স্থাপত্যের মহিমায় স্মৃতিধন্য নান্দনিক মাজার

নান্দনিক মাজার হলো বদর আউলিয়ার মাজার। শুরুটা রূপকথার গল্পের মতো। নাহ্, রূপকথার এ গল্প রাক্ষসের গল্পের চেয়েও রোমহর্ষক। জিন-পরিদের গাঁয়ে এলেন এক দরবেশ বাবা। হাতে তসবি। শরীরে সাদা আলখেল্লা। হাতে কাঠের লাঠি। যাতে ভর করে সুবাতাস বইতে শুরু করল পুরো এলাকায়। সুবাতাসে ছুটে এল জিন-পরিরা বাবাকে আক্রমণ করতে। কিন্তু পরাস্থ হলো যখন দেখল ফকির বাবার উজ্জ্বল মহিমান্বিত চেহারা। ফকির বাবা বললেন, আমাকে এক চাটি জ্বালানোর জায়গা দে। আমি তোদের কিছুই করব না। সঙ্গে সঙ্গে রাজি হলো জিনের সরদার। ভুলটা তিনি এখানেই করলেন। ফকির বাবা ঝোলা থেকে বের করলেন বিশাল এক চেরাগ। সেই চেরাগ বা চাটিতে আগুনের স্পর্শ আনতেই সুনসান হয়ে গেল চারদিক। পালিয়ে গেল পুরো জিনের দল। পুরো এলাকা আলোকিত হয়ে দূর হলো অজ্ঞানতার অন্ধকার। এলাকার নাম হলো চাটিগাঁও। সেই চাটিগাঁও থেকে চাটগাঁ। চাটগাঁ থেকে চট্টগ্রাম। আর সেই সৌম্যদর্শন দরবেশ বাবার নাম বদর আউলিয়া (রা.)।

চট্টগ্রামে ইসলাম প্রচারের শুরুতে ১২ জন আউলিয়া মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। সে জন্য চট্টগ্রামকে বলা হয় বারো আউলিয়ার দেশ। আর হজরত বদর শাহ্কে বলা হয় বার আউলিয়ার সরদার। এ সময় বাংলার শাসক ছিলেন সুলতান ফখরুদ্দীন মোবারক শাহ্ (১৩৩৮-৪৯ খ্রি.)। সুফি দরবেশের প্রতি তিনি অন্যান্য সুলতান বাদশাহের মতোই ছিলেন দারুণ শ্রদ্ধাশীল। বারোজন দরবেশের মধ্যে বদর আউলিয়াকেই প্রধান হিসেবে সম্মান দেখানো হয়। বদর আউলিয়া চট্টগ্রামে আসেন ইসলাম প্রচারে। ঐতিহ্য অনুসারে, চট্টগ্রামের মানব বসতির সঙ্গে বদর আউলিয়ার নাম জড়িত। চট্টগ্রামের অধিবাসীরা তাঁকে তাঁদের অভিভাবক হিসেবে জানায় গভীর শ্রদ্ধা।

বদর আউলিয়ার আগমন

চট্টগ্রাম মুসলমানদের রাজ্যভুক্ত হওয়ার আগে অর্থাৎ ফখরুদ্দীন মোবারক শাহ চট্টগ্রাম জয় করার আগেই ইসলাম প্রচারের জন্য সুদূর আরব থেকে হজরত বদর শাহ (রহ.) এখানে আসেন। কথিত আছে, পাথরের বুকে চেপে সাগর পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রামে পৌঁছান তিনি। চট্টগ্রামের জনমানবহীন পরিবেশে দৈত্য-দানবের কাছ থেকে তিনি এবাদত করার জন্য এক চাটি পরিমাণ জায়গা চেয়ে নেন। চাটির আলো ও আজানের ধ্বনির বিস্তারে দৈত্য-দানবেরা পালিয়ে যায়। এ ঐতিহ্যবাহী চাটি থেকে চট্টগ্রামের নামকরণ বলে ব্যাপক জনশ্র“তি আছে। আউলিয়া বদর শাহই প্রথম চট্টগ্রামে চেরাগ জ্বেলে গোড়াপত্তন করেন এ শহরের। আর এই ঐতিহাসিক স্মৃতি বহন করছে মোমিন রোডস্থ ‘চেরাগী পাহাড়’। বদরশাহ মানুষের গানের মধ্য দিয়েও বেঁচে আছেন, তার প্রমাণ মাঝিদের বিখ্যাত উদ্দীপনামূলক গান- ‘বদর বদর বদর বদর হেঁইয়ো…দর বদর বদর বদর হেঁইয়ো’। চট্টগ্রামে পির বদরের আস্তানা প্রায় সাড়ে ছয় শ বছরের স্মৃতিবাহী। পির বদরের সমাধি ভবনটি সুলতানি আমলে নির্মিত। বৌদ্ধ, হিন্দু ও চৈনিকেরা বদর আউলিয়াকে পরমেশ্বর অথবা আত্মার অধস্তন হিসেবে ভক্তি করত। অন্যদিকে মুসলিমেরা তাঁকে আউলিয়া বা দরবেশ হিসেবে শ্রদ্ধা জানায়। পূর্ব বাংলার মাঝিরা অন্য পাঁচচজন দরবেশের (যারা পাঁচ পির নামে পরিচিত) সঙ্গে বদর আউলিয়ার নাম উচ্চারণ করে শ্রদ্ধাভরে। সমুদ্র উপকূল ধরে দক্ষিণে সুদূর মালয় উপদ্বীপ ছাড়িয়েও সমুদ্রগামীদের কাছে তিনি নিত্যদিনের রক্ষক হিসেবে খ্যাত। আরাকানের মধ্যযুগীয় বৌদ্ধ রাজাগণ তার সমাধির জন্য কয়েকটি গ্রাম ওয়াকফ করেন এবং তাঁরা তীর্থযাত্রী হিসেবে এ পবিত্র নান্দনিক মাজারে এসে দান করতেন। মিয়ানমারের টেনাসেরিমের জনগণ তাঁকে মাদরা বলে ডাকত। আকিয়াবের অধিবাসীদের কাছে তিনি বুদ্ধ আউলিয়া বা বুদ্ধ সাহেব হিসেবে পরিচিত।  তিনি বদর আলম, বদর পির, বদর আউলিয়া, বদর শাহ্ ও পির বদরুদ্দীন নামে পরিচিত। বদর আরবি শব্দ, এর অর্থ পূর্ণচন্দ্র। তাঁর আগমনের সঠিক সন-তারিখ জানা না গেলেও ধারণা করা হয়, চতুর্দশ শতকের শুরুতে তিনি আকিয়াব, কুতুবদিয়া ও কক্সবাজার হয়ে সমুদ্র উপকূলবর্তী চট্টগ্রাম অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম প্রচারে আসেন। বার্মার আকিয়াবে (বর্তমান মিয়ানমার) বেশ কিছুদিন ছিলেন। সেখানে রয়েছে তাঁর আস্তানা শরিফ ও মসজিদ। আকিয়াব থেকে আসেন টেকনাফের নিকটবর্তী শাহ্পরির দ্বীপে। এখানে কিছুদিন অবস্থান করেন। এখানে আস্তানা শরিফ ও মসজিদ ছিল, যা উনিশ শতকের প্রথম দশকে নদীগর্ভে বিলীন হয়। তাঁর স্মৃতি বিজড়িত স্থানটি ‘বদর মোকাম’ নামে পরিচিত।

হজরত বদর শাহ কক্সবাজারে অবস্থানকালে ইসলাম প্রচারে রত ছিলেন। স্থাপন করেন খানকাহ্ শরিফ ও মসজিদ। বর্তমান কক্সবাজারে (সদর থানায়) হজরত বদর শাহের স্মৃতি বিজড়িত মসজিদ ও খানকাহ্ স্থানটি ‘বদর মোকাম’ নামে পরিচিত। সেখান থেকে কিছু দূরের লোকালয়ে আসেন তিনি। সাগরপারে অবস্থিত এ স্থানটিতে ছিল তাঁর খানকাহ্ শরিফ, যা ‘বদরখালী’ নামে তাঁর স্মৃতি বহন করছে। হজরত বদর শাহের (রহ.) সঙ্গে কতিপয় সঙ্গী ছিলেন, যাঁরা বারো আউলিয়া নামে সুপরিচিত। সঙ্গীদের নিয়ে তিনি কুতুবদিয়া দ্বীপে আসেন। দ্বীপাঞ্চলটি তখনো সমুদ্রবক্ষে জেগে ওঠেনি। আউলিয়ারা এখানে এসে নামাজ আদায় করেন। জনশ্র“তি আছে, হজরত বদর শাহের সঙ্গীদের একজন ছিলেন শাহ্ কুতুবদিয়া আউলিয়া। তিনি এখানেই থেকে যান। এর পরেই বঙ্গোপসাগরের দ্বীপ জেগে ওঠে। স্থাপিত হয় জনবসতি। হজরত কুতুব উদ্দিনের নামানুসারে কুতুবদিয়ার নামকরণ করা হয়। হজরত বদর শাহ্ (রহ.) কুতুবদিয়া থেকে চলে যান পূর্বদিকে বাঁশখালীতে। সেখানকার সাগরপারে আস্তানা স্থাপন ও মসজিদ নির্মাণ করেন, যার নামও ‘বদর মোকাম’। সেখান থেকে সরাসরি চলে আসেন সমুদ্র তীরবর্তী প্রাচীন পর্তুগিজ বন্দরসমৃদ্ধ দেয়াং রাজ্যে। এখানে রয়েছে বদর পিরের আস্তানা ও বারো আউলিয়া নামক তীর্থস্থান, অতঃপর নদীপথে আসেন চট্টগ্রামে। বঙ্গোপসাগরের মোহনা হয়ে কর্ণফুলী নদীর পাথরঘাটায় অবতরণ করেন। কথিত আছে, হজরত বদর শাহ্ (রহ.) একখানি কুদরতি কিস্তি পাথরে চড়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রাম আসেন। সেই পাথর আজও পবিত্রতার সঙ্গে তাঁর নান্দনিক মাজার প্রাঙ্গণে সংরক্ষিত রয়েছে। প্রায় সাত ফুট দীর্ঘ ও দুই ফুট প্রশস্ত পাথরের সঙ্গে কয়েকটি বৃহৎ আকৃতির শ্বেত বর্ণের সামুদ্রিক শামুকও সংরক্ষিত রয়েছে। যেগুলো হজরতের সমুদ্রে যাত্রায় সফর সঙ্গী ছিল বলে জনশ্র“তি রয়েছে। হজরত বদর শাহ্ কর্ণফুলী নদীর যে স্থানে পাথরসদৃশ কিস্তি থেকে অবতরণ করেন, সে স্থান পাথরঘাটা নামে নামকরণ করা হয়। নদীসংলগ্ন একটি অনুচ্চ টিলায় আরোহণ করে তিনি খানকাহ্ বা আস্তানা স্থাপন করেন। এখানে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস ও চট্টগ্রামে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। প্রতিষ্ঠা করেন মসজিদ ও খনন করা হয় পুকুর, যা বদর মসজিদ ও বদর পুকুর নামে পরিচিত। সাগর ও নদী তীরবর্তী মানুষেরা ছিল মগ জলদস্যু কর্তৃক নির্যাতিত। আরাকানিদের অত্যাচার-নিপীড়নে স্থানীয় জনগণের মধ্যে বিরাজ করছিল অসন্তোষ। বর্ণবৈষম্য ও জাতিগত বিদ্বেষ সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলাকে বিনষ্ট করছিল। এমনই পরিস্থিতিতে হজরত পির বদর শাহের (রহ.) নেতৃত্বে আউলিয়াদের আহ্বানে দলে দলে বর্ণবৈষম্য জর্জরিত মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিতে থাকে। মুসলমানদের সংখ্যা বাড়ছিল দিন দিন। সুফি-সাধকদের প্রচার-প্রচারণায় ইসলাম ধর্ম চট্টগ্রামের আনাচকানাচে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন দেশ থেকে আসতে থাকেন ধর্ম প্রচারকগণ। সুফিদের চট্টগ্রামে ইসলাম প্রচারে বাধা ছিল আরাকানি শাসক ও সৈন্যরা। বাংলার সুলতান ফখরুদ্দীন স্বয়ং ফেনীর অদূরে শশৃদি নামক স্থানে সেনা সমাবেশ করেন। কদল খান গাজীর নেতৃত্বে সৈন্যরা ফেনী নদী অতিক্রম করে চট্টগ্রামে প্রবেশ করে চট্টগ্রাম বিজয় সম্পন্ন করে। জনশ্র“তি আছে, হজরত বদর শাহ্ (রহ.) ও অন্যান্য সুফি-দরবেশ মুসলমান সেনাদের সঙ্গে চট্টগ্রাম বিজয় অভিযানে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম বিজয় সম্পন্ন হলে হজরত বদর শাহ্ শহরের মাঝখানে একটি সুউচ্চ টিলায় আরোহণ করে একটি চেরাগ বা চাটিতে আগুন জ্বালিয়ে চট্টগ্রামে ইসলামের বিজয় ঘোষণা করেন। সে সময় থেকে পাহাড়টি ‘চেরাগী পাহাড়’ নামে পরিচিতি পেয়ে আসছে। চট্টগ্রামের জনসাধারণ মাটির তৈরি প্রদীপকে চেরাগ বা চাটি বলে থাকে। হজরত বদর শাহ্ কর্তৃক চেরাগ বা চাটি জ্বালানোর স্মারকরূপে ‘চেরাগী পাহাড়’ বিগত প্রায় ৬৭০ বছর ধরে মুসলমানদের চট্টগ্রাম বিজয়ের স্মৃতিকে ধারণ করে আছে। তবে পাহাড়টি আদি রূপ আর নেই। নগরায়ণের পরিপ্রেক্ষিতে সড়ক নির্মাণের প্রয়োজনে পাহাড়টির চারদিকে মাটি কেটে ক্ষুদ্রাকৃতি করা হয়, তবুও চেরাগের আদলে কাটা মাটিতে পাহাড়টির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যেতো। ১৬ মার্চ ১৯৯৩ সালে মাটির পাহাড়টিকে আরও কেটে-ছেঁটে মাটির ঢিবির চতুর্দিকে ইটের দেয়াল তুলে তৈরি হয়েছে একটি স্মারকসৌধ।

ব্যাপক জনশ্র“তি রয়েছে যে হজরত বদর শাহের আগমনের আগে চট্টগ্রামে জিন, পরি ও দৈত্য-দানবদের আধিপত্য ছিল। কোনো কোনো ঐতিহাসিক ও গবেষকদের মতে, জিন-পরিদের বিতাড়ন বলতে আরাকানি মগ, জলদস্যু ও লুটেরা-হার্মাদদের বোঝানো হয়েছে। শত শত বছর এই হার্মাদ-জলদস্যুরা চট্টগ্রামে তাদের ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। পির বদর তাঁদের কাছে নামাজ আদায় করার জায়গা চেয়ে নেন। তিনি পাহাড়ে উঠে নামাজ আদায় করে পকেট থেকে দুটো পাথর বের করে একটির সঙ্গে অন্যটি ঘষে চেরাগ বা চাটিতে আগুন জ্বালিয়ে দেন। কুদরতি চেরাগের আলোয় জিন-পরিরা চট্টগ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায়। চেরাগ থেকে চেরাগী পাহাড় এবং চাটি থেকে চাটিগ্রামে বা চাটিগাঁ নামকরণ হয় বলে ঐতিহাসিকেরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। আউলিয়া বা ওলিদের চাটির মাহাত্ম্যে চাটিগাঁও বা চাটিগ্রাম নামের উৎপত্তির কথা সর্বপ্রথম লিখিতভাবে পাওয়া যায় ঐতিহাসিক হামিদুল্লাহ খানের রচনায়। তবে হজরত বদর শাহ্ (রহ.) কর্তৃক চাটি বা চেরাগ জ্বালানোর স্থান চেরাগী পাহাড় এবং চাটি থেকে চাটিগাঁ বা চাটিগ্রাম ও পরবর্তী সময়ে সংস্কৃত প্রভাবিত ‘চট্টগ্রাম’ সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় মত। এখানকার অধিবাসীরা চাটগাঁইয়া বা চাটিগাঁইয়্যা নামে অভিহিত।

বদর আউলিয়ার নান্দনিক মাজার

বদর আউলিয়ার দরগাহ চট্টগ্রাম শহরের সবচেয়ে প্রাচীন স্থাপনাগুলোর অন্যতম। চট্টগ্রামের পুরোনো দুর্গ এলাকা অন্দরকিল্লার অন্তর্গত বর্তমানের বখশিরহাটের নিকটবর্তী বদরপট্টি বা বদরপট্টি নামে পরিচিত স্থানে বদর আউলিয়ার নান্দনিক মাজার অবস্থিত। বদর পিরের নামানুসারে স্থাপনাটির নামকরণ করা হয়। প্রাচীর বেষ্টিত নান্দনিক মাজার কমপ্লেক্সটির পূর্ব দিকে রয়েছে একটি প্রবেশপথ, সমাধিসৌধ ও একটি পাকা কুয়া। চতুর্ভুজাকার সমাধিসৌধটি অত্যন্ত পুরু ও শক্ত প্রাচীরে নির্মিত। ওপরে ছাদটি সামান্য ঢালু এবং একটি বড় গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত। বদর আউলিয়ার নান্দনিক মাজারের পশ্চিম ফাসাদে বেলেপাথরের একটি শিলালিপি রয়েছে। শিলালিপিতে অনুভূমিকভাবে নাসখ রীতিতে পাঁচ লাইনে আরবিলিপি উৎকীর্ণ।

সিমেন্টে বাঁধানো প্রশস্ত আঙিনা পার হলে বর্গাকৃতি দালান। ওপরে সবুজ রং করা বড় গম্বুজ ও মিনার। অনুপম স্থাপত্যে গড়া বদর আউলিয়ার নান্দনিক মাজার চট্টগ্রামের সবচেয়ে প্রাচীন ইমারত হিসেবে স্বীকৃত ঐতিহাসিকদের কাছে। চট্টগ্রামের পুরাকীর্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন ইটারনাল চিটাগাং বইয়ের লেখক শামসুল হোসেন। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এটি যে সবচেয়ে পুরোনো ভবন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মাজারটি অন্তত ৭০০ বছরের পুরোনো। বদর আউলিয়ার নান্দনিক মাজারের স্থাপত্যশৈলী দেখে বোঝা যায় এটি পুরোপুরি সুলতানি আমলের। ১৩৩৮ সালে সুলতান ফখরুদ্দীন মোবারক শাহের বাংলা বিজয়ের পর অনেক সুফি সাধক এখানে এসেছিলেন। বদর আউলিয়ার আগমনও ঘটেছে এ সময়ে।’

বদর আউলিয়ার নান্দনিক মাজারে ঢুকতেই ইবাদতখানা। তার মাঝামাঝি আরও একটি চতুষ্কোণ কক্ষে বদর আউলিয়ার রওজা (কবর) শরিফ। বদর আউলিয়ার নান্দনিক মাজারের খাদেম শফিকুল ইসলাম কাচের শোকেসে ঢাকা পাথরের খণ্ড দেখিয়ে বলেন, বদর আউলিয়া এই পাথরের কিস্তি চড়ে (নৌকা) চট্টগ্রাম এসেছিলেন। মূল রওজা ঘরটি বদর আউলিয়ার সময়কালে নির্মিত। রওজা কক্ষে সুদৃশ্য গিলাফে ঢাকা বদর আউলিয়ার সমাধি। এই কক্ষের ওপরেই আছে গম্বুজ। কক্ষের চার কোণে যুক্ত করা হয়েছে খিলান। প্রত্যেক খিলানের তলায় আড়াআড়ি আছে দুটি করে কুলুঙ্গি। খিলান চারটির মাথা পরস্পর যুক্ত হয়ে অষ্টভুজ আকার ধারণ করে গড়ে তুলেছে গোলাকার গম্বুজ।

৬০০ থেকে ৭০০ বছর আগে নান্দনিক মাজারটি ছিল কর্ণফুলী নদীর একেবারে তীর ঘেঁষে। নদীর মুখোমুখি ও তার বিপরীত দিকে দুটো গেট ছিল একসময়। রাস্তার মুখোমুখি গেটটি না থাকলেও পেছনেরটির ধ্বংসাবশেষ এখনো রয়ে গেছে। মাজারের মোতোয়ালি সৈয়দ আবুল হাশেমের কাছ থেকে জানা যায়, প্রাচীন সমাধিসৌধটি ছিল একটিমাত্র কক্ষ নিয়ে। এখন তার চারপাশ ঘিরে প্রশস্ত ইবাদতখানা তৈরি হয়েছে। বদর আউলিয়ার রীতি মেনে এখনো এখানে প্রতিরাতে ১২টি চেরাগ জ্বালানো হয়।

ইতিহাস বলছে, মোগল ঐতিহাসিক শিহাব-উদ-দিন তালিশের (আনুমানিক ১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দ) বিবরণে বদর আউলিয়ার নান্দনিক মাজারের উল্লেখ আছে। পারস্যের প্রাক-মুসলিম সভ্যতার স্থাপত্যরীতি অনুসরণে নির্মিত এই নান্দনিক মাজারের ভেতরে পাওয়া গেছে নসক শৈলীতে লেখা প্রাচীন আরবি শিলালিপি। দুষ্পাঠ্য এই শিলালিপি বদর পিরের সমাধিফলক বলে মনে করেন ইতিহাসবিদেরা। এই মাজার নিয়ে গবেষণা করতে বিভিন্ন দেশের ইতিহাসবিদেরা আসেন। আসেন সুফি সাধক, হিন্দু-মুসলিমসহ সব ধর্মের নারী-পুরুষ। তিনি জানান, একসময় বাণিজ্য করতে সমুদ্রযাত্রায় বের হওয়ার আগে সওদাগরেরা এসে দোয়া নিতেন। সপ্তাহের প্রতি বৃহস্পতিবার প্রচুর ভক্তকুলের আগমন ঘটে মাজারে।

উইকিপিডিয়া

বদর আউলিয়ার নান্দনিক মাজারের পূর্বদিক থেকে প্রবেশের জন্য একটি সূচ্যগ্র খিলানপথ রয়েছে। খিলানপথটি গম্বুজ আচ্ছাদিত বিশাল একটি অভিক্ষিপ্ত অবকাঠামোর কুলুঙ্গির কেন্দ্রে স্থাপিত। গম্বুজের প্রাধান্যকে অক্ষুণ্ন রেখেই এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে চারটি ছোট মিনার ছাদের ওপর থেকে উত্থিত হয়েছে। মিনারগুলো ছোট গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত। স্থানীয় প্রবীণ অধিবাসীরা জানান, সমাধি কমপ্লেক্সের পশ্চিম দিকে আরও একটি প্রবেশপথ ছিল। ১৯৬০ সালে বারান্দা সংযোজনের কারণে এটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। মাজারের উত্তর-পূর্ব কোণে একটি পরিত্যক্ত পাকা কুয়া আছে। অতীতে এটির পানি ওজুর জন্য ব্যবহৃত হতো। জনশ্র“তি আছে যে এ পবিত্র কুয়ার পানি দিয়ে গোসল করলে অসুস্থ ব্যক্তি ভালো হয়ে যেত।

বর্তমানে এই নান্দনিক মাজারটির অস্তিত্ব বিলীন হতে চলেছে। আশপাশে ভূমিদস্যুদের দৌরাত্ম্যে এ নান্দনিক মাজারের বেশ কিছু জমি দখল হয়ে গেছে। এখানে এককালে চারপাশে বিশাল জায়গা থাকলে এখন শুধু একচিলতে জায়গা আছে যা মাজারটিকে ধারণ করে আছে। মাজারের বামপাশ ঘেঁষে চলে গেছে একটি সীমানাপ্রাচীর। এর পরেই বিশাল ভবন। এভাবে ধীরে ধীরে অবক্ষয়ের পথে পরিগণিত এই নান্দনিক মাজারটি বাংলাদেশের সম্পদ। একে রক্ষায় আমাদের সবার এগিয়ে আসা উচিত। নয়তো ৭০০ বছরের প্রাচীন এই নান্দনিক মাজারটি কালের অতলে অচিরেই হারিয়ে যাবে অদূর ভবিষ্যতে।

প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৬তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৪

+ posts