মানুষের ভালোবাসাই যাঁর অর্জন

‘আমার বাবা ছিলেন একজন কৃষক। আমাদের মানুষ করতে তিনি প্রচুর পরিশ্রম করেছেন। বড় ভাই ব্যবসা শুরু করার পর আমরা তাঁকে সংসারের দায় থেকে মুক্তি দিই। ব্যবসায় যখন সচ্ছলতা, তখন ভাই আমাকে ব্যবসা করতে দেন ৬০ হাজার টাকা। ঐ টাকায় আমি বাজারে ঢেউটিনের ব্যবসা শুরু করি। বেশ চলছিল ব্যবসা! এরই মধ্যে বড় ভাই একটি কাপড়ের মিল স্থাপন করেন। কিন্তু নানা বিড়ম্বনার কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। মামলা-মোকাদ্দমা চলে দীর্ঘদিন। প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়। এমনকি একপর্যায়ে আমাদের পরিবার প্রায় নিঃস্ব হতে বসে। এই দুর্যোগ কাটিয়ে আমরা নতুন করে ব্যবসা শুরু করি; আবার ফিরে আসে সচ্ছলতা। এ সময়ই বাবা পাড়ি দেন না-ফেরার দেশে।’ জীবনের উত্থান-পতনের গল্পের এ পর্যায়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন সফল নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্। এস এস রোড, সিরাজগঞ্জের ‘মেসার্স জিন্নাহ্ ট্রেডার্স’-এর স্বত্বাধিকারী তিনি। বন্ধন-এর নিয়মিত আয়োজন ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বের এবারের সফল ব্যবসায়ী তিনি। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির আঞ্চলিক বিপণন কর্মকর্তা জিয়াউল হক জীবনের সহযোগিতায় জানাব তাঁরই জীবনের সাফল্য-রহস্য।

ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ জন্ম ১৯৬১ সালের ২৫ মে বেলকুচি, সিরাজগঞ্জে। বাবা মরহুম ময়দান আলী ও মা মরহুমা জয়ফুল বেগম। ১৯৭৭ সালে জ্ঞানদাইনী উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৭৯ সালে সিরাজগঞ্জ সরকারি বিশ^বিদ্যালয় কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৮৩ সালে একই কলেজ থেকে তিনি স্নাতকসম্পন্ন করেন। এরপর জড়িয়ে পড়েন বড় ভাইয়ের ব্যবসায়। ১৯৮৪ সালে এককভাবে শুরু করেন ঢেউটিন ব্যবসা। পরবর্তীতে ব্যবসায় যুক্ত হয় সিমেন্ট ও রড। ২০০৮-০৯ সালে সম্পৃক্ত হন আকিজ সিমেন্ট ব্যবসার সঙ্গে। গুণগতমানের এ পণ্যটি তাঁকে এনে দেয় অভাবনীয় ব্যবসায়িক সাফল্য। বর্তমানে তিনি আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির সিরাজগঞ্জ টেরিটরির একজন সেরা বিক্রেতা।

ব্যবসায়ী জিন্নাহ্ যে ব্যবসায় হাত দিয়েছেন, তাতেই পেয়েছেন সফলতা। কিন্তু সহজে আসেনি এ সাফল্য। এর পেছনে রয়েছে ব্যবসার প্রতি নিষ্ঠা, সততা আর কঠোর পরিশ্রম। যখন তিনি ঢেউটিন ব্যবসা শুরু করেন তখন ব্যবসাটি সম্পর্কে কোনো ধারণাই তাঁর ছিল না। পাশর্^বর্তী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ঢাকা যান, সেখান থেকে ঢেউটিন কিনে খুচরা পর্যায়ে বিক্রি শুরু করেন। দোকানে বেশ ভালোই বিক্রি হতে থাকে। সিদ্ধান্ত নেন ব্যবসার পরিসর বাড়ানোর। তখন উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ে ঢেউটিনের দোকান ছিল না বললেই চলে। ফড়িয়ারা শহর থেকে টিন কিনে গ্রামের হাটে হাটে বিক্রি করতেন। তিনি স্থানীয় সলোঙ্গা হাটে একটি দোকান ভাড়া নিয়ে শুধু হাটের দিন টিন বিক্রি করতেন। এ ছাড়া আশপাশের কিছু উপজেলায় পাইকারি ভিত্তিতে ব্যবসাও করতেন। এরপর সিমেন্ট ও রড ব্যবসার সঙ্গেও সম্পৃক্ত হন। এসব ব্যবসায় তিনি দারুণ সাফল্য অর্জন করেন। অভূতপূর্ব সাফল্যে তিনি বিভিন্ন কোম্পানির পক্ষ থেকে পেয়েছেন ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, টেলিভিশন, স্মার্টফোন, স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা। এ ছাড়া প্রতিবছর কোম্পানির দেওয়া নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করায় পেয়েছেন মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ অফার।

ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ বিয়ে করেন ১৯৯৩ সালে। তাঁর স্ত্রী সাবিহা সুলতানা শিউলি। এ দম্পতির একমাত্র ছেলে রাফিদ বিন জিন্নাহ্ সবুজ কানন উচ্চবিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। সিমেন্ট ব্যবসার পাশাপাশি তিনি ঠিকাদারিও করেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কাজেও জড়িত। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতি করছেন। বর্তমানে তিনি সিরাজগঞ্জ পৌর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি, চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক, মাওলানা ভাসানী ডিগ্রি কলেজের গভর্নিং বডির সদস্য এবং সিরাজগঞ্জ রড-সিমেন্ট ব্যবসায়ী সমিতির যুগ্ম সম্পাদক।

ব্যবসায় সাফল্য পেতে একজন ব্যবসায়ীকে কৌশলী হতে হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ব্যবসায়ী জিন্নাহ্। এখন সবাই যেভাবে ব্যবসা করে অর্থাৎ বিভিন্ন নির্মাণ সাইটে যাওয়া, ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, মিস্ত্রিদের উপহারসামগ্রী প্রদান ইত্যাদির কোনো কিছুই তিনি করেন না। তারপরও সবাই তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকেই পণ্য কেনেন। এর অন্যতম কারণ, তাঁর পারিবারিক ও রাজনৈতিক পরিচয়। অনেক বছর ধরে রাজনীতি করছেন কিন্তু কখনোই তিনি অনৈতিক সুবিধা নেননি। আর্থিক লেনদেনেও দারুন স্বচ্ছ। ঢাকা, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, বগুড়াসহ বিভিন্ন স্থানে মহাজনদের সঙ্গে ব্যবসা করেছেন কিন্তু কারও টাকা অপরিশোধিত রাখেননি। বছর শেষে প্রতিটি কোম্পানির হিসাব চুকিয়ে দিয়েছেন।

তাঁর জীবনে কোনো সফলতা নেই বলে তিনি মনে করেন। তবে একদিক থেকেই তিনি সফল বলে নিজেকে দাবি করেন। আর তা হচ্ছে মানুষের ভালোবাসা অর্জন। বাকি জীবনটা এই অর্জন নিয়েই বাঁচতে চান।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৭তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০।

মাহফুজ ফারুক
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top