ব্যবসা করুন লক্ষ্য ঠিক করে

নদীবেষ্টিত জনপদ বরিশালের গৌরনদী। বিখ্যাত আড়িয়াল খাঁ নদের শাখানদী পালরদী। এই নদীই বয়ে গেছে গৌরনদীর বুক চিরে। আগে নদীটি যেমন ছিল স্রোতস্বিনী, তেমনি রূপ-লাবণ্যময়। নদীর জলের রং ছিল গৌর বর্ণের। তাই তো নদীটিকে ডাকা হতো গৌরনদী নামে। কালক্রমে নদীর নামেই পরিচিতি পেয়েছে এলাকাটি। গৌরনদী বরিশালের ঐতিহ্যবাহী ও সমৃদ্ধ থানা। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে এর রয়েছে গৌরবময় রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস। এখানকার সফল তিন নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী মো. বখতিয়ার হাওলাদার, মো. ইখতিয়ার হাওলাদার ও রেজাউল করিম সুজন। শহরের বন্দর রোডে অবস্থিত ‘মেসার্স হাওলাদার ট্রেডার্স-এর স্বত্বাধিকারী এই তিন সহোদর। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমানের সহযোগিতায় এবারের ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে থাকছে তাঁদের ব্যবসায়িক ও পারিবারিক জীবনের সাফল্যময় আখ্যান।

ব্যবসায়ী মো. বখতিয়ার হাওলাদারের জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৭৪, দিয়াশুর, গৌরনদীতে। বাবা মরহুম মো. শাহজাহান হাওলাদার ও মা দেলোয়ারা বেগম। তিনি পালরদী মডেল উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৯১ সালে মাধ্যমিক এবং সরকারি গৌরনদী মহাবিদ্যালয় থেকে ১৯৯৩ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ছাত্রজীবনেই জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। তাঁর বাবা ছিলেন একজন ব্যবসায়ী, যিনি গড়ে তোলেন ইটের ভাটা, ময়দার মিল ও নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসা। এই হাওলাদার ট্রেডার্সের প্রতিষ্ঠাতাও তিনি। তাঁকে এ ব্যবসায় সহযোগিতা করতেন সর্বকনিষ্ঠ ছেলে রেজাউল করিম সুজন। ২০১২ সালে তাঁর মৃত্যুর পর ব্যবসার হাল ধরেন ছোট ছেলে সুজন। বাবার দেখানো পথ ও কৌশল প্রয়োগ করেই চালিয়ে যেতে থাকেন ব্যবসা।

নির্মাণপণ্য হিসেবে শুরুতে খুচরা পর্যায়ে বিক্রি করতেন আকিজ সিমেন্ট। বিক্রিও হতো উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। ক্রমেই বাড়তে থাকে বিক্রির পরিমাণ। এ সময় সুজন অন্য দুই ভাইয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে নিয়ে নেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির পরিবেশকস্বত্ব। ব্যবসাটির কলেবর বড় হওয়ার সম্ভাবনা দেখে রাজনৈতিক ব্যস্ততা সত্ত্বেও ব্যবসা দেখভালের দায়িত্ব নেন বখতিয়ার হাওলাদার। সেই সঙ্গে মেজো ভাই ইখতিয়ার হাওলাদারকেও ব্যবসায় সম্পৃক্ত করেন। তিন ভাইয়ের মিলিত প্রচেষ্টায় এগোতে থাকে ব্যবসা। বড় ভাই কোম্পানির সঙ্গে সব ধরনের চুক্তি, খুচরা ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন নির্মাণকাজে সিমেন্টের গুণগত মান তুলে ধরাসহ পণ্যের প্রচার-প্রচারণা চালান। ব্যাংক লেনদেন, বকেয়া আদায়, কোম্পানির বিভিন্ন প্রোগ্রামে অংশ নেওয়াসহ অন্যান্য কাজ করেন মেজো ভাই। আর সার্বক্ষণিক তদারকি, নিরবচ্ছিন্ন পণ্য সরবরাহ, পরিবহন, খুচরা পর্যায়ে বিক্রিসহ সামগ্রিক বিষয় দেখভাল করেন ছোট ভাই সুজন।

গৌরনদী মূলত মফস্বল শহর। ব্যবসা ও রাজনৈতিক কারণে এ শহরে সবাই হাওলাদার পরিবারের সঙ্গে পরিচিত। তা ছাড়া একজন সুব্যবসায়ী হিসেবে সুনাম ছিল বাবার। যা তাঁদের ব্যবসা প্রসারে হয়েছে দারুণ সহায়ক। সে কারণে পাইকারি বিক্রির পাশাপাশি খুচরা পর্যায়েও তাঁদের বিক্রি বেশ ভালো। শুধু আকিজ সিমেন্টকে সঙ্গী করেই চালাচ্ছেন ব্যবসায়িক কার্যক্রম। পরিবেশক হওয়ায় খুচরা পর্যায়ে পণ্যটির বাজার সৃষ্টির চ্যালেঞ্জিং কাজটিও সামলাচ্ছেন ভালোভাবেই। সাফল্যের এমন স্বীকৃতিস্বরূপ আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির পক্ষ থেকে পেয়েছেন ট্যাব, ডিনার সেট, মোবাইল, ঘড়ি, নগদ টাকাসহ নানা উপহারসামগ্রী। এ ছাড়া ভাইদের প্রতিনিধি হয়ে চীন, থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভুটান ভ্রমণ করেছেন ইখতিয়ার হাওলাদার।

ব্যবসায়ী বখতিয়ার হাওলাদার বিয়ে করেছেন ২০১০ সালে। স্ত্রী পলি বেগম। তাঁদের এক মেয়ে এক ছেলে। বড় মেয়ে তহেরন ইসলাম রোজার বয়স সাড়ে তিন বছর এবং ছোট ছেলে বিবেক আব্দুল্লাহর বয়স এক বছর চার মাস। ইখতিয়ার হাওলাদার বিয়ে করেছেন ২০১১ সালে। স্ত্রী মনি বেগম। তাঁদের দুই মেয়ে। বড় মেয়ে ইমা হাওলাদার চার বছরের ও ছোট মেয়ে ইভা হাওলাদারের বয়স মাত্র দুই মাস। মাকে নিয়ে তিন ভাই ও তাঁদের একান্নবর্তী পরিবার। এমনকি তাঁদের চাচা ও আত্মীয়রাও থাকেন পাশের বাড়িতেই।

ব্যবসায়ী বখতিয়ার হাওলাদার গৌরনদী পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। ব্যবসা ও রাজনীতির পাশাপাশি ঠিকাদারিও করেন। সরকারি চাউলের (ওমএমএস) ডিলারও তিনি। গণমানুষের সেবায় সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকলেও চেষ্টা করেন ব্যবসা ও পরিবারকে সময় দিতে। তবে তাঁর অনুপস্থিতিতে অন্য দুই ভাই ভালোভাবেই ব্যবসা সামাল দেন।

ব্যবসায় রয়েছে সম্মান ও মর্যাদা। নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি একটি পরিপূর্ণ ব্যবসায়ী পরিবার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে চান তাঁরা। নির্মাণপণ্যের এ ব্যবসাকে সঙ্গী করে এগোতে যান আগামীর পথে। আর তাই নির্মাণসামগ্রী ব্যবসার পাশাপাশি পৈতৃক ইটভাটাকে নতুন আঙ্গিকে চালু করতে চান। এতেই নির্মাণপণ্য ব্যবসায় এলাকায় নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে বলেই তাঁদের বিশ্বাস।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৮তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৫

মাহফুজ ফারুক
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top