চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসেন যিনি

চ্যালেঞ্জ নিতে তিনি ভালোবাসেন। আর তাই কঠিন জেনেও শুরু করেন নির্মাণপণ্য ব্যবসা। ফলাফল প্রথম বছরেই ধাক্কা; ক্ষতি প্রায় ৬০ হাজার টাকা। ব্যবসার গোমর তখনো তিনি বোঝেননি। এই ক্ষতি অনেক বড় ধাক্কা হলেও হাল ছাড়ার পাত্র নন। আশপাশের সফল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আয়ত্ত করেন মুনাফা লাভের নানা কৌশল। শুরু করেন কম মুনাফায় গুণগতমানের পণ্য বিক্রি। ক্রমেই বদলাতে থাকে পরিস্থিতি। বাড়তে থাকে ব্যবসায়িক পরিসর, ভিড় করতে থাকেন ক্রেতারা। এরপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। এই দৃঢ়চেতা অদম্য মনোভাবের কারণে একজন সফল নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী হিসেবে আজ যিনি সগৌরবে প্রতিষ্ঠিত। বন্ধন-এর নিয়মিত আয়োজন ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বের এবারের সফল ব্যবসায়ী মো. মনজুর রহমান। মোমেনশাহী রোড, টঙ্গী, গাজীপুরের ‘মাহফুজ ট্রেডিং’-এর স্বত্বাধিকারী তিনি। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির আঞ্চলিক বিপণন ব্যবস্থাপক মো. সারাফাত হোসেনের সহযোগিতায় তুলে ধরা হলো তাঁর ব্যবসায়িক সাফল্য!

ব্যবসায়ী মো. মনজুর রহমানের জন্ম ১৯৬০ সালের ৭ অক্টোবর টঙ্গী, গাজীপুরে। বাবা মো. আবদুুল মজিদ মিয়া ও মা মরহুমা মরিয়ম বেগম। ১৯৭৮ সালে নোয়াগাঁও এমএ মজিদ মিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর লেখাপড়ার ইতি টেনে জড়িয়ে পড়েন পৈতিক ব্যবসায়। বাবা ছিলেন কাপড়ের ব্যবসায়ী। পরবর্তীতে আরো কিছু ব্যবসায় জড়ালেও তাতে আসেনি কাক্সিক্ষত সাফল্য। ১৯৯৩ সালে টঙ্গী বাজারে প্রথমবারের মতন শুরু করেন নির্মাণপণ্য ব্যবসা। এই ব্যবসাটিই তাঁকে এনে দেয় অভাবনীয় সাফল্য। বর্তমানে তিনি আকিজ সিমেন্টের টঙ্গী টেরিটরির সম্মানিক ডিলার।

মো. মনজুর রহমান প্রথম দিকে আকিজ সিমেন্ট বিক্রি করতেন খুচরা পর্যায়ে। পণ্যটির সম্ভাবনা উপলব্ধি করে ২০১৬ সালে নেন পণ্যটির পরিবেশকত্ব। গুণগতমানের এ পণ্যটি স্বল্প সময়ে তাঁকে এনে দেয় অনন্য ব্যবসায়িক সাফল্য। সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি কোম্পানির পক্ষ থেকে পেয়েছেন এসি, ফ্রিজ, ডিপফ্রিজ, এলইডি টিভি, ডিনারসেট, স্মার্টফোন, নগদ টাকা প্রভৃতি। এ ছাড়া প্রতিবছর কোম্পানির দেওয়া নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করায় পেয়েছেন মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, নেপালসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের অফার। আকিজ সিমেন্ট ছাড়াও বর্তমানে তিনি কেএসআরএম, জিপিএইচ ও এসএসআরএম স্টিলের একজন স্থানীয় ডিলার।

মনজুর রহমান একজন সফল ব্যবসায়ী হলেও দীর্ঘ ব্যবসায়ী জীবনে পেরিয়েছেন অনেক চড়াই-উতরায়। বেশ কিছু ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়েছেন নিজেকে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অধিকাংশ ব্যবসায়। অংশীদারির ভিত্তিতে পোলট্রি ফার্ম করেছিলেন কিন্তু সফল হননি; ক্ষতি হয়েছে অনেক টাকার। এরপর মিনারেল ওয়াটার প্ল্যান্ট ও  নিটিং ফ্যাক্টরি দেন। কিন্তু তাতেও বিধি বাম! লোকসান হয় প্রচুর অর্থের। তবে জমি ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবসায় তিনি ভালো করেছিলেন কিন্তু মন্দা ভাব বিরাজ করায় ব্যবসাটি আপাতত বন্ধ রেখেছেন। যা কিছু করেছেন সবই নিজের বুদ্ধিতে। ফলাফল কী হবে তা নিয়ে ভাবেননি। তবে যে ব্যবসায় করেন না কেন তা সৎভাবে করেছেন। নীতি-আদর্শ বিসর্জন দেননি কখনোই। ওজনে কম দেওয়া, নিম্নমানের পণ্য ভালো বলে চালিয়ে দেওয়ার মতো ছলচাতুরী করেও ব্যবসা করেননি। ফলে ব্যবসায়ী হিসেবে ক্রেতার কাছে তাঁর সততার সুনাম অনন্য।

ব্যবসায়ী মো. মনজুর রহমান বিয়ে করেন ১৯৮৯ সালে। স্ত্রী আমেনা রহমান। এ দম্পতির দুই মেয়ে এক ছেলে। বড় ছেলে মাহফুজুর রহমান রিয়াজ, ইনস্টিটিউট অব মেরিন একাডেমি (আইএমএ) থেকে মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। মেজ মেয়ে আফরোজা সুলতানা মিথি, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি (আইইউবিএটি) থেকে বিবিএ সম্পন্ন করেছেন এবং ছোট মেয়ে ফাহমিদা সুলতানা মাশফি এবার মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। ব্যবসায়ী মনজুর ব্যবসা নিয়ে চিরকালই ব্যস্ত। তা সত্ত্বেও ছেলে-মেয়েদের তিনি সুশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। পাশাপাশি তিনি টঙ্গী থানা পৌর রড-সিমেন্ট ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাবেক সহসভাপতি ও সাহেববাড়ী দারুস সালাম জামে মসজিদ কমিটির সদস্য। 

নির্মাণপণ্য ব্যবসা বেশ লাভজনক বিধায় অনেকেই সম্পৃক্ত হচ্ছেন এই ব্যবসায়। কিন্তু সাফল্য পাচ্ছে হাতেগোনা। এর অন্যতম কারণ না বুঝে; না জেনে ব্যবসা আরম্ভ করা। নতুন ব্যবসায়ীরা দোকানের ভাড়া বাড়িয়ে দিচ্ছেন, অধিক বা কম দামে পণ্য বিক্রি করে বাজার নষ্ট করছেন। অনেকেই প্রচুর বাকি দিচ্ছেন। কিন্তু তা ওঠাতে ব্যর্থ হয়ে দেওলিয়া হয়ে বিদায় নিচ্ছেন ব্যবসা থেকে। এভাবে তাঁরা যেমন নিজের ক্ষতি করছেন, তেমনি ব্যবসার পরিবেশও নষ্ট করছেন। ব্যবসায় সফল হতে চাইলে এই ব্যবসায়ীর পরামর্শ, আগে ব্যবসা শিখতে হবে; হতে হবে পরিশ্রমী। আর বাকির প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে নীতি-আদর্শ মেনে ব্যবসা করতে হবে। তবেই আসবে কাঙ্খিত সাফল্য।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৪তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৯।

মাহফুজ ফারুক
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top