ব্যবসা করুন একাগ্রতার সঙ্গে

ব্যবসায়ী মো. আবদুস সামাদের মুদির দোকানটা ছিল খড়ের চালার; মালামালও নিতান্তই কম। আশপাশের দোকানগুলো যেমনি বড়, তেমনি রকমারি পণ্যে ঠাসা। সুযোগ পেলেই তাঁর ব্যবসার এমন করুণদশায় অন্য ব্যবসায়ীরা ঠাট্টা-মশকরা করতে ছাড়তেন না। নিন্দুকের ওসব বাঁকা কথায় একটুও বিচলিত না হয়ে একনিষ্ঠ মনে ব্যবসা করে যান আবদুস সামাদ। স্বল্প মুনাফায় গুণগত মানের পণ্য বিক্রি, বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল, অক্লান্ত পরিশ্রম, সততা ও ক্রেতার সঙ্গে সুব্যবহারের মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যেই পরিবর্তন আনেন ব্যবসায়িক অবস্থানের। উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় গ্রাম্য বাজারের ছোট্ট সেই ব্যবসা আজ মহিরুহ বৃক্ষের মতো ডালপালা মেলেছে। নিজেকে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছেন সফল একজন ব্যবসায়ী হিসেবে। দারুসসালাম কাস্টমস মোড়, কুষ্টিয়ার ‘মেসার্স রাজু-খাজা ট্রেডার্স’-এর কর্ণধার তিনি। বন্ধন-এর নিয়মিত আয়োজন ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে এবার জানাব সংগ্রামী এ ব্যবসায়ীর বর্ণাঢ্য জীবনের উত্থান-পতনের গল্প। সঙ্গে ছিলেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ আঞ্চলিক বিপণন কর্মকর্তা জগৎময় কুমার রায়।

ব্যবসায়ী আবদুস সামাদের জন্ম কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার বিভাগ গ্রামে, ১৯৬৩ সালে। বাবা মরহুম ডা. শাহাদাৎ হোসেন ও মা মরহুমা রহিমা বেগম। বাবা ছিলেন হোমিওপ্যাথি ডাক্তার। তাঁর পূর্বপুরুষদের প্রচুর সম্পত্তি থাকলেও অপরিমিত খরচ ও বড় সংসারের ব্যয়ভার মেটাতে পরিবারটি ক্রমেই অসচ্ছল হয়ে পড়ে। টানাপোড়েনের সংসারে  বাবা মারা যান বাল্যকালে। খুব ছোট বয়সেই সংসারের অভাব মেটাতে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন ব্যবসায়। এ জন্য পড়ালেখাও খুব বেশি করতে পারেননি। পোড়াদহ উচ্চবিদ্যালয়ে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন।

তখন তিনি ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র, তাঁর বড় ভাই নিজের জমানো টাকা থেকে মাত্র বিশ টাকা দেন ব্যবসার জন্য। সেই টাকা দিয়ে বিড়ি, সিগারেট ও ম্যাচ কিনে হাটে-বাজারে বিক্রি শুরু করেন। প্রতি হাটে স্কুল শুরুর আগে এবং পরে চলত কেনা-বেচা। এভাবে চলতে চলতে প্রায় এক বছর পর সুগন্ধি গ্রামে বাঁশ, কাঠ ও খড়ের চালা দিয়ে একটি মুদির দোকান দেন। দোকানে মুদি পণ্য বলতে কয়েক প্যাকেট বিড়ি-সিগারেট, অল্প পরিমাণে তেল, লবণ, চিনি, আটা ও সামান্য পরিমাণ অন্যান্য মালামাল। স্কুলে যাওয়ার আগে খুব ভোরে দোকান খুলতেন আবার স্কুল থেকে ফেরার পথে বাজার থেকে দোকানের জন্য প্রয়োজনীয় মালামাল কিনে আনতেন। এভাবে মাস ছয়েকের মধ্যে সংসারের যাবতীয় ব্যয় মিটিয়েও জমা করেন ৩০০ টাকা। যদিও তখন জিনিসপত্রের দাম এক পয়সা থেকে কয়েক আনার মধ্যেই ছিল। তাই অর্থের পরিমাণটা নেহাত কম নয়। বছরখানেক পর এই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় এক হাজার। তখন পরিমাণে এটি অনেক টাকা। মুদির ব্যবসায় এত টাকার দরকার হতো না। সে জন্য তিনি এক আত্মীয়ের পরামর্শে বিএডিসির সারের পরিবেশক লাইসেন্স নেন। দেশে তখন সবে রাসায়নিক সারের ব্যবহার শুরু হয়েছে। মিরপুর উপজেলা গুদাম থেকে ১৫-২০ ব্যাগ সার নিয়ে আসতেন। দুই-তিন দিনের মধ্যে তা বিক্রিও হয়ে যেত। বেশ মুনাফাও আসতে লাগল। কয়েক মাসের মধ্যেই পুঁজি বেড়ে দাঁড়ায় কয়েক হাজার টাকায়। এরই মধ্যে মুদি ব্যবসাটির পরিসর বাড়ে। ১৯৮২ সালে তিনি বিএডিসির আরও বড় পরিবেশক স্বত্ব পান। পোড়াদহ নতুন বাজারে ব্যবসা শুরু করেন। প্রতিদিন দুই ট্রাক সার অনায়াসে বিক্রি হয়ে যেত। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি বাজারে নতুন বাড়িও করেন।

ব্যবসায়ী আবদুস সামাদের ব্যবসায় সাফল্য যখন তুঙ্গে তখন এক আত্মীয়ের সঙ্গে পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষ শুরু করেন। বাকি সব ব্যবসায় সাফল্য পেলেও এ ব্যবসা তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। রুই মাছের পোনা ভেবে প্রচুর পোনা কিনলেও তা আসলে ছিল অন্য মাছের পোনা। এই ব্যবসায় প্রচুর বিনিয়োগ করে প্রচণ্ড আর্থিক ক্ষতির মধ্যে পড়েন। এ ঘটনায় মুষড়ে পড়েন তিনি। হাতে অবশিষ্ট টাকা আছে মাত্র পাঁচ হাজার। তবুও তিনি দমে না গিয়ে পূর্ণ উদ্যমে উদ্যোগী হন নিজ ব্যবসায়। বিভিন্নজনের কাছ থেকে ধার করে ব্যবসাকে চাঙা করেন। এ পর্যায়ে ব্যবসায় যোগ করেন কীটনাশক। ১৯৮৮ সালে তিনি পোড়াদহ বাজারে জমি কিনে নিজস্ব জায়গায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

১৯৯০ সালে বিএডিসির নতুন নিয়মের লাইসেন্স জটিলতার কারণে সারের ব্যবসা বাদ দিয়ে নির্মাণপণ্যের ব্যবসা শুরু করেন। অত্র অঞ্চলে তখন রড, সিমেন্ট ও ঢেউটিনের দোকান ছিল না। লোকেরা কুষ্টিয়া শহর থেকে পণ্য কিনে আনত। এ জন্য কাছাকাছি পণ্য পাওয়ায় আশপাশের গ্রামের লোকেরা তাঁর দোকানে ভিড় করতে থাকে। এ ব্যবসায়ও খুব দ্রুতই সাফল্য পান। ২০০৭ সালে আকিজ সিমেন্ট বিক্রি শুরু করেন। শুরুর পর থেকে পরপর তিন বছর পণ্যটি বিক্রিতে কুষ্টিয়া জেলার সেরা বিক্রেতা হন। তাঁর এমন সাফল্যে ২০১১ সালে তিনি অর্জন করেন পণ্যটির কুষ্টিয়া-২ টেরিটরির পরিবেশকত্ব। পরিবেশক হয়েও তিনি তাঁর সাফল্যের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখেন। ২০১৩ সালে পরিবেশকদের মধ্যে চতুর্থ সেরা পরিবেশক নির্বাচিত হওয়ায় অর্জন করেন মোটরসাইকেল। ২০১৪ সালে সপ্তম হওয়ায় অর্জন করেন স্বর্ণালংকার। ২০১৫ সালে সারা দেশে পরিবেশকদের গ্রেড-২-এ দ্বিতীয় স্থান অর্জন করায় জিতে নেন মোটরসাইকেল। এ ছাড়া প্রতিবছর কোম্পানির দেওয়া নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণ করায় বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ অফারসহ জিতে নেন অসংখ্য উপহারসামগ্রী ও সম্মাননা।

ব্যবসায়ী আবদুস সামাদ বিয়ে করেন ১৯৮৩ সালে। সহধর্মিণী মোছা. মনোয়ারা বেগম। তাঁদের কোনো সন্তানাদি না থাকলেও ভাইয়ের ছেলেমেয়েদের আপন সন্তানের মতো লালন-পালন করছেন। তিনি আজীবন ব্যবসা নিয়েই ব্যস্ত থাকেননি, বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় কাজেও রয়েছে তাঁর সরব পদচারণ। তিনি পোড়াদহ কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, পোড়াদহ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীনও অনেক সহযোগিতা করেছেন, পোড়াদহ বাজার কমিটির সাবেক সদস্য ছাড়াও বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানার সদস্য তিনি, যেসব প্রতিষ্ঠানে তিনি নিয়মিত অনুদান দেন। এ ছাড়া বিচার-সালিসেও রয়েছে তাঁর সরব উপস্থিতি।

বাংলাদেশের অখ্যাত এক গ্রাম্য হাটে ফেরি করে ব্যবসা শুরু করা একজন ক্ষুদে উদ্যোক্তা আজ একজন সফল ব্যবসায়ী হওয়ার পেছনে রয়েছে কিছু কারণও। ক্রেতারা তাঁর কাছ থেকে পণ্য কিনেছেন গুণগত মান ও অমায়িক ব্যবহার পেয়ে। কোম্পানি ও পরিবেশকেরা প্রচুর মালামাল ও সমর্থন দিয়েছেন তাঁর লেনদেনে স্বচ্ছতা, কথা দিয়ে কথা রাখা ও সময়মতো বকেয়া পরিশোধ করায়। পরিবেশক হওয়ার পরেও সফলতা ধরে রাখতে পেরেছেন কারণ তিনি প্রতিনিয়ত তরুণ ব্যবসায়ীদের তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যবসায়িক পরামর্শ ও কৌশল শেখান বলেই। এ ছাড়া ব্যবসার প্রসারে প্রতিদিন সাইট ভিজিটে গিয়ে বাড়ি নির্মাতা, ঠিকাদার, প্রকৌশলী ও মিস্ত্রিদের সঙ্গে আলাপচারিতায় মেতে ওঠেন। এভাবেই বিস্তৃত হচ্ছে ব্যবসায়ী আবদুস সামাদের ব্যবসার পরিসর।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৬তম সংখ্যা, জুন ২০১৭।

মাহফুজ ফারুক
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top