• Home
  • মূল রচনা
  • মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় স্মৃতি স্মারক মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ
Image

মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় স্মৃতি স্মারক মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ

বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার মৃত্যুর পর অস্তমিত হয় বাংলার স্বাধীনতার সূর্য। এখান থেকেই পরে শুরু হয়েছিল স্বাধীনতাকামী স্বাধীন বাংলার নকশা পত্তন। অর্থাৎ মেহেরপুরে স্থাপিত হয়েছিল বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী। ১০ এপ্রিল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার গঠন করা হয় মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায়, যা নতুন নাম ধারণ করে মুজিবনগর। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভা এই মুজিবনগরে (বৈদ্যনাথতলায়) শপথ নেয়। এখানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস-সংবলিত একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে। স্থাপত্যরীতির মাধ্যমে ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ধারাবাহিক ইতিহাস এই স্মৃতিসৌধ ও মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ, বাঙালির সংগ্রাম ও ত্যাগের মহান এক প্রতীক। মুজিবনগরের আম্রকাননে ২০.১০ একর জমিতে সহস্রাধিক বৃক্ষের নিরিবিলি সবুজ-শান্ত পাখি ডাকার গর্বিত এক অহংকার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্মৃতির এ মিনার। ১৯৭১ সালে ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের স্মৃতির উদ্দেশে নির্মিত এ সৌধটি নান্দনিক আর শৈল্পিক দিক থেকে যেমন অনন্য, ঐতিহাসিক বিচারে এ স্থানটির গুরুত্বও তেমনি বিশ্বখ্যাত। কেননা এরই মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথম কোনো সরকার গঠনের প্রয়াস পেয়েছিল।

মেহেরপুর জেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের অবস্থান। স্মৃতিসৌধে পৌঁছার আগেই সড়কের পূর্ব পাশে দর্শনার্থীদের জন্য তৈরি করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন পিকনিক স্পট। নির্মাণ করা হয়েছে জেলা পরিষদের ডাক বাংলো ‘সূর্যোদয়’। সড়কের পূর্ব পাশে স্মৃতিসৌধের মানচিত্র, ১৯৭১ সালে গঠিত অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রিসভার নাম ও ছবিসহ বড় আকারের সাইনবোর্ড তৈরি করা হয়েছে। যার মাধ্যমে দর্শনার্থীরা মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের অবস্থান, গুরুত্ব, অস্থায়ী সরকারের গুরুত্ব সহজেই বুঝতে পারে। সোজা সড়ক দিয়ে স্মৃতিসৌধের প্রবেশপথে দুটি ৮ ও ৪ ফলকের তোরণ বা গেট নির্মাণ করা হয়েছে, যেগুলো মূল সৌধকে অন্যান্য স্থাপনা থেকে সহজেই আলাদা করেছে।

২৩টি কংক্রিটের ত্রিকোণ দেয়ালের সমন্বয়ে উদীয়মান সূর্যের প্রতীকরূপে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ নির্মিত। ১৬০ ফুট ব্যাসের গোলাকার স্তম্ভের অর্ধাংশের ওপর বেদিকে কেন্দ্র করে ভূ-তল থেকে উচ্চতা ৩ ফুট ৬ ইঞ্চি। ২ ফুট ৬ ইঞ্চি উচ্চতায় দেয়ালগুলো দণ্ডায়মান। সমকোণী ত্রিভুজ আকৃতির দেয়ালগুলোর প্রথমটির উচ্চতা ৯ ফুট ও দৈর্ঘ্য ২০ ফুট। প্রতিটি দেয়াল ক্রমাগত দৈর্ঘ্যে ১ ফুট উচ্চতায় ৯ ইঞ্চি করে বৃদ্ধি পেয়ে ২৩তম দেয়ালের দৈর্ঘ্য হয়েছে ৪২ ফুট আর উচ্চতা ২৫ ফুট ৬ ইঞ্চি।

প্রখ্যাত স্থপতি তানভীর করিম এই ঐতিহাসিক স্মৃতিসৌধের স্থাপত্য নকশা করেন। পরে স্থাপত্য অধিদপ্তর এটির পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনে মেসার্স এভরিডে ইঞ্জিনিয়ারিং নির্মাণ প্রতিষ্ঠান স্মৃতিসৌধটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে। স্মৃতিসৌধটি নির্মাণে ৫২৫ টন সিমেন্ট, ৭০ টন লোহা, ৮ লাখ ইট, ২০ হাজার ঘনফুট পাথর, ৩০ হাজার ঘনফুট বালু, ৪২ হাজার ঘনফুট কংক্রিট ব্যবহৃত হয়েছে।

স্মৃতিসৌধটি ১১ সেক্টরে বিভক্ত। এগুলো হলোÑ

১.     ২৩টি স্তম্ভ : রক্তাক্ত সূর্য থেকে ২৩টি সূর্যের রশ্মি বরাবর সমগ্র দক্ষিণাংশে ২৩টি ফলক বা স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। এ ২৩টি ফলক দ্বারা ১৯৪৮-৭১ সাল পর্যন্ত ২৩ বছরের পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানি বর্বরতা বা অত্যাচারকে নির্দেশ করা হয়েছে। ২৩ ফলকের শুরু হয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে।

২.    রক্তাক্ত সূর্য : সৌধের মাঝখানে লাল ইট দিয়ে একটি মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে, যার নাম রক্তাক্ত মঞ্চ। এখানেই ১৯৭১-এ অস্থায়ী সরকার শপথ গ্রহণ করে। তাই এটিকে রক্তাক্ত সূর্য বা রক্তাক্ত মঞ্চ বলা হয়।

৩.    বুদ্ধিজীবীর মাথার খুলি : রক্তাক্ত সূর্য থেকে উত্তর-পূর্বে সিঁড়ি পর্যন্ত চত্বরে ১ লাখ গোলাকৃতির ঢালাই করা হয়েছে, যা মুক্তিযুদ্ধের সময়ের এক লাখ বুদ্ধিজীবীর মাথার খুলি নির্দেশ করে।

৪.    ৩০ লাখ শহীদ : সিঁড়ির পশ্চিম দিকে প্রায় ৩ ফুট উঁচুতে রক্তাক্ত সূর্য থেকে উত্তর-পশ্চিমাংশে জুড়ে ৩০ লাখ নুড়ি পাথরের ঢালাই রয়েছে। যেটি মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ বিসর্জনকারী ৩০ লাখ শহীদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

৫.    বে অব বেঙ্গল : সৌধের দক্ষিণ ও পূর্ব অংশজুড়ে আম বাগানে পাথরের ঢালাই করা স্থানটি বে অব বেঙ্গল অর্থাৎ বঙ্গোপসাগরকে নির্দেশ করে। যদিও বে অব বেঙ্গল মঞ্চের উত্তরে। কিন্তু দক্ষিণে বে অব বেঙ্গল হলে স্মৃতিসৌধের মঞ্চ ঘুরে যায়। এ জন্য তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এরশাদের নির্দেশে এটি মঞ্চের উত্তরে রাখা হয়েছে।

৬.   একুশে ফেব্রুয়ারি : স্মৃতিসৌধের প্রধান পিচঢালা সোজা রাস্তা, যেটি মূল সৌধের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এটির দ্বারা ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনকে স্মরণ করা হয়েছে। এ রাস্তা দিয়ে কোনো ইঞ্জিনচালিত যানবাহন প্রবেশ করে না। সবাই পায়ে হেঁটে এখানে আসে।

৭.    রক্তের সাগর : সৌধের প্রধান সড়ক বরাবর একটি ঢালু রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সময় রক্তের বন্যা বা রক্তের সাগরকে বোঝানো হয়েছে। স্মৃতিস্তম্ভের পশ্চিম পাশে একটি বিশাল মেহগনি গাছ রয়েছে। জনশ্রুতি আছে, এটি ইংরেজ গভর্নর রবার্ট ক্লাইভের হাতে লাগানো।

৮.    ১৯টি জেলা : ৩০ লাখ পাথরের ঢালাইকে আবার ১৯ কলামে ভাগ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের ১৯টি জেলাকে বোঝানো হয়েছে।

৯.    ৭.৫ কোটি জনসংখ্যা : রক্তাক্ত সূর্য থেকে ফলকের পাদদেশ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের তৎকালীন বাংলাদেশের ৭.৫ কোটি জনতাকে বোঝানোর জন্য ৭.৫ কোটি মোজাইক পাথর দিয়ে ঢালাই করা হয়েছে। যে পাথরগুলো ২৩টি সূর্যের রশ্মিতে বিভক্ত।

১০.  ১১টি সিঁড়ি : সৌধে ওঠার জন্য দক্ষিণ-পূর্ব অংশজুড়ে ১১টি ধাপে সিঁড়ি রয়েছে। এ সিঁড়িগুলো মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভক্ত বাংলাদেশের ১১টি সেক্টরকে নির্দেশ করে।

১১.  পিলার : প্রথম ফলকের উচ্চতা ৯ ফুট ৯ ইঞ্চি। পরবর্তী প্রতিটি ফলকের উচ্চতা ৯ ইঞ্চি করে বাড়ানো হয়েছে। এ ৯ ইঞ্চি উচ্চতা বাড়ানোর ফলে ১৯৭১ সালের দীর্ঘ ৯ মাস ৯ দিন বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধকে বোঝানো হয়েছে। প্রতিটি ফলকের প্রতি সারিতে অনেকগুলো ছিদ্র রয়েছে। এটি দ্বারা মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত গুলি নির্দেশ করা হয়েছে। পরবর্তী প্রতিটি পিলারের ক্রমাগত দৈর্ঘ্য ১ ফুট উচ্চতায় ৯ ইঞ্চি করে বেড়েছে।

স্মৃতিসৌধের বর্তমান অবস্থা

শিল্পের বিচারে স্মৃতিসৌধটি যেমন নজরকাড়া ঐতিহাসিক দিক থেকেও তেমনি এটি মহিমায় ভাস্বর। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে প্রয়োজনীয় সরকারি তদারকি বা তত্ত্বাবধানের অভাবে এ স্মৃতিসৌধের ঔজ্জ্বল্য ও গুরুত্ব দিন দিন হ্র্াস পাচ্ছে। কারণ, স্মৃতিসৌধ রক্ষণাবেক্ষণে নিযুক্ত নেই কোনো কর্মচারী। স্মৃতিসৌধ নির্মাণের পর ডাইভারশন রোডের পাশে ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩৩টি সোডিয়াম বাতি বসানো হয়েছিল। সেগুলোর অধিকাংশ নষ্ট হয়ে গেলেও ঠিক করা হচ্ছে না। স্মৃতিসৌধের ওপর জুতা পায়ে মানুষ তো বটেই গরু-ছাগলও অবাধে হেঁটে বেড়ায়। মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ কেন নির্মিত হয়েছে, এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী- তা ব্যাখ্যা করার মতো কেউই নেই। কোথাও নেই কোনো সংক্ষিপ্ত বিবরণী। প্রবেশ তোরণের পাশে একটি ছোট্ট, জীর্ণ সাইনবোর্ড আছে বটে, কিন্তু সেটি ভুল বানানে ভরা। ফলে প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী এখানে এসে অতৃপ্তি নিয়ে ফিরে যায়।

মুজিবনগর কমপ্লেক্স

স্মৃতিসৌধের পাশে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি কমপ্লেক্স। কমপ্লেক্সের ভেতরে ও বাইরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক বিভিন্ন ধ্বংসলীলা ভাস্কর্যের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।

  • গোলাপ বাগান : মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লে¬ক্সের প্রধান প্রবেশপথের দুই পাশে পশ্চিম ও পূর্ব দিকে দুটি গোলাপ বাগান নির্মাণ করা হয়েছে। যেখানে ছয় প্রকৃতি/রঙের গোলাপ ফুলের চারাগাছ সন্নিবেশিত হয়েছে। এখানে ছয় প্রজাতির গোলাপ ফুল দ্বারা ১৯৬৬ সালে লাহোরে উত্থাপিত ঐতিহাসিক ছয় দফাকে স্মরণ করা হয়েছে। যার প্রথম দফা ছিল পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসন।
  • ১৯৭১ সালে নিরস্ত্র মানুষকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক নির্মমভাবে গুলি ও হত্যা : বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পশ্চিমের ভাস্কর্যে অঙ্কিত হয়েছে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক এ দেশের স্বাধীনতাকামী জনগণের প্রতি নির্দয়ভাবে গুলি ও হত্যাকাণ্ডের চিত্র। এ দৃশ্যে তিনজন পাকিস্তানি সেনা এ দেশের মুক্তিকামী পুরুষ ও মহিলাকে চোখে কাপড় বেঁধে নির্দয়ভাবে হত্যা করেছে এবং একজন নারী ও চারজন পুরুষকে গুলি করার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ দৃশ্যের মাধ্যমে তৎকালীন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতাকে বোঝানো হয়েছে।
  • নারী নির্যাতন : পশ্চিম দিকের তৃতীয় ভাস্কর্যে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এ দেশের মা-বোনদের ওপর পাকিস্তানি হানাদারদের নির্যাতনের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পৈশাচিক নির্মম নির্যাতনের নিখুঁত চিত্র এখানে সন্নিবেশিত হয়েছে। এ দৃশ্যে দেখা যাচ্ছে একটি খুঁটির সঙ্গে গলায় কাপড় পেঁচিয়ে একজন নারীকে শারীরিক নির্যাতন ও সম্ভ্রমহানি করা হয়েছে। আরেকজন নারীকে পাকিস্তানি হানাদার টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে।
  • অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসযজ্ঞ : পশ্চিম দিকের সর্বশেষ ভাস্কর্য ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনা কর্তৃক এ দেশীয় মুক্তিকামী জনতার বাড়ির বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। এ দৃশ্যে তিনজন সেনার হাতে আগুনের মশাল দিয়ে বাড়িতে অগ্নিসংযোগের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
  • বঙ্গবন্ধুর ভাষণরত ভাস্কর্য : প্রবেশপথের পশ্চিমাংশের ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম স্থাপিত হয়েছে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রদত্ত ঐতিহাসিক ভাষণের ভাস্কর্য।
  • মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি কর্নেল এম এ জি ওসমানীর ভাস্কর্য
  • বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতিকে গার্ড অব অনার প্রদান : পূর্ব দিকের দ্বিতীয় ভাস্কর্যে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে সেনাবাহিনীর গার্ড অব অনার প্রদানের দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে। এ দৃশ্যে আটজন সেনা একজন নায়কের নেতৃত্বে রাষ্ট্রপতিকে গার্ড অব অনার প্রদান করছেন এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম সালাম জানিয়ে গার্ড অব অনার গ্রহণ করছেন।
  • মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডারদের বৈঠক (তেলিয়াপাড়া সম্মেলন) : প্রবেশপথের পূর্বে তৃতীয় ভাস্কর্যে একটি ঐতিহাসিক সম্মেলনের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল সিলেটের তেলিয়াপাড়ায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস, আনসার ও পুলিশ বাহিনীর উচ্চপদস্থ বাঙালি সদস্যরা এক বৈঠকে মিলিত হয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মিলিত আক্রমণের পরিকল্পনা করে। এ সম্মেলনকে বলা হয় ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়া সম্মেলন। এখানে উপস্থিত ছিলেন এম এ জে ওসমানী, ডিসি পান্ডে, রেজা, নুরুজ্জামান, শফিউল্ল¬াহ, রব, সাফায়াত জামিল, রাকিব, মইনুল, নুরুল, খালেদ ও জিয়াউর রহমান।
  • ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক দৃশ্য : পূর্ব দিকের সর্বশেষ ভাস্কর্যে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। আত্মসমর্পণপত্রে পাকিস্তানি বাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডারের অধিনায়কেরা লে. জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী ও বাংলাদেশ ও ভারতের সম্মিলিত মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান সেনাপতি লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা স্বাক্ষর করেন। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার। এ ছাড়া এখানে বেশ কিছু সেনাসদস্যও উপস্থিত ছিলেন। এ ভাস্কর্যের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিজয়ের ঐতিহাসিক মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর

স্মৃতি কমপ্লে¬ক্সের অভ্যন্তরে উত্তর-পূর্ব দিকের সাতটি কক্ষে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক চালানো ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যাকাণ্ডের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

১.     পাকিস্তানি বাহিনীর ধ্বংসকৃত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার : ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারিতে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতির উদ্দেশে স্থপতি হামিদুর রহমানের সুনিবিড় কারুকার্যে স্থাপিত হয়েছিল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। স্মৃতি কমপ্লে¬ক্সে প্রবেশের পর পূর্ব দিকে প্রথম কক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক পরিচালিত ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। এখানে দুজন সেনাসদস্য ও একটি ট্রাঙ্কের ভেতরে একজন শহীদ মিনার ধ্বংসের কাজে ব্যস্ত থাকার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। শহীদ মিনারের মধ্যখানের পিলার বা ফলক ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং ট্রাঙ্কের কামান ওই ভাঙা অংশের দিকে তাক করে রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে এ দেশের ভাষার জন্য প্রাণ বিসর্জনকৃত শহীদদের প্রতি চরম অবমাননা করা হয়েছে, যা এ চিত্রে দৃশ্যমান।

২.    ধ্বংসকৃত জাতীয় প্রেসক্লাব : রাজধানী ঢাকার বর্তমানে তোপখানা রোডের পাশে অবস্থিত জাতীয় প্রেসক্লাবও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনারা এটিরও ক্ষতিসাধন করে। দ্বিতীয় কক্ষে পাঁচজন সেনা (ট্রাঙ্কে একজন) ট্রাঙ্ক-সহযোগে স্বাধীন মতপ্রকাশের এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর চিত্র অঙ্কিত হয়েছে।

৩.    সচিবালয় আক্রমণ ও ধ্বংসযজ্ঞ : তৃতীয় কক্ষে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম সরকারি স্থাপনা সচিবালয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর দৃশ্য স্থাপিত হয়েছে। এখানে চারজন (ট্রাঙ্কে একজন) সেনাসদস্য ট্রাঙ্ক-সহযোগে সচিবালয়ে আক্রমণরত অবস্থার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

৪.    রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমণ ও ধ্বংসযজ্ঞ : চতুর্থ কক্ষে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আক্রমণ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে। এ চিত্রে দেখা যাচ্ছে দুজন দাঁড়িয়ে, দুজন বসে এবং পাঁচজন শুয়ে পুলিশ লাইনে আক্রমণ চালাচ্ছে।

৫.    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ হলে নির্মম হত্যাযজ্ঞ : পঞ্চম কক্ষে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে পরিচালিত নির্মম হত্যাযজ্ঞের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এ দৃশ্যে হলের কাছে বেশ কিছু লাশের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে, যার মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা স্পষ্ট করা হয়েছে।

৬.   পিলখানা আক্রমণ : ষষ্ঠ কক্ষে তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলসের সদর দপ্তর পিলখানায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক আক্রমণ ও ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র রূপায়িত হয়েছে। এ চিত্রে একটি টিনশেডের (পিলখানা) স্থাপনায় আটজন সেনা আক্রমণ ও ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালনারত অবস্থায় দেখা যাচ্ছে।

৭.    রায়েরবাজারে সৃষ্ট বধ্যভূমিতে নির্মম হত্যাযজ্ঞ : সপ্তম কক্ষে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক ঢাকার রায়েরবাজারে সৃষ্ট বধ্যভূমিতে নির্মম হত্যাযজ্ঞের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এখানে বিচ্ছিন্নভাবে বেশ কিছু লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়, যা সে সময়ের পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মমতাকে নির্দেশ করে।

মানচিত্র

মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লে¬ক্সের মূল আকর্ষণ হলো বিশালকায় বাংলাদেশের মানচিত্র। এ মানচিত্রে দেশের প্রধান প্রধান নদীর অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে। মুক্তিযদ্ধকালীন বিভক্ত ১১ সেক্টরে মুক্তি সংগ্রামের পর্যায় ও প্রকৃতি সামগ্রিক মানচিত্রে তুলে ধরা হয়েছে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৭তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৫

Related Posts

হাইওয়ের বুকে খাড়া শহর: নগরের নতুন ভাষা

হাইওয়ে একদিকে যেমন চলাচলের জন্য অপরিহার্য, অন্যদিকে এটি শহরের ভেতরের জীবনকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এমনই এক দ্বন্দ্বের মধ্যে…

ByByshuprova Apr 20, 2026

বন্যা প্রতিরোধী বাঁশের বাড়ি নির্মাণের এখনই সময়

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। সাগর উপকূলে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ব-দ্বীপ বাংলাদেশ। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বন্যা বাংলাদেশের জন্য খুবই…

পাহাড়ের ঢালে খোদাই করা ‘নট আ হোটেল সেতোউচি’

এর নকশাটি ছিল সরাসরি জাপানি লোকজ স্থাপত্য থেকে অনুপ্রাণিত। যা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান সংবেদনশীলতার মাধ্যমে এর যুক্তিকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে।…

নদীর মাঝে ফুটে ওঠা কংক্রিটের টিউলিপ পার্ক

প্রায় আড়াই একর জায়গাজুড়ে রয়েছে ঘোরানো হাঁটার পথ, সাজানো বাগান, আর ৭০০ আসনের একটি এম্ফিথিয়েটার। ২৬০ মিলিয়ন ডলারের…

01~1
previous arrow
next arrow

CSRM

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

কী কী থাকছে আকাশছোঁয়া শান্তা পিনাকলে
সমুদ্রবাণিজ্যের বর্জ্য থেকে অনন্যা এক স্থাপত্য
Home of Haor
Weather
Youth Park
Tower
শহর,সেতু আর সুরের টেনেসির আর্টস সেন্টার
Al Hamra
Teroshri Mosq