নীতি-আদর্শে সফল যিনি

বেলা ১১টা। জমজমাট হালুয়াঘাট বাজার। দোকানে দোকানে চলছে পণ্য বিকিকিনি। বন্ধন-এর নিয়মিত আয়োজন ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বের সফল ব্যবসায়ীর সন্ধানেই এসেছি ভারতীয় সীমান্তবর্তী জনপদ ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে। সঙ্গে রয়েছেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির জ্যেষ্ঠ আঞ্চলিক বিপণন কর্মকর্তা সৈয়দ নাদির রহমান। সফল ব্যবসায়ী মো. শাহজাহান খানের ‘মেসার্স খান এন্টারপ্রাইজ’। ব্যস্ত এ ব্যবসায়ীর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভিড় অসংখ্য ক্রেতার। তাঁদের মধ্যে আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায়ের লোকজনই বেশি। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরও সুযোগ মিলছিল না কথা বলার। দুপুরের পর ক্রেতা কিছুটা কমলে কথা হলো তাঁর সঙ্গে। কথা প্রসঙ্গে জানা গেল তাঁর ব্যবসায়িক সফলতার রহস্য!

ব্যবসায়ী মো. শাহজাহান খানের জন্ম ১৯৬৫ সালের ১২ অক্টোবর হালুয়াঘাটের গামারিতলা গ্রামে। বাবা মরহুম আইন উদ্দিন খান ও মা কুলসুম বিবি। ১৯৭৯ সালে হালুয়াঘাট রাঙ্গাপাড়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণের পরপরই জড়িয়ে পড়েন ব্যবসায়। শুরুটা ধানের ব্যবসা দিয়ে। ব্যবসার সুবাদেই তাঁকে আসতে হতো হালুয়াঘাট বাজারে। সেখানে হরেক রকম পণ্যের রমরমা বাণিজ্য তাঁর নজরে পড়ে। ইচ্ছে হয় এমন একটি ব্যবসার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করার, যা থেকে তিনি জীবনে বড় ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবেন সহজেই। এ জন্য খুঁজতে থাকেন উপযুক্ত ব্যবসা। একপর্যায়ে সবার সঙ্গে পরামর্শ করে বেছে নেন নির্মাণপণ্য ব্যবসা। তখন হালুয়াঘাটে মাত্র একটিই নির্মাণপণ্যের দোকান ছিল বিধায় ব্যবসাটিকে তিনি সম্ভাবনাময় মনে করেছিলেন। তাঁর এই সিদ্ধান্তটি ছিল অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত ও সময়োপযোগী, যার ফলে তিনি অত্র অঞ্চলের একজন বড় ও সফল নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী হিসেবে আজ প্রতিষ্ঠিত। 

শাহজাহান খানের নির্মাণপণ্যের এ ব্যবসাটির শুরু ২০০১ সালে। তখন অল্প পরিসরে সিমেন্ট ও রড বিক্রি করতেন। তবে আপন দক্ষতায় ক্রমেই বাড়তে থাকে ব্যবসায়িক পরিসর। ২০১৫ সালে শুরু করেন আকিজ সিমেন্ট ব্যবসা। গুণগতমানের এ পণ্যটি স্বল্প সময়ে তাঁকে এনে দেয় অভাবনীয় ব্যবসায়িক সাফল্য। প্রচুর বিক্রির ফলে তিনি হয়ে ওঠেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির ময়মনসিংহ-২ টেরিটরির অন্যতম সেরা বিক্রেতা। পণ্যটি বিক্রি শুরুর পরের বছর থেকেই অর্জন করেন অত্র টেরিটরির সর্বোচ্চ বিক্রেতা হওয়ার অনন্য গৌরব। এমন অভূতপূর্ব সাফল্যে তিনি কোম্পানির পক্ষ থেকে পেয়েছেন মোটরসাইকেল, ফ্রিজ, এলইডি টিভি, ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন, ডিনারসেট, স্বর্ণালংকার প্রভৃতি। এ ছাড়া প্রতিবছর কোম্পানির দেওয়া নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করায় পেয়েছেন ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভুটান, নেপাল, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের অফার।

ব্যবসায়ী মো. শাহজাহান খানের সফলতার মূলে রয়েছে তাঁর নীতি-আদর্শ। কখনোই তিনি নীতিবিরুদ্ধ কাজ করেনি। ওজনে কম দেওয়া, নিম্নমানের পণ্য ভালো বলে চালিয়ে দেওয়ার মতো ছলচাতুরী করেও ব্যবসা করেন না। যাকে যে কথা দেন তা যেকোনোভাবেই রক্ষা করেন ব্যবসার শুরু থেকেই। ফলে তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে। এমন সুনামে দূর-দূরান্তের ক্রেতারা আসেন তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য কিনতে। তাঁদের অধিকাংশই তাঁকে চেনেন না কিন্তু নামের সঙ্গে পরিচিত। লোক মুখে শুনেই অপরিচিত এসব ক্রেতা পণ্য কিনতে আসেন তাঁর দোকানে। শুধু ক্রেতারা নয়, নির্মাণসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কোম্পানিও জানে তাঁর সম্পর্কে ইতিবাচক এমন সব তথ্য। যার জন্য সব ধরনের সহযোগিতা পান কোম্পানির পক্ষ থেকে।

ব্যবসায়ী মো. শাহজাহান খান পারিবারিক বন্ধনে জড়ান ১৯৮৯ সালে। স্ত্রী তাসলিমা খাতুন। এ দম্পতির দুই ছেলে। বড় ছেলে তানভির হাসান খান, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ ও এমবিএ সম্পন্ন করেছে। ছোট ছেলে তাফসির হাসান খান ধারা আদর্শ ডিগ্রি কলেজ, হালুয়াঘাট বিএসএস দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত। নির্মাণপণ্য ব্যবসার পাশাপাশি কয়লার ব্যবসায়ও রয়েছে তাঁর। এ ছাড়া গ্রামে রয়েছে ধান ও কৃষিপণ্যের ব্যবসা। বাজারে এখন তাঁর একটি শোরুম ও ছয়টি গোডাউন। এসব কাজে যুক্ত ১২ জন স্থায়ী কর্মচারী। এ ছাড়া নির্মাণপণ্য ক্রেতাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে রয়েছে অটোরিকশা, ট্রলি ও ঠেলাগাড়ি।

নগরায়ণের এই যুগে নির্মাণপণ্য ব্যবসা লাভজনক হওয়া সত্ত্বেও অনেকেই পাননি কাক্সিক্ষত সাফল্য। এর অন্যতম কারণ নীতিহীনতা ও ওয়াদার বরখেলাপ। এ ছাড়া ব্যবসায়িক সুবিধার্থে কোম্পানি যে বকেয়া প্রদান করে, তা নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু কেউ না বুঝে যদি অবিবেচকের মতো বাকিতে পণ্য বিক্রি করে তা আদায়ে ব্যর্থ হয়, তাতে ব্যবসার অপূরণীয় ক্ষতি হয়। সে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা পরে আর সম্ভবপর হয় না। এ জন্য ব্যবসায় সফলতা পেতে নীতিনৈতিকতার পাশাপাশি বুঝে-শুনে ব্যবসা করতে হবে, এমনটাই পরামর্শ সফল এ ব্যবসায়ীর।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১১তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৯।

মাহফুজ ফারুক
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top