ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ এড়াতে নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন

বর্তমানে দেশের জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশ যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে ট্রেন। যাত্রী পরিষেবা কিংবা পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বেই ট্রেন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে পরিচিত। কিন্তু বিগত দিনে কিছু ট্রেন দুর্ঘটনা এ যোগাযোগ ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে ভাবিয়ে তুলেছে যাত্রীদের। ট্রেনের দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে মুখোমুখি সংঘর্ষ, লাইনচ্যুতি, আগুন লাগা, বাস কিংবা অন্য যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষ ইত্যাদি। তবে ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে এসব দুর্ঘটনার মধ্যে দুটি ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ অত্যন্ত ভয়াবহ ও মারাত্মক। এ মুখোমুখি সংঘর্ষের ফলে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে এবং সেই সঙ্গে দেশ ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতিরও সম্মুখীন হচ্ছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের জরিপ অনুযায়ী, ২০০৮ সালের ১৩ মে রাজধানী ঢাকার পূর্ব প্রান্তের একটি স্টেশনে দুটি ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৮ জন নিহত ও ১২ জনের মতো আহত হয়। ২০০৯ সালের ৮ ফেব্রæয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ স্টেশনে সিলেটগামী উপবন এক্সপ্রেস ও নোয়াখালীগামী একটি ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা ঘটে। ২০০৯ সালের ২২ জুন কমলাপুর স্টেশনে চট্টগ্রাম থেকে আসা মহানগর প্রভাতী ও কমলাপুর ছেড়ে যাওয়া ঈশা খাঁ এক্সপ্রেসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১ জন নিহত ও ১২ জন আহত হয়। বাংলাদেশ রেলওয়ের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১৯৯৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ১৪ বছরে ৯৭টি মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ ১৪ বছরের ট্রেন দুর্ঘটনায় ৫১৪ যাত্রী নিহত ও ৩২৭২ যাত্রী আহত হয়েছে, বেশিরভাগ হতাহতের ঘটনাই ঘটেছে ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষের ফলে। এ ছাড়া ২০১০ সালের ৮ ডিসেম্বর নরসিংদীতে মহানগর প্রভাতী ও চট্টলা এক্সপ্রেসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৫৯ জন নিহত ও ১৫৯ জন আহত হয়। এসব মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ও এর ফলে সৃষ্ট হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখেই ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ এড়াতে ‘অটোমেটিক রেইল ট্রেক সুইচিং সিস্টেম উইথ কম্পিউটারাইজড কন্ট্রোল’ নামে একটি প্রযুক্তির উদ্ভাবন করেছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) দুই শিক্ষার্থী খিজির মাহমুদ এবং মোঃ রিয়া সাদ আজিম। এ উদ্ভাবনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন চুয়েটের তড়িৎকৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছোটন কান্তি দাশ।

ট্রেন লাইন নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ম্যানুয়াল ও অটোমেটিক সফটওয়্যার

এ প্রযুক্তির কার্যপ্রক্রিয়া ও উদ্ভাবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে উদ্ভাবকরা জানান, এর মাধ্যমে দুটি ট্রেনের অবস্থান নির্ণয় করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রেন দুটিকে মুখোমুখি সংঘর্ষের হাত থেকে রক্ষা করবে। ট্রেন লাইনে ট্রেনের অবস্থান নির্ণায়ক কিছু সেন্সর লাগানো থাকবে, যার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক ট্রেনের অবস্থান ও গতি প্রধান নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে পর্যবেক্ষণ করা হবে। যদি কোনো ট্রেন ত্রুটিপূর্ণ নির্দেশনা কিংবা অসাবধানতাবশত মুখোমুখি অবস্থানে আসার উপক্রম হয় তাহলে প্রধান নিয়ন্ত্রণ কক্ষে এটির জন্য অ্যালার্ম বেজে উঠবে, ট্রেনের অবস্থান নির্দেশ করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নির্দেশ দেবে। তার পরও যদি কোনো ব্যবস্থা নেওয়া না হয় তাহলে ট্রেন দুটির মুখোমুখি সংঘর্ষের আগেই যে কোনো একটি ট্রেনের লাইন পরিবর্তন করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রেন দুটিকে দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা করবে। এজন্য প্রধান নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কম্পিউটারে উদ্ভাবকদের উদ্ভাবিত একটি সফটওয়্যার থাকবে, সফটওয়্যারটির মাধ্যমে অটোমেটিক ও ম্যানুয়াল মোডে কাজ করানো যাবে। এতে নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বসেও ট্রেন লাইনের লাইন পরিবর্তন করা যাবে। এ ছাড়া এ সফটওয়্যারটির মাধ্যমে প্রধান নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বসেও ট্রেনের অবস্থান ও গতির দিক সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা যাবে। প্রযুক্তিটি বাংলাদেশ রেলওয়েতে ব্যবহৃত হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব ও বর্তমানে ব্যবহৃত দেশীয় পুরনো প্রযুক্তির ব্যাপক পরিবর্তন হবে বলে জানান চুয়েটের উদ্ভাবকরা। উদ্ভাবক সূত্রে জানা যায়, প্রযুক্তিটি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে মোটর, মাইক্রোকন্ট্রোলার, সেন্সর, কমিউনিকেশন কেবল, ভিজুয়াল বেসিক, কন্ট্রোলরুম সার্ভার, পিসি কানেক্টর, রেলওয়ে কলিশন এভইডিং/অ্যাভয়ডিং সফটওয়্যার ইত্যাদি। ছোট পরিসরের জন্য তৈরি এ প্রজেক্টটিতে খরচ হয়েছে মাত্র ৫ হাজার টাকা। বাংলাদেশ রেলওয়ের যে কোনো রাস্তায় এটি ব্যবহার করতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে খরচ হবে ৪-৫ লাখ টাকা।

উদ্ভাবনের তত্ত্বাবধায়ক চুয়েটের তড়িৎকৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছোটন কান্তি দাশ বলেন, ‘বাংলাদেশে এ ধরনের কাজ নিয়ে গবেষণা বৃদ্ধি করার এখনই প্রকৃত সময়। এ প্রযুক্তিটির কার্যপদ্ধতি আরও বাড়িয়ে উপযুক্ত ব্যবহারের মাধ্যমে ট্রেন দুর্ঘটনার মাত্রা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।’

ট্রেন লাইন নিয়ন্ত্রণ কক্ষের যন্ত্রপাতি

প্রযুক্তিটি প্রসঙ্গে খিজির মাহমুদ বলেন, ‘২০১০ সালের ৮ ডিসেম্বর নরসিংদীতে মহানগর প্রভাতী ও চট্টলা এক্সপ্রেসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৫৯ জন নিহত ও ১৫৯ জন আহত। মূলত এ ধরনের একটি হৃদয়বিদারক ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না হয় তার জন্য আমি এবং আমার বন্ধু মোঃ রিয়া সাদ আজিম মিলে পুরো দুর্ঘটনাটি নিয়ে গবেষণা শুরু করি। দুর্ঘটনাটি নিয়ে সূ² গবেষণার পর তা নিরসনে এ ধরনের একটি প্রযুক্তির চিন্তা মাথায় আসে আমাদের। তার পরই প্রযুক্তিটি সম্পাদনের সম্ভাব্যতা নিয়ে কাজে নেমে পড়ি। তার পর প্রায় দীর্ঘ ৮ মাস গবেষণার পর এটি সম্পাদন করতে সমর্থ হই। এ সময়ে আমাদের চুয়েটের ল্যাবে সুদীর্ঘ সময় গবেষণার কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে এবং সঠিক গবেষণার জন্য বেশ কিছু ল্যাব এবং শিক্ষক অনেক বেশি সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। এ প্রযুক্তিটি বাংলাদেশ রেলওয়েতে ব্যবহৃত হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব হবে বলে আমি মনে করি।’

  • বন্ধন প্রতিবেদক

প্রকাশকাল: বন্ধন ২২ তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১২

+ posts