মো. সবুজ মিয়া, মো. কাওছার আলম রাশেদ ও আবু তাহের দেওয়ান সুমনÑতিনজন সফল নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী। ‘ইউনিক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’-এর স্বত্বাধিকারী এ ব্যবসায়ীবৃন্দ ব্যবসা করছেন অংশীদারি মালিকানার ভিত্তিতে। ২০১৫ সালে অত্যন্ত স্বল্পপরিসরে শুরু করা এ ব্যবসাটি এখন যেন মহিরুহ বটবৃক্ষ। অংশীদারি ব্যবসার আগে তিনজনই সম্পৃক্ত ছিলেন নির্মাণপণ্য ব্যবসার সঙ্গে; বিক্রি করতেন আকিজ সিমেন্ট। পণ্যটির ব্যবসায়িক সম্ভাবনা উপলব্ধি করে তাঁদের নিজ নিজ ব্যবসা একীভূত করে নেন আকিজ সিমেন্টের ডিলারশিপ। বর্তমানে তাঁরা কোম্পানিটির নারায়ণগঞ্জ, ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জÑএ তিন টেরিটরির ডিস্ট্রিবিউটর। বন্ধন-এর নিয়মিত আয়োজন ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে এবার জানাব এ ব্যবসায়ীবৃন্দের সাফল্য-রহস্য। সহযোগিতায় ছিলেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক জনাব মো. ফজলুর রহমান।
তিন ব্যবসায়ীর একযোগে ব্যবসা খুব বেশি দিন হয়নি। অথচ এরই মধ্যে কীভাবে তাঁরা অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করলেন তা এক রহস্য। তবে রহস্যের কিছু নেই! এর মূল্যে রয়েছে একে অন্যের প্রতি অগাধ আস্থা, বিশ^াস ও পরিশ্রম, সেই সঙ্গে লক্ষ্যেও প্রতি এগিয়ে চলা। কাওছার আলম রাশেদ উচ্চশিক্ষার জন্য গিয়েছিলেন জর্জিয়া, রাশিয়া। সেখান থেকে ফিরে চাকরি খুঁজছিলেন হন্যে হয়ে। কিন্তু চাকরি যেন সোনার হরিণ। কোনোভাবেই মিলছিল না! অবশেষে এক বড় ভাই সিমেন্ট ব্যবসার পরামর্শ দেন। উপায়ান্ত না পেয়ে বরিশাল থেকে নারায়ণগঞ্জে এসে যুক্ত হন আকিজ সিমেন্ট ব্যবসায়। কোম্পানিটি তাঁকে বিক্রেতার একটি আইডি দেয়। দোকানে ব্যবসার পরিবর্তে তিনি বেছে নেন নির্মাণ প্রকল্পে সিমেন্ট বিক্রি। প্রতিদিন বিভিন্ন প্রকল্প ঘুরে প্রকৌশলীদের আকিজ সিমেন্টের গুণগত মান সম্পর্কে বোঝাতেন। অল্প পরিমাণে হলেও অর্ডার পেতে শুরু করেন। দু-তিন মাসের মধ্যে মাসিক বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় কয়েক হাজারে।
একপর্যায়ে কোম্পানি আইডিভিত্তিক ব্যবসা বন্ধ করে ডিলারশিপ ব্যবসার সিদ্ধান্ত নেয়। নারায়ণগঞ্জের বড় ব্যবসায়ীদের নিয়ে মিটিং হয় সমনি¦তভাবে ডিলারশিপ ব্যবসার জন্য। কিন্তু ব্যবসায়ীরা ঐক্যমতে আসতে না পারায় ছোট পরিসরে ফতুল্লার ডিলারশিপ নিতে আগ্রহী হন ব্যবসায়ী কাওছার রাশেদ ও সবুজ মিয়া। কিন্তু চাইলেই তো আর হলো না, প্রয়োজন অনেক টাকার। কোম্পানিকে বড় অঙ্কের ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হবে। ব্যবসাসূত্রেই পরিচয় উভয় ব্যবসায়ীর; সম্পর্কও দারুণ। দুজনে মিলে সমপরিমাণ অর্থ দিয়েও ঘাটতি মিটছিল না; প্রয়োজন আরও টাকার। উপায়ান্ত না দেখে সবুজ মিয়া তাঁর বন্ধু ব্যবসায়ী সুমনকে সঙ্গে নেন। সমান অংশীদারির ভিত্তিতে গঠন করেন লিমিটেড কোম্পানি। তবুও ঘাটতি থেকে যায়। একদিকে কোম্পানির চাহিদা মেটাতে না পারা অন্য দিকে তিনজনের অংশীদারি ব্যবসায় কোম্পানির আস্থার অভাব, সব মিলিয়ে যখন ডিলারশিপ না পাওয়ার আশঙ্কা তখন তাঁরা কিছু সময় নেন এবং আশ^স্ত করেন সময়মতো বাকি জামানত প্রদানের। এমন প্রতিশ্রুতি এবং তাঁদের দৃঢ়তায় অবশেষে পেয়ে যান ডিলারশিপ।
অবশিষ্ট জামানত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও এ ব্যবসায়ীরা জানতেন না কীভাবে দেবেন! তবে বিশ^াস ছিল পরিশোধ করতে পারবেন। নিজেদের ঐকান্তিক চেষ্টা ও পরিশ্রমে তা করতে সক্ষমও হন তাঁরা। তাও পণ্য বিক্রির টাকা দিয়ে। এরপর প্রতিবছর কোম্পানির দেওয়া নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেছেন। যা আয় হয় তা আবার বিনিয়োগ করেন। নিজেরা শুধু অল্প কিছু সম্মানি নেন। ফলে ব্যবসা বেড়েছে। কোম্পানির জামানতও বাড়িয়েছেন কয়েকগুণ। এমন নজরকাড়া সাফল্যে কোম্পানির পক্ষ থেকে তাঁরা ফতুল্লার পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ ও সিদ্ধিরগঞ্জ টেরিটরির দায়িত্ব পান। এ ছাড়া আকিজ সিরামিকসের একটি ডিসপ্লে সেন্টার ও ফকিরবাড়ি, নারায়ণগঞ্জে একটি পেভমেন্ট টাইলস কারখানা গড়ে তুলেছেন।
তাঁদের এ সিদ্ধান্তটি ছিল অত্যন্ত সঠিক ও যুগোপযোগী। এই সিমেন্ট ব্যবসা থেকেই তাঁরা পেয়েছেন কাক্সিক্ষত সাফল্য। তবে সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে পারস্পরিক বিশ^াস ও পরিশ্রম। তিনজন মিলে একসঙ্গে নানা প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন। নিজেদের মধ্যে চমৎকার বোঝাপড়ার মাধ্যমে সমনি¦ত প্রচেষ্টায় এগিয়ে যাচ্ছে তাঁদের অংশীদারিত্বের ব্যবসা। কেউ অনুপস্থিত থাকলেও অন্যজন সেটা চালিয়ে নেন। প্রতিষ্ঠানের জন্য যা কিছু ভালো তাই করেন। ভবিষ্যতেও টিকিয়ে রাখতে চান এমন সম্পর্ক; এগিয়ে যেতে চান একসঙ্গে।
মো. সবুজ মিয়া বর্তমানে ‘ইউনিক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল লি.’-এর চেয়ারম্যান। জন্ম ১৯৮৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর মেঘনা, কুমিল্লায়। পিতা মো. আবদুস সালাম ও মাতা রওশন আরা বেগম। ২০১১ সালে বিয়ে করেন এ ব্যবসায়ী। তাঁর সহধর্মিণী সম্পা আক্তার। তাঁদের দুই মেয়ে। বড় মেয়ে ফাতেমাতু ইকফা আয়াত, তালেমুল মিল্লাত মাদ্রাসায় নার্সারিতে পড়ছে। ছোট মেয়ে মরিয়ম মাহাদী আরাবি, বয়স ২ বছর। সবুজ মিয়ার অংশীদারি ব্যবসা ছাড়াও রয়েছে নিজস্ব ব্যবসা। ভূইগড়, ফতুল্লা অবস্থিত ‘মেসার্স সবুজ আয়রন স্টোর’-এর স্বত্বাধিকারী তিনি। এ ছাড়া তাঁর রয়েছে নির্মাণপণ্যের আরও তিনটি শোরুম।
মো. কাওছার আলম রাশেদ ‘ইউনিক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল লি.’-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর। জন্ম ১৯৮৭ সালের ২৫ জুন, গৈলা, বরিশাল। পিতা আকন মোহাম্মদ আলী ও মাতা মাহমুদা বেগম। বিয়ে করেছেন ২০১৬ সালে। সহধর্মিণী জান্নাতুল ফেরদৌস। তাঁদের এক মেয়ে উমাইজা আলম ইয়ারিকা। বয়স প্রায় দেড় বছর। ব্যক্তিগতভাবে ‘আমার জুতা ডট কম’ নামের একটি অনলাইন শপের মাধ্যমে নিজস্ব ব্যবসাও পরিচালনা করেন তিনি।
আবু তাহের দেওয়ান সুমন ‘ইউনিক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল লি.’-এর ডিরেক্টর। জন্ম ১৯৮৫ সালের ১০ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জে। পিতা মো. আশেক আলী দেওয়ান ও মা আক্তারুন্নেসা। বিয়ে করেন ২০১২ সালে। সহধর্মিণী রুমা আক্তার স্বর্ণা। তাঁদের এক ছেলে এক মেয়ে। বড় ছেলে মো. আনাস, হাজি সেলিম ইসলামী মাদ্রাসায় শিশু শ্রেণিতে পড়ছে। ছোট মেয়ে ফাতেমা আক্তার আনিসা, বয়স ৩ বছর। ব্যবসায়ী সুমন ‘হাজি দুদু মুন্সি অ্যান্ড ব্রাদার্স’-এর কর্ণধার।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৩তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৯।