কীর্তিপাশার কীর্তি

রাজা কীর্তিনারায়ণের নামে কীর্তিপাশা জমিদারবাড়ি। বরিশাল থেকে ঝালকাঠি, এরপর ১০ মিনিটের অটো রাস্তা। রাস্তা খুব একটা ভাঙাচোরা তা কিন্তু নয়। বরিশাল শহরটা ছবির মতো সুন্দর হলেও ঝালকাঠিতে এখনো তেমন একটা শহুরে ছাপ লাগেনি। কিন্তু যতটুকু লেগেছে তাতেই সুন্দর ছিমছাপ রূপ নিয়েছে শহরটি। এর ফেলে আসা অতীত ছিল আরও সুবর্ণময়। কীর্তিপাশা রাজবাড়ি যার জ্বলন্ত প্রমাণ।

ইতিহাসের কীর্তিপাশা

কীর্তিপাশা জমিদার পরিবার ছিল ঝালকাঠি জেলার বৈদ্যবংশীয় জমিদার। কীর্তিপাশার জমিদারদের আদি নিবাস বিক্রমপুর পরগনার পোড়াগাছা গ্রামে। ধারণা করা হয়, দুর্গাদাস সেন এই জমিদার পরিবারের আদি পুরুষ। এর আগের ইতিহাস তেমন জানা যায় না। গেলেও তা ভাসা-ভাসা। দুর্গাদাস সেনের পুত্র রামজীবন। রামজীবনের দুই পুত্র রামগোপাল ও রামেস্বর সেন। এ বংশের রাজকৃষ্ণ সেন ঢাকায় মোগল সরকারের চাকুরে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে রাজকৃষ্ণের পুত্র কৃষ্ণরাম, বিষ্ণুরাম ও রঘুনাথ সেলিমাবাদ পরগনার (রায়েরকাঠি) জমিদার রাজা জয়নারায়ণের অধীনে চাকরি করেন। রঘুনাথ সেন স্বীয় দক্ষতার গুণে রায়েরকাঠি রাজাদের প্রধান দেওয়ান নিযুক্ত হন এবং মোগল সরকার থেকে ‘মজুমদার’ পান। ঢাকার নায়েব নাজিম নওয়াজিস মুহম্মদের আমলে কৃষ্ণরামের বুদ্ধিমত্তার গুণে একসময় খাজনা অনাদায়ের কারণে সেলিমাবাদের জমিদারি নিলাম থেকে রক্ষা পায়। পুরস্কারস্বরূপ রাজা জয়নারায়ণ একটি বৃহৎ তালুক (কীর্তিপাশা) সৃষ্টি করে তাঁকে দান করেন। রায়েরকাঠির রাজা জয়নারায়ণের পৃষ্ঠপোষকতায় আঠারো শতকের মধ্যেই কীর্তিপাশার সেন পরিবার একটি বৃহৎ জমিদার পরিবারে পরিণত হয়। কীর্তিপাশার জমিদারদের মধ্যে কাশীরাম তিন আনি, কৃষ্ণরাম ও রাজারাম ছয় আনি, বিষ্ণুরাম তিন আনি এবং বলরাম সেন চার আনি জমিদারির স্বত্ব লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে বিষ্ণুরাম সেন, বলরাম সেন ও কাশীরাম সেন স্ব স্ব নামে সেলিমাবাদ পরগনায় জমিদারি কেনেন।

কীর্তিপাশার জমিদাররা কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘মজুমদার’ এবং  চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর ‘চৌধুরী’ উপাধিতে ভূষিত হন। এই পরিবারে রাজকুমার সেনের আমলে ১২৪৪ বঙ্গাব্দে জমিদারি নিয়ে গৃহবিবাদ শুরু হয়। বরিশালের সাব জজ কীর্তিপাশায় উপস্থিত হয়ে এ বিবাদের অবসান ঘটান। রাজকুমারের মৃত্যুর পর তৎপুত্র প্রসন্নকুমার রায় চৌধুরী নাবালক থাকায় এ জমিদারি বরিশালের জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে কোর্ট অব ওয়ার্ডসের অধীনে যায় এবং সহকারী কালেক্টর মি. রেলি প্রসন্নকুমারের অভিভাবক নিযুক্ত হন। পরে কোর্ট অব ওয়ার্ডস থেকে মুক্ত হয়ে কীর্তিপাশার জমিদারি বড় হিস্যা ও ছোট হিস্যায় বিভক্ত হয়।

প্রসন্নকুমার রায় চৌধুরী ১৮৭১ সালে কীর্তিপাশায় একটি মধ্য ইংরেজি স্কুল ও ১৮৭২ সালে একটি দাতব্য হাসপাতাল ও পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৭৬ সালে গভর্নর জেনারেল লর্ড নর্থব্রুক (১৮২৬-১৯০৪) ঢাকায় এলে তিনি একজন মানী ব্যক্তি হিসেবে আমন্ত্রিত হন। ১৮৭৭ সালে প্রিন্স অব ওয়েলস কলকাতায় আসলে প্রসন্নকুমার তাঁর দরবারে উপস্থিত ছিলেন। তিনি কলকাতার জুওলজিক্যাল গার্ডেন, রয়েল এশিয়াটিক সোসাইটি, জমিদারি পঞ্চায়েত এবং ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ছিলেন। তাঁর পুত্র রোহিনী কুমার রায় চৌধুরী ঔপন্যাসিক ও ইতিহাসবিদ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। রোহিনীকুমার রায় চৌধুরীর বরিশালের ইতিহাস ‘বাকলা’ এবং পারিবারিক ইতিহাস ‘আমার পূর্বপুরুষ’ দুটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। এ পরিবারের শশীকুমার রায় চৌধুরী ছিলেন একজন সংগীতজ্ঞ। তা ছাড়া অধ্যাপক তপন কুমার রায় চৌধুরী বর্তমান সময়ের একজন খ্যাতনামা ঐতিহাসিক ও লেখক।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর এ জমিদার পরিবারের অধিকাংশ সদস্য দেশ ত্যাগ করেন। ১৯৫০ সালে জমিদারি বিলুপ্তি আইন কার্যকর হলে কীর্তিপাশা জমিদারির দীর্ঘ ইতিহাসের অবসান ঘটে। উত্তরাধিকারীরা সরকারের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ লাভ করেন।

জমিদারবাড়ির স্থাপত্যকলা

জমিদারবাড়ির ঢোকার ফটকেই কমলিকান্দর নবীনচন্দ্র বালিকা বিদ্যালয়। এই বাড়িটিতে বিদ্যালয় স্থাপিত হয় ১৯৭৫ সালে। এর বাইরেই বিশাল দুটো দিঘি। এগুলোতে এখন মাছ চাষ হয়। আগে এগুলো ছিল জমিদারদের সম্পত্তি। বিদ্যালয় ভবনের ফটক পেরোতেই চট করে সামনে চলে আসে ফেলে আসা অতীত। যেন একসময় সুড়ঙ্গ। স্কুল ভবনটি অপেক্ষাকৃত নতুন। এই নতুন ভবনটি স্কুলের জন্য ব্যবহৃত হলেও পেছনের ভবনগুলো এখন আর ব্যবহার করা হয় না।

স্কুল ভবনের স্থাপত্য পোস্ট লিন্টেল স্ট্রাকচার সিস্টেমের। প্রাঙ্গণে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড্ডয়নরত। কলামগুলো আয়োনিক কলাম রীতির বিবর্তিত রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কলাম পোস্ট দেখলেই বোঝা যায় জমিদারবাড়ির স্থাপত্যকলা পুরোপুরি মোগলদের কাছ থেকে নেওয়া নয়। কিছুটা মিশেছে এদেশীয় স্থাপত্যরীতিও। ইংরেজি এল আকৃতির ভবনে মোট কক্ষ আছে ২০টিরও বেশি। এগুলোতে নিয়মিত ক্লাস হয়। পাশেই স্থাপিত নতুন ভবন। এগুলো আবার একদম নব্য স্থাপত্যরীতির। হয়তো পুরোনো স্থাপত্যকলাকে নকল করার মতো শৈল্পিক শিল্পী এখন আর নেই।

স্কুল ভবনের পাশেই পুরোনো মন্দির। সঙ্গে আছে ছোট একটি নাটমন্দির। এই মন্দিরে একসময় শিবপূজা হতো। এখন সবই কালের সাক্ষী। শিবমন্দিরের স্থাপত্যকলা একদমই দেশীয় স্থাপত্যকলা। মোগল আমলের আগে এ দেশে এ ধরনের স্থাপত্যকলার নির্মাণ ছিল অহরহ। মন্দিরের ছাদটাকে ছাউনির আকার দেওয়া হতো। সেই ছাউনি এখনো দেখা যায়। কিন্তু এখন আর পূজা হয় না। শিব বিগ্রহ পড়ে থাকে একা। দেখার মতো কেউ নেই।

মন্দিরের দেয়ালগুলো বেশ প্রশস্ত। কুলুঙ্গি আছে অনেকগুলো। সব মিলিয়ে ত্রিশোর্ধ্ব। এগুলোর মাঝে পট রেখে তাতে পূজা করার চল ছিল। নাটমন্দিরে আছে কীর্তনালয়ও। স্কুলঘর পেরিয়ে ভেতরে আরেকটা উঠোন। উঠোনে ছড়িয়ে আছে প্রাচীন স্থাপত্যকলা। বাম পাশজুড়ে আছে প্রাচীন নাট্যশালা। সংস্কৃতিমনা জমিদারবাড়িতে প্রায়ই নাটকের আয়োজন হতো। সেখানকার চিহ্ন এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে এই এলাকা। বিশাল ডোরিক কলামগুলো এর  কৌলীন্য প্রকাশ করে।

ছাদহীন স্থাপত্যকলায় রয়েছে ধ্বংসচিহ্ন। সতীদাহ প্রথার প্রচলন ছিল জমিদার বংশে। সতীদাহ রদ ঘোষণার আগে এখানে স্বামীর সঙ্গে স্ত্রীরা সহমরণে যেত। এখনো সেই সহমরণ মঞ্চ দেখা যায়। রোহিনী রায় চৌধুরীর সমাধিটি নির্মাণ করা হয়েছে নতুনভাবে। পারিবারিক শিবমন্দির ও একটি শিবমূর্তি এখনো রয়েছে। 

জমিদারের মূল বাড়ির অবকাঠামোর অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। একপাশে একটা পঞ্চভুজাকার সিঁড়ি আছে। সেটা দিয়ে উঠে গেছে নিচু অথচ সুন্দর দোতলা। সেখানে এককালে জমিদার থাকতেন। বংশানুক্রমে দেশ ভাগ সেই জমিদারিত্ব কেড়ে নিয়েছে। এই বাড়ির স্থাপত্যকলা স্কুল ভবনের মতো নয়। পোস্টস্ল্যাব সিস্টেম। দোতলায় বড় বড় কলাম দেখা গেলেও আসলে এগুলো বিশাল কলামই। নিচের কলামগুলো সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য। কলামগুলো আর পুরো স্থাপত্যের রূপ দেখে বোঝাই যায় এককালে শৌর্য-বীর্যে এই বাড়ি কতটা মহিমাময় ছিল।

ইট, চুন, সুরকি উঠে যাওয়া বাইরের সঙ্গে জমিদারবাড়ির তেমন কোনো মিল নেই। ভেতরের স্থাপনা এখনো বেশ মজবুত। বিশাল মোটা থামসমৃদ্ধ একটা করিডর আছে। করিডরের একপাশে সারি সারি ঘর। ঘরগুলো বেশ বড়। চৌকোনা ঘরগুলোর যেকোনোটিতে জমিদার থাকতেন। এখন অবশ্য তার কোনো চিহ্ন নেই। জমিদার নেই, জমিদারি নেই কিন্তু অনেক চিহ্নই অমলিন।

রোমান আর্চের ব্যবহার এই ভবনে উল্লেখযোগ্যভাবে দৃশ্যমান। সবগুলো আর্চ সমান। জানালা ও দরজা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এগুলো মোগল-পরবর্তী স্থাপত্যধারার সাক্ষী। কাঠের জানালাগুলো এখনো অমলিন। যেন সামান্য বার্নিশ করলেই চকচক করে উঠবে। পুরো কমপ্লেক্সটাই জরাজীর্ণ। এখানে নিয়মিত ক্লাস হচ্ছে। বাচ্চারা খেলছে। ক্লাস করছে। কিন্তু এসব ভবনে স্কুল করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত সেটাই মূল প্রশ্ন। স্থাপনাটিকে যদি সুচারুভাবে সংস্কার করে ক্লাস চলত, তাহলে বাচ্চাদের প্রাণ সংশয়ের আশঙ্কা থাকত না। কিন্তু বর্তমানে ভঙ্গুর এই ভবনে বাচ্চারা খেলাধুলা করে, যা তাদের জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ। জমিদার ভবনে নেই কোনো রেলিং। যেকোনো সময় ছাদের কড়িবর্গা ভেঙে পড়ার উপক্রম। আমাদের পুরাকীর্তি আমাদেরই ধরে রাখতে হবে। ইতিহাস জানার জন্য এর কোনো বিকল্প নেই। নইলে সেই দিন দূরে নয়, কীর্তিপাশা জমিদার বংশের মতো কীর্তিপাশা রাজবাড়িও হারিয়ে যাবে কালের গর্ভে। অবৈধ দখলবাজ আর সময়ের করাল গ্রাস থেকে একে রক্ষা করা আমাদেরই দায়িত্ব।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৬তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৫

স্থপতি রাজীব চৌধুরী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top