কেরোসিন কাঠের হালচাল

আদিকাল থেকেই জনপ্রিয় কাঠের তৈরি আসবাব। বাজারে রকমারি বিকল্প বের হলেও কাঠের চাহিদা কমেনি একটুও। কাঠের আসবাব ঘর সাজানোর পাশাপাশি প্রকাশ করে শৈল্পিকতা ও আভিজাত্য। আসবাবের পাশাপাশি ভাস্কর্য, ইন্টেরিয়র ডিজাইন, গৃহনির্মাণ, তৈজসপত্র, ব্যবহৃত অনুষঙ্গ প্রভৃতি কাজে রয়েছে কাঠের বহুল ব্যবহার। কিন্তু সেগুন, মেহগনি, গর্জন প্রভৃতি উন্নতমানের কাঠের দাম অনেকটাই আকাশচুম্বী; কম আয়ের মানুষদের নাগালের বাইরে। এই প্রেক্ষাপটে দারুণ উপযোগী কেরোসিন কাঠ। অন্যান্য কাঠের তুলনায় কম দামে টেকসই এই কাঠের আদ্যোপান্ত জানাচ্ছেন মোহাম্মদ রবিউল্লাহ।

কেরোসিন কাঠের বৈশিষ্ট্য

বাজারে প্রাপ্ত অন্যান্য কাঠের মতোই কেরোসিন কাঠের ব্যবহার উপযোগিতা। এই কাঠে কয়েক স্তরে লেয়ার থাকে। লেয়ারের উপরিভাগে থাকে ফাইবার। ফাইবার যত মসৃণ হয়, কাঠের গুণাগুণ তত ভালো মানের হয়। আবার গাছের বয়সের ওপরও কাঠের গুণাগুণ নির্ভর করে। বয়স বেশি হলে ফাইবার তত মসৃণ হয়। ঘষার মাধ্যমে সুন্দরভাবে প্রাকৃতিক নকশা বের করা যায়। এ ছাড়া এর কিছু ভিন্ন বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে- 

প্রসেসিং ও সিজনিং করা থাকে

কখনো ঘুণ পোকা ধরে না

পোকামাকড় সহজে আক্রমণ করতে পারে না

বাঁকা হয় না 

যেকোনো কালার, বার্নিশ, ডোকো পেইন্ট করা যায়

ইনটেরিয়ের যেকোনো কাজ করা যায়

ইচ্ছেমতো রং বা ডিজাইন করা যায় 

নিজস্ব ফাইবারসমৃদ্ধ

টেকসই

আসবাব 

চেয়ার, টেবিল, খাট, সোফা সেটসহ অন্য ভারী আসবাবও কেরোসিন কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়। সে ক্ষেত্রে বেশি লেয়ারযুক্ত কেরোসিন কাঠ ব্যবহার করা হয়। তবে অধিক লেয়ার থাকায় অন্যান্য কাঠের তুলনায় এই কাঠ তুলনামূলকভাবে কিছুটা ভারী। তিন, দুই ও এক আসনের তিনটি লো-হাইটের, সহজ করে বললে চার ইঞ্চি কাঠের ফ্রেম বানিয়ে এতে ফোম ও কুশন দিয়ে সহজেই সোফা বানানো যায়। পাশে একটা ম্যাট্রেস দিয়ে বাড়তি বসার ব্যবস্থা আর অতিথির থাকার ব্যবস্থা দুটোই একসঙ্গে হতে পারে এই কেরোসিন কাঠ দিয়ে।

ইন্টেরিয়রে কেরোসিন কাঠ

মধ্যবিত্তদের জীবনে ঘরের ইন্টেরিয়র পরিবর্তন মানেই বাড়তি খরচের চাপ। কম খরচে ঘর বা অফিসকে রুচিশীল চেহারা দিতে চাইলে কেরোসিন কাঠের কোনো বিকল্প নেই। কেরোসিন কাঠের ওপর লেজার দিয়ে নকশা করলে আরও সুন্দরভাবে তা ফুটে ওঠে। এই কাঠের স্থায়িত্বও নেহাত কম নয়। ফলে ইন্টেরিয়র ডিজাইনে কেরোসিন কাঠের হরহামেশাই ব্যবহার দেখা যায়। 

শৈল্পিক অনুষঙ্গ 

সাধারণত শোরুমের ডেকোরেশন ও শেলফ, বুক শেলফ, শু-র‌্যাক, অ্যাকুরিয়াম, ক্রেস্ট ও উপহারসামগ্রী, কলমদানি, গিফট আইটেম, ছবির ফ্রেম, শোপিস তৈরিসহ নানা শৈল্পিক অনুষঙ্গ তৈরিতে এই কাঠ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

আমদানি-কথন

মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কানাডা, চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে এই কাঠ আসে আমাদের দেশে। মূলত পাইনগাছ থেকেই কেরোসিন কাঠ হয়ে থাকে। যেসব দেশে পাইনগাছ বেশি জন্মে, সেসব দেশ এই কাঠের তৈরি মালামাল রপ্তানি করে থাকে। বিদেশ থেকে যেসব মালামাল আসে, সেগুলোকে পেটি বলা হয়। পেটি মূলত বিভিন্ন মেশিনারিজ ও খাদ্যসামগ্রীর বক্স। একে অব্যবহৃত কাঠ বা গর্দাও বলা হয়। ফেলনা বা পুরোনো এই পেটি ভেঙে আবার নতুন রূপ দেওয়া যায়।

দরদাম ও গুণাগুণ

পেটি ভাঙা পুরোনো কাঠ ছাড়াও বেলফোর ও গরম্যান এই দুই ধরনের কেরোসিন কাঠ পাওয়া যায় বাজারে। এর মধ্যে বেলফোর মধ্যম মানের আর সবচেয়ে ভালো মানের হচ্ছে গরম্যান। এই দুই প্রকারের কেরোসিন কাঠের দরদাম নির্ভর করে গাছের বয়স অনুযায়ী। পাইনগাছের বয়স যত বেশি হবে এই কাঠের দামও তত বেশি হবে। কারণ গাছের বয়স বেশি হলে প্রাকৃতিকভাবেই কাঠের ভেতরে নকশা তৈরি হয়।

প্রতি কেভি/সিএফটির বেলফোর কেরোসিন কাঠ বিক্রি হয়ে থাকে ১৬০০-১৮০০ টাকায়। এর পুরুত্ব ১-১.৫ ইঞ্চি হয়ে থাকে। এই কাঠ দিয়ে মাঝারি আকারের আসবাব তৈরি করা হয়। অ্যাকুরিয়াম, বুক শেলফ, ডেস্কটপ টেবিল, দোকানের শেলফ তৈরিতে বেলফোর কেরোসিন কাঠ ব্যবহৃত হয়।

অন্যদিকে গরম্যান কেরোসিন কাঠ প্রতি কেভি/সিএফটি বিক্রি হয়ে থাকে ২২০০-২৫০০ টাকায়। এর পুরুত্ব ৩-৫ ইঞ্চি হয়ে থাকে। গরমেন্ট কেরোসিন কাঠ দিয়ে সাধারণত ভারী আসবাব তৈরি করা হয়। শোরুমের ডেকোরেশনে, দরজা-জানালার ফ্রেম ও পাল্লায় এই কাঠ ব্যবহৃত হয়। 

এ ছাড়া প্রতি কেভি/সিএফটি পেটি ভাঙা কেরোসিন কাঠ সাধারণত ৫০০-৮০০ টাকায় বিক্রি হয়। এর পুরুত্ব ০.৫-১ ইঞ্চি। কেভি বা সিএফটি ছাড়া কেজি মাপেও এই পুরোনো কাঠ ৩৫-৬০ টাকা ধরে বিক্রি হয়। ক্রেস্ট, উপহারসামগ্রী, কলমদানি, গিফট আইটেম ও শোপিস তৈরিতে পুরোনো বা ফেলনা কেরোসিন কাঠ ব্যবহৃত হয়। শৌখিন লোকেরা পুরোনো এই কেরোসিন কাঠের মাধ্যমে তাঁদের শখ পূরণ করে থাকেন। এই কাঠের মাধ্যমে সহজেই মনের মতো আসবাব ও শৌখিন জিনিসপত্র তৈরি করা যায়। আজকাল বাণিজ্যিকভাবেও এসব পুরোনো কাঠ দিয়ে গিফটসামগ্রী ব্যাপকভাবে উৎপাদন করা হচ্ছে।

কোথায় পাবেন

রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন কাঁটাবনে, মোহাম্মদপুরের টাউন হল, উত্তরা, যাত্রাবাড়ীসহ প্রায় সবখানেই কাঠ বিক্রির দোকানগুলোতে পাবেন এই কাঠ। তবে পুরান ঢাকার বংশাল, কাওরান বাজার, বাড্ডা, মাজার রোডে রয়েছে নতুন-পুরোনো কাঠের বড় বাজার। এসব স্থান থেকে কেভি বা কেজি হিসেবে নিজের মতো করে কেরোসিন কাঠ নিয়ে শৌখিন পণ্য তৈরি করতে পারেন। পুরোনো ছাড়াও প্রসেসিং ও সিজনিং করা অব্যবহৃত কেরোসিন কাঠও আমদানি করা হয় বিদেশ থেকে। দেশের মধ্যে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে কম পরিসরে এই কাঠ প্রসেসিং ও সিজনিং করা হয়। তবে অধিকাংশই আসে বিদেশ থেকে।

 ংঃধৎৎধনরঁষ@সধরষ.পড়স

প্রকাশকাল: বন্ধন ১৪৯ তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২৩

+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top