দূর থেকে দেখে মনে হবে যেন মেঘের কোলে বাড়ি দুলছে। অবাক হওয়ার মতোই কিছু ঘটার পরিকল্পনা চলছে। স্বপ্নের মতো হলেও সত্যি এটাই যে ক্লাউড আর্কিটেকচার নামের একটি আর্কিটেকচারাল কোম্পানি ইতিমধ্যেই এই রকম বাড়ি বানানোর জন্য নিজেদের কাজ শুরু করেছে।
কিন্তু এটা কি সম্ভব, ঝুলন্ত কোনো বাড়ি তৈরি? খুব সম্ভব। অন্তত কাগজ-কলমে তো অবশ্যই সম্ভব। আমাদের মহাকাশে অসংখ্য গ্রহাণুখণ্ড বিভিন্ন গ্রহকে প্রদক্ষিণ করে চলছে বছরের পর বছর। আমাদের পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে এমন গ্রহাণু থেকে একটি টাওয়ার নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান ক্লাউড আর্কিটেকচার। বলা হচ্ছে, এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় টাওয়ার হতে চলেছে। এই টাওয়ার থেকে পৃথিবীতে আসতে হলে প্যারাস্যুট ব্যবহার করতে হবে।
টাওয়ারটা ঝুলবে কীভাবে?
সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে বা আমাদের এই সৌরজগতে আছে এগারোটি গ্রহ। অথচ লক্ষ কোটি গ্রহাণু বা এসটেরয়েডকে আমরা তেমন কোনো পাত্তাই দেই না। কারণ, এগুলোর আকার বেশ ছোট। অন্তত পৃথিবীর উপগ্রহ চাঁদের সঙ্গে তুলনা করলে এগুলো ঢের ছোট। তবে এর বেশির ভাগই পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। তবে আকার আর দূরত্বের কারণে আমরা এগুলো তেমন একটা দেখতে পাই না। মাঝেমধ্যে এগুলো খুব কাছে চলে এলে খবরে আসে। আবার কিছু এসটেরয়েড আছে পৃথিবীর খুব কাছে থেকেই সূর্যকে পরিভ্রমণ করে চলছে লক্ষ কোটি বছর ধরে। আর ঝুলন্ত এই স্থাপত্য এমনই কোনো একটা এসটেরয়েডের সঙ্গেই ঝুলিয়ে দেওয়া হবে।
নিউইয়র্কের ‘ক্লাউড আর্কিটেকচার কোম্পানি’র এই বিশালাকার পরিকল্পনা বাস্তবে অসম্ভব মনে হলেও এমনটাই ঘটতে চলেছে। আর এই ঝুলন্ত বাড়ির নাম দেওয়া হয়েছে ‘এনালেম্মা টাওয়ার’। স্থাপত্যবিদদের ধারণা, ‘গ্রহাণুকে কেন্দ্র করে এই ধরনের নকশার চিন্তাকে কাজে লাগিয়ে সবচেয়ে লম্বা ও উঁচু টাওয়ার নির্মাণ করা যায়। পুরো স্থাপত্যটি হবে একেবারে গোছালো ও সাদাসিধে। এর মধ্যে বিভিন্ন ফ্লোরে অনেক কিছুই থাকবে। যেমন অফিস, আদালত, মার্কেট, স্কুল ইত্যাদি। মোটকথা এতে যারা থাকবে, তাদের প্যারাস্যুটে দোল খাওয়া বছরে একবার হবে কি না সন্দেহ। কারণ, এই পুরো স্থাপত্যটিই হবে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ স্থাপত্য। এতেই ফসল ফলানো থেকে শুরু করে স্পা পর্যন্ত থাকবে। শুধু গ্রাহককে বেছে নিতে হবে সে কী চায়। এর আগেও এই কোম্পানিটি মহাকাশে মহাকাশযান পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিল, যাতে মঙ্গলগ্রহে থ্রিডি প্রিন্টেড বরফের বাড়ির পরিকল্পনা দিয়েছিল। তাঁরা বলেন, ইতিমধ্যেই এটি প্রমাণিত যে আবাসিক টাওয়ারগুলো প্রতি বর্গফুট হিসাবে বিক্রি হয়। ‘এনালেম্মা টাওয়ার’ যে এভাবেই বিক্রি হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এর ব্যয়ের মতোই এর দামও সেরকমই থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্থাপত্যবিদেরা উত্থাপন করেছিলেন যে এই টাওয়ারটি দুবাই শহরের আকাশে নির্মাণ করা হলেই সব দিক থেকে ভালো। কেননা এখানে ভবন নির্মাণ করা নিউইয়র্কের তুলনায় অনেক সস্তা। দুবাই শহরের মধ্যে সবচেয়ে উঁচু দুটো বাড়িসহ কিছু স্থাপত্যের সূতিকাগার রয়েছে। তাই এই শহর এমন বাড়ি দেখতে অভ্যস্ত। এখানকার কর্মীদেরও আছে বেশ ভালো অভিজ্ঞতা।
প্রিফেব্রিকেড মডিউলগুলো পৃথিবী থেকে উত্তোলন করা হবে। বিল্ডিং প্রতি সাসপেশন জয়েন্টে একটি করে প্লাগ লাগানো থাকবে, যা তারগুলো দ্বারা গ্রহাণুতে আটকানো থাকবে। তারগুলো এতটাই শক্ত হবে যে একটি টাওয়ার ঝুলিয়ে রাখলেও বিপদের কোনো আশঙ্কা থাকবে না।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘যেহেতু এই নতুন টাওয়ারের টোপোলজি বাতাসের আওতাভুক্ত, সেহেতু এটি পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় স্থানান্তরিত হতে পারে।’ এ প্রসঙ্গে তাঁরা আরও বলেন, ‘গ্রহাণুকে ব্যবহার করে কল্পিত এই টাওয়ারটি শুধুমাত্র কল্পনা নয়, বাস্তবেও নির্মিত হতে চলেছে।’
আন্তর্জাতিক মহাকাশ সংস্থা নাসা (ন্যাশনাল অ্যারোনটিকস অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) ২০২১ সালের জন্য একটি গ্রহাণুর পুনরুদ্ধার মিশন নির্ধারণ করেছে, যার ভবিষ্যৎ লক্ষ্য হলো একটি গ্রহাণু ক্যাপচার এবং স্থানান্তরিতকরণের সম্ভাব্যতা পালন। গ্রহাণুর শরীরে বিশালাকারের নোঙর ফেলে তার সাথে শক্ত কেব্্ল জুড়ে দিয়ে ভবনটি আকাশ থেকে ঝোলানোর পরিকল্পনা করছে কোম্পানিটি, যা এত দিন কেউ কখনো চিন্তাই করেনি।
এই টাওয়ারটি প্রতিদিন উত্তর থেকে দক্ষিণ গোলার্ধের দিকে পৃথিবীকে আটবার প্রদক্ষিণ করবে। নিউইয়র্ক ও আভানাটসহ আরও আটটি শহরের ওপরের দিয়ে যাত্রা করবে বিশালাকৃতির এই ভবন। কক্ষপথের সবচেয়ে নিচের অংশটি হবে ধীরগতির অংশ। দূর থেকে এটাকে ম্যানহাটনের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় দেখা যাবে। মনে হবে আকাশে ভাসছে।
বিজ্ঞানীরা একটি ব্লগে বলেছেন, মানুষ তার মস্তিষ্কের ক্ষমতায় এই পৃথিবীকে পাল্টে ফেলছে। সেই দিন হয়তো বেশি দূরে নয়, যেদিন মানুষ এই ব্রহ্মাণ্ডকেও পাল্টে ফেলবে। এই ভবনটিকে পুরো একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ভবন হিসেবে ডিজাইন করা হচ্ছে। এতে থাকছে সোলার প্যানেল, যার মাধ্যমে সে সূর্য থেকে আলোকরশ্মি ব্যবহার করে নিজের বৈদ্যুতিক চাহিদা মেটাতে পারবে। এর অ্যাপার্টমেন্ট অংশে থাকবে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, যাতে থাকবে ফাইভ স্টার মানের সুযোগ-সুবিধা। এর একটি অংশে মার্কেট, সিনেপ্লেক্সসহ একটি পূর্ণাঙ্গ শহরের সব সুযোগ-সুবিধা এতে যুক্ত করা হচ্ছে। যেহেতু লোড বিয়ারিং ক্যাপাসিটির কোনো বালাই নেই, তাই এতে ইচ্ছেমতো ডিজাইন করা হচ্ছে। এর স্ট্রাকচার হবে স্টিল স্ট্রাকচার। পৃথিবী থেকে মডিউলার স্ট্রাকচার বানিয়ে নিয়ে সেটি গ্রহাণু থেকে ঝোলানো হবে।
ভবনের জানালার আকার এবং আকৃতি টাওয়ারের দৈর্ঘ্যরে সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রার সঙ্গে যাতে খাপ খায়, তেমনভাবেই ভবনটি তৈরি করা হবে। জানালাগুলো টাওয়ারের শীর্ষে থাকবে। কারণ, যাতে এটি ট্রপোস্ফেয়ারের ওপর দিয়ে প্রসারিত হয়ে টাওয়ারের বাসিন্দাদের প্রতিদিন অতিরিক্ত ৪০ মিনিট সূর্যের আলো দিতে পারে। বর্ধিত চাপকে মোকাবিলা করার জন্য উন্নত ব্যবস্থা থাকবে। ঘূর্ণিঝড় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন বজ্রপাতে যেন এই ভবনের ক্ষতি না হয় সেজন্য এটিকে বিদ্যুৎ পরিবাহী বস্তু দিয়ে বানানো হচ্ছে। ভবনের অধিকাংশ বিদ্যুতের চাহিদা এটির ঝড়ের সময়কার বজ্রপাত থেকে পাওয়া যাবে।
এনালেম্মা টাওয়ারটির কল্পনার পেছনে আছে ক্লাউড আর্কিটেকচার ফার্ম, যার পেছনে আছেন মাসায়ুকি সোনো ও ওস্তাপ রুদাকেভিচ নামের দুই স্থপতি। ক্লাউড আর্কিটেকচার অফিস কোম্পানির এই দুই তরুণের হাত ধরে বিশ্বস্থাপত্য নতুন এক দিগন্তে যাত্রা শুরু করছে। দেখা যাক এবার কোথায় গিয়ে থামে মানুষ!
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১২০তম সংখ্যা, এপ্রিল-আগস্ট ২০২০।