতন করা
  • ইকোট্যুরিজমকে সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য পরিকাঠামোর সুব্যবস্থা করা
  • কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা
  • স্থানীয় আর্থসামাজিক বিকাশ সাধন
  • প্রকৃতি ও পরিবেশের সংরক্ষণ
  • সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রভৃতি


ইকোট্যুরিজমের গুরুত্ব
প্রকৃতি-পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও প্রকৃতি সংরক্ষণে ইকোট্যুরিজমের গুরুত্ব অপরিসীম। ইকোট্যুরিজমের গুরুত্ব অনুধাবন করে জাতিসংঘ ২০০২ সালকে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইকোট্যুরিজম ইয়ার’ ঘোষণা করে। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে ভুগতে থাকা দেশগুলোর জন্য ইকোট্যুরিজমের ব্যাপক প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। শুধু পরিবেশ রক্ষাই নয়, টেকসই উন্নয়নের জন্যও ইকোট্যুরিজম গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশগত পর্যটন বা ইকোট্যুরিজম স্পট ভ্রমণের মাধ্যমে ব্যাপক শিক্ষালাভেরও সুযোগ রয়েছে। ইকোট্যুরিজম শিক্ষামূলক ভ্রমণ ও গবেষকদের গবেষণা করারও সুযোগ তৈরি করে। ইকোট্যুরিজমের গুরুত্ব তুলে ধরা হলো-

পর্যটনে ব্যবহৃত হাউস বোট, কেরালা, ভারত

  • ইকোট্যুরিজম পিছিয়ে থাকা প্রত্যন্ত এলাকার অর্থনৈতিক বিকাশে সাহায্য করে
  • স্থানীয়দের গাইড, যানবাহন পরিচালনা ও অন্যান্য কারিগরি পরিষেবা প্রদানের মাধ্যমে বিপুল জনগোষ্ঠীকে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে, স্বনির্ভর হতে সাহায্য করে
  • হোমস্টে, খাবার হোটেল, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ব্যবসার মাধ্যমে সম্প্রদায়ের জন্য অতিরিক্ত আয়ের উৎস সৃষ্টি হয়
  • বিভিন্ন বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদ সম্পর্কে মানুষ জানতে শেখে
  • প্রকৃতির মধ্যে থেকে মানুষ বিনোদনের সুযোগ পায়
  • ইকোট্যুরিজমের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকার মানুষের সমাগম ঘটায় সংস্কৃতির মিলন ঘটে
  • স্থানীয় এলাকার পরিকাঠামো গত বিকাশ ঘটে। যেমন- রাস্তাঘাট নির্মাণ, বিদ্যুৎ, হোটেল প্রভৃতি
  • মানুষ প্রাকৃতিক পরিবেশে সংরক্ষণের গুরুত্ব অনুধাবনে সক্ষম হয়
  • স্থানীয় মানুষের মধ্যে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের প্রতি মনোনিবেশ করতে দেখা যায়
  • ইকোট্যুরিজম পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি টেকসই উন্নয়নের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে স্থানীয় এলাকার পরিকাঠামোগত বিকাশ ঘটে, যেমন: রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, হোটেল প্রভৃতি
  • ইকোট্যুরিজম ঐতিহ্যগত রীতিনীতি, অনুশীলন এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণকে উৎসাহিত করে। দর্শনার্থীদের কাছে তাদের অনন্য সংস্কৃতি এবং জীবনধারা প্রদর্শন করে, সম্প্রদায়গুলো তাদের পরিচয় এবং গর্বের বোধকে শক্তিশালী করতে পারে পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী নৃত্য, হস্তশিল্প প্রদর্শন এবং সাংস্কৃতিক ভ্রমণের মতো সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আয়ও করতে পারে।
  • স্থানীয় সম্প্রদায়কে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, মালিকানা এবং পর্যটন উদ্যোগের ব্যবস্থাপনায় জড়িত করে ক্ষমতায়ন করে।
  • ইকোট্যুরিজম সক্রিয়ভাবে জড়িত এবং স্থানীয় সম্প্রদায়কে উপকৃত করে, তাদের পর্যটন পরিকল্পনা, উন্নয়ন এবং ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণের ক্ষমতা দেয়। সম্প্রদায়ভিত্তিক পর্যটন উদ্যোগগুলো নিশ্চিত করে যে স্থানীয় বাসিন্দারা পর্যটনের অর্থনৈতিক সুবিধার অংশীদার হয় এবং এর ফলাফলগুলোতে তাদের অংশীদারত্ব রয়েছে।
  • ইকোট্যুরিজম সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং আদিবাসী, ঐতিহ্যগত জ্ঞান এবং স্থানীয় রীতিনীতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে। দর্শকদের স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে একটি সম্মানজনক এবং পারস্পরিকভাবে উপকারী পদ্ধতিতে জড়িত হতে উৎসাহিত করা হয়, ক্রস-সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া এবং উপলব্ধি বৃদ্ধি করে।


বিশ্বব্যাপী ইকোট্যুরিজম
জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থার মতে, প্রতিবছর ১৪০ কোটির বেশি পর্যটক বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করে থাকে। অর্থাৎ বর্তমান সময়ে ইকোট্যুরিজমের গুরুত্ব অনুধাবন করে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ইকোট্যুরিজমের বিকাশে মনোনিবেশ করেছে। বিশ্বে ইকোট্যুরিজম ধারণার সফল প্রয়োগ করছে নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে, ইকুয়েডর, গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ এবং আন্দিজ পর্বতমালা এলাকার বিভিন্ন দেশ। মালদ্বীপ, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের মতো এশিয়ার দেশগুলো পর্যটন খাতকে পরিকল্পিত উপায়ে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এসব দেশের অর্থনীতি পর্যটন খাতের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। এ ছাড়া আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও ভুটান ধারণাটি ভালোভাবেই কাজে লাগাচ্ছে। ভুটান পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সাংস্কৃতিক সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দেয়। দেশটি পর্যটকদের সংখ্যা সীমিত করে এবং ভ্রমণের ওপর দৈনিক শুল্ক ধার্য করে তা টেকসই উন্নয়নে ব্যয় করার মাধ্যমে একটি শীর্ষ পরিবেশবান্ধব গন্তব্য হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে। ভারতের কেরালা, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরাখন্ড ও হিমাচল প্রদেশে নিশ্চিত করা হয়েছে ইকোট্যুরিজম। ইকোট্যুরিজম খাত থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ স্থানীয় মানুষের অরণ্য নিধন ও বন্য পশু হত্যা থেকে বিরত রাখে। তাই ভারত সরকারের পরিবেশ ও অরণ্য দপ্তর আর পর্যটন দপ্তর জাতীয় উদ্যান, অভয়ারণ্য ও জীববৈচিত্র্য মূল সংরক্ষণ অঞ্চলগুলোতে ইকোট্যুরিজম মূলক প্রকল্পে স্থানীয়দের যুক্ত করতে উদ্যোগী হয়েছে। ভারতবর্ষে কিছু ইকোট্যুরিজম সাইটের মধ্যে অন্যতম-

প্রকৃতির কোলে গড়ে ওঠা ইকো কটেজ

  • কেরালার পেরিয়ার ব্যাঘ্র প্রকল্প
  • থেনমালা-কেরালার একটি পুরস্কৃত ইকোট্যুরিজম সাইট
  • সুন্দরবন
  • উত্তরাখন্ডের নন্দাদেবী জীবমূল সংরক্ষণ অঞ্চল (ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী সাইট)
  • উত্তরাখন্ডের জিম করবেট জাতীয় উদ্যান


বাংলাদেশ ইকোট্যুরিজমের হালচাল
আমাদের দেশে দারুণ সম্ভাবনা থাকা সত্তে¡¡ও এখানে ইকোট্যুরিজম সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে ‘বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন’। এই প্রতিষ্ঠানটি দেশের পরিবেশবান্ধব পর্যটনের প্রসারে রাখতে পারেনি তেমন ভ‚মিকা। তবে দেশের কিছু কিছু বনাঞ্চল, যেমন- কালেঙ্গা, সাতছড়ি, সুন্দরবন, খাদিমনগর, মেধা-কচ্ছপিয়া ও অন্যান্য বনে সীমিত পরিসরে ইকোট্যুরিজম চালু হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করেছে দেশি-বিদেশি কিছু এনজিও। এ ছাড়া দেশে সামান্য কিছু হোমস্টে গড়ে উঠলেও এখনো পর্যন্ত ইকোট্যুরিজম নিয়ে নেই কোনো সঠিক পরিসংখ্যান। পৃথিবীর অনেক দেশ তাদের সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্যগুলোকে পর্যটকদের কাছে উপস্থাপনের জন্য বিভিন্ন ধরনের পর্যটন চালু রেখেছে। এর মধ্যে খুব জনপ্রিয় এবং গ্রহণযোগ্য পর্যটনব্যবস্থা হলো হোমস্টে পর্যটন। এ ধরনের পর্যটনে বাড়ির মালিক তাঁর ঘরগুলো পর্যটকদের ভাড়া দিয়ে থাকেন। অতিথি পর্যটকদের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থাও তিনিই করেন। এ সেবাটি প্রদানের মাধ্যমে তিনি অতিথি পর্যটকের কাছ থেকে কিছু অর্থ পান। এ ব্যবস্থায় মূলত দুই পক্ষই লাভবান। ভারতে এ ধারণাটি দ্রæত জনপ্রিয়তা লাভ করছে। দেশটির পর্যটন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে হাজার হাজার এ ধরনের বাড়ির নাম-ঠিকানা এবং বাড়িওয়ালার নাম লিখে রাখা হয়েছে। যোগাযোগের জন্য মোবাইল ফোন নম্বরও দেওয়া আছে। পর্যটকেরা তাঁদের অভিরুচি অনুযায়ী বাড়ি পছন্দ করে সেখানে যান এবং স্বাচ্ছন্দ্যে থাকেন।

সম্প্রতি বান্দরবান জেলার থানচি, ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার চর কুকড়িমুকড়ি, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ, নওগাঁর সোমপুরবিহার ও দেশের পার্বত্য এলাকাগুলোতে সীমিত পর্যায়ে কিছু হোমস্টে গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডও দেশব্যাপী এই সুবিধা চালু করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নিজ নিজ পর্যটন এলাকায় হোমস্টে করার জন্য স্থানীয় লোকজনকে উদ্বুদ্ধ করছে। তবে তা খুবই সীমিত পরিসরে। হোমস্টে ধারণাটি বাস্তবায়ন করা গেলে এক এটি হয়ে উঠতে পারে গ্রামীণ দারিদ্র্য দূরীকরণের একটি অন্যতম হাতিয়ার। আর এই পরিকল্পনা সঠিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে বাংলাদেশ হয়ে উঠবে হোমস্টে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় একটি গন্তব্য।

বাংলাদেশে ইকোট্যুরিজম তেমন একটা না থাকলেও এই ধারণা নিয়ে গড়ে উঠছে কিছুটা এনভায়রনমেন্ট ফ্রেন্ডলি ট্যুরিজম, যাকে লেস ইম্পেক্ট কনভেনশনাল ট্যুরিজম বলা যায়। ইকোট্যুরিজমের প্রথম ও প্রধান শর্ত ইকোসিস্টেম ম্যাচিং। স্থানীয়ভাবে প্রাপ্য সামগ্রী ব্যবহার করে পর্যটন সুবিধার উন্নয়ন করতে হয়। ঠিক রাখতে হয় ইকো-ব্যালান্স। অর্থাৎ অতিরিক্ত শব্দ, আলো, আতশবাজি ও আগুনের ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। বনের ভেতর বারবিকিউ করা যায় না। এখন কিছু করপোরেট গোষ্ঠী ও পুঁজিপতিরা আধুনিক ব্যবস্থাপনা, পরিবেশসম্মত পর্যটনব্যবস্থা করলেও সেটা ইকোট্যুরিজম নয়। ইউএসএইড নিসর্গ প্রজেক্টের আওতায় কিছু জায়গায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে ইকোট্যুরিজম ধারণা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। তবে আশার কথা, সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগ স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সরাসরি পর্যটন কর্মকাÐের সঙ্গে স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করছে। বনে পর্যটকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে তৈরি করা হচ্ছে নতুন চারটি সুন্দরবন ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র। বনের ভেতর দিয়ে পর্যটকদের অবাধ যাতায়াতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বনের সার্বিক পরিবেশ। পরিস্থিতি বিবেচনায় বনের সৌন্দর্য অবলোকনে নিরিবিলি পরিবেশ সৃষ্টি ও বন্য প্রাণীদের অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করে পরিবশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তুলতে বন বিভাগ নতুন ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। সুন্দরবনের ভেতরে বর্তমানে মোট সাতটি পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে। যেখানে প্রতিবছর প্রায় দুই লাখ পর্যটক ভ্রমণ করে থাকেন। এর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

সুন্দরবনের অদুরে নির্মিত একটি রিসোর্ট

রয়েছে ভিন্ন চিত্রও। বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় একের পর এক গড়ে উঠছে বেসরকারি রিসোর্ট। এরই মধ্যে বনের গাছ কেটে, খাল ভরাট করে খুলনা ও সাতক্ষীরায় ১৪টি রিসোর্ট গড়ে তোলা হয়েছে। আরও আটটির নির্মাণকাজ চলছে। রিসোর্টগুলো চালানোর জন্য বিকট শব্দে চলছে জেনারেটর। বাজছে সাউন্ড সিস্টেম। বেশির ভাগ রিসোর্টে স্থাপন করা হয়েছে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র। মাটিতে বড় গর্ত করে আলাদাভাবে পচনশীল ও অপচনশীল বস্তু রাখা হচ্ছে। প্লাস্টিকের মতো বর্জ্য কয়েক দিন পরপর ফাঁকা জায়গায় পুড়িয়ে দেওয়া হয়। গাছগাছালির মধ্যে এসব কটেজ তৈরির জন্য কিছু বড় গাছ কাটা পড়ছে। প্রাকৃতিক জলাভ‚মিও নষ্ট করা হয়েছে। একাধিক রিসোর্টে হাঁটার পথ, শৌচাগার, এমনকি ঘরেও কংক্রিটের ব্যবহার হচ্ছে। রিসোর্ট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীতে পর্যটক আনা-নেওয়ার জন্য ট্রলারের সংখ্যাও বেড়েছে, যা বনের নীরবতা ভাঙছে।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করা হয়েছে। এসব এলাকায় সেখানকার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের ক্ষতি করে কোনো স্থাপনা নির্মাণ কিংবা কোনো কর্মকান্ড সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে গড়ে ওঠা এসব রিসোর্ট বনের পরিবেশের ক্ষতি করছে। রিসোর্টগুলোর আশপাশে পানি, শব্দ ও মাটিদূষণ বাড়ছে। বনের প্রাণীরা ওই এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। তা ছাড়া কটেজগুলোর মালিক বাইরের মানুষ, যা ইকোট্যুরিজমের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অতি দ্রুত এসব রিসোর্ট নির্মাণ বন্ধ করতে না পারলে স্পর্শকাতর এ বন ও বনের প্রতিবেশব্যবস্থার ক্ষতি হবে, যেমন হয়েছে গাজীপুরের ভাওয়াল বন।

বাংলাদেশে ইকোট্যুরিজমের সম্ভাবনা
প্রাকৃতিক সম্পদ ও সৌন্দর্যে ভরপুর বাংলাদেশ ইকোট্যুরিজমের দিক দিয়ে প্রচুর সম্ভাবনাময়। দেশে পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, খাল-বিল, বৃক্ষ-বনানী, চা-বাগান, সাগরসৈকত, সংস্কৃতি-সভ্যতা, প্রাণিকুল, জীববৈচিত্র্য, ইতিহাস-ঐতিহ্য, হাওর-বাঁওড়, দ্বীপ-লেক, জলপ্রপাত, ঝরনাধারা প্রভৃতি পরিবেশগত পর্যটন বা ইকোট্যুরিজম স্পট ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান ও বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে বাংলাদেশ ইকোট্যুরিজমের অনুক‚ল। দেশের আনাচকানাচে প্রান্তিক পর্যায়ে এমন অনেক পরিবেশগত পর্যটন স্পট আছে, যেগুলো পরিকল্পিত উপায়ে সংরক্ষণ না করার ফলে হারিয়ে যেতে বসেছে! পৃথিবীর একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ইকোট্যুরিজম গড়ে তোলা সম্ভব। এটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে পৃথিবীব্যাপী সুপরিচিত। এ ছাড়া বঙ্গোপসাগরের বুকে অবস্থিত সেন্ট মার্টিন বা অনুরূপ দ্বীপকেও ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যায়। এ ছাড়া সিলেটের চা-বাগান, পার্বত্য চট্টগ্রাম, বিশ্বের বৃহত্তম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, কুয়াকাটার মতো অনন্য প্রাকৃতিক স্থানসমূহ ইকোট্যুরিজমের উৎকৃষ্ট কেন্দ্র হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলা ইকোট্যুরিজমের জন্য অনেক বেশি সহায়ক। দেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বসবাসস্থানকে ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। এ ছাড়া ষড়্্ঋতুর বাংলাদেশে ঋতুভিত্তিক ইকোট্যুরিজমের সম্ভাবনাও কাজে লাগানো যেতে পারে।

সেন্টমার্টিন

স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে প্রতিবছর প্রায় ৭ লাখের বেশি বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে ভ্রমণ করে থাকে। এ ছাড়া প্রতিবছর প্রায় ১ কোটির মতো বেশি অভ্যন্তরীণ তথা দেশি পর্যটক ভ্রমণ করে। ইকোট্যুরিজম পরিকল্পনায় পর্যটকের সংখ্যা যেমন বাড়বে, তেমনি প্রকৃতিও সংরক্ষণ হবে। বাংলাদেশে ইকোট্যুরিজমের সম্ভাবনা উন্মোচনে সরকারি, আধা সরকারি, বেসরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত ও যৌথ পরিকল্পনা গ্রহণ করা আবশ্যক। ইকোট্যুরিজমের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশ হবে এশিয়ার রোড মডেল। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের পথে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের পর্যটনশিল্প এখনো টেকসই পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে বিকশিত হতে পারেনি এবং টেকসই পর্যটন এসডিজির অন্যতম লক্ষ্য, যদি এটি পরিকল্পনা অনুযায়ী সংগঠিত করা না যায়, তবে বাংলাদেশের জন্য এসডিজি লক্ষ্য পূরণ হবে বেশ কঠিন।

তথ্যসূত্র:
ইন্টারন্যাশনাল ইকোট্যুরিজম সোসাইটি
ড. মো. মোরশেদুল আলম, শিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশকাল: বন্ধন ১৬৭ তম সংখ্যা, জুলাই ২০২4

+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top