মেগালিথ কথন (পর্ব ২)

……গত সংখ্যার পর

ইউরোপে মেগালিথিক স্থাপত্যের প্রসার

ইউরোপে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৫০০ থেকে ১৫০০ বছর আগে নিওলিথিক বা প্রস্তর যুগের শেষ ভাগে এবং ক্যালকোলিথিক বা তাম্র যুগে সাধারণত পাথর লম্বাভাবে দাঁড় করানো হতো। মাল্টার মেগালিথিকগুলোকেই ইউরোপের সবচেয়ে পুরোনো মেগালিথিক বলে মনে করা হয়। ইংল্যান্ডের মধ্যে স্টোহেন্জটাই হতে পারে সবচেয়ে প্রাচীন। সার্ডিনিয়াতেও ৮০০০-এরও বেশি মেগালিথিক      স্ট্রাকচারÑ ডলমেন, মেনহির আর বৃত্তাকার কবর আছে। নুরাগি নামের এক নুরাজিক সভ্যতার তৈরি, যেগুলো পাথর দিয়ে টাওয়ারের মতো করে তৈরি কিন্তু অনেক জটিল। প্রায়ই এগুলো বিশাল কবর বা অন্যান্য মেগালিথিক স্থাপত্যের কাছাকাছি হয়ে থাকে।

কার্নাক পাথরের কথা বলতে গেলে সবার আগে আসে ফ্রান্সের কৌম ডে ক্যেলুর কথা। পিয়েরে জিনÑ ব্যাপ্টিস্ট লিগ্রা ড’অসি মেনহির এবং ডলমেন নাম প্রবর্তন করে, দুটোই ব্রিটিশ ভাষার প্রত্নতাত্ত্বিক শব্দ থেকে নেওয়া হয়েছে। ভুলক্রমে তিনি মেগালিথিককে গ্যালিক কবর বলে অভিহিত করেন। ব্রিটেনে মেগালিথিক নিয়ে প্রাথমিক গবেষণা শুরু করেন প্রত্নতাত্ত্বিক আবরি ও স্টুকিলি। ১৮০৫ সালে, জ্যাক ক্যামব্রি মনুমেন্ট সেলটিক নামে একটি বই বের করেন, যেখানে তিনি একটি সেল্টিক পাথরভিত্তিক গোপন সংঘের কথা তুলে আনেন। ড্রুইড এবং মেগালিথের সঙ্গে ভিত্তিহীন সম্পর্কের গুজবে জনগণের মন কুরে কুরে খায়। বেলজিয়ামের ছোট শহর ওয়েরিসে আছে একটি মেগালিথিক সাইট। নেদারল্যান্ডের উত্তর-পূর্ব দিকে বিশেষ করে ড্রেনথে প্রদেশে আছে বেশ কিছু মেগালিথিক স্থাপনা। আয়ারল্যান্ডে খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫০০ থেকে ৩০০০ বছরের পুরোনো নিওলিথিক প্যাসেজ কবরক্ষেত্র আছে ব্রু না বনি নামে। এখানে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজে দুই শতাধিক সাজানো পাথর বেরিয়ে এসেছে, যা ইউরোপের সব মেগালিথিক শিল্পের এক-তৃতীয়াংশ।

মেগালিথিক নির্মাণের সময়কাল

মেসোলিথিক

ব্রিটেন, আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্স আর স্ক্যান্ডেনেভিয়ান অঞ্চলে কিছু মেগালিথিক মূর্তি (কখনো বা কেবল স্থাপনা) খনন করে ধারণা করা হচ্ছে যে এগুলোর সঙ্গে ধর্মীয় কার্যকলাপের সংযোগ ছিল, যা কি না নিওলিথিক যুগ থেকে মেসোলিথিক যুগে, শতাব্দী থেকে হাজার বছর যাবৎ চলে আসছে। কিছু পূর্বশর্তও রয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরবর্তী প্রজন্ম এসব রীতিকে ছুড়ে ফেলেছে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা গেছে এদের কার্যকলাপে রয়েছে বৈপরীত্যও।

উইকিপিডিয়া

নিওলিথিকচ সময়কাল

সিরকা খ্রিষ্টপূর্ব ৯০০০: এশিয়া মাইনরের গঠন, গোবেকলি টেপে: সবচেয়ে পুরোনো আবিষ্কৃত ধর্মীয় স্থাপত্য

সিরকা খ্রিষ্টপূর্ব ৭৩৫০: সিসিলির দক্ষিণ-পশ্চিমে ১২ মিটার লম্বা, ১৫০০০ কেজি ওজনের মনোলিথ

সিরকা খ্রিষ্টপূর্ব ৭০০০: প্রটো ক্যানানিতি

সিরকা খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০০: পর্তুগালের এভোরা

সিরকা খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০০: আটলান্টিক নিওলিথিক পিরিয়ডের শুরু

সিরকা খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮৫০: মাল্টার স্কোর্বা মন্দির

সিরকা খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮০০: ব্রিটানি এবং পৈট্যু

সিরকা খ্রিষ্টপূর্ব ৪৫০০: দক্ষিণ মিশরের নাবতা প্ল্যায়া

সিরকা খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০০: কার্নেকের ব্রিটানি, পর্তুগালের লিসবন, ফ্রান্স, কর্সিকা, স্পেন, ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের মনোলিথ

সিরকা খ্রিষ্টপূর্ব ৩৭০০: আয়ারল্যান্ডের নকিভিয়াগ

সিরকা খ্রিষ্টপূর্ব ৩৬০০: মাল্টার মন্দির

সিরকা খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫০০: স্পেন, আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্স, মাল্টা, বেলজিয়াম, জার্মানির কবর

সিরকা খ্রিষ্টপূর্ব ৩৪০০: সার্ডিনিয়ার বৃত্তাকার কবর বিস্তৃত আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, জার্মানি, সুইডেন, ডেনমার্কে

সিরকা খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩০০: ফ্রান্সের কার্নাক

সিরকা খ্রিষ্টপূর্ব ৩২০০: মাল্টার মেগালিথিক নির্মাণ

সিরকা খ্রিষ্টপূর্ব ৩১০০: রাশিয়ান ডলমেন নির্মাণ

সিরকা খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০: সার্ডিনিয়া, ফ্রান্স এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, স্পেন, সিসিলি, বেলজিয়াম, অর্কনি এবং ব্রিটেনের প্রথম হেন্জ নির্মাণ

সিরকা খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০: ব্রিটানি, ইতালির অটরান্টো, সার্ডিনিয়া, নর্থইস্ট স্কটল্যান্ড, জার্মানির বেল বেকার, ব্রিটেনে স্টোনহেন্জ বৃত্তাকার পাথর ইত্যাদির নির্মাণ। বেল বেকারের মাধ্যমেই নিওলিথিক পিরিয়ডের বিদায়, তাম্র যুগের সূচনা

সিরকা খ্রিষ্টপূর্ব ২৪০০: ব্রিটেনে বেল বেকার সংসৃতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠা, সমসাময়িক সময়ে শতাধিক পাথরের বৃত্ত নির্মাণ।

ব্রোঞ্জ যুগ

সিরকা খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০: ব্রিটানির নির্মাণ, ইতালির বারি, সিসিলির সাভা ডেই সারভি এবং স্কটল্যান্ডের ক্যালানিশ নির্মাণ

উত্তর-পশ্চিম ইউরোপে ব্রোঞ্জ যুগের আগমন, ক্যালকোলিথিক পিরিয়ডের বিদায়

সিরকা খ্রিষ্টপূর্ব ১৮০০: ইতালির গিওভিনাজ্জো নির্মাণ

সিরকা খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০: পর্তুগালের নির্মাণকার্য

সিরকা খ্রিষ্টপূর্ব ১৪০০: ডেনমার্কের মেয়ের কবর, বর্তমানে এ রকম নিদর্শনের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ

সিরকা খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০: ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে সর্বশেষ মেগালিথিক নিদর্শন নির্মাণ, সামুদ্রিক জলদস্যুর আক্রমণের কারণে নির্মাণকাজ স্থগিত।

আফ্রিকান মেগালিথ

পশ্চিম মিশরীয় মরুভূমির দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় নুবিয়ান মরুভূমির যে নাবতা প্লায়া, সেটা একসময় এক বিশাল হ্রদ ছিল বলে মনে করা হয়, যেটা বর্তমান কায়রো থেকে ৫০০ মাইল দক্ষিণে। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম সহস্রাব্দে নাবতা প্লায়ার লোকেরা নিখুঁতভাবে গ্রীষ্মীয় সৌর বিন্দু অবস্থানের পদ্ধতি এবং যন্ত্রপাতি তৈরি করেছিল। ধারণা করা হয়, এই লেকের পাশটাতে কেবল মৌসুমি সময়েই জনসমাগম হতো, সম্ভবত গরমকালে গবাদিপশুকে ঘাস খাওয়ানোর জন্য। দক্ষিণ-পশ্চিমীয় মরুভূমিতে অবশ্য আরও বেশ কিছু পাথরের বৃত্ত দেখা যায়। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ বছরের পুরোনো নামোরাটুংগা নামক মেহালিথিক ব্যবহৃত হতো কাশিথিক ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী দ্বারা, তারার সঙ্গে মিল রেখে ৩৫৪ দিনের এক চন্দ্রবর্ষ ঠিক রাখার জন্য। এটি আবিষ্কৃত হয় মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে বি এন লিন্চ এবং এল এইচ রবিন্স দ্বারা।

আরও আছে টিয়া নামের সেন্ট্রাল ইথিওপিয়ার বেশ কিছুসংখ্যক মেগালিথ। এসব প্রাচীন মেগালিথিকসের মধ্যে কিছু আছে খোদাইকার্য করা, এলাকাটি ওয়ার্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্গত। পূর্ব হারাঘে এলাকার মার্ভেলের উপত্যকায়ও মেগালিথিক পাওয়া যায়।

এশীয় মেগালিথ

উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মেগালিথিক কবর পাওয়া যায়। মূলত কোরিয়ান উপদ্বীপে এগুলো দেখা যায়। আরও পাওয়া যায় চীনের লিয়াওনিং, শ্যান্ডং আর ঝেজিয়াংয়ে, তাইওয়ানের ইস্টকোস্টে, জাপানের কিয়োশু এবং শিকোকুতে, ভিয়েতনামের ডং পেই প্রদেশে এবং ভারত ও পাকিস্তানের কিছু কিছু অংশে। ইন্দোনেশিয়ার সাম্বা এবং নিয়াসে এখনো মেগালিথিকের সংস্কৃতি দৃশ্যমান। মেগালিথিক করবের সবচেয়ে বড় সমাবেশ দেখা যায় কোরিয়ায়। প্রত্নতত্ত্ববিদেরা বলেন, কোরিয়ান উপদ্বীপে ১৫,০০০ থেকে ১,০০,০০০ মেগালিথ আছে। প্রচলিত ধারণায় সংখ্যাটা ৩০,০০০-এর কাছাকাছি ঘোরাঘুরি করে, যা সারা বিশ্বের মোট ডলমেনের ৪০ শতাংশ।

উত্তরীয় ধাঁচ

চীনে, বিশেষত লিয়াও নদীবক্ষে উত্তর-পূর্ব এশীয় মেগালিথিকের প্রথম প্রচলন। লম্বা করে দাঁড় করানো মেগালিথ দিয়ে কবরের প্রললন খুব দ্রুতই চীনের লিয়াও নদীবক্ষ অঞ্চল থেকে কোরিয়ান উপদ্বীপে পৌঁছেছিল, যদিও ভৌগোলিকভাবে এবং সময়ক্রমেও এরা ছিল স্বতন্ত্র এবং আলাদা। প্রাচীনতম মেগালিথিক সমাধিকে বলা হয় নর্দান যা টেবিল-স্টাইলের কবর। কারণ, সেগুলা ভূমির ওপরেই ভারী পাথরের স্ল্যাব দ্বারা চেম্বারের মতো করে বানানো। একটি অতিকায় বড় আকৃতির পাথরকে স্ল্যাব চেম্বারের ওপর দিয়ে দেওয়া হয়, যেটা একটি টেবিল টপ আকৃতি গঠন করে। এসব মেগালিথিক মুমুন পাত্রশিল্প সময়কার এবং (দু-একটা বাদে) হান নদীর দক্ষিণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। উত্তর চীনের কয়েকটা উত্তরীয় স্টাইল মেগালিথ কবরে বেশকিছু জিনিসপত্রও পাওয়া গেছে যেমন ব্রোঞ্জের ছুরি। বোঝাই যাচ্ছে এগুলো দলনেতা বা গোত্রপ্রধানদের কবর ছিল। এখন অবশ্য কবরচোরদের কল্যাণে কবরের মধ্যে আর কিছু অবশিষ্ট নেই।

দক্ষিণীয় স্টাইল

দক্ষিণীয় কোরিয়ান উপদ্বীপে দক্ষিণীয় স্টাইল মেগালিথিক কবর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এদের সময়কাল ধারণা করা হয় মুমুন সময়কালের প্রথমভাগ থেকে মাঝামাঝি সময়ে। উত্তরীয় মেগালিথের তুলনায় দক্ষিণীয় মেগালিথের আকার ছোট। দক্ষিণীয় মেগালিথ মাটির তৈরি কবরের চেম্বার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। অতিকায় বিশাল বড় পাথর দিয়ে ঢেকে দেওয়া সমাধির ভার বহন করত ছোট ছোট পাথর। কোরিয়ান উপদ্বীপের বেশির ভাগ মেগালিথিক কবরই দক্ষিণীয় স্টাইলের।

উইকিপিডিয়া

উত্তরীয় মেগালিথিকের পাশাপাশি দক্ষিণীয় মেগালিথিকসে হাতেগোনা বেশ কিছু হাতের কাজও আছে। মেগালিথিক সমাধিতে লাল রঙের প্রলেপ দেওয়া মৃৎশিল্প, ব্রোঞ্জের ছোরা, পাথরের ফলার ছুরি এবং পাথরের অলংকার পাওয়া গেছে। দক্ষিণীয় মেগালিথিক প্রায়ই দেখা যায়, একসঙ্গে অনেক ঝরনার দিকে মুখ করে আছে। মেগালিথিক কবরস্থানে দেখা যায় সমাধিগুলো বড় বড় নুড়িপাথরের দ্বারা সারিবদ্ধভাবে সংযুক্ত। লাল রঙের ভাঙা মাটির পাত্র আর পোড়া কাঠকয়লা দেখে প্রত্নতত্ত্ববিদেরা মনে করেন যে এই বেদিগুলো ধর্মীয় কার্যকলাপ আর অনুষ্ঠানের জন্যই তৈরি করা হয়েছিল। দক্ষিণীয় মেগালিথের ভারী পাথরে অনেক সময়ই কাপ মার্ক পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বেশকিছু পাথরে মানুষ আর ছোরার ছবি খোদাই করে আঁকা আছে।

ক্যাপস্টোন স্টাইল

এ ধরনের মেগালিথগুলোকে অন্যগুলোর থেকে সহজেই আলাদা করা যায় চার মিটার গভীর ব্যুরিয়াল শ্যাফট দেখে, যা বড় বড় খোয়ার সঙ্গে সংযুক্ত। কোনো রকম ভারবাহী পাথর ছাড়াই মূল পাথরটা ব্যুরিয়াল শ্যাফটের ওপরে বসানো থাকে। ক্যাপস্টোন স্টাইল মেগালিথগুলো কোরিয়ান উপদ্বীপের অঞ্চলে মূলত স্তম্ভ টাইপ হয়ে থাকে। এবং এগুলো কোরিয়ার দক্ষিণ উপকূলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। ধারণা করা হয় যে এগুলো মধ্য মুমুন পিরিয়ডের শেষ ভাগে এবং লেট মুমুন পিরিয়ডের প্রথম দিকে নির্মিত। উদাহরণস্বরূপ: ডেওকচেওন নি’র চ্যাংওনে একটা ক্যাপস্টোন সমাধি পাওয়া গেছে, যেটা চারকোনা অনেক বড় এবং মাটির প্ল্যাটফর্মে তৈরি। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা পুরোটা খুঁড়ে বের করতে পারেনি কিন্তু নিচের প্ল্যাটফর্মটা অন্তত ৫৬ ঢ ১৮ মিটার হবে আকারে।

ইন্দোনেশিয়ায় প্রচলিত মেগালিথ সংস্কৃতি

ইন্দোনেশীয় দ্বীপপুঞ্জ হলো অতীত এবং বর্তমানের অস্ট্রিনেশীয় মেগালিথ সংস্কৃতির মূল ধারক। দক্ষিণ সুমাত্রার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নায়াসে, উত্তর সুমাত্রার বাতাক জনগোষ্ঠীর ভেতর, পূর্ব নুসা টেংগারার সুমবা দ্বীপে, দক্ষিণ সুলাওয়েসির বাসিন্দাদের ভেতর এখনো মেগালিথ সংস্কৃতি চালু আছে। এই মেগালিথ সংস্কৃতিতে এখনো বিচ্ছিন্ন করে বাধামুক্তভাবে সংরক্ষণ করে রাখা আছে। বেশকিছু মেগালিথ সাইট এবং স্থাপনা ইন্দোনেশিয়ার বেশকিছু অঞ্চলে পাওয়া গেছে। জাভা, সুমাত্রা, সুলায়েশি এবং সুন্দ্রা দ্বীপে বিভিন্ন মেগালিথিক যেমন মেনহির, ডলমেন, স্টোন টেবিল, প্রাচীন পাথরের মূর্তি এবং পুনডেন বেরুনডাক নামক স্টেপ পিরামিড ধরনের স্থাপনা আবিষ্কৃত হয়েছে।

পাগুয়াংগাম সিসোলোক, পশ্চিম জাভা আর গুনুং পাদাং অঞ্চলে পুনদেন স্টেপ পিরামিড এবং মেনহির দেখা যায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সবচেয়ে বড় মেগালিথিক সাইট হলো গুনুং পাদাং। পশ্চিম জাভার সিপারি মেগালিথ সাইটে অবশ্য মনোলিথ, পাথরের টেরেস, এবং সার্কোপাগি পাওয়া যায়। জাভা এলাকায় পরে যে হিন্দু-বৌদ্ধ মন্দিরের প্রচলন হয়েছিল, সেটার পূর্বসূরি নিহিত আছে পুনডিনস্টেপ পিরামিডের ভেতর। উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, অষ্টম শতাব্দীর বড়বুদুর আর ১৫ শতাব্দীর কান্ডি সুখ স্টেপ পিরামিড স্টাইলকে অনুকরণ করে। সেন্ট্রাল সুলায়েসির লোরে লিন্দু ন্যাশনাল পার্কে প্রাচীন মেগালিথিক পাথরের কিছু ধ্বংসাবশেষ অবশিষ্ট আছে। বিশেষ করে বাদা, বেসোয়া আর নাপু উপত্যকা এলাকায়।

ভারতের মহারাষ্ট্রের মিডিয়া গন্ড

মিডিয়া গন্ড এলাকায় এখনো বেশ কিছু মেগালিথ নির্মাণের সংস্কৃতি চালু আছে বলে এক গবেষণায় জানা গেছে। ভারতের মহারাষ্ট্র প্রদেশের গাদচিরোলী জেলার ভামরাগাদ তালুকা এলাকায় মিডিয়া গংরা বাস করে থাকে।

মেলানেশিয়ান মেগালিথ

মেলানেশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ করে মিলনে উপসাগর প্রদেশ, ফিজি আর ভানুয়াটুতে মেগালিথিক পাওয়া যায়। কয়েকটি খননকার্য চালানো হয়েছে এবং স্ট্রাকচারগুলোর সম্বন্ধে অল্প কিছুই জানা গেছে। মেলানেশিয়ার এক প্রাচীন রীতি হলো মেগালিথ, যার নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে ২০০০ বছরের প্রাচীন কিরিউইনার মেগালিথ কবর ওটুয়ামের সময়কাল নির্ধারণ করে। কিন্তু খুব কম মেগালিথেরই সময়কাল নির্ধারণ করা গেছে। মূলত বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের জন্যই মেগালিথগুলো ব্যবহার করা হতো। যেমন: কবর, বলিদান আর উর্বরতা বৃদ্ধির পূজা। কিছু মেগালিথের সামনে নাচার জায়গাও আছে। মেলানেশিয়ার কিছু কিছু অঞ্চলে এখনো ধর্মীয়ভাবে পবিত্র মেগালিথিক সাইটে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এখনো প্রচলিত আছে। মৃত মানুষের আত্মা জীবিত থাকে এবং ফেরত আসে এ রকম কিছু বিশ্বাসকে সম্মান জানিয়ে মেগালিথিক সাইটগুলোতে খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

মাইক্রোনেশীয় মেগালিথ

ইস্টার্ন ক্যারোলিন দ্বীপপুঞ্জের ফোনপেই এবং কোসরাই দ্বীপে মাইক্রোনেশিয়ার সবচেয়ে প্রাচুর্য্যময় মেগালিথ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে এই দুই দ্বীপে প্রিজম্যাটিক ব্যাসল্ট দ্বারা উলম্ব স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে ফোনপেইয়ের সালাপুক এবং কোরসেইয়ের মেনকাতে।

সমুদ্র থেকে অনেক দূরে এই স্থাপনাদ্বয় বিচ্ছিন্ন। এরপর মেগালিথ স্থাপনা নির্মাণ করা হয় উপকূলীয় দ্বীপগুলোতে, একঝাঁক রাজকীয় এবং ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে। এ ধরনের স্থাপনার সময়কাল নির্ধারণ দুরূহ কিন্তু সম্ভবত এই দ্বীপগুলোতে জনসমাগম আরম্ভ হয় ৮০০ খ্রিষ্টাব্দে এবং আরও পরে ১০০০ থেকে ১৪০০ খ্রিষ্টাব্দে আরও বেশকিছু ধর্মীয় মেগালিথ স্থাপনা তৈরি করা হয়। নান মাদোল প্রায় নিশ্চিতভাবেই এক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় রাজশাসনের প্রতিনিধিত্ব করে, যার ঐতিহাসিক নাম সাউদেলিয়ার্স। সাউদেনিয়ার্ণ কিংবদন্তি অনুসারে সম্ভবত দক্ষিণ বা পশ্চিমে আর কোনো জনবসতি স্থাপিত হয়নি। নান মাদোল একসময় তার প্রাধান্য হারাতে থাকে এবং একসময় তা পরিত্যক্ত হয় সউদেল্যুর সাম্রাজ্য পতনের পরে। মৌখিক ইতিহাস অনুসারে কোর্সাই যোদ্ধাদের আক্রমণই ছিল এই সাম্রাজ্য পতনের মূল কারণ।

কথিত ইতিহাস আর গবেষণা করে বের করা সময়কাল অনুযায়ী, ১৪০০ সালে নান মাদোলের পতনের পরবর্তী ৩০০ বছরে কোসরাই দ্বীপে লেলু নামক মেগালিথিক সাইটই উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠেছিল। ইউরোপীয়দের আগমনকালেও এটা পরিত্যক্তই ছিল। মাইক্রোনেশিয়ান এসব মেগালিথিক সাইট গঠনগত দিক দিয়ে অন্যান্য মেগালিথিক সাইটের সঙ্গে খুব অল্পই মিল ছিল। অনেক দূর থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপগুলোতে প্রিজম্যাটিক ব্যাসল্ট কলাম নিয়ে আসা হয়েছিল এবং ধাপে ধাপে পাথর বসিয়ে এবং প্রবালের টুকরা দিয়ে মাঝখানটা ভরাট করে এগুলো বানানো হয়েছিল। এই স্ট্রাকচারগুলো দিয়ে ১০ মিটার উচ্চতাসম্পন্ন অত্যন্ত মজবুত দেয়াল বানানো যেত। লেলু আর নান মাদোলের দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় অবস্থিত স্টেপ পিরামিড কিছুটা মেলানেশীয় আকৃতির প্রভাব প্রদর্শন করলেও অন্যগুলো যেমন: রাজকীয় বাসভবন, ধর্মীয় স্থাপনাগুলো, কমন স্পেস এমনকি খালের সংযোগের জন্যে প্রসারিত রূপ- এর কোনো অনুরূপ প্রশান্ত মহাদেশীয় অঞ্চলে ছিল না।

মেগালিথের আধুনিক মতবাদ

মেগালিথের অনেক রকম ব্যবহার আছে যেমন বাজারের সীমানা দেওয়া, কেবল অতীতের কোনো ঘটনার সম্মানে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ এবং ধর্মীয়-সামাজিক কাজে ব্যবহার ইত্যাদি। সাধারণ কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন, অর্ধচন্দ্রাকার এবং কোনাকুনি আকৃতি দেখে, যা ধারণা করা হয়, মিশরের ফারাওদেরও এ রকম চিহ্ন ছিল। ভারত, মালয়েশিয়া, পলিনেশিয়া, উত্তর আফ্রিকা, উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকার আদিবাসী জনগোষ্ঠী এই পাথরগুলোকে আত্মা এবং দেবতার প্রতীক হিসেবে পূজা করত। বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভভাগেও গবেষকেরা মনে করতেন সব মেগালিথই একক মেগালিথ সংস্কৃতির অংশ কিন্তু আধুনিক সময়কাল নির্ধারণের পদ্ধতি আবিষ্কারের পর এই ধারণা পরিবর্তন হয়েছে। ইউরোপে কোনো মেগালিথিক সংস্কৃতি ছিল না যদিও অঞ্চলভিত্তিকভাবে কিছু কিছু জায়গায় ছিল এমনকি ব্রিটিশ আইলেরই একটা ছোট্ট অংশেও ছিল। প্রত্নতত্তবিদ ইউয়ান ম্যাকি লিখেছেন: ‘নওলিথিক পিরিয়ডে ধর্মীয় সংস্কৃতি ছিল, সেটা বিভিন্ন পাথরের বৃত্ত এবং মৃৎশিল্প দেখে নিশ্চিতভাবেই বলা চলে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কেউ নিউলিথিক আর্কিওলজির সবকিছু একসঙ্গে এক করতে পারেনি।’

বাংলাদেশের মেগালিথিক স্ট্রাকচার

সিলেট শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তরে জৈন্তিয়া পাহারের পাদদেশে জৈন্তিয়াপুর। প্রাচীন জৈন্তিয়া রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু। পৌরাণিক ও তান্ত্রিক শাস্ত্রেও এর তথ্য পাওয়া যায়। সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীতে কামরূপ রাজ্যের অধীন এবং পরে চন্দ্র ও বর্মণদের অধীনে এ রাজ্য শাসিত হয়। বর্মণদের পতনের পর দেব বংশের অধীনে আবার চলে যায় এর শাসনভার। এই বংশের শেষ রাজা জয়ন্ত রায়ের ছিল একটিমাত্র সন্তান… জয়ন্তি… যার বিয়ে হয় এক খাসিয়া নেতার ছেলের সঙ্গে। তার নাম ছিল লান্দোয়ার। এই বিয়ের সুবাদেই ১৫০০ শতাব্দীতে জৈন্তিয়াপুর চলে যায় খাসিয়াদের দখলে… ১৮৩৫ সালে ব্রিটিশরা এটিকে পুনর্দখল করে। ভাঙা ফটক এবং অসম্পূর্ণ দেয়াল ছাড়া জৈন্তিয়া রাজবাড়ির কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। দেয়ালও ছেয়ে গেছে শেওলায়। ফটকে দাঁড়িয়ে ভাবতে কষ্ট হয়… এটিরও একসময় কতই না জৌলুশ ছিল!

জৈন্তিয়া রাজবাড়ির সামনেই পড়ে আছে কতগুলো অদ্ভুত আকারের বড় বড় পাথরের টুকরো… কয়েকটি দাঁড় করানো… কয়েকটি ঠেস দেওয়া…কয়েকটি আবার পাথরের পায়ার ওপর শোয়ানো। এগুলোকে বলা হয় ‘মেগালিথ’; সারা বাংলাদেশে কেবল জৈন্তিয়াতেই দেখা মিলবে এমন মেগালিথের।

তুরস্ক, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, পর্তুগাল, হল্যান্ড ও ডেনমার্কে যত মেগালিথ দেখা যায়, জৈন্তিয়ার মেগালিথের ফরমেশন তাদের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত মানের। এগুলো কবেকার, তা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করা না গেলেও, ভারত এবং এশিয়ায় পাওয়া অন্যান্য মেগালিথের সময়কাল ছিল খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ শতাব্দী থেকে খ্রিষ্টাব্দ প্রথম শতাব্দীর মাঝে। অর্থাৎ এগুলোর আনুমানিক বয়স দুই থেকে সাড়ে তিন হাজার বছর।

স্থানীয় প্রশাসন মেগালিথের প্রায় গা-ঘেঁষে গ্রিল দিয়ে জায়গাটিকে ঘিওে রেখে দায়িত্ব শেষ করেছে। এর চারদিকে অপরিকল্পিতভাবে বেড়ে উঠছে দোকানপাট। সাইনবোর্ড আর বিলবোর্ডের কারণে দেখতে পাওয়া কষ্টকর। মেগালিথের ওপরেই পোস্টার সেঁটে দিতে ভুল করেনি স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীরাও। স্থানীয় লোকজন কেউ কোনো তথ্য দিতে পারেনি এগুলোর ব্যাপারে। তবে ব্যবহার করছে সবাই এই ঘের দেওয়া জায়গাটিকে একটি পাবলিক ডাস্টবিন হিসেবে। এটি আমাদের কৃষ্টি, আমাদের ইতিহাস, আমাদের ঐতিহ্য আর তাই এই মেগালিথ স্ট্রাকচারগুলোকে আমাদেরই রক্ষা করতে হবে। এগুলো আমাদের বিস্মৃত অতীতের সাক্ষী। সেই সোনালি অতীতকে রক্ষা করতে না পারলে একসময় ছিন্নমূল হয়ে পড়ব আমরা। সেই দিন আসার আগেই হয়তো সরকার ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ঘুম ভাঙবে এটাই এ মুহূর্তের আশা!

ক্যাপশন

ঘোবেকি টেপে

ইসরায়েলের অ্যাটলিফ ইয়ামে মেগালিথিক স্থাপনা

জর্ডানের আম্মামের ধ্বংসপ্রাপ্ত পাথর

আয়ারল্যান্ডের পোর্টাল কবর

কার্নাক সৌধ (ফ্রান্স)

মেগালিথ কবরের নির্মাণকাজ

ব্রিটানির মেগালিথ কবর-সেইন্ট মিখায়েল টুমুলুস

ইংল্যান্ডে কাপ এবং রিং মার্ক

সার্ডিনিয়াতে ন্যুরেজ

কার্নাকের কাছাকাছি টুমুলুস

নাবতা প্লায়া মেগালিথ

কোরিয়ায় নর্দান স্টাইল মেগালিথিক কবর

কোরিয়ায় প্রাপ্ত ক্যাপস্টোনে ছোরা আর দুজন মানুষের খোদাই করা প্রতিকৃতি

ইন্দোনেশিয়ায় নিয়াস দ্বীপের মানুষের সঙ্গে মেগালিথ

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৬তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৫

স্থপতি রাজীব চৌধুরী
+ posts
Scroll to Top