সেতুর গল্প

অনেক অনেককাল আগের গল্প বলি। এশিয়া মাইনরের কোনো এক উপত্যকায় একটি মেয়ে পানির পাত্র নিয়ে হেঁটে চলেছে নদীর তীরে। নদীর না বলে একে খাল বলা ভালো। এর একপাশে গড়ে উঠেছে ওদের গ্রাম। গ্রামে শত শত নারী-পুরুষ। তাদের পানীয় জলের উৎস কেবল এই নদী। কিন্তু নদীর ওই পাড়ে কী আছে এখনো ওদের অনেকের দেখা হয়নি। শত-সহস্র বছর ধরে ওরা গল্প শুনেছে নদীর ওই পাড়ে থাকা সুন্দর বনাঞ্চলের। কিন্তু কখনো যেতে পারেনি। নদীর স্রোতে ভেসে গেছে কত মানুষ! কত প্রাণী যে প্রতিদিন নদীতে পড়ে হারিয়ে যায়! কিন্তু কখনোই ওরা নদীর ওই পাড়ে যেতে পারে না। মেয়েটা ভেড়ার চামড়া দিয়ে বানানো পানির ব্যাগে পানি নিতে নিতে ভাবছিল, যদি কোনোভাবে ওই পাড়ে হেঁটে যাওয়া যেত? মেয়েটার ভাবনা এক দিন সত্যি হলো! বিশালাকার এক গাছ ঝড়ে ভেঙে পড়ল নদীর এই পাড়ে। সেই গাছ গিয়ে পড়ল নদীর অপর পাড় পর্যন্ত। তাতেই যেন উল্লাসে মেতে উঠল সবাই। নদীর ওই পাড়ে চলে গেল নিমেষেই সবাই। যেখানে এতকাল আটকে ছিল ওই পাড়ের সৌন্দর্যদর্শন- সেখানে নিমেষেই মানুষ আশ্চর্য জাদুবলে পার হয়ে গেল নদী। সেই জাদু বাস্তবতায় আজকের সেতু।

সেতু কী?

যেকোনো জলাশয়, উপত্যকা বা কোনো দুর্গম রাস্তা সুবিধাজনক ও নিরাপদে পারাপারের ব্যবস্থা করার জন্য ওই সব স্থানের ওপর দিয়ে তৈরি কাঠামোকেই সেতু বলা হয়। সেতু যে স্থানের ওপর দিয়ে বিস্তৃত থাকে-উক্ত স্থান ও সেতুর মাঝের স্থানটি ফাঁকা রাখা হয়। স্থান, কাল ও পারিপাশির্^কতার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন সেতুর জন্য অসংখ্যা ভিন্ন ভিন্ন ডিজাইন করা হয়। একটি সেতুর ডিজাইন সেতুটি তৈরির উদ্দেশ্য, যে স্থানে সেতুটি তৈরি হচ্ছে ও যেখানে তা স্থাপিত হচ্ছে, সেতুটি তৈরিতে কী ধরনের উপাদান ব্যবহৃত হচ্ছে এবং সেটি তৈরির জন্য কী পরিমাণ অর্থ মজুত আছে- এমন সব বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।

মানব সভ্যতার প্রাথমিক পর্যায়ের সেতু বলতে রাস্তায় পরে থাকা গাছ ও পারাপারের জন্য ব্যবহৃত পাথরের টুকরোকেই বোঝানো হতো। অন্যদিকে নিওলিথিক যুগের মানুষেরা স্যাঁতসেঁতে স্থানে বোর্ডওয়াক (নিচু সেতু যা ভূতল থেকে সামান্য উঁচু) সেতু তৈরি করেছিল। ১৩ শতাব্দীতে তৈরি দক্ষিণ গ্রিসের পেনোপোলিস অঞ্চলে অবস্থিত আর্কাডিকো সেতুটি সবচেয়ে পুরোনো আর্চ বা বাঁকানো সেতুর মধ্যে অন্যতম, যা এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে।

নামের ইতিকথা

অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি অনুযায়ী, ইৎরফমব শব্দটি একই অর্থ বিশিষ্ট অনেক পুরোনো ইংরেজি শব্দ নৎুপম থেকে এসেছে। এই শব্দটি সরাসরি প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় শব্দ থেকে এসেছে। কিন্তু একই নামের তাসের যে খেলা রয়েছে, তার ইতিহাস কিন্তু ভিন্ন।

ইতিহাসের পাতায়

পথ চলার সুবিধার জন্য একটার পর আরেকটা বিছিয়ে রাখা পাথরের টুকরো বা স্টেপিং স্টোন- সবচেয়ে সাধারণ ধরনের হওয়ায় এগুলোকে পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো সেতু বলা যেতে পারে। ছয় হাজার বছরের পুরোনো ইংল্যান্ডের সুইট ট্র্যাক ও পোস্ট ট্র্যাক, নিওলিথিক মানুষের স্যাঁতসেঁতে স্থানে তৈরি বোর্ডওয়াক সেতুর অন্যতম উদাহরণ। এ ছাড়া পানির ওপর চলাচলের জন্য প্রাকৃতিকভাবে পতিত বা মানুষের কেটে এনে ফেলে রাখা গাছ দিয়ে তৈরি লগ ব্রিজ বা টিম্বার ব্রিজও নিঃসন্দেহে পুরোনো সেতুর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। সম্ভবত মানুষের তৈরি সবচেয়ে প্রাচীন সেতু হচ্ছে এই ফেলে রাখা গাছের গুঁড়ি। তখন মানুষ দলবদ্ধ হয়ে এসব সেতুর জন্য বিশালাকার গাছ কেটে এনে সেগুলো স্থাপন করত। এই সেতু স্থাপন করতে গিয়ে চাকার উদ্ভব হয়, যা অন্য এক গল্প। বড় গাছের গুঁড়িগুলো মাটিতে গড়িয়ে আনা হতো নদীর তীরে। এভাবেই গড়িয়ে চলা চাকার উদ্ভব। কিন্তু সেতুর জন্য চাকার খুব একটা প্রয়োজনীয় কিছু না হলেও চাকার জন্য সেতু অবশ্যই প্রয়োজনীয়। তাই সেতুতে প্রতিনিয়ত বয়ে চলে লাখো-কোটি চাকা, যা গতি এনে দিয়েছে পৃথিবীকে।

সুইজারল্যান্ডের জুরিখ লেকের ওপর দিয়ে বিস্তৃত হজব্রুক র‌্যাপারস্যুইল-হার্ডেন সবচেয়ে পুরোনো টিম্বার সেতুর মধ্যে একটি। সিডামের পশ্চিমে এই প্রাগৈতিহাসিক গাছের গুঁড়ির স্তূপ ১৫২৩ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দের সময়কার। রোমান সাম্রাজ্যের তৈরি ৬ মিটার (২০ ফুট) চওড়া কাঠের তৈরি সেতুটিই হেঁটে পারাপারের জন্য মানুষের তৈরি প্রথম কাঠের সেতু, যা লেক জুরিখের ওপর দিয়ে প্রবাহিত। অন্তত দ্বিতীয় শতাব্দী পর্যন্ত এই সেতুটির বেশ কিছু পুনর্গঠন কাজ হয়েছিল। ১৩৫৮ থেকে ১৩৬০ সালের মধ্যে অস্ট্রিয়ার ডিউক চতুর্থ রুডল্ফ এই লেকের ওপরে একটি নতুন কাঠের সেতু তৈরি করেন, যা ১৮৭৮ সাল পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়েছিল। এর দৈর্ঘ্য ছিল ১,৪৫০ মিটার (৪,৭৬০ ফুট) ও প্রস্থ ছিল ৪ মিটার (১৩ ফুট)। ২০০১ সালের ৬ এপ্রিল পুনর্গঠিত এই সেতুটি উন্মুক্ত করা হয়, যা এখন সুইজারল্যান্ডের দীর্ঘতম কাঠের সেতু।

গ্রিসের দক্ষিণাঞ্চলের পেলোপনিজ এ অবস্থিত আর্কাডিকো সেতুটি মাইসেনিয়ান সভ্যতার চারটি কর্বল আর্চ ব্রিজের মধ্যে একটি। টিরাইনের দুর্গ ও এপিডোরাস শহরের মধ্যে চ্যারিয়ট চলাচলের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপনের অংশ হিসেবে এই সেতুটির নকশা করা হয়েছিল। প্রাচীন গ্রিসের তাম্র যুগে (১৩০০ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দ) তৈরি এই সেতুটি সবচেয়ে পুরোনো আর্চ ব্রিজ যা এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে। হেলেনিস্টিক যুগে পাথর দ্বারা নির্মিত বেশ কিছু আর্চ ব্রিজ এখনো পেলোপনিজ অঞ্চলে বিদ্যমান।

সে সময়ের রোমানরাই প্রাচীন সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে পারদর্শী ছিল। রোমানরা যেসকল আর্চ ব্রিজ ও সেচ কাজে ব্যবহারের জন্য অ্যাক্যুডাক্ট তৈরি করেছিল তা সব ধরনের বৈরী পরিবেশে টিকে থাকতে পারত, যেখানে আগের সেতুগুলো ধ্বংস হয়ে যেত। এমনকি সে সময়ের কিছু সেতু আজও রয়েছে। স্পেনের ট্যাগাস নদীর ওপরে নির্মিত আলক্যান্তারা সেতুটি এর অন্যতম এক উদাহরণ। রোমানরা সিমেন্টের ব্যবহারও করেছিল যার ফলে প্রাকৃতিক পাথরের স্থায়িত্বে বেশ কিছু বৈচিত্র্য এসেছিল। পোজ্জোলানা নামে একটি সিমেন্ট ব্যবহার করা হতো যা পানি, চুন, বালু ও আগ্নেয়গিরি থেকে প্রাপ্ত পাথরচূর্ণ দিয়ে তৈরি। কংক্রিটের সেতু রোমানদের পরবর্তী সময়ে তৈরি হয়। কারণ, সিমেন্ট ব্যবহারের এই প্রযুক্তি হারিয়ে গিয়েছিল, যা অবশ্য পরে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।

ভারতীয় উপমহাদেশে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে বাঁধ ও সেতু নির্মাণের উল্লেখ পাওয়া যায়। জেমস্ প্রিন্সেপের জরিপ থেকে গির্নারের কাছে মৌর্য সেতুর উল্লেখ পাওয়া যায় যেটি বন্যায় ভেঙে গিয়েছিল। পরে যা সম্রাট চন্দ্রগুপÍ মৌর্যের প্রধান স্থপতি পুষ্পগুপ্ত সংস্কার করেন। মোটামুটি চতুর্থ শতকে ভারতে পাটির মতো করে বোনা বাঁশ ও লোহার শিকল দিয়ে তৈরি আরও মজবুত সেতু তৈরির উল্লেখ পাওয়া যায়। সামরিক ও বাণিজ্যিক উভয় ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য সে সময়ে ভারতে মোগল শাসনামলে বেশ কিছু সেতু তৈরির উল্লেখ পাওয়া যায়।

যদিও বৃহদাকারের কাঠের তৈরি চীনা সেতুর ওয়ারিং সাম্রাজ্যের সময়েই পাওয়া যায়, ৫৯৫ থেকে ৬০৫ সুই শাসনামলে নির্মিত ঝাইঝো সেতুটিই চীনের সবচেয়ে প্রাচীন পাথরের তৈরি সেতু। পাথর দিয়ে বিভাজিত অংশসম্পন্ন পৃথিবীর প্রাচীনতম ওপেন-স্প্যানড্রেল আর্চ ব্রিজ হিসেবে এই সেতুটির ঐতিহাসিক গুরুত্বও যথেষ্ট। ইউরোপের এই ধরনের বিভাজিত অংশসম্পন্ন সেতু বা আর্চ ব্রিজের মধ্যে প্রাচীনতম হলো অ্যালকোনেটার সেতু (প্রায় দ্বিতীয় শতকে নির্মিত), অন্যদিকে রোমান যুগে নির্মিত বিশাল ওপেন-স্প্যানড্রেল ট্রোজোন সেতুটির (১০৫ খ্রিষ্টাব্দ) বিভাজিত আর্চগুলো কাঠের তৈরি।

ইউরোপীয়দের উপনিবেশ স্থাপনের ঠিক আগে, ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দে দক্ষিণ আমেরিকার ইনকা সভ্যতার অধিবাসীরা দড়ি দিয়ে তৈরি খুব সাধারণ ঝুলন্ত সেতু ব্যবহার করত। ১৮ শতাব্দীতে হ্যানস্ উলরিখ গ্রাবেনম্যান, জোহানেস গ্রাবেনম্যান ও অন্যান্যরা কাঠের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি সেতুর নকশায় বেশ কিছু নতুনত্ব এনেছিলেন। ১৭১৬ খ্রিষ্টাব্দে হুবার্ট গতিয়ে সেতু সম্পর্কে প্রথম গ্রন্থ রচনা করেন। ১৭৭৯ সালে ইংল্যান্ডের শর্পশায়ার-এর লৌহ সেতুর স্থাপনার মধ্য দিয়ে সেতু নির্মাণের প্রযুক্তির ইতিহাসে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদ্ভাবনার সূচনা হয়। সেভার্ন নদী পারাপারের জন্য তৈরি এই সেতুর আর্চগুলোর নির্মাণে প্রথমবারের মতো কাস্ট আয়রন বা ঢালাই লোহা ব্যবহার করা হয়েছিল। ১৯ শতকের শিল্প-বিপ্লবের সময় থেকেই বড় আকারের সেতুর নির্মাণকাজে আঁট বাঁধার কৌশলে রট আয়রন বা পেটা লোহা ব্যবহার করা হয়। কিন্তু অনেক ভারী ওজন পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রসারণক্ষমতা লোহার নেই। ইস্পাতের উচ্চ প্রসারণক্ষমতার কারণে এর উদ্ভাবনের পর থেকে অনেক বড় আকারের সেতু নির্মাণে ইস্পাতের ব্যবহার শুরু হয়। ইস্পাতের তৈরি এসব সেতুর অনেকগুলোই গাস্তাভ আইফেল (আইফেল টাওয়ারের স্থপতি)-এর কাজের অনুসরণে করা হয়েছিল।

কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে ১৭ শতকের শেষ থেকে ১৮ শতকের শেষের দিকে কাঠের গুঁড়ি দিয়ে বেশ কয়েকটি ঢাকা সেতু তৈরি হয়েছিল, যা এই সময়কালের বেশ আগে জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডে নির্মিত সেতুর মতো দেখতে ছিল। পরে বেশ কিছু সেতু পাথর বা ধাতুর তৈরি হলেও, এগুলোর আঁটগুলো ছিল কাঠের তৈরি। যুক্তরাষ্ট্রে সেতু নির্মাণে তিন ধরনের আঁট বাঁধার কৌশল ব্যবহৃত হতো: কুইন পোস্ট, বার আর্চ ও টাউন ল্যাটিস। এই ধরনের শত শত কাঠামো এখনো উত্তর আমেরিকায় চোখে পড়ে। ১৯৯০-এর দশকে ‘দ্য ব্রিজেস অব দ্য ম্যাডিসন কাউন্টি’ নামক বই, চলচ্চিত্র ও নাটকের মাধ্যমে ওই সেতুগুলো সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হয়।

ঢালাই শিল্পের পথিকৃৎ স্টেফান ব্রাইলা মর্জাইস সেতু নামে বিশ্বের প্রথম সড়কপথে ব্যবহারের ঢালাই সেতুর নকশা করেন। এটি পরে ১৯২৯ সালে পোল্যান্ডের লোওইকজের কাছে মর্জাইসে অবস্থিত স্নুদিয়া নদীর ওপর নির্মিত হয়েছিল। ১৯৯৫ সালে আমেরিকান ওয়েল্ডিং সোসাইটি এই সেতুটির জন্য পোল্যান্ডকে হিস্টোরিক ওয়েল্ডিং স্ট্রাকচার অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত করে।

হরেক রকম সেতু

সেতুর রকমফের হতে পারে নানামাত্রায়। ব্যবহৃত কাঠামোগত উপাদানের ধরন, সেতুর ওপর দিয়ে কী পরিবহন করা হচ্ছে, সেতু কি একস্থানে আবদ্ধ না স্থানান্তরযোগ্য ও নির্মাণ উপাদানের ওপর ভিত্তি করেই সাধারণত সেতুর প্রকারভেদ করা হয়।

কাঠামোগত ধরন

চাপ, সঙ্কোচন, বক্রতা, ব্যাবর্তন ও বিভাজন-সেতু নির্মাণে আবশ্যক এই বিভিন্ন কাঠামোগত বলগুলো সেতুর কার্য পরিচালনায় কীভাবে কাজ করছে তার ওপর নির্ভর করেও সেতুর প্রকারভেদ করা যেতে পারে। বেশির ভাগ সেতু নির্মাণের সময়ে এই প্রধান বলগুলোর প্রায় সব কটিই ব্যবহার করা হলেও এগুলোর মধ্যে মাত্র কয়েকটি বলই প্রাধান্য পেয়ে থাকে। আর এই বলগুলোর স্বকীয় উপস্থিতি খুব স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়। যেমন একটি ঝুলন্ত বা তার-বাঁধা অংশের চাপ সম্পর্কিত উপাদানগুলো একটি সুনির্দিষ্ট আকারের হয়ে থাকে এবং এর স্থান নির্ণয়ও ভিন্ন হয়ে থাকে। অন্যান্য ক্ষেত্রে যেমন আঁট বাঁধা সেতুর ক্ষেত্রে সব বল অপেক্ষাকৃত বেশিসংখ্যাক উপাদানের সবগুলোর মধ্যেই বণ্টন করা যেতে পারে।

বিম সেতু

এই ধরনের সেতু মূলত একটি কড়িকাঠ বা থাম, যার দুই প্রান্ত একই ধরনের সহযোগী কাঠামোর ওপর রেখে ভারসাম্য রক্ষা করা হয়। এটা এ রকম খুব সাধারণভাবে তৈরি হতে পারে যখন একটি বিম দুটি স্থানের ওপরে যোগাযোগ স্থাপনের কাজ করে থাকে। আবার এ রকমভাবে একাধিক থামের সাহায্যেও কয়েকটি অংশ মিলে একটানা লম্বা সেতু তৈরি হয়ে থাকে। যখন একাধিক বিম ব্যবহার করে এ রকম লম্বা সেতু তৈরি করা হয়, তখন মাঝের সহযোগী কাঠামোগুলোকে বলা হয় পিয়ার। বিমের তৈরি প্রাচীনতম সেতু ছিল গাছের গুঁড়ি, যা খুব সাধারণভাবে বিভিন্ন ধরনের ছোট-বড় জলাশয়ের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত বিছিয়ে দেওয়া হতো। আধুনিক যুগের থামের সেতু যেমন কাঠের তৈরি ছোট হতে পারে, তেমনি ইস্পাতের বাক্স দিয়ে তৈরি বড় আকারেরও হতে পারে। লম্বালম্বি বলের কারণে সেতুর থামের ওপর একটি বিভাজনকারী বাঁকা চাপের সৃষ্টি হয়, যা সেতুর দুই দিকের সহ-কাঠামোর দৈর্ঘ্য বরাবর ছড়িয়ে পড়ে। সেগুলো সাধারণত ইস্পাত, কংক্রিট বা কাঠের তৈরি হয়ে থাকে। কড়িকাঠের সেতু ও ফলকবিশিষ্ট কড়িকাঠের সেতু, যা সাধারণত ইস্পাতের তৈরি হয়ে থাকে, থামওয়ালা সেতুর মধ্যে পড়ে। বাক্সওয়ালা কড়িকাঠের সেতু, যা ইস্পাত বা কংক্রিট বা উভয় দিয়েই তৈরি হয়ে থাকে, বিমওয়ালা সেতুর যা আরও একটি উদাহরণ। বিমওয়ালা সেতুর খিলানের দৈর্ঘ্য সাধারণত ২৫০ ফুট (৭৬ মিটার)-এর বেশি হয় না। কারণ, বক্রতা চাপটি খিলানের দৈর্ঘ্যরে বর্গাকারে বেড়ে যায় (আর বিচ্যুতি দৈর্ঘ্যরে এক-চতুর্থাংশ শক্তি অনুপাতে বেড়ে যায়)। তবে বাক্সবিশিষ্ট কড়িকাঠের সেতু হলেও রিও-নিটেরিও সেতুর মূল খিলানটির দৈর্র্ঘ্য ৩০০ মিটার (৯৮০ ফুট)। ২৩.৮৩ মাইল (৩৮.৩৫ কিমি) দীর্ঘ যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ লুইজিনিয়ায় অবস্থিত বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ লেক পনচারট্রিয়ান কসওয়ে নামক থামওয়ালা সেতুটির একেকটি খিলানের দৈর্ঘ্য ৫৬ ফুট (১৭ মিটার)। থামওয়ালা সেতুগুলো আজকের যুগের ব্যবহৃত সবচেয়ে সাধারণভাবে তৈরি ও সবচেয়ে প্রাচীন ধরনের সেতু এবং জনপ্রিয়ও বটে।

ট্রাস সেতু

ট্রাস সেতুর ওজন বহনকারী উপরিকাঠামোটি কোনাকুনি ট্রাস তৈরি করে বানানো হয়। এই ট্রাস হলো বিভিন্ন উপাদান একসঙ্গে জোড়া দিয়ে তৈরি ত্রিভুজাকৃতির কাঠামো। এই জোড়া লাগা উপাদানগুলো (সাধারণত সোজা) গতিশীল ওজনের প্রভাবে কখনো টান, কখনো সংকোচন আবার কখনোবা উভয়ের প্রভাবেই পরিবর্তনশীল হতে পারে। ট্রাস সেতুগুলোই আধুনিক সেতুর মধ্যে প্রাচীনতম। এখানে উল্লেখিত প্রাথমিক ধরনের ট্রাস সেতুগুলোর নকশা খুবই সাধারণ, যা উনিশ ও বিশ শতকের যে স্থপতিরা খুব সহজেই বিশ্লেষণ করতে পারবেন। উপাদানগুলোর পর্যাপ্ত ব্যবহারোপযোগিতার কারণে এই আঁটি বাঁধা সেতুগুলোর নির্মাণ বেশ লাভজনক।

ক্যান্টিলিভার সেতু

এই ধরনের সেতুগুলো আড়াআড়িভাবে পেতে রাখা বড় বড় স্প্যান দিয়ে তৈরি। এই স্প্যানগুলো শুধু একটি প্রান্ত একটি কাঠামোর ওপর ভর দিয়ে রাখা থাকে। বেশির ভাগ বড় ক্যান্টিলিভার সেতুই দুটি স্প্যান দিয়ে তৈরি যেগুলো ভারবহনকারী কাঠামো বা স্তম্ভের বিপরীত দিকে প্রসারিত হয়ে মুখোমুখি এমন একটা জায়গায় মেলে যেটি, সেতুটির দ্বারা পারাপারকারী জলাশয়টির ঠিক মাঝখানে অবস্থিত। ক্যান্টিলিভার সেতুগুলো থামওয়ালা সেতুর মতো প্রায় একই ধরনের উপাদান ও কৌশল ব্যবহার করে তৈরি করা হয়ে থাকে। পার্থক্য শুধু সেতু বরাবর ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন শক্তির কার্য পরিচালনায়। কিছু ক্যান্টিলিভার সেতুর মাঝ বরাবর সেতুটিকে আরও মজবুত করার জন্য একটি বাড়তি থাম ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কানাডার কুইবেকে অবস্থিত ৫৪৯ মিটার (১ হাজার ৮০১ ফুট) দীর্ঘ কুইবেক সেতু দীর্ঘতম বড় খিলানওয়ালা সেতু।

আর্চ সেতু

আর্চ সেতুর দুই প্রান্তে একটি করে স্ট্রাকচার থাকে। সেতুর ওজন এই দুই প্রান্তে অবস্থিত দুইটি স্ট্রাকচারের ওপর রাখা হয়। গ্রিকরাই প্রথম আর্চ সেতু তৈরি কওে, যার মধ্যে রয়েছে আর্কাডিকো সেতু। স্নোভেনিয়ার সোলকানে সোচা নদীর ওপরে অবস্থিত ২২০ মিটার (৭২০ ফুট) দীর্ঘ সোলকান সেতুটি বিশ্বের দ্বিতীয় দীর্ঘতম ও রেলওয়ের দীর্ঘতম পাথরের সেতু। ১৯০৫ সালে এটি তৈরির কাজ শেষ হয়। প্রায় ৫ হাজার টন (৪ হাজার ৯০০ লম্বা টন, ৫ হাজার ৫০০ ছোট টন) থেকে তৈরি এই সেতুর আর্চটি, প্লোউওয়েনের ফ্রিডেন্সব্রুক (সাইরাটাল ভায়াডাক্ট)-এর পরেই বিশ্বের দ্বিতীয় দীর্ঘতম এবং রেলওয়ের দীর্ঘতম পাথরের আর্চ। সাইরাব্যাক নদীর উপত্তকার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ৯০ মিটার (২৯৫ ফুট) দীর্ঘ খিলানবিশিষ্ট ফ্রিডেন্সব্রুকের আর্চটি একই বছরে নির্মিত। দুটির মধ্যে পার্থক্য এই যে সোলকান সেতুটি নির্মিত হয় পাথরের খন্ড দিয়ে, আর ফ্রিডেন্সব্রুক সেতুুটি নির্মিত হয় পাথর ও হামান-দিস্তা খন্ডের মিশ্রণে। 

ইয়াংযে নদীর ওপরে অবস্থিত ১ হাজার ৭৪১ মিটার (৫ হাজার ৭১২ ফুট) দীর্ঘ শাওতিয়ানমেন সেতুটি বর্তমানে বিশ্বের দীর্ঘতম আর্চ সেতু, যার একটি খিলানের দৈর্ঘ্য ৫৫২ মিটার (১ হাজার ৮১১ ফুট)। চীনের চোংগিংয়ে অবস্থিত এই সেতুটি ২০০৯ সালের ২৯ এপ্রিল জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

টাইড আর্চ সেতু

চিরাচরিত আর্চ সেতুর চেয়ে ভিন্ন এই টাইড আর্চ ব্রিজে আর্চের মতো একটি আলাদা কাঠামো রয়েছে। সাধারণ আর্চ ব্রিজের দুই দিকের মোড়ের ওপর ধাক্কা দিয়ে সেতুর ওজন ও বহনকারী যানবাহনের ওজন স্থানান্তর করার পরিবতে, এই ধরনের সেতুতে আর্চেও প্রান্ত দুইটি কাঠামোর নিচের দিকের তারের সঙ্গে টেনে বেঁধে রাখা হয়। এদের বোস্ট্রিং বা জ্যা আর্চও বলা হয়ে থাকে।

ঝুলন্ত সেতু বা সাসপেনশন ব্রিজ

এই সেতু তারের সাহায্যে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে। প্রাচীনতম ঝুলন্ত সেতু বাঁশের গায়ে দড়ি বা লতা জড়িয়ে তৈরি করা হতো। আধুনিক ঝুলন্ত সেতুতে তারটি মিনার থেকে ঝুলতে থাকে, যা বাক্স জাতীয় অংশ বা কোফাড্র্যামের সঙ্গে যুক্ত থাকে। এই কোফাড্র্যাম বা বাক্স-জাতীয় অংশটি হ্রদ, নদী বা সাগরের গভীরে পোঁতা থাকে। প্রকারভেদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সাধারণ ঝুলন্ত সেতু, টানা রিবন সেতু, আন্ডারস্প্যান্ড ঝুলন্ত সেতু, ঝুলন্ত-ডেক সেতু ও সেলফ-অ্যাংকর্ড ঝুলন্ত সেতু। এ ছাড়া আধা-ঝুলন্ত সেতু নামেও এক ধরনের সেতু রয়েছে। বার্টন-আপন্-টেন্টের ফেরি সেতুটি ইউরোপের একমাত্র নিদর্শন। ৩ হাজার ৯০৯ মিটার (১২ হাজার ৮২৫ ফুট) দীর্ঘ জাপানের কায়কিয়ো বিশ্বের দীর্ঘতম ঝুলন্ত সেতু। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটিতে অবস্থিত ঝুলন্ত সেতু সাসপেশন ব্রিজের একটি চমৎকার উদাহরণ। ছোট্ট এই সেতুতে শুধু মানুষ চলাচল করতে পারে। যান চলাচলের জন্য এই সেতু উপযুক্ত নয়।

ক্যাবল-স্টেইড সেতু

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর ওপর তৈরি হওয়া শাহ আমানত সেতু ক্যাবল-স্টেইড ব্রিজের চমৎকার উদাহরণ। ঝুলন্ত সেতুর মতো, এই সেতু তার বা কেবলের সাহায্যে ঝুলে থাকে। তবে এই ধরনের সেতুর ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কমসংখ্যাক তার লাগে আর মিনারের উচ্চতাও বেশি হয়ে থাকে। ১৭৮৪ সালে সি.টি. (বা.সি.জে.) লশা সর্বপ্রথম ক্যাবল-স্টেইড সেতুর নকশা তৈরি করেন। ২০১২ সালে উন্মুক্ত রাশিয়ার ভøাদিভস্তকে অবস্থিত রাস্কি সেতুটি বিশ্বের দীর্ঘতম ক্যাবল-স্টেইড সেতু। ২০১৮ সালের শেষের দিকে চালু হতে যাওয়া কানাডার কুইবেকের মন্ট্রিয়ালের সেন্ট লরেন্স নদীর ওপরে অবস্থিত নিউ চ্যামপ্লেইন সেতুর ওপর দিয়ে গাড়ি, বাইসাইকেল ও হালকা ওজনের যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করতে পারবে। এটি উন্মুক্ত হওয়ার পরে পুরোনো সেতুটি ভেঙে ফেলা হবে।

স্থায়ীভাবে যুক্ত বা স্থানান্তরযোগ্য সেতু

বেশির ভাগ সেতুই স্থায়ীভাবে যুক্ত সেতু অর্থাৎ এদের কোনো স্থানান্তরযোগ্য অংশ নেই এবং এগুলো পরিত্যক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত একই স্থানে থাকে। বেইলি সেতুর মতো অস্থায়ী সেতুগুলো বিভিন্ন অংশ একত্রকরণ বা আলাদা করার জন্য, ভিন্ন স্থানে পরিবহনের বা পুনরায় ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়। সামরিক স্থাপনার কাজে এবং কোনো পুরোনো সেতুর সংস্কারকাজ চলা অবস্থায় পরিবহনের কাজ চালানোর জন্য এই অস্থায়ী সেতুগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নৌকা বা এই ধরনের অতিউচ্চ পরিবহনের থেকে দূরে এই ধরনের সেতু তৈরি করা হয়। এগুলো সাধারণত বিদ্যুৎ-চালিত হয়ে থাকে।

দ্বিতল সেতু  

দ্বিতল সেতুর দুইটি স্তর থাকে। যেমন: জর্জ ওয়াশিংটন সেতু, যার একদিকে আঁটি বাঁধার কারণে ওপরের তথা সড়কপথের স্তরটি মজবুত হয়েছে এবং এই স্তরের ভারসাম্যহীন চলাচলের বাধার সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে এই সেতুর নিচের স্তরটি ওপরের স্তর স্থাপনের তিন বছর পরে স্থাপন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটি এবং নিউ জার্সির বার্জেন কাউন্টিকে সংযোগকারী বিশ্বের ব্যস্ততম এই সেতুটির ওপর দিয়ে প্রতি বছর গড়ে ১০২ মিলিয়ন যানবাহন চলাচল করে। হংকংয়ের সিং মা সেতু ও ক্যাপ শুই মুন সেতুর ওপরের স্তরে ৬টি লেন রয়েছে এবং নিচের স্তরে ২টি লেন ও এমটিআর মেট্রো ট্রেনের জন্য এক জোড়া ট্র্যাক রয়েছে। কিছু দ্বিতল সেতুর শুধু একটি স্তর রাস্তার জানমাল পরিবহনের কাজে ব্যবহার করা হয়; যেমন মিনেপোলিসের ওয়াশিংটন অ্যাভেনিউ সেতুর নিচের স্তরটি মোটরগাড়ি ও হালকা ওজনের রেল পরিবহনের জন্য এবং এর ওপরের স্তরটি পথচারী ও বাইসাইকেল চলাচলের (মূলত মিনেসোটা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের জন্য) জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। একইভাবে টরন্টোর প্রিন্স এডওয়ার্ড ভায়াডাক্টের ওপরের স্তরে মোটর পরিবহন, বাইসাইকেল চলাচল ও ফুটপাত হিসেবে ব্যবহারের জন্য পাঁচটি লেন রয়েছে; আর এর নিচের স্তরে ব্লার-ড্যানফোর্থ সাবওয়ে লাইনের জন্য এক জোড়া ট্র্যাক রয়েছে। সানফ্রান্সিস্কো-ওকল্যান্ড বে সেতুর পশ্চিম অংশের খিলানেও দুইটি স্তর রয়েছে। 

১৮৪৯ সালে নির্মিত টাইরনর নিউ ক্যাসলের টাইন নদীর ওপরে অবস্থিত রবার্ট স্টেফেন্সনের হাই লেভেল সেতুটি দ্বিতল সেতুর প্রাথমিক যুগের একটি নিদর্শন। ওপরের স্তরে রয়েছে রেলওয়ে এবং নিচের স্তরটি রাস্তার সাধারণ পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হয়। মিনাই স্ট্রেটের ওপরে অবস্থিত ব্রিটানিয়া সেতু এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের ডেরি তে অবস্থিত ক্র্যাইগাভন সেতুটিও এই ধরনের নিদর্শন। কোপেনহ্যাগেন ও মালমোঁর মাঝে অবস্থিত ওরসান্ড সেতুটির ওপরের স্তরে রয়েছে চার-লেনবিশিষ্ট হাইওয়ে এবং নিচের স্তরে এক জোড়া রেলওয়ে ট্র্যাক। লন্ডনের টাওয়ার সেতুটি একটি ভিন্ন ধরনের দ্বিতল সেতু, যার মাঝ বরাবর নিচের স্তরে রয়েছে একটি ব্যাসক্যুল স্প্যান এবং ওপরের স্তরে রয়েছে একটি ফুটওভারব্রিজ।

ভায়াডাক্ট

একাধিক সেতু সংযোগ করে তৈরি তুলনামূলকভাবে দীর্ঘতর কাঠামোকে বলা হয় ভায়াডাক্ট। বিশ্বের দীর্ঘতম এবং বেশ কিছু সুউচ্চ সেতু ভায়াডাক্ট, যেমন লেক পনচারট্রেইন কসওয়ে ও মিলাউ ভায়াডাক্ট।

ত্রিমুখী সেতু

ত্রিমুখী সেতুর তিনটি ভিন্ন ভিন্ন খিলান সেতুর ঠিক মধ্যস্থানে মিলিত হয়। ওপর থেকে দেখলে এই সেতুকে দেখতে ইংরেজি ঞ বা ণ-এর মতো লাগে। ত্রিমুখী সেতু বেশ দুর্লভ। ট্রিজ, মার্গারেট সেতু ও জেন্সভিল ণ- সেতু ত্রিমুখী সেতুর নিদর্শন।

ব্যবহারগত ধরন

ট্রেন, পথচারী, রাস্তার সাধারণ ট্রাফিক ও পরিবহন, পানি পরিবহনের জন্য আলাদা লাইন বা অন্যান্য যেকোনো ধরনের বাহন চলাচলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা নকশার ওপর ভিত্তি করেও সেতুর প্রকারভেদ করা হয়ে থাকে। অ্যাকুইডাক্ট পানি পরিবহনের জন্য তৈরি এক ধরনের ভায়াডাক্ট জাতীয় সেতু যা একই উচ্চতার দুটি ভিন্ন স্থানকে সংযুক্ত করে। একটি সড়ক-রেল সেতু দিয়ে মোটরগাড়ি ও রেলগাড়ি উভয়ই চলাচল করে থাকে। ওভারওয়ে এমন একধরনের সেতু, যা দুটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ পরিবহন, যেমন মোটরগাড়ি ও রেলগাড়ি- একই সঙ্গে চলাচলের জন্য নির্মিত। আবার স্টরস্ট্রোম সেতুর মতো সেতুগুলোর ওপরের দিক দিয়ে বিদ্যুৎ পরিবহনের লাইনও থাকে। কিছু সেতু ভিন্ন ধরনের কাজে ব্যবহারের জন্যও তৈরি হয়ে থাকে, যেমন ব্রাতি¯øাভার নেভি মোস্ট সেতুর মিনারে একটি রেস্তোরাঁ রয়েছে, অথবা এগুলোকে রেস্তোরাঁ-সেতুও বলা যেতে পারে যা একটি রেস্তোরাঁ হিসেবে ব্যবহারের জন্যই নির্মিত হয়েছে। আবার কিছু কিছু ঝুলন্ত সেতুর মিনার বার্তা প্রেরণের কাজে ব্যবহৃত অ্যান্টেনা স্থাপনের জন্যও তৈরি হয়ে থাকে। 

এমনকি কোনো নির্দিষ্ট কাজে ব্যবহারের পরিকল্পনা ছাড়াও সেতু নির্মাণ হয়ে থাকে। অনেক সেতুর নিচের অংশটি বহু গৃহহীন মানুষের কোনোমতে মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়ে থাকে, আর বিশ্বের সব সেতুর আশপাশের কাঠের বা অন্যান্য উপাদানের খন্ডগুলো গ্রাফিতি শিল্পের ক্যানভাস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিছু কিছু সেতু মানুষকে আত্মহত্যার জন্য টানে আর এগুলো আত্মহত্যা-সেতু নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে।

উপাদানগত ধরন 

সেতুর কাঠামো তৈরিতে ব্যবহৃত উপাদান সেতুর প্রকারভেদ নির্ধারণের কাজেও ব্যবহৃত হয়। ১৮ শতাব্দীর শেষ সময় পর্যন্ত গাছের গুঁড়ি, পাথর ও রাজমিস্ত্রির কাজের মাধ্যমেই সেতু নির্মাণ করা হতো। আধুনিক সেতুগুেিলা কংক্রিট, ইস্পাত, ফাইবার রিইনফোর্সড পলিমার (এফআরপি), স্টেনলেস ইস্পাত বা এই উপাদানগুলোর সংমিশ্রণে নির্মিত হয়ে থাকে। আবার জীবন্ত গাছ থেকে জীবন্ত সেতুও তৈরি হয়ে থাকে যেমন ভারতে ফাইকাস ইলাস্টিকা গাছের শিকড় এবং জাপানে উইস্টারিয়া লতা থেকে জীবন্ত সেতু তৈরি হয়েছে।

ক্যান্টিলিভার সেতু

ছোট পায়ে হাঁটা সেতু তৈরির জন্য সাধারণ পিয়ার ব্যবহার করা হয়ে থাকলেও, ভারী সড়ক বা রেলপথের পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত ক্যান্টিলিভার সেতু নির্মাণের কাজে কাঠামো তৈরিতে ব্যবহৃত ইস্পাতের পিয়ার বা প্রি-স্ট্রেসড কংক্রিট ব্যবহার করা হয়।

ঝুলন্ত সেতু

বেশির ভাগ ঝুলন্ত সেতুতে ব্যবহৃত তারগুলো সাধারণত দস্তা দিয়ে ঝালাই করা ইস্পাতের তৈরি হলেও, কিছু কিছু ঝুলন্ত সেতু এখনো ইস্পাতের মিশ্রণে মজবুত করে তৈরি করা কংক্রিট দিয়েই নির্মাণ করা হয়।

আর্চ সেতু

ইট, পাথর ও এই ধরনের অন্যান্য উপাদান যার বেশ দৃঢ় সংকোচন ও বিভাজন শক্তি রয়েছে- এই ধরনের উপাদান দিয়ে আর্চ সেতু নির্মিত হয়ে থাকে। বর্তমানে অবশ্য পাথরের চল নেই। প্রায় সর্বত্রই কংক্রিট ও প্রিস্ট্রেসড রেইনফোর্সমেন্ট ব্যবহার করা হয়।

বিম সেতু

এই সেতু সাধারণত স্বল্পমূল্যেও নির্মাণ উপাদান প্রিস্ট্রেসড রেইনফোর্সড কংক্রিট দিয়েই তৈরি করা হয়। এর সঙ্গে শক্তি বাড়ানোর জন্য রাবার বা অন্যান্য উপাদান মেশানো হয়। এভাবে নির্মিত সেতুটির সংকোচন ও টান উভয় ধরনের শক্তি সহ্য করার ক্ষমতা অনেক বেশি হয়।

ট্রাস সেতু

আঁটি বাঁধা সেতুর ত্রিভুজাকৃতি টুকরোগুলো নকশা অনুযায়ী সোজা ও মাইল্ড স্টিল এঙ্গেল ও বার জোড়া দিয়ে তৈরি হয়ে থাকে। 

সৌন্দর্যের বাহ্যিক রূপ

বেশির ভাগ সেতুই ব্যবহারোপযোগিতার বিচারে একই রকম হলেও বেশ কিছু সেতুর বাহ্যিক সৌন্দর্যের গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য রয়েছে। এই ধরনের গুরুত্ব সাধারণত একটি বড় সেতুর ক্ষেত্রে হয়ে থাকে, যা কোনো শহর বা বন্দরের প্রবেশের জন্য ব্যবহৃত হয়। এই সেতুগুলোকে ‘সিগনেচার’ সেতুও বলা হয়ে থাকে। কোনো পার্কের ভেতরের বা পার্কওয়ে বরাবর নির্মিত সেতুর নকশা করার ক্ষেত্রে স্থপতিরা বাহ্যিক সৌন্দর্য্যরে দিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। উদাহরণস্বরূপ নিউইয়র্কের ট্যাকোনিক স্টেট পার্কওয়ে বরাবর নির্মিত সেতুগুলোর উল্লেখ করা যেতে পারে যেগুলোর সম্মুখভাগ পাথরে নির্মিত।

একটি সুদৃশ্য সেতু নির্মাণের জন্য, মাঝে মাঝে সেতুর উচ্চতা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি করা হয়ে থাকে। এই ধরনের সেতু পূর্ব-এশীয় বাগানে বেশি দেখা যায়। দেখতে পূর্ণিমার চাঁদের মতো দেখতে হওয়ায় এই সেতুগুলোকে ‘মুন ব্রিজ’ বলা হয়ে থাকে। অন্যান্য বাগান সেতুর মধ্যে এ রকমও দেখা যায় যে শুধুমাত্র একটি ঝরনার মতো দেখানোর জন্য কিছু নুড়ি বিছানো অংশের ওপর দিয়ে সেতুটি প্রবাহিত হয়েছে। রাজবাড়ির ভেতরে প্রায়ই এই ধরনের সেতু দেখা যায়, যা একটি কৃত্রিম জলাশয়ের, কিছুটা প্যাসেজওয়ের মতো, ওপর দিয়ে নির্মিত যেন পারাপারের সময় এমন মনে হয় যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রবেশ করা হচ্ছে। চীনের বেজিংয়ের ফরবিডেন সিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ চত্বরে পাঁচটি সেতুর একটি সেট একটি সর্পিল জলাশয়ের ওপরে নির্মিত হয়েছে। মধ্যস্থানের সেতুটি বিশেষভাবে সম্রাট, সম্রাজ্ঞী ও তাঁদের পরিচারকদের ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত রাখা হতো।

সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ

কাঠামোগত পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা সমন্বয়ে সেতুর রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করা হয়। বিভিন্ন দেশের স্থাপত্য শিল্পের নিয়ম অনুযায়ী এই সমন্বয়ে বিভিন্ন ধরনের কাজ করা হয়ে থাকে যেমন প্রতি তিন বা ছয় মাসে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, প্রতি দুই বা তিন বছরে একটি সাধারণ পরীক্ষা এবং প্রতি ছয় বা দশ বছরে একটি পূর্ণ পরীক্ষা। ইউরোপে পুরোনো সেতুর রক্ষণাবেক্ষণের খরচ নতুন সেতু নির্মাণের চেয়েও বেশি। ঢালাইকৃত ইস্পাত দিয়ে নির্মিত সেতুর স্থায়িত্বকাল পরীক্ষিত ঢালাই খন্ড রূপান্তরের মাধ্যমে বেশ খানিকটা বাড়ানো সম্ভব হয়। এর ফলে নির্মিত সেতুটির ব্যবহারোপযোগিতা বেশ বেড়ে যায়।

শুধু সেতু তৈরিই শেষ কথা নয়। গল্পের কেবল শুরু তখন। প্রতিদিন সেতুকে পর্যবেক্ষণ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব পর্যবেক্ষকের একটা টিম প্রতি সাত দিন পর পর সেতুকে পর্যবেক্ষণ করে থাকেন। দেখেন সেতুতে কোনো ফাটল ধরল কি না- পিয়ারগুলো ঠিক আছে কি না অথবা ক্যাবলগুলো ঠিকমত লোড নিতে পারল কি না। ভূমিক¤প সহনীয় সেতু হলেও প্রতিটি সেতুতে পর্যেবক্ষকদের ক্যামেরা লাগানো থাকে, যা সেতুকে প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করেই চলেন। প্রতিমাসে কেবল ব্রিজগুলোর ক্যাবলগুলোর ময়লা পরিষ্কারের জন্য টিম কাজ করে। এদের কাজ প্রচন্ড ঝুঁকিপূর্ণ। তবুও জীবন বাজি রেখে কিছু লোক প্রতিনিয়ত এসব সেতু পাহারা দিচ্ছেন যেন আপনি আমি ঠিকমতো প্রতিদিন এসব সেতুতে নিরাপদে ব্যবহার করে যেতে পারি।

(চলবে)

গবেষণা সহকারী: সোহেলি তাহমিনা  

ক্যাপশন

আর্কডিকো সেতু 

আকাশি কায়কীয় সেতু (বিশ্বের দীর্ঘতম ঝুলন্ত সেতু), জাপান

ইরানের এস্ফাহান শহরে জায়্যাদাহ নদীর ওপরে অবস্থিত সিওসেপোল সেতুটি সাফভিদ আমল (১৫০২-১৭২২) এর সেতু

নেদারল্যান্ডের অ্যামস্টারডামে অবস্থিত সেতুচিত্র

মোগল আমলে তৈরি ভারতের পেশোয়ার অঞ্চলের সেতু

কভারড্ ব্রিজ বা ঢাকা সেতু, ওয়েস্ট মন্টরোজ, ওন্টারিও, কানাডা।

লন্ডন ব্রিজ- বিখ্যাাত ক্যান্টিলিভার ব্রিজ

আর্কিনিস টাইটাস ব্রিজ

রাসকি সেতু

মিলাউ ভায়াডাক্ট

মার্গারেট সেতু
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৫তম সংখ্যা, জানুয়ারী ২০১৯

স্থপতি রাজীব চৌধুরী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top