কোথায় যেন একটা শব্দ হলো। এ ঘরেই তো! এত রাতে কে? কে হাঁটছে? আরে, একটা ছায়া মানব হেঁটে গেল! কে? কে? কে ওখানে? ভূত?
ভাবছেন ভূতের গল্প লিখব এখন? মোটেই না। লিখব হানাবাড়ির গল্প। কখনো কি ভূত দেখেছেন? এই প্রশ্নের সঙ্গে প্রায় সরাসরি যুক্ত হলো হানাবাড়ির প্রসঙ্গটা। কেউ বলবে, ‘ভূত আছে।’ কেউ বলবে, ‘ধ্যাত! ভূত বলে কিচ্ছু নেই।’ কেউ বলবে, ‘এসব হলো ভণ্ডামি।’ কেউ বলবে, ‘আছে, আছে, আলবত আছে। আমি শুনেছি, ও বাড়িতে আছে…।’ কিন্তু তাকে ধরে বসলেই জানা যাবে ছোট মামার মামাতো ভাইয়ের খালাতো বোনের জামাইয়ের দুলাভাই একবার একটা বাড়িতে রাতে থেকে ভূত দেখেছে। কিন্তু তাকে ধরে বসলেও একই গল্প। সেও নাকি শুনেছে। মোট কথা ভূতের বাড়িতে থাকার অভিজ্ঞতা এই ১৬ কোটির দেশে পাবেন কই? হ্যাঁ, বলতে পারেন বাংলা সাহিত্যে এমন গল্প ঢের আছে।
কিন্তু হানাবাড়িতে রাত কাটানো নিয়ে কত শত গল্পই না এ যাবৎ পড়েছি আমরা। কোনোখানেই শেষমেশ ভূতের অস্তিত্ব টের পাওয়ার মতো কোনো ঘটনার উল্লেখ না থাকাটাই হয়তো বিজ্ঞানমনস্করা ‘ভূত বলে কিছু নেই’ এমনটাই মনে করেন। কেউ কখনো ভূত দেখেনি কিন্তু ভূতের গল্প পছন্দ করে না এমন বিশ্বাস অবান্তর। এমন বিশ্বাসে বিশ্বাসী মানুষগুলোই হানাবাড়ির নাম শুনলে কৌতূহলবশেই ঘুরে আসতে চাইবে।
আমাদের দেশে এমন হানাবাড়ি আছে অনেক। কিন্তু সেগুলো গুম করে রাখতেই বেশি পছন্দ করে মানুষ। কারণ, নিজের বাসায় ভূত আছে এমন কথা কেউ স্বীকার করে না। কিন্তু বিদেশিরা আবার ঠিক উল্টো। রীতিমতো পয়সা খরচা করে ওরা বাড়ির ভেতর ভুতুড়ে ডেকোরেশন করে। সাউন্ড ইফেক্ট দিয়ে একটা ভয়াল পরিবেশ সৃষ্টি করে। কস্টিউম পরে কিছু মানুষ ভূতের অভিনয় করে লোকেদের ভয় দেখাতে ভালোবাসে। মোটকথা বিদেশিদের ভূতবিলাস উন্নতমানের। সেদিক থেকে ভূত আছে, এটাই আমরা ভয়ে বলি না। বলি ‘তেনারা আছেন। শুনতে পেলে…!’। তা যা-ই হোক, তেনা বা ভূত কিন্তু পৃথিবীর সবখানে আছে। শুধু মানুষ না, ঘোড়া-কুকুর এমনকি বিড়ালেরও ভূত আছে। কিন্তু আমাদের সামনে আসে না ওরা, হয়তো মানুষ-ভূতদের পালিত-ভূত হয়েই আজীবন থেকে যায়। এই যেমন আপনার পোষা বিড়ালের মতো কোনো এক মানুষ-ভূতের পোষা বিড়াল-ভূত থাকতেই পারে। অবান্তর বা অযৌক্তিক কিছু না। কিন্তু এই যে ভূতের বাড়ির অবতারণা করলাম, সেই ভূতের বাড়ির প্রসঙ্গই আজকের আলোচনায়।
হ্যাঁ, যেনতেন বাড়ি না। একেবারে খাঁটি ভূতের বাড়ি। যেখানে মানুষ ভূতের আভাস পেতেই ভয়ে পালিয়েছে। কিন্তু আবার ফিরে এসে সাজিয়ে-গুছিয়ে ভূতের বাড়ি হিসেবেই ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান খুলে বসেছে। বাংলাদেশে এমন না থাকলেও আছে কিন্তু আমেরিকায়। সেই বিখ্যাত পেনসিলভানিয়ায়। নাম তার Eastern State Penitentiary (ESP)।
Eastern State Penitentiary-কে ইএসপি নামে আদর করে ডাকে অনেকে। যদিও এটা মোটেও আদুরে বাড়ি না। দেখতে ভয়ংকর। বাইরে থেকে না হলেও ভেতরে তো অবশ্যই। যার অবস্থান পেনসিলভানিয়ায় ফেয়ারমাউন্ট অ্যাভিনিউতে। বাড়িটি চালু ছিল ১৮২৯ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত। চালু ছিল মানে এতে আসামিদের শাস্তি দেওয়া হতো। এই যেমন উইলি সাটন বা আল কোপোনির মতো ভয়ংকর অপরাধীদের এখানে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। শাস্তিটা ছিল মধ্যযুগীয়। একটা সুন্দর হুইলচেয়ারে বসিয়ে সেটাতে নানা রকমভাবে শারীরিক নির্যাতন করার খবর এসেছিল সেই সময়ের পত্রিকায়। এই বাড়িটি কিন্তু শুধু এর শাস্তিদানের জন্যই বিখ্যাত বা কুখ্যাত হয়েছিল সে আমলে। কারণ, এটাই ছিল একমাত্র জেলখানা, যা পৃথিবীর সবচেয়ে দামি স্ট্রাকচারে তৈরি এবং এটাকে মডেল ধরেই এ যাবৎ ৩০০ জেলখানা ডিজাইন করা হয়েছে। স্থপতি আর প্রকৌশলীদের পছন্দের এই বাড়িটির কাঠামো বেশ সুন্দর। আরও সুন্দর এর গঠন প্রণালি, যার সেলগুলোতে আসামিদের রাখা হতো। দেওয়া হতো শাস্তি।
আফসোস, সেদিন আর নেই। নেই সেই শাস্তিকালও। আমাদের দেশে যখন মুক্তিযুদ্ধ চলছে, তখন সেটি বন্ধ হয়ে যায় বা বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু আদৌ কি বন্ধ হয়েছে? মোটেই না। এটা এরপরেই খুলে দেওয়া হয়েছে ভুতুড়ে বাড়ি হিসেবে। বছরের ৩৬৫ দিন এখানে ১০টা-৫টা শো হয়। দেখতে আসে হাজারো দেশ-বিদেশের ভূতপ্রেমী মানুষ।
জন হ্যাভিলান্ড কর্তৃক ডিজাইন করা এই ভবনটি ২৫ অক্টোবর ১৮২৯ সালে খুলে দেওয়া হয় আসামিদের জন্য। বিশ্বে অপরাধীদের কাছে এটা একটি কালো দিন নিশ্চিত। কারণ, এ দিন থেকে এই কুখ্যাত (আসামিদের কাছে) বা বিখ্যাত (সাধারণ মানুষের কাছে) বাড়িটি কর্মযজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পেনসিলভানিয়ার এই বাড়িটিতে যে উপায়ে আসামিদের মানুষ হিসেবে পরিণত করার জন্য চিকিৎসা দেওয়া (পড়ে নিন শাস্তি) হতো, এই নিয়মটাই পুরো পৃথিবীতে বিখ্যাত পেনসিলভানিয়ান সিস্টেম নামে পরিচিত। একে সেপারেট সিস্টেমও বলা হয়। এই সেপারেট সিস্টেমে প্রতিটি সেলারে একজন করে আসামিকে আটকে রাখা হতো। যদিও তাদের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মাঝেমধ্যে দেখা করার সুযোগ মিলত। কিন্তু সেই সুযোগ পেত খুব অল্প কজনই।
নিউইয়র্কে অপরাধীদের একসঙ্গে জোট বেঁধে কিছু নির্দিষ্ট কাজ চুপচাপ করে যাওয়ার একটা প্রথা চালু ছিল। এই নিয়ম চালু ছিল পেনসিলভানিয়ায়ও। আর কাজ না করলে দেওয়া হতো শাস্তি। আর এই শাস্তিব্যবস্থার ওপরে ভিত্তি করে তৈরি করা এই স্থাপনাটিকে নকল করে এর রেডিয়াল প্ল্যান নির্ভর করেই পরে বানানো হয়েছে ৩০০-এর অধিক মডেল।
এই স্থাপনাটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছিল, যাতে প্রতিটি রুমের পেছন দিকে সংযুক্ত করিডরের মাধ্যমে প্রতিটা সেলে নজর রাখা যেত। আর ঘরের দরজায় লাগানো ছোট একটা ফুটো দিয়ে খাবার প্রবেশ করানো যেত। কিন্তু এই বাড়িটার কাজ অর্ধেক হওয়ার পর ডিজাইনারের মনে হলো এই পদ্ধতি বড়ই সেকেলে। এরপরেই এই দরজার পরে সিল করা একটা দরজা বসানো হয়, যা দিয়ে বাইরের শব্দকে আটকানোর ব্যবস্থা করেছিলেন ডিজাইনার। আর হলওয়েতে হাঁটার সময় গির্জার মাঝে হাঁটার একটা অনুভূতি হতো, যা কারাবন্দীদের মধ্যে একটা শান্ত-সমাহিত পরিবেশ সৃষ্টিতে ছিল দারুণ সহায়ক। প্রতিটি ঘরের দরজা ছিল অনেক ছোট আকৃতির। অনেকে মনে করেন দরজাগুলো এতই ছোট ছিল যে এগুলো দিয়ে বাইরে পালিয়ে যাওয়ার মতো বোকা কোনো অপরাধীই ছিল না। আবার অনেকেই মনে করেন, এই সব ছোট দরজার জন্যই অন্য কয়েদির ওপর আক্রমণ থামিয়ে দেওয়া যেত। মোটকথা এসব অপরাধীকে আটকে রেখে মানুষ করার পথে তাদের মধ্যে ধর্মবোধ জাগিয়ে তোলার জন্যই এমন নকশার অবতারণা করেন ডিজাইনার। আর প্রতিটি ঘরেই ছিল একটা কাচ। এই কাচ দিয়ে বাইরের পৃথিবী দেখা যেত। যদিও মাটি থেকে অনেক উঁচুতে ডিজাইন করা কাচগুলোকে বলা হতো ‘ঈশ্বরের চোখ’। মানে ঈশ্বর তোমাকে দেখছেন তুমি কীভাবে পাপমুক্ত হচ্ছো বা ঈশ্বর তোমাকে সব সময় দেখছেন, এমন সত্যে উপস্থিত হতে পারে আসামিরা।
সেলের বাইরে একটা কক্ষ বর্ধিত আকারে ছিল, যেটাতে আসামিরা শরীরচর্চা করতে পারত। কিন্তু এটা ছিল মোটা দেয়াল দিয়ে বেষ্টিত, যেন আসামিরা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারে। আসামিদের শরীরচর্চার সময়ও ছিল ভিন্ন। যার ফলে আসামিদের মাঝে মুখ দেখাদেখিও ছিল প্রায় অসাধ্য। কিন্তু এই বাড়িতে কিছু ভালো ব্যবস্থাও ছিল। এর মধ্যে শীতকালে ঘর গরম রাখার জন্য প্রতিটি রুমের নিচ দিয়ে প্রবাহিত নলের মাধ্যমে প্রতিদিন চালনা করা হতো গরম জলের ধারা, যা নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ।
এই বাড়ির আসল ডিজাইনে একটি উইংয়ে সাতটি ঘর রাখা হয়েছিল। কিন্তু এটা বানানোর আগে থেকেই পুরো হাউসফুল এই কারাগারে অনেক অপরাধী জড়ো হওয়ায় প্রতিটি উইংয়ে নতুন করে কিছু কক্ষ বানানো হয়েছিল। আর ১৫ নম্বর কক্ষে রাখা হতো সবচেয়ে গুণ্ডা টাইপের অপরাধীকে। কিন্তু এত কিছু ভালো ভালো কথার মাঝে একটু চাঁদের কলঙ্কের মতো যে ব্যাপারটা ভেসে উঠেছে, ইতিহাস বলছে, সেটা আসামি নির্যাতন। অবাধ্য আসামিদের বেশ ভয়ানক কায়দায় নির্যাতন করা হতো।
তবে এই কয়েদখানা থেকে যে আসামিরা পালানোর চেষ্টা করেনি তা কিন্তু নয়। ১৯৪৫ সালে ঘটেছিল নাড়া দেওয়া একটি পালানোর ঘটনা। মোট ১২ জন আসামি সেবার পালিয়েছিল, যাদের মধ্যে কুখ্যাত উইলি সাটনও ছিলেন। পরে আবিষ্কৃত হলো ৩০ মিটার দীর্ঘ একটা টানেল। এটা দিয়ে ওরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। কিন্তু এটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এর বিভিন্ন দিকে আরও প্রায় ৩০টি টানেল পাওয়া যায় অর্ধখোদিত হিসেবে।
অবশেষে ১৯৭১ সালে এটি বন্ধ ঘোষিত হয় এবং এর ভেতর আটকে থাকা অপরাধীদের ৩১ মাইল দূরে গ্রেটারফোর্ড কারাগারে প্রেরণ করা হয়। আর ফিলাডেলফিয়া এটি কিনে নিয়ে পুরো কাঠামোকে নতুন করে সাজায়। এর ভেতর সংযুক্ত করা হয় একটি শপিং মল আর লাক্সারি অ্যাপার্টমেন্ট। কিন্তু এর নতুন অংশটি পুরোনো সেই দেয়ালগুলোকে ঘিরেই বসিয়ে দেওয়া হয়। এতে পুরোনো এই স্ট্রাকচারের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এর দেয়ালের কিছু অংশে জঙ্গলে গাছগাছালি জন্মায়। অনেক বনবিড়াল স্থান করে নেয় বিভিন্ন কক্ষে। ১৯৮৮ সালে মেয়র উইলসন গুডি এর উন্নয়নকাজ স্থগিত ঘোষণা করেন এবং জনসাধারণের জন্য পুরো বাড়িটি উন্মুক্ত করে দেন।
কিন্তু এখানেই হয়তো গল্পটি থেমে যেতে পারত। কিন্তু গল্পের শুরুটা এখান থেকেই। বাড়িকে ঘিরে নানা রকম ভুতুড়ে ঘটনা লোকমুখে প্রচার হতে শুরু করে। সে আমলে যেসব অপরাধী নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে মৃত্যুবরণ করেছিল, তাদের চিৎকার শোনা যেত বিভিন্ন সময়। মাঝে মাঝে কিছু অবয়বের চিৎকার শোনা যেত বিভিন্ন পুরোনো সেলারে। সে সময় এখানে যারা শাস্তি পেত, তাদের মাঝে ছিল ব্যাংক ডাকাত, খুনি কিংবা ছিনতাইকারীর মতো পেশাদার লোকজন। তাদের শুধু শাস্তি দিয়েই ক্ষ্যান্ত হতো না সে সময়ের পুলিশবাহিনী, তাদের জন্য ছিল আত্মশুদ্ধির ব্যবস্থা। আর এই আত্মশুদ্ধি যারা চাইত না, তাদের জন্য ছিল সীমাহীন বেদনা। বাস্তবিক পক্ষে মধ্যযুগীয় বর্বর অত্যাচার-ব্যবস্থার সাক্ষী এই কারাগারে যেসব শাস্তি প্রধানত দেওয়া হতো, তার মধ্যে মূলত শরীরে ক্ষত তৈরি করে বরফ-ঠান্ডা পানিতে চুবিয়ে রাখা, জিহবায় ছিদ্র করে চেইন দিয়ে আটকে রেখে হাঁটানো, চেয়ারের সঙ্গে উলঙ্গ করে বেঁধে রেখে পেটানোর মতো শাস্তি। সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল দ্য হোল নামের চিকিৎসা। এতে ভয়ংকর অপরাধীদের অন্ধকার ঘরে (সেল ব্লক ১৪-এর নিচে) আটকে রাখা হতো, যেখানে থাকত না কোনো আলো। পানি নেই, খাবার নেই, এমন একটা পরিবেশে থাকতে গিয়ে অনেকেই পাগল হয়ে যেত। দুই সপ্তাহ পর পর তাদের সামান্য খেতে দেওয়া হতো। এই সেল ব্লক ১৪-এর নিচ থেকে আজও শোনা যায় হাহাকার। সাধারণ মানুষ বেশ আগ্রহ নিয়ে আনন্দ পেলেও একবার ভেবে দেখুন কী পরিমাণ অত্যাচার আর নির্যাতন করা হতো তাদের ওপর। এই গত শতকেই যা আমরা বিগত ৫০০ বছরের মধ্যেও কল্পনা করতে পারি না।
স্থাপনা হিসেবে এই পেনিটেনশিয়ারি অনেক মূল্যবান স্থপতিদের কাছে। স্থপতি জন হ্যাভিল্যান্ড এই বাড়িটি ডিজাইন করার সময় ১৮০০ শতকের আগে ডিজাইন করা বাড়িগুলোকে দেখে তাঁদের ভুলগুলোকে শুদ্ধ করার তাগিদ অনুভব করেন। এবং পুরো স্ট্রাকচারকে নিওগোথিক লুক দেন। এতে প্রতিটি সেল উইং ঘুরে ঘুরে এসে মিলিত হয় একটি বাইরের বাহুতে, যার প্রতিটি কোণে লাগানো ছিল সিসি ক্যামেরা। দক্ষ নজরদারির মাধ্যমে অপরাধীদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলাই যার মূল উদ্দেশ্য ছিল না কিন্তু পরে তা-ই ঘটেছিল সেসব হতভাগ্য মানুষের কপালে। সামান্য চুরি করার অপরাধে কাউকে কাউকে না খেয়ে মরতে হয়েছে সেই ১৪ নম্বর কক্ষের নিচে। প্রতিটি কক্ষের মাপ ছিল ৮ ফুট বাই ১২ ফুট। আর প্রতিটি কক্ষ ছিল ১০ ফুট উচ্চতার। আর প্রতিটি কক্ষে ছিল গরম পানি প্রসবণের ব্যবস্থা। এভাবে আটটি অক্ষ একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়ে তৈরি হয়েছিল এই ৪৫০ রুমবিশিষ্ট কুখ্যাত কারাগার।
কিন্তু এই কারাগার এখন খুলে দেওয়া হয়েছে সাধারণের প্রবেশের জন্য। তাও সবকটা কক্ষে নয়। কিছু কিছু কক্ষ এখনো সাধারণের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। সেসব কক্ষে নানা রকম ভুতুড়ে অভিজ্ঞতা হয় বলে সেখানে সাধারণ দর্শনার্থীদের যাওয়া বারণ। এমন একটি হানাবাড়িতে প্রতিবছর ১০ হাজারেরও অধিক দর্শনার্থী যায় শুধু অত্যাচারিতদের সেই আর্তনাদের খসখস শব্দ শোনার জন্য।
ভূতের কবলে হোয়াইট হাউস
আমেরিকার ওয়াশিংটন ডিসির হোয়াইট হাউস চেনে না এমন মানুষ হয়তো এই গ্রহে বিরল। এমন একটি বাড়ি, যাতে আমেরিকার মতো ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী প্রেসিডেন্ট বাস করেন। আজ বহু বছর ধরে এখানে বাস করেছেন অনেক প্রেসিডেন্ট। অনেকে মারা গেছেন, অনেকে ছেড়ে গেছেন ক্ষমতা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। তবে এর নাম হোয়াইট হাউস কেন এবং এর রং সাদাই বা কেন? এটি ১৭৯২ সালের ১৩ অক্টোবর স্থাপিত হয়, যার নির্মাণ শেষ হয় ১৮০০ সালে। ১৮১৪ সালে যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনারা ভবনটিতে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। যুদ্ধ থামলে পুনরায় এর সংস্কারকাজ শুরু হয়। ভবনটির দেয়ালে আগুনের পোড়া দাগ ও ধোঁয়ার ছাপ ঢাকার জন্য দেয়ালের ওপর সাদা রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়। সেই থেকে এটি হোয়াইট হাউস নামে পরিচিত। এমন একটি ভবনে যখন ভূত-প্রেতরা আস্তানা গাড়ে, তখন কেমন হয়?
বিশ্বমোড়ল আমেরিকা যখন উত্তরাধুনিকতার মোড়কে ডিজিটাল বিশ্ব গড়ার নেতৃত্ব দিচ্ছে তখন তাদের প্রেসিডেন্টের বাসভবনে ঘুরে বেড়াচ্ছে ডজন খানেক ভূত! এমন বিশ্বাস কেবল ভৌতিক গল্পপ্রিয় আমেরিকানরাই নয়, হোয়াইট হাউসের একাধিক সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারীও নিজেদের এসব ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বলে দাবি করেছেন। শোনা যায়, হোয়াইট হাউসের পূর্ব দিকের একটি কক্ষে প্রায়ই কাজে ব্যস্ত থাকতেন হোয়াইট হাউসের প্রথম ফার্স্ট লেডি এবিগেইল অ্যাডামসের ভূত। আবার অনেকে বলেন, মরার পরও বাগানে কাজ করে যাচ্ছেন হোয়াইট হাউসের কর্মচারী ডলি ম্যাডিসন। শুধু তাঁরাই নন, আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন, রুজভেল্ট, হ্যারিসন, রিগ্যান, অ্যান্ড্রু জ্যাকসনসহ আরও অনেকের ভূত এখনো দিব্যি ঘুরে বেড়ায় হোয়াইট হাউসে। সাবেক কর্মচারীদের অনেকেই বলেছেন, বাড়িটি সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং এখানকার সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রেতাত্মা দিয়ে ভরা। সাবেক প্রেসিডেন্ট হ্যারিসনের ভূত বিভিন্ন সময় চিলেকোঠার জিনিসপত্র তছনছ করে কী যেন খুঁজত। প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের ভূতকে প্রায়ই তাঁর শয়নকক্ষে দেখা যেত। আবার ফার্স্ট লেডি এবিগেইল অ্যাডামসকে প্রায়ই হলওয়েতে ভাসতে দেখা যেত। হোয়াইট হাউসে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনের ভূতকে। হোয়াইট হাউসের ভূত-কাহিনিতে একটি বিষয় লক্ষণীয়, তা হচ্ছে এখানকার কোনো ভূতই আশ্চর্যজনকভাবে কারও কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করেনি।
১৯৫০ সালে এই হোয়াইট হাউসকে নতুন করে সাজাতে গিয়ে একটি ছবি তোলা হয়। এতে দেখানো আছে দুটো মানুষের ছায়া, যারা সেখানে ছিল না। কিন্তু ছবিতে ঠিক এসেছে। ফটোগ্রাফার এবি রোঈ তুলেছিলেন ছবিটি। অনেকে এর অনেক ব্যাখ্যা দিয়েছেন কিন্তু কেন মানুষ আকৃতির এই ছায়া এখানে এসেছে, সেটার কোনো ব্যাখ্যা কেউ দিতে পারেননি। মোটকথা ২০০ বছর ধরে এই হোয়াইট হাউস নিয়ে যে ভূত-তর্ক চলে আসছে, তার আছে নানা ধরনের প্রমাণ। শেষমেশ বর্তমান ফার্স্ট লডি মিশেল ওবামা ২০১৪ সালে বলেছিলেন তিনি এবং তাঁর স্বামী প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা হলওয়েতে কিছু শব্দ শুনেছেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে ওবামা কিছুই খুঁজে পাননি।
ডলি মেডিসনের ভূত
প্রেসিডেন্ট উইড্রো উইলসনের আমলে বাড়ির চাকরদের আদেশ করা হলো পুরোনো বাগান নতুন করে সাজানোর জন্য। এ সময় ডলি মেডিসনের ভূতের উদ্ভব হয়। ডলি মেডিসনের ভূত চাকরদের পথ রোধ করে দাঁড়ায়। আর তাই বাগান সংস্কারের কাজ করা আর সম্ভব হয়নি। এখনো সেই বাগানে কেউ হাত দেয় না। শুধু ফুলের পরিচর্যা করে।
মিস্টার বার্নসের ভূত
একদিন হলওয়েতে পরিষ্কার শোনা গেল ভূতের চিৎকার। ঠিক চিৎকারও না, ফিসফিস কিন্তু জোরালো শব্দ। অর্থ করলে দাঁড়ায় ‘আমি মিস্টার বার্নস’। কিন্তু এই শব্দের কোনো উৎপত্তিস্থল সে সময় পাওয়া যায়নি। কিন্তু এ ঘটনার এক দশক পর আবারও একই ধরনের শব্দ পাওয়া গেল। এবার সেটা পশ্চিমের সিটিং হল থেকে। এবারও একই রকমÑ ‘আমি মিস্টার বার্নস’। গার্ডরা মনে করল, এটা জেমস বাইরেনের শব্দ। কিন্তু সেদিন উনি সেখানে ছিলেনই না। কে এই বার্নস? ইতিহাস ঘাঁটলে পাওয়া যায় ডেভিড বার্নসের নাম। তাঁকে জোর করে উঠিয়ে দিয়ে ১৭৯০ সালে এই হোয়াইট হাউস বানানো হয়েছিল!
দোতলার ভূত
হোয়াইট হাউসের দোতলায় অনেক অনেক ভুতুড়ে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন অনেকেই। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান একবার লিখেছিলেন, ‘আমি প্রায়ই হলওয়েতে অনেক লোকের সমাগম শুনতে পাই। কিন্তু ওখানে গিয়ে কিছু দেখতে পাইনি। আবার গতকাল রাতেই কে যেন আমার ঘরে দুবার নক করেছিল। আমি দ্রুত উঠে দরজা খুলে দিয়ে দেখি পুরো বাড়ি ঘুমোচ্ছে। আমি নিশ্চিত এই বাড়িতে ভূত আছে এবং তা সত্যই আছে।’
এবিগেইল এডামসের ভূত
দোতলার শোয়ার ঘরগুলোর পূর্ব দিকের ঘরে ফার্স্ট লেডি এবিগেইল এডামসকে দেখা যেত। শোনা যায় এই ঘরে তিনি চুলের পরিচর্যা করতেন। এখনো কেউ নতুন এলে এই ঘরে ভেজা চুলের গন্ধ পান। অনেকেই ভেজা কাপড়ের গন্ধও পান। কিন্তু এই ঘরে কেউ থাকে না। থাকার প্রশ্নও আসে না অবশ্য। মহিলা ভূতের সঙ্গে কে থাকতে যাবে?
আব্রাহাম লিঙ্কনের ভূত
হোয়াইট হাউস থেকে সামান্য দূরেই আব্রাহাম লিঙ্কন মারা গিয়েছিলেন নৃশংসভাবে। শোনা যায়, তাঁর মৃত সন্তান উইলির সঙ্গে দেখা করার জন্য প্রায়ই প্ল্যানচেট করার চেষ্টা করতেন তিনি। সেই উইলিকে মাঝেমধ্যে হলে হাঁটতে দেখা যেত। কেভিন কুলিজের স্ত্রী লিঙ্কনের ভূত প্রথম দেখতে পান। এরপর উনস্টন চার্চিল, কার্ল স্যানবার্গ, গ্রেইস কুলিসহ অনেকেই এই অভিজ্ঞতা পেয়েছেন।
ভূত আছে কি নেই এই তর্ক পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো তর্কগুলোর মধ্যে একটি। ভূত নিয়ে গবেষণাও কম হয়নি দুনিয়ায়। পরজীবনে বেঁচে থাকার প্রবণতা থেকে তৈরি হওয়া এসব ভ্রান্তিবিলাস মানুষ পছন্দ করে। কারণ, মানুষ অমরত্ব চায়। শুধু বেঁচে থাকাই নয়, চায় অনন্ত যৌবন। আর এ থেকেই যাবতীয় ভূত ও ভুতুড়ে ভীতির উদ্ভব। আর এসব বিখ্যাত স্থাপনায় জড়িয়ে থাকা ভুতুড়ে বিষয়গুলোর জন্যই হয়তো এ বাড়িগুলো আজও এত বিখ্যাত সবার মানসপটে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৪তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৫