পদ্মা, আড়িয়াল খাঁ, কুমার, পালরদীর মতো নদীবিধৌত জনপদ মাদারীপুর। নদী ছাড়াও চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য খাল-বিল। আগে এ জনপদের বিখ্যাত ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে খ্যাত ছিল শহরের প্রাণকেন্দ্র তরমুগরিয়া। ব্যবসা-বাণিজ্যের সেই ঐতিহ্য আগের মতো আর না থাকলেও নির্মাণপণ্য ব্যবসায় তরমুগরিয়া হয়ে উঠেছে অনন্য। মাদারীপুরের সফল একজন নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী মো. সালাহউদ্দিন। তরমুগরিয়ার শহীদ বাচ্চু সড়কে অবস্থিত ‘মেসার্স সাইফুল্লাহ এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী যিনি। বন্ধন-এর নিয়মিত আয়োজন ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে এবার জানাব তাঁর ব্যবসায়িক সফলতার রহস্য। সঙ্গে ছিলেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা জনাব এস এম মামুন।
ব্যবসায়ী সালাহউদ্দিনের জন্ম ১৯৭৯ সালের ৩ নভেম্বর মাদারীপুরে। বাবা হাজি আবদুল কাদির মিয়া ও মা হাজি হামিদুন্নেসা। ১৯৯৬ সালে মাধ্যমিক, ১৯৯৮ সালে উচ্চমাধ্যমিক আর ২০০০ সালে বি.কম পরীক্ষা শেষে শুরু করেন নির্মাণপণ্য ব্যবসা। শুরুটা রড ও সিমেন্ট দিয়ে। বর্তমানে তিনি বিএসআরএম, একেএস, এইচআরআরএম ইস্পাত, মেট্রোসেম স্টিল, কেএসআরএম স্টিলসহ বেশ কয়েকটি সিমেন্ট কোম্পানির স্থানীয় পরিবেশক।
ব্যবসার সূচনালগ্ন থেকেই বিক্রি করছেন আকিজ সিমেন্ট। প্রথম দিকে তিনি ছিলেন কোম্পানিটির এসিআরডি ডিলার। মাত্র ৫০ ব্যাগ সিমেন্ট দিয়ে শুরু হয় তাঁর এ ব্যবসায়িক যাত্রার। গুণগতমানসম্পন্ন এ পণ্যটি ব্যবসায় স্বল্প সময়েই তাঁকে এনে দিয়েছে অভাবনীয় সাফল্য। তিনি আকিজ সিমেন্টের মাদারীপুর টেরিটরির অন্যতম সেরা বিক্রেতা। পণ্যটি বিক্রিতে ২০১৭-১৮ সালে অর্জন করেন তৃতীয় সেরা বিক্রেতার স্বীকৃতি। এমন অভূতপূর্ব সাফল্যে তিনি আকিজ সিমেন্টসহ অন্যান্য কোম্পানির পক্ষ থেকে পেয়েছেন মোটরসাইকেল, ফ্রিজ, টিভি, এয়ারকুলার, স্মার্টফোন, ডিনার সেট, স্বর্ণালংকার, নগদ টাকার মতো উপহারসামগ্রী। এ ছাড়া প্রতিবছর কোম্পানির দেওয়া নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করায় পেয়েছেন ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ভুটান, নেপাল, ভারতসহ নানা দেশ ভ্রমণের অফার।
বাসার পাশেই সারি সারি নির্মাণসামগ্রীর দোকান। সেসব দোকানের রমরমা বিকিকিনি দেখতে দেখতেই তিনি বড় হয়েছেন। বাল্যকাল থেকেই সম্ভাবনাময় এ ব্যবসাটির প্রতি তাঁর আগ্রহ জন্মে। কিন্তু এ ব্যবসায় আসার আগে ন্যূনতম অভিজ্ঞতা ছিল না ব্যবসায়ী হিসেবে। রমরমা এ ব্যবসাপল্লীতে নিজেদের জায়গা থাকায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য সাহস জোগালেও ব্যবসাটির আদ্যোপান্ত না জেনে ব্যবসা শুরুর বোকামি তিনি করেননি। আশপাশের কয়েকজন অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী ও তাঁদের ছেলেদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলে কৌশলে জেনে নেন ব্যবসার বিস্তারিত। যদিও প্রথম দিকে ব্যবসা গুছিয়ে নিতে কিছুটা বেগ পেতে হয়েছে তা সত্তে¡ও স্বল্প সময়ের মধ্যেই পেয়েছেন কাঙ্ক্ষিত সাফল্য।
ব্যবসায়ী সালাহউদ্দিন বিয়ে করেন ২০০৪ সালে। তাঁর সহধর্মিণী মিসেস নার্গিস। এ দম্পত্তির দুই মেয়ে। বড় মেয়ে সিনথিয়া পৌর মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আর ছোট মেয়ে সারা এফএইচ কিন্ডারগার্টেন স্কুলে প্লে গ্রুপে পড়ছে। বাবা-চাচার সঙ্গে যৌথ পরিবারেই বসবাস তাঁর। বাবা ছিলেন শিক্ষক আর মা মাদারীপুর নিরাময় ক্লিনিকের অন্যতম ব্যবসায়িক অংশীদার। দুই বোনের মধ্যে বড় রাশিদা আক্তার পলি, ছোট বোন সাদিয়া আফরোজ প্রমি কুমিল্লা আর্মি মেডিকেল কলেজে পড়ছে। তাঁর চাচা ডা. মো. আবদুুল ওয়াদুদ ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক। চাচাতো ভাই-বোনের মধ্যে বড় সায়মা সামিয়া বিপা স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে, মেজো মো. সাইফুল্লাহ আসমত আলী খান পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে এবং ছোট ইলমা ইয়াসা ডনোভান সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
ব্যবসার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংগঠনিক কাজেও জড়িত ব্যবসায়ী সালাহউদ্দিন। তিনি মাস্টার কলোনি সমাজকল্যাণ পরিষদ সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। নিজ গ্রাম জাফরাবাদের স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসা ও কবরস্থানের জন্য তাঁর পরিবার এলাকায় প্রায় ৮০ শতাংশ জমি দান করেছে। তাঁর ব্যবসায় যুক্ত আছে প্রায় ৩০ জন কর্মী। স্থানীয় বাজারে তাঁর রয়েছে ৪টা শোরুম ও ১টা গোডাউন। নির্মাণপণ্যের এ ব্যবসাটি সফলভাবে পরিচালনায় তাঁর অন্যতম সহযোগী মো. মাসুম বিল্লাহ।
ব্যবসায়ী সালাহউদ্দিন নির্মাণপণ্য ব্যবসাতে দারুণ সফলতা পেলেও চান মাদারীপুরের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে। আর সে লক্ষ্য সামনে রেখেই তিনি তাঁর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। বর্তমানে প্রায় ১০টি ব্র্যান্ডের নির্মাণপণ্যের পরিবেশক হলেও দ্রুতই অপ্রচলিত ব্র্যান্ড বাদ দিয়ে মানসম্মত পণ্য নিয়েই আগামীতে এগোতে চান।
প্রকাশকাল: ১০১তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৮।