প্রতিবছর পৃথিবীর জনসংখ্যা বাড়ছে আর সবাই ছুটছে বড় বড় শহরের দিকে। শুধু বাংলাদেশের জনসংখ্যার সঙ্গে বছরে যুক্ত হচ্ছে অন্তত ২০ লাখ নতুন মুখ। ঢাকাসহ পৃথিবীর অনেক বড় শহরের নাগরিক সমস্যার মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা আবাসন। আবাসন নির্মাণযজ্ঞ বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ। এ জন্য বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান নাগরিকদের জন্য আবাসন নিশ্চিত করা রীতিমতো চ্যালেঞ্জিং। এ রকম পরিস্থিতিতে সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে দ্রুত নির্মাণ উপযোগী নতুন কোনো প্রযুক্তির উদ্ভাবন না হলে সমস্যার সমাধান করা সত্যিই কঠিন। তবে আশার কথা হলো, চীন, ইতালি, কোরিয়াসহ আরও অনেক দেশের বিজ্ঞানীরা সমস্যাটির সমাধানে উদ্ভাবন করেছেন থ্রি-ডি প্রিন্টার, যা দিয়ে শুধু ভবনই নয়, একটি নগরের নানা অবকাঠামো তৈরি করা সম্ভব।
থ্রি-ডি প্রিন্টার বিশেষ ধরনের প্রিন্টার, যা একটি ডিজিটাল ফাইলের বাস্তব রূপায়ণে সহায়তা করে। কোনো নির্মাণকাজ শুরুর আগে ইঞ্জিনিয়ার বা আর্কিটেক্টরা কম্পিউটারে একটি বাড়ি বা স্থাপনার ডিজাইন (CAD Design) তৈরি করেন। তারপর ডিজাইনটিকে একটি কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত বিশালাকার প্রিন্টিং মেশিনের সাহায্যে খণ্ড খণ্ড অংশে ভাগ করেন। এই প্রিন্টারে সাধারণ কালির পরিবর্তে দ্রুত শুকিয়ে যায় এবং কঠিন আকার ধারণ করে, এমন উপকরণ ব্যবহার করা হয়। ফলে মুদ্রণের পর বস্তুটি শক্ত ও ব্যবহারের উপযোগী ত্রি-মাত্রিক অথচ বাস্তব এক রূপ পায়।
শহরে-গ্রামে যেখানেই হোক না কেন, এখন বাড়ি বানানোর জন্য আর সনাতন পদ্ধতির নির্মাণকৌশল কম ব্যবহৃত হবে; একেবারে হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে না। তবে শুরু হবে স্বল্প সময়ে অল্প খরচে প্রিন্টার দিয়ে নতুন বাড়ি তৈরির প্রক্রিয়া। শুনে একটু অবাক লাগলেও ইতিমধ্যে এ প্রযুক্তির সহায়তায় তৈরি হয়ে গেছে পাঁচতলা অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং, দ্বিতল ভিলাসহ ছোট-বড় নানা স্থাপনা। থ্রি-ডি প্রিন্টার দিয়ে এরই মধ্যে বিশ্বের প্রথম অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং তৈরির গৌরব অর্জন করেছে চীন। যখন আর্কিটেক্ট আর আবাসন কোম্পানিগুলো বাড়ি বা স্থাপনার থ্রি-ডি মডেল ডিজাইনের প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, তখন চীনারা অনেকটাই নীরবে করে ফেলেছে দুরূহ এ কাজটি। একটি পাঁচতলা ভবন ও ১ হাজার ১০০ বর্গমিটারের অর্থাৎ ১১ হাজার ৮৪০ বর্গফুটের একটি ভিলা চীনারা বানিয়ে ফেলেছে, তাও আবার থ্রি-ডি প্রিন্টার দিয়ে।
গত বছরের মার্চে উইন সান নামক চীনা কোম্পানি নির্মাণ ও শিল্প-কারখানার বর্জ্য যেমন- কাচ ও অন্যান্য আর্বজনার সঙ্গে দ্রুত শুকাতে সক্ষম এমন সিমেন্ট ও বিশেষ হার্ডনিং এজেন্টের মিশ্রণ ব্যবহার করে থ্রি-ডি প্রিন্টারের সাহায্যে মাত্র ২৪ ঘণ্টা বা এক দিনের মধ্যে ১০টি ঘর তৈরি করে ফেলে। এরই ধারাবাহিতকায় ‘উইন সান’ সুঝুউ ইন্ডন্ট্রিয়াল পার্কে একটি পাঁচতলা অ্যাপার্টমেন্ট ভবন ও প্রায় ১২ হাজার বর্গফুটের একটি ভিলা হয়, যাতে আবারও চীনাদের যোগ্যতার প্রমাণ মেলে।
ভবনের বড় অংশগুলো তৈরি করা হয় ‘উইন সান’ কোম্পানির কারখানায়। পরে প্রতিটি অংশকে ইস্পাত ও ইনসুলেশন দিয়ে একটির সঙ্গে আরেকটিকে জুড়ে দেওয়া হয়। ভবনের এসব খণ্ডাংশ তৈরি করতে যে প্রিন্টারটি ব্যবহার করা হয় তার উচ্চতা ৬ দশমিক ৬ মিটার, চওড়া ১০ মিটার এবং দৈর্ঘ্যে ৪০ মিটার (২০ x ৩৩ x ১৩২ ফুট)। এই বিশাল আকৃতির প্রিন্টারটি তৈরি করেছেন ‘উইন সান’ কোম্পানির কর্ণধার মা-ইহ।
এদিকে বিশ্বের প্রথম থ্রি-ডি প্রিন্টারে তৈরি অফিসঘরটি স্থাপিত হচ্ছে দুবাইয়ে। প্রায় দুই হাজার বর্গমিটার আয়তনবিশিষ্ট এই অফিসের বিভিন্ন অংশ ২০ ফুট লম্বা একটি থ্রি-ডি প্রিন্টারে তৈরি করে পরে সেগুলোকে জোড়া দেওয়া হবে অফিসটি যেখানে তৈরি হবে সেখানে। পুরো কাজটি করতে সময় লাগবে মাত্র কয়েক সপ্তাহ।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ন্যাশনাল ইনোভেশন কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ গারগাওয়ি বলেন, ‘একসময় থ্রি-ডি প্রিন্টারে বিল্ডিং তৈরির ধারণাটা ছিল স্বপ্ন কিন্তু আজ তা চরম বাস্তব। এই অফিসঘরটি থ্রি-ডি প্রিন্টিং টেকনোলজির দক্ষতা ও সৃজনশীলতার একটি সাক্ষ্য হবে, যা ডিজাইন ও নির্মাণে উন্মোচন করবে নতুন এক দিগন্ত।’
থ্রি-ডি প্রিন্টারে তৈরি ভবনের দেয়াল সাধারণ ইটের বা কংক্রিটের দেয়ালের মতো পুরু না হয়ে ভেতরের অংশ হয় ফাঁপা। ফলে তাপ ও শব্দ নিয়ন্ত্রণ করা যায় সহজেই। আবার ফাঁপা অংশের ভেতর জিগজ্যাগ প্যাটার্ন থাকায় অনেক মজবুতও হয় এর দেয়াল। দেয়ালের ভেতর দিয়ে রয়েছে পানির পাইপ, ইলেকট্রিক লাইনসহ অন্যান্য লাইন টানার সুব্যবস্থা।
নির্মাতা কোম্পানির ভাষ্য মতে, একটি ভিলা তৈরি করতে নির্মাণসামগ্রীর অপচয় কম হয় ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ, ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ কম শ্রমিকের প্রয়োজন হয় এবং ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ প্রয়োজন হয় কম সময়ের। পুনর্ব্যবহারযোগ্য নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করার ফলে পাথরসহ অন্যান্য সামগ্রীর হয় ব্যয়সাশ্রয়ী। ফলে একদিকে যেমন এটা অর্থ সাশ্রয় করে, তেমনি পরিবেশবান্ধবও। আগুন ও পানি থেকে নিরাপদ এসব ভিলা সর্বোচ্চ ৯ মাত্রার ভূমিকম্প সহনীয় বলে জানিয়েছেন এর নির্মাণ সংস্থা।
শুধু যে চীনারাই থ্রি-ডি প্রিন্টার প্রযুক্তি দিয়ে বাড়ি তৈরি করছে তা কিন্তু নয়, চেষ্টা করছে আরও অনেকেই। আসলে এ পদ্ধতিতে বাড়ি বানানোর চিন্তার বাস্তবায়ন প্রথম শুরু করে ডাচ্ আর্কিটেক্ট ও আল্টিমেকার নামের দুটি ডাচ কোম্পানি। তারা ২০১৪ সালে নেদারল্যান্ডের আমস্টার্ডামে ১৩ কক্ষবিশিষ্ট একটি ক্যানেল হাউজ তৈরির উদ্যোগ নেয়। থ্রি-ডি প্রিন্টারের সাহায্যে ছোট ছোট ব্লক আকারে ক্যানেল হাউসটির বিভিন্ন অংশ তৈরি করে ঠিক যেভাবে লেগো দিয়ে বাড়ি বানানো হয় সেভাবে জোড়া দিয়ে এটি নির্মাণ করা হবে। আড়াই মিটার উচ্চতা ও প্রায় পৌনে দুই মিটার চওড়া ব্লকগুলো তৈরি হবে কারমার মেকার (Karmer Marker) নামক থ্রি-ডি প্রিন্টারে। ক্যানেল হাউজের প্রতিটি ঘরে ৬ থেকে ১০টি থ্রি-ডি প্রিন্টেড ব্লক প্রয়োজন হবে। ব্লকের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হবে ৮০ শতাংশ উদ্ভিদজাত তেল থেকে তৈরি বিশেষ ধরনের বায়ো-প্লাস্টিক। ২০১৭ সাল নাগাদ এটির নির্মাণকাজ শেষ হবে বলে ধারণা করছেন এর নির্মাতারা।
এখন পর্যন্ত স্থাপনা নির্মাণে সবচেয়ে বড় থ্রি-ডি প্রিন্টারের মালিক ইতালি। সেপ্টেম্বরে ইতালির রিটিতে একদল ডিজাইনার বেশ বড় আকারের থ্রি-ডি প্রিন্টার উন্মোচন করেন। নাম যার বিগ ডেল্টা, যা আকারে ৪০ ফুট লম্বা এবং এর ব্যাস ২০ ফুট। এই বিগ ডেল্টা থ্রি-ডি প্রিন্টারটি যথেষ্ট বিদ্যুৎসাশ্রয়ী। বাড়ি তৈরিতে এটিতে মাত্র ১০০ ওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হয়। আর এ কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশটি সচরাচর সহজলভ্য কাঁচামাল ব্যবহার করে। আকৃতি ও ডিজাইনের কারণে বিগ ডেল্টা খুব সহজে অল্প সময়ে বাড়ি তৈরি করতে সক্ষম বলে দাবি এর নির্মাতাদের।
এতে খরচ কম হওয়ার কারণ এটি মূলত দুর্যোগপ্রবণ বা দুর্যোগ আক্রান্ত এলাকাতে গৃহহীন মানুষের জন্য বাড়ি তৈরি করবে। যন্ত্রটি আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীর প্রায় ৪ বিলিয়ন মানুষের আবাসন তৈরিতে সাহায্য করবে বলে মনে করেন এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড অ্যাডভান্স সেভিং প্রজেক্ট (Wordl’s Advanced Saving Project-WASP)।
যদিও সনাতন পদ্ধতিকে দূরে সরিয়ে নিজের জায়গা করতে অনেকটা সময় ও সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে হবে নব এই প্রযুক্তিকে, তারপরও নির্মাণশিল্পে এর শুরুটা বেশ আশাব্যঞ্জক বলে মানেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৮তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৫