অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী
যানজট সমস্যা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়

ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী ১৯৪২ সালের ১৫ নভেম্বর সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা প্রকৌশলী আবিদ রেজা চৌধুরী এবং মা হায়াতুন নেছা চৌধুরী। স্ত্রী সেলিনা নওরোজ চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফলিত পদার্থবিদ্যায় মাস্টার্স ডিগ্রিধারী। সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুল থেকে ১৯৫৭ সালে মাধ্যমিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৫৯ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর ভর্তি হন আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (বর্তমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে)। ১৯৬৩ সালের নভেম্বর মাসে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন পুরকৌশল বিভাগে। সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যাডভান্স স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এমএসসি করেন। থিসিসের বিষয় ছিল কংক্রিট বীমে ফাটল। ১৯৬৮ সালে পিএইচডি করেন কম্পিউটার এইডেড ডিজাইন অব হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের উপর। ২০০১ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী যুক্তরাজ্যের সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের ফেলো। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সভাপতি ছিলেন। বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটি, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এবং বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন/করছেন। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ছিলেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিস রহমান

যানজট বর্তমানে জাতীয় সমস্যায় রূপ নিয়েছে। এ সমস্যা সমাধানে সর্বপ্রথম কোন্ বিষয়গুলোকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন। এ ক্ষেত্রে সরকারের সফলতার সম্ভাবনা কতটুকু?

এ শহরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রয়োজনীয় রাস্তাঘাট নির্মিত না হওয়া যানজট সমস্যার অন্যতম প্রধান কারণ। গত চল্লিশ বছরে জনসংখ্যা দশ লক্ষ থেকে বেড়ে এখন প্রায় দেড় কোটি হয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বৃদ্ধি পেয়েছে যানবাহনের সংখ্যা। অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ সহ্য করতে পারছে না পুরাতন রাস্তাগুলো। এ ছাড়া ঢাকা মহানগরীর বিস্তার মূলত উত্তর-দক্ষিণ কেন্দ্রিক। একটি শহরে শুধু উত্তর-দক্ষিণমুখী রাস্তা হলে চলবে না। প্রয়োজন পূর্ব-পশ্চিমমুখী রাস্তারও। আর সেটা আমাদের নেই। আমাদের রোড প্ল্যানিংটা সঠিকভাবে হয়নি। আবার এখন যে রাস্তাগুলো রয়েছে তাও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। সরকার থেকেও ভালো উদ্যোগ নেই এ সমস্যা সমাধানে। ঢাকা মহানগরের রাস্তা ব্যবহারকারীদের মধ্যে সিংহভাগই পথচারী। পৃথিবীর যে কোনো দেশে পথচারীদের জন্য আলাদা ফুটপাত রয়েছে। আমাদের দেশেও ফুটপাত আছে। তবে ফুটপাতগুলো যে উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছে তা কাজে আসছে না। ফুটপাতের বেশির ভাগই ফেরিওয়ালাদের দখলে। রাস্তার উপরে রয়েছে ছোট ছোট দোকান। ফুটপাত দখল করে রেখেছে ভবন নির্মাণ সামগ্রী। অনেক সময় প্রধান প্রধান সড়ক দখল করে এসব কাজ করা হচ্ছে। এমনিতেই রাস্তা অপ্রতুল, সেখানে ফুটপাত দখল করে রাখায় সৃষ্টি হচ্ছে যানজটের। এটা সম্পূর্ণরূপে বেআইনী। এগুলো দেখার কোনো লোক নেই। যারা ফুটপাত ব্যবহার করবে তাদেরও রয়েছে নানান প্রতিবন্ধকতা। ফুটপাত সংলগ্ন ভবনগুলোতে প্রবেশ করতে গেটের সামনে ফুটপাতটাকে কাটা হয়েছে। কিন্তু এগুলোর বেশির ভাগই উলম্বভাবে কাটার ফলে পথচারীকে ঘন ঘন এক ফুট নামতে বা উঠতে হয়। এগুলো পথ চলতে পথচারীদের সমস্যা সৃষ্টি করে। পথচারীরা ফুটপাত ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হয়। কেননা এর ফলে বারবার ওঠানামা করতে পথচারীদের কষ্ট হয়। এ কারণেই সে আর এটা ব্যবহার করতে চায় না। অনেক রাস্তায় দুই লাইনে গাড়ি পার্কিং করে রাখা হচ্ছে। পার্কিং পলিসি আছে তবে তার বাস্তবায়ন নেই। 

তার মানে আপনি বলছেন আইন প্রয়োগের অভাবে এমনটা হচ্ছে?

হ্যাঁ, সেটাই। আমাদের যে পার্কিং পলিসি রয়েছে তার বাস্তবায়ন করতে হবে। যে আইন রয়েছে সেই আইনের সঠিক প্রয়োগ ছাড়া ভালো কিছু আশা করা যায় না। ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে হলে এটি অনেক কাজে আসবে। মতিঝিলে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যাতায়াতের জন্য রাস্তার মাঝে দুই লেনে গাড়ি রাখা হচ্ছে সকাল-বিকাল। কেন এমনটি হবে? প্রধান সড়কগুলোতে রাস্তা দখল করে বেআইনীভাবে গাড়ি পার্কিং বন্ধ করতে না পারলে আমরা যত রাস্তাই নির্মাণ করি না কেন তাতেও যানজট নিরসন সম্ভব হবে না। 

মতিঝিলে অনেক বহুতল ভবন রয়েছে যাদের নিজস্ব পার্কিং স্পেস নেই, সে ক্ষেত্রে…

ভালো কথা বলেছ। ১৯৯০-এর আগে বিল্ডিং কোড ছিল না। এর আগে যে ভবনগুলো নির্মিত হয়েছে সেগুলোতে পার্কিং ব্যবস্থা নাও থাকতে পারে। আগে যারা বিল্ডিং প্ল্যান করেছে তারা অতটা সচেতন ছিল না। ১৯৯৩ সালে বিল্ডিং কোড করা হলো। এর আইনগত ভিত্তি আসতে আসতে কেটে গেল আরো ১৩ বছর। নতুন ভবন নির্মাণ কোড অনুকরণ/অনুসরণ করে করলে এ সমস্যা থাকার কথা নয়। এখন যে কোনো ভবন অনুমোদনের আগে দেখা হচ্ছে ভবনের ভিত বা বেজমেন্টে পার্কিং ব্যবস্থা আছে কিনা। বিল্ডিং কোডে বলা আছে, কমার্শিয়াল ভবন বা আবাসিক ভবন যেটিই হোক না কেন নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা পার্কিংয়ের জন্য রাখতে হবে। 

দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, কাগজে-কলমে দেখানো হলেও বাস্তবে বাণিজ্যিক ভবনগুলোতে পার্কিংয়ের স্থানে অনেকে দোকান করে বা ঘর করে ভাড়া দিচ্ছে। মাঝে মাঝে রাজউকের পক্ষ থেকে ম্যাজিস্ট্রেট এসে উচ্ছেদ করলেও আবারো কয়েকদিন পরে আগের অবস্থানে ফিরে যাচ্ছে। 

পার্কিং ব্যবস্থার উন্নয়নে কী করা যেতে পারে?

খুব উন্নত প্রযুক্তির ট্রাফিকিং সিস্টেম আমাদের আছে। ট্রাফিক পুলিশ এটা ব্যবহার করছে না। তারা বলছে, এটা ব্যবহার করলে ঢাকা শহরের যানজট আরও বৃদ্ধি পাবে। যানজট নিরসনে ট্রাফিক পুলিশ দিয়ে গাড়ি পার্কিং সমস্যার সমাধান করা যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন পার্কিং পুলিশ। পুলিশের নৈতিকতার জায়গা থেকে আরও সৎ হতে হবে। ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন করতে পুলিশের কাজকে মনিটর করতে নতুন একটি টিম তৈরি করতে হবে। যারা পুলিশের কাজগুলোকে মনিটর করবে। যানজট নিরসনে নতুন রাস্তাঘাট করতে হবে, যার একটি তালিকা কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা বা Strategic Transport Plan-এ (এসটিপি) দেওয়া আছে। রাস্তা দখল করে রেখেছে হকাররা। তাদের জন্যও যানজট বেড়ে যাচ্ছে। এদের রাস্তা থেকে সরাতে হবে। পার্কিং জায়গা অনেকটা তারা দখল করে রেখেছে। 

হকারদের পুনর্বাসন না করে রাস্তা থেকে উচ্ছেদ করলে আদৌ কি কোনো সুফল পাওয়া যাবে?

হকার উচ্ছেদ করা একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ। এখান থেকে লক্ষ লক্ষ হতদরিদ্র ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের জীবিকার ব্যবস্থা হচ্ছে। এদের উচ্ছেদ করতে হলে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে এই বিশাল জনগোষ্ঠী কোথায় যাবে! শুধু উচ্ছেদ না, পাশাপাশি তাদের পুনর্বাসন করলে এর সুফল পাওয়া যেতে পারে। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় এমন একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো কাজে আসেনি। গাউছিয়া, গুলিস্তান বা নিউমার্কেটের সামনে হকাররা বড় একটা জায়গা দখল করে রেখেছে। এটি না হলে এখানে আসা ক্রেতাদের ভোগান্তি কম হতো। এ ব্যাপারে একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা কাজে লাগানো প্রয়োজন। এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনা করে কাজ করা যেতে পারে। এসটিপিতে এ ব্যাপারে উল্লেখ রয়েছে। 

যানজট নিরসনে কি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানে বা এসটিপিতে? 

হ্যাঁ। এ ধরনের একটি পরিকল্পনা রয়েছে। কিছু অবকাঠামোগত ও গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন করার একটি পরিকল্পনা আছে এখানে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাঝে রয়েছে নতুন কিছু রাস্তা নির্মাণ এবং গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন বলতে আধুনিক বাস সার্ভিস পদ্ধতি এবং ঢাকার জন্য মেট্রোরেল ব্যবস্থা চালু করা। এটি মাটির নিচ দিয়ে হতে পারে আবার উপর দিয়েও হতে পারে। যানজট নিরসনে এ পদ্ধতি বেশ ভূমিকা পালন করবে। 

মেট্রোরেল মাটির নিচে করলে ভালো হতো না?

হ্যাঁ, অনেকে এটা মনে করেন। এলিভেটেড করলে প্রতি কিলোমিটারে যদি খরচ হয় ৪০ মিলিয়ন ডলার, সেখানে মাটির নিচে দিয়ে করলে খরচ হবে ১০০ মিলিয়ন ডলার। আবার মাটির নিচে করলে এটির পরিচালনা ব্যয় হবে দ্বিগুণ। এর সাথে ভয় আছে বন্যা নিয়ে। যেহেতু আমাদের দেশ বন্যাপ্রবণ, সেহেতু একটি ঝুঁকি থাকে। যদিও বন্যার পানি যাতে টানেলে না ঢোকে তার জন্য ব্যবস্থা রাখা সম্ভব। তারপরও জাপানিরা পর্যালোচনা করে বলেছে, মাটির উপরে করলে আমাদের দেশের জন্য ভালো হবে। এখানে আরো একটি পরিকল্পনার কথা বলা আছে সেটি হচ্ছে, বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট। এটির নির্মাণ খরচ কম। এই বাসগুলো অনেক লম্বা। এর দরজাগুলো অনেক বড়। অনেক লোক একসাথে বাসে উঠতে পারে এবং নামতে পারে। বাসের ফ্লোরবোর্ডগুলো অনেক নিচু থাকে। সহজে যাত্রীরা উঠতে পারে। এটি শুধু সুনির্দিষ্ট প্লাটফর্মে থামবে। রাস্তায় নিজস্ব সংরক্ষিত লেনে দ্রুত গতিতে চলতে পারে। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘণ্টায় ১০ হাজার মানুষ পরিবহন করতে সক্ষম হবে, যদি এই বাস র‌্যাপিড ট্রান্সজেকশন (বিআরটি) প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। 

এ পদ্ধতিতে বাস চলাচলের জন্য আলাদা লেন করতে হবে সেটা কিভাবে?

এটি একটি বড় সমস্যা। রাস্তা চওড়া করার জন্য আমাদের নতুন করে ভূমি অধিগ্রহণ করতে হবে। এখন বাংলাদেশের যে কোনো স্থানে জমি কেনা কঠিন। মেট্রোরেল প্রকল্প আটকে আছে জমি অধিগ্রহণ করা জটিলতার কারণে। কুড়িল এলাকার প্রায় ১০০টি বাড়ি উচ্ছেদ করতে হবে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে। নাখালপাড়ার অনেকে আন্দোলন করছে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে। এ ব্যাপারে সরকারকেই সিদ্ধান্ত দিতে হবে। 

বড় ধরনের এ জনস্বার্থের জন্য সরকার কি শক্ত ভূমিকা পালন করবে?

সেটা তাদের বিবেচনা। একজনের বহু কষ্টে ও সারা জীবনের অর্জিত সম্পদ দিয়ে নির্মিত ভবন সহজেই কি ভাঙতে দেবে? তা নিশ্চয়ই দেবে না। এ ছাড়া আমাদের প্রকল্পগুলো পরিচালনায় বড় ধরনের সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব কারণে বাড়ির প্রকৃত মালিক বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সঠিক মূল্য পাচ্ছে না। সামাজিক ন্যায়বিচারের অভাব রয়েছে এখানে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা আস্থা রাখতে পারে না আমাদের সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপর। প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়ে একজন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে যদি তার ন্যায্যমূল্য ক্ষতিপূরণ হিসাবে দিতে পারেন তাহলে খুব বেশি আপত্তি থাকার কথা নয়। এ ধরনের উদ্যোগ নিলে পুনর্বাসনের কথাটি ভালোভাবে মাথায় রাখতে হবে। আমি বলেছি, বর্তমান প্রকল্পগুলোতে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এসব ব্যক্তিকে উত্তরায় রাজউকের বিভিন্ন প্রকল্পে স্থানান্তরিত করার জন্য। এটি করা হলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে। 

এরশাদ আমলে জনস্বার্থে জমি অধিগ্রহণ করা হলে ক্ষতিগ্রস্ত কোনো নাগরিক কোর্টে মামলা করতে পারত না। কিন্তু গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সে আইন স্বভাবতই চলছে না। কোর্টে মামলা হচ্ছে। মামলা মানেই দীর্ঘসূত্রতা। এত সব কাজ করে যানজট সমস্যা সমাধানে শক্ত কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। 

বড় ধরনের এসব প্রকল্প হাতে নেওয়ার চেয়ে ছোট ছোট প্রকল্প হাতে নেওয়া বা আপনি আগে যেটা বলেছেন সঠিক ব্যবস্থাপনার কথা, সেটি কতটুকু কাজে আসবে বলে মনে করছেন?

হ্যাঁ। এসটিপিতে বলা হয়েছে এ ব্যাপারে। সেখানে ৭০টি পলিসি রয়েছে। একটি হলো পথচারী যেন স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। যানজট নিরসনে এ পদ্ধতি সবচেয়ে কম খরচে বেশি লাভ হওয়ার প্রকল্প। পথচারীর অবাধ চলাচল নিশ্চিত করার জন্য যে কাজ করা প্রয়োজন তার খরচ খুব বেশি হবে না।

এর সাথে আরো একটি বিষয় যোগ করা যায়, তা হলো বিভিন্ন বাস পাল্লা দিতে গিয়ে বা পাশ কাটিয়ে কাটিয়ে রাস্তা দখল করছে। ফুটপাত দখল করে বসানো হয়েছে তাদের টিকিট কাউন্টারগুলো। ফুটপাত এবং রাস্তা দুটিই তাদের দখলে। এসটিপিতে বলা হয়েছে, যে কোনো রুটে ‘রুট ফ্র্যানচাইজিং’-এর মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির বাস চলবে। বাসটির নির্দিষ্ট রঙ থাকবে। কোন্ বাস চলবে তা নির্ধারণ করবে বাস মালিক সমিতি। এটি হলে পাল্লা দিয়ে বাস চলাচল করা এবং ওভারটেকিংয়ের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে নগরবাসী। যানজটও কমবে। আমাদের সময়ে আমরা স্কুলে যেতাম বাসে। নির্দিষ্ট সময় পর পর বাস আসত। তখন ঢাকা মেট্রোপলিটন মোটর ভেহিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন নামে একটি সংস্থা বাস চলাচল নিয়ন্ত্রণ করত। বাসগুলো সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যাপারে দায়বদ্ধ ছিল। তা না হলে তাদের জরিমানা করা হতো। এখন সেটা নেই। বাস ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করা সহজ। এটি করা যাচ্ছে না বাস মালিকদের কেউ কেউ অনেক প্রভাবশালী বলে। 

ঢাকার যানজট ব্যবস্থাপনার জন্য বিভিন্ন সংস্থা রয়েছে যেমন রাজউক, সিটি কর্পোরেশন, মেট্রোপলিটন পুলিশ, ঢাকা ট্রান্সপোর্টেশন কো-অডিনেশন বোর্ড, সড়ক ও জনপথ বিভাগ। এ সব প্রতিষ্ঠান যানজট নিরসনে কে কী ভূমিকা পালন করবে তা উল্লেখ রয়েছে এসটিপিতে। ঢাকার যানজট নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে যে ধরনের ভূমিকা পালন করার কথা তা হচ্ছে না। সবচেয়ে বড় সমস্যা এর সাথে জড়িত বহু সংস্থা। একটি বড় প্রকল্প হাতে নিলে তার সাথে যুক্ত হতে চায় সব সংস্থা । মেট্রোরেল প্রকল্পের জন্য মূলত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ঢাকা ট্রান্সপোর্টেশন কো-অর্ডিনেশন বোর্ডকে। মূলত তারাই দেখভাল করবে। কিন্তু এটি খুব দুর্বল একটি বোর্ড। এ বোর্ডের কথা কেউ শুনতে চায় না।

যানজট সমস্যা সমাধানে এসটিপির কি কোনো দুর্বলতা আছে?

এসটিপির একটি বড় দুর্বলতা আছে। যানজট নিরসনে বাংলাদেশ রেলওয়ের ভূমিকা কী হবে এসটিপিতে তার উল্লেখ নেই। যদিও যে কোনো দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে রেল ব্যবস্থার উন্নয়ন অনেক বড় ভূমিকা পালন করে। যদি আমরা একটি সারফেস রেল ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে পারি তবে যানজট সমস্যা অনেকটাই দূর করা সম্ভব হবে। ঢাকার রেল ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে ঢাকার পার্শ¦বর্তী শহরগুলো থেকে লোকজন অফিস করতে পারবে। তাদের ঢাকায় থাকার প্রয়োজন হবে না। এ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে ঢাকার উপর থেকে চাপও কমবে। 

রেল লাইন নির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে রেলক্রসিং সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। সে ক্ষেত্রে…?

হ্যাঁ, সে ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা থাকবে। ঢাকা শহরে ২৫-৩০টি রেলক্রসিং রয়েছে। রেলপথ ও সড়কের ক্রসিংয়ের ক্ষেত্রে ওভার পাস নির্মাণ করে এ সমস্যা সমাধান করা যেতে পারে। তবে রেলকে যদি ভূতল থেকে কিছুটা উপরে করা যায় তা হলে সেটা খুব ভালো হবে। সড়কের ওভার পাস করতে হলে খরচ কম কিন্তু ঝামেলা বেশি।

যানজট নিরসনে কমলাপুর স্টেশনকে সরিয়ে নেওয়ার কথা বলেন অনেকে, আপনি কী মনে করেন?

এটি কোনো বাস্তব সমাধান না। অনেকে বলেন টঙ্গী পর্যন্ত রেলপথ আনলেই চলবে। তাহলে সারা দেশ থেকে প্রতিদিন টঙ্গীতে লক্ষ লক্ষ লোক এসে নামবে। তাদের আবার ঢাকা শহরে প্রবেশ করতে বাসে উঠতে হবে। বাসের উপর আবার চাপ বাড়বে। যানজট হবে দ্বিগুণ। রেলস্টেশনকে ঢাকার বাইরে করার পরিকল্পনা আমার কাছে অবাস্তব মনে হয়।

উন্নত দেশগুলোতে শহরের রেললাইন মাটির নিচে রয়েছে। মাটির নিচ দিয়ে শহরের কেন্দ্রস্থলে রেল পৌঁছে যাচ্ছে। সেখানে আমরা কেন শহরের বাইরে রেলস্টেশন স্থাপন করব? এ ছাড়া শহরের বাইরে রেলস্টেশন স্থাপন করা এবং এর অবকাঠামোগত উন্নয়ন অনেক ব্যয়বহুল। 

ঢাকা শহরে কি মাটির নিচ দিয়ে রেললাইন করা সম্ভব?

কেন সম্ভব নয়? অবশ্যই সম্ভব। আস্তে আস্তে করতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা এবং সদিচ্ছা নিয়ে কাজ করলে মাটির নিচ দিয়ে রেললাইন করাও সম্ভব ঢাকা শহরে। যে সমস্যা আমরা ৪০ বছরে বানিয়েছি তার সমাধান রাতারাতি হবে না। এটি সমাধানে আরো হয়তো ৩০-৪০ বছর লাগবে। তবে অসম্ভব না। 

যানজট সমস্যা যেভাবে চলছে তার সমাধান না হলে আগামী ৫-১০ বছরে কী অবস্থা হবে ঢাকা শহরের?

স্থবির হয়ে যাবে সবকিছু। গাড়ি আমদানি কমাতে হবে। গাড়ির দাম কমেছে। আমাদের আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। গাড়ি কিনলে সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। সবাই চেষ্টা করছে গাড়ি কেনার। ফলে যেটা হবে ঢাকা এলিফ্যান্ট রোড থেকে উত্তরা যেতে এখন সময় প্রয়োজন দেড় থেকে দুই ঘণ্টা, সেখানে প্রয়োজন হবে তিন থেকে চার ঘণ্টা। আর যাওয়া আসা করতেই ছয় থেকে আট ঘণ্টা সময় ব্যয় হবে। ফলে বিরূপ প্রভাব পড়বে আমাদের স্বাস্থ্যের উপর। বাড়বে মানসিক চাপ। শিশুরা সময়মতো স্কুলে যেতে পারবে কিনা, অফিসগামী মানুষ সময়মতো অফিসে যেতে পারবে কিনা তার নিশ্চয়তা আর থাকবে না। উন্নত দেশের বড় বড় শহরে বাসা থেকে পরিকল্পনা করে বের হয়ে সে মতো কাজ করে বাসায় ফিরে আসা যায়। আমাদের দেশে সে সুযোগ আর থাকবে না।

আমাদের দেশে অনেক বিদেশী বিনিয়োগকারী বিনিয়োগ করতে এসে এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলে আসতে যানজটের চিত্র দেখে তারা বিনিয়োগ না করে ফিরে যান। যে দেশে এত যানজট সে দেশে বিনিয়োগ করার প্রয়োজন নেই। কিছু কিছু বিনিয়োগকারী বিদেশীদের জন্য হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা করেছেন। কেউ কিনেছেন আবার কেউ ভাড়া করে কাজ চালাচ্ছেন। এটা কোন সমাধান হলো না। যানজট সমস্যা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশে সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। 

এখন ঢাকার বাইরেও যানজট ছড়িয়ে পড়েছে?

হ্যাঁ। আগে চট্টগ্রামে যাওয়া যেত মাত্র পাঁচ ঘণ্টায়। এখন সেখানে সময় লাগছে আট থেকে নয় ঘণ্টা। রেডিমেড গার্মেন্টস সেক্টরে অনেক ট্রাক বা কার্গো ভ্যান প্রতিনিয়ত চলছে এ রাস্তায়। যানজটের কারণে নির্দিষ্ট সময়ে এসব যানবাহন বন্দরে পৌঁছাচ্ছে না। বাড়ছে এ সেক্টরের সবচেয়ে আতঙ্কের নাম স্টকলট-এর সংখ্যা। একজন ব্যবসায়ী স্টকলট হলে ব্যবসায়িকভাবে ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হন। তার বিরূপ প্রভাব পড়ে আমাদের অর্থনীতিতে। যদি আমরা অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে চাই তাহলে এ সমস্যাকে এক নম্বর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে সকলে মিলে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। 

আমাদের সরকারের আচরণ বা প্রকৃতি কী, তা আমরা জানি। এ সমস্যা সমাধানে সরকারের ভূমিকার প্রতি আপনি কি আশাবাদী?

আমাদের দেশে পাঁচ বছর মেয়াদী সরকার। এ ধরনের পদ্ধতিতে প্রথম দুই বছরের পর রাজনৈতিক সরকারের দ্বারা কঠিন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা কষ্টকর। সরকার গঠনের প্রথম থেকেই কঠিন কাজগুলো করতে পারে। আবার জমি অধিগ্রহণ বা পুনর্বাসনের কাজগুলো করতে গেলে বিরোধী দল এটাকে ইস্যু করে আন্দোলন করে। প্রকৃতপক্ষে বাধাগ্রস্ত হয় সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকান্ড। আমাদের দেশের সরকার এ ঝুঁকি নেবে না। সরকারের উচিত তার দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে কাজ করে যাওয়া। বিরোধী দলের সমালোচনা বা আন্দোলনের ভয়ে বসে থাকলে চলবে না। তাদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে পারলেই সম্ভব। অসম্ভব কিছুই না। সরকারের কাছে জমি অধিগ্রহণ করা এবং হকার বা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা কঠিন কাজ। তারা দৃঢ়ভাবে উদ্যোগ নিলে সফল হবে। হকারদের উচ্ছেদের পাশাপাশি পুনর্বাসন করার উদ্যোগ নিতে হবে। জমি অধিগ্রহণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির মালিকদের অন্যত্র পুনর্বাসনের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সেটা করতে পারলে এ ধরনের উদ্যোগ সফল হবে।

এ কাজের জন্য আপনার সুনির্দিষ্ট কোনো সুপারিশ আছে কি?

আমাদের দেশে পিডবিøউবিকে একটি ভবনের মূল্যায়ন করতে বলা হয়। কিন্তু পিডবিøউবি যে মূল্যায়ন করবে তা দিয়ে ঐ রকম আর একটি ভবন নির্মাণ করা যাবে না। এজন্য সম্পূর্ণ স্বাধীন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। যারা সঠিক মূল্যায়ন করবে। যেমন বাড়ি ভাঙা হবে তেমনি বাড়ি করতে বর্তমানে কত খরচ হবে তার মূল্যায়ন করবে। সরকারের মাধ্যমে হলে এ কাজ সঠিকভাবে মূল্যায়ন হবে না। অনেক প্রকল্পে এ ধরনের কাজ করানো হয়।

আমাদের আরও একটি জটিলতা রয়েছে তা নিরূপণ করতে হবে। আমাদের দেশে যেটা হয় সরকার ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির মাঝে একটি দালাল থাকে। ক্ষতিপূরণের বেশির ভাগ টাকা এই দালালরা ভাগ করে নেয়। এই দালালদের মাধ্যমে না গিয়ে সরকারকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির সাথে সুনির্দিষ্ট সময়ে ক্ষতিপূরণ পৌঁছানোর নিশ্চয়তা দিতে হবে। এ নিশ্চয়তা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের দিতে পারলে বা তাদের মাঝে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলে সরকার তার অভীষ্ট লক্ষ্যে সহজে পৌঁছতে পারবে। তারও আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছার। আর এ সমস্যার সমাধান দিতে পারে রাজনীতিবিদরা।

ঢাকা শহরে যে তিনটি ফ্লাইওভারের কাজ চলছে, নির্মাণ শেষ হলে যানজট সমস্যার কি কোনো সমাধান হবে ?

যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান প্রকল্পে প্রথমে যে পরিকল্পনাটি ছিল তা বাস্তবায়িত হলে যানজট সমস্যা আরো প্রকট হতো। পূর্বের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প শেষ হলে কিছুটা তো সমাধান হবে। উত্তরা থেকে মতিঝিল কিছু ভালো বাস এখন চলতে পারবে। এর ফলে অনেকে প্রাইভেট কার ব্যবহার না করে বাসে চলাচল করবে। কিছুটা সমাধান হবে। 

মেট্রোরেলের প্রস্তাবিত যে রুটটি রয়েছে তা বাস্তবায়িত হলে সংসদ ভবনের মূল নকশা ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। আপনি কী মনে করছেন?

রোকেয়া সরণি দিয়ে চন্দ্রিমা উদ্যানের পাশে এসে পূর্বদিকে ঘুরে গিয়ে তেজগাঁও বর্তমান যে বিমানবন্দর আছে সেটার ঠিক দক্ষিণ দিয়ে বিজয় সরণির উপর দিয়ে বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার হয়ে আবার টার্ন নিয়ে এয়ারপোর্ট রোড দিয়ে সরাসরি শাহবাগ হয়ে বাংলা একাডেমীর সামনে দিয়ে চলে আসবে। এটি হচ্ছে মেট্রোরেলের মূল পরিকল্পনার রুট। এ রুটটাকে পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে মূলত বিমানবাহিনীর চাপে। বিমানবাহিনী যে আপত্তি তুলে এই রুটটি পরিবর্তন করেছে তা অযৌক্তিক। নগর পরিকল্পনার সাথে জড়িত অনেক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, শহরের মাঝে এমন একটি বিমানবন্দর বা ঘাঁটি থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। যদি রাখতেই হয় তবে তা ছোট করা যেতে পারে। মেট্রোরেলের যে উচ্চতা তার চেয়ে বেশি উচ্চতায় রয়েছে নভোথিয়েটারের গম্বুজ। আর এই উচ্চতায় বিমান বা হেলিকপ্টার উড্ডয়ন বা অবতরণে কোনো সমস্যা সৃষ্টি করবে না। তাহলে বোঝা যায়, এটা একটি অযৌক্তিক বক্তব্য। যদি রানওয়ের দৈর্ঘ্য কিছু কমানো যায় তাতে মেট্রোরেল প্রকল্প বিমান উড্ডয়ন ও নামানোতে কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না। আমি মনে করি, মেট্রোরেল রুট বিজয় সরণি দিয়ে যাওয়াই বাঞ্ছনীয়। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন আমাদের সংসদ ভবন। এর সৌন্দর্যে ব্যাঘাত ঘটানো ঠিক হবে না। পরিবেশবাদী, বাংলাদেশের স্থপতি এবং জাপানি স্থপতিরাও এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সংসদ ভবনের পূর্বদিক থেকে ৫০ মিটার নেওয়া যেতে পারে মেট্রোরেলের রুট করার জন্য, এ রকম একটি সিদ্ধান্ত সরকার ইতোমধ্যে জাপানি সরকারকে জানিয়েছে।

স্যার, এই এলাকাটিও তো লুই কানের মূল নকশার অংশ?

আমি বলেছি মেট্রোরেলের রুট করতে সরকার যদি অনুমোদন দেয়। আর আমি যতদূর জানি, সংসদ ভবন এলাকার পার্লামেন্ট যদি রাজি হয় তাহলে প্রকৌশলগত সমস্যা সমাধান করা যাবে। উল্লেখ্য, লুই কানের মাস্টার প্ল্যানের অনেক পরিবর্তন করা হয়েছে অনেক আগে থেকেই। স্পীকার বা ডেপুটি স্পীকারের বাসভবন করা হয়েছে, জিয়া উদ্যান করা হয়েছে। যেটা মূল নকশায় ছিল না। এ নিয়ে মামলা হয়েছে। হাইকোর্ট রায় দিয়েছে এটা অবৈধ।

এই রুটটাকে আপনি কোন্ দিক দিয়ে যাওয়ার কথা বলবেন?

আমার কাছে যদি সিদ্ধান্ত চাওয়া হয় আমি বলব, বিজয় সরণি দিয়ে গেলে ভালো হবে। 

প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ সম্পর্কে আপনার মতামত জানাবেন, এটা কতটা যুক্তিযুক্ত?

ঢাকা শহরের যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ গত চল্লিশ বছরে সারা দেশ থেকে মানুষ এখানে এসে জমা হয়েছে। পৃথিবীর মধ্যে এ শহরের জনসংখ্যাই সবচেয়ে দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ চাপ কমানোর সমাধান হচ্ছে বিকেন্দ্রীকরণ। চুম্বকের মতো সবাইকে আকর্ষণ করে নিয়ে আসছে ঢাকা শহর। এখানে কয়েক হাজার গার্মেন্টস কারখানা রয়েছে। এগুলোকে এখানে থাকার আদৌ কোনো প্রয়োজন নেই। গার্মেন্টসগুলোকে ঢাকার বাইরে দ্রুত স্থানান্তর করা যেতে পারে। এর ফলে এ সেক্টরে কর্মরত লক্ষ লক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকের জীবনমানের উন্নয়ন হবে। কারণ ঢাকা শহরে এসব শ্রমিক স্বল্প পরিসরে অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেককে বসবাস করতে হচ্ছে বস্তিতে। শহরের মাঝে অনেক শিল্প স্থাপনা রয়েছে সেগুলোকেও সরাতে হবে।

শুধু শিল্পায়নে বিকেন্দ্রীকরণ করলে চলবে না, প্রশাসনিক কাঠামোতেও বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। বেশির ভাগ স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা যেমন শিপিং কর্পোরেশন বা পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় মন্ত্রণালয় থেকে। এই কাঠামো পরিবর্তন করতে হবে। সব ক্ষমতা মন্ত্রণালয়ের হাতে কুক্ষিগত। নিয়োগ করা থেকে বদলি দেওয়া পর্যন্ত সব কাজ করা হচ্ছে মন্ত্রণালয় থেকে। সব কাজ ঢাকা কেন্দ্রিক। স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে হবে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। তাহলে কিছুটা সমাধান আশা করা যাবে। 

স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা বৃদ্ধি করলে এ সমস্যার সমাধান হবে?

আসলে আমাদের দেশে সবকিছুই মন্ত্রণালয়নির্ভর হয়ে গেছে। অনেক স্থানে টেকনিক্যাল বিষয়ে না জানার কারণে কাজ না করে ফেলে রাখে। এ সমস্যার সমাধান হতে হবে। আমাদের প্রচলিত পদ্ধতি ব্রিটিশদের কাছ থেকে পাওয়া। তারা এটা বদলে ফেলেছেন। আমরা আঁকড়ে ধরে আছি। ভারতে তাদের রেলওয়ের উন্নয়নে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন। পৃথিবীর মধ্যে তাদের রেলব্যবস্থা অনেক বিস্তৃত এবং বিশ্বে যে কয়েকটি স্বল্প সংখ্যক রেলওয়ে মুনাফা অর্জন করে তার মধ্যে ইন্ডিয়ান রেলওয়ে অন্যতম। স্বাধীনভাবে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। রেলওয়ে বোর্ডের চেয়ারম্যান যিনি সাধারণত একজন রেলওয়ে প্রকৌশলী তিনি পদাধিকার বলে মন্ত্রণালয়ের মুখ্য সচিব। স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে ঢাকায় কাজ করতে আসা মানুষের চাপ কমবে। অনেক প্রতিষ্ঠান আপনা-আপনি ঢাকার বাইরে চলে যাবে।

যানজট সমস্যা সমাধানে নদী পথের ভূমিকা সম্পর্কে বলবেন?

আমরা সৌভাগ্যবান। ঢাকার চারপাশে নদী রয়েছে। এই নদী পথকে যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য ব্যবহার করতে হবে। ঢাকার চারপাশে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ছড়িয়ে দিতে হবে। সহজেই যেন মালামাল পরিবহন করা যায় নদী পথ দিয়ে। নদী দখলমুক্ত করতে হবে। মিরপুরের লোক সদরঘাটে নদী পথে যেতে পারবে। সে নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে।

অন্যান্য অনেক সড়ক প্রকল্প হাতে নেওয়ার চেয়ে এই প্রকল্প অনেক বেশি কাজে আসবে। নদীপথে মালামাল পরিবহনে খরচ সবচেয়ে কম। ট্রেনে পরিবহন করলে খরচ আসে এর তিন গুণ এবং ট্রাকে আরো বেশি খরচ পড়বে।

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ 

তোমাকেও।

প্রকাশকাল: বন্ধন ২৩ তম সংখ্যা, মার্চ ২০১২

+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top