বাস্তুশাস্ত্রকে কেউ কেউ নির্মাণশাস্ত্র আবার স্থাপত্যবিদ্যাও বলে থাকে। হাজার বছর ধরে মানুষ থেকে মানুষে এই শাস্ত্রের জ্ঞান বাহিত হচ্ছে। বাস্তুশাস্ত্র হচ্ছে এমন এক শাস্ত্র, যার মাধ্যমে মানুষ বাস্তু সম্পর্কে গভীর জ্ঞান লাভ করে। এই শাস্ত্রে উল্লিখিত তথ্য-উপাত্ত দ্বারা মানুষ নির্মাণে সক্ষম হয় আধুনিক ও মনোরম বাস্তু তথা বাসস্থান। আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে রচিত বৈদিক শাস্ত্র যেমন-বেদ, মৎস্য পুরাণ ইত্যাদিতে ‘বাস্তু’র চর্চা সম্পর্কে বিশদ বর্ণনা আছে। বেদের অনেক জায়গায় বাস্তুশান্তির জন্য মন্ত্রেরও উল্লেখ আছে। মহাভারতের বিখ্যাত চক্রব্যূহ নির্মাণকৌশলও বাস্তুশাস্ত্রের নিয়মে বানানো। মূলত বাস্তুশাস্ত্র এমন এক শাস্ত্র, যেখানে বাস্তুর পরিকল্পিত নির্মাণ এবং ঘরের দরজা, জানালা, আসবাব কোথায় কীভাবে থাকবে কিংবা কী করলে শুভ হবে সব বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এটাকে অনেকেই পরিকল্পনাশাস্ত্রও বলে থাকে। বর্তমান স্থাপত্য পরিকল্পনার ওপর নির্ভরশীল। ‘কী হবে’ এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে পরিকল্পনা করা হয়। এর ভিত্তিতেই বাড়িঘরের ডিজাইন করা হয়। এতে পূর্বঅভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হয়। মোটামুটিভাবে স্থাপত্যশিল্প এরই ওপর নির্ভরশীল। বাস্তুশাস্ত্র হলো সে রকমই এক পরিকল্পনাশাস্ত্র, যা অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতের সুন্দর আবাসস্থল নির্মাণশিল্প। উপমহাদেশের সনাতন ধর্মাশ্রয়ী লোকজনের মাঝে এই বাস্তুর প্রচলন চলে এলেও এই অঞ্চলের অন্য ধর্মগুলোকেও এই বাস্তু ছুঁয়ে গেছে পরম মমতায়। এই বাস্তুর নিয়মগুলোই খানিকটা পাল্টে বৌদ্ধদের কাছে পরিচিত ‘ফেংশ্যুই’ নামে। সেখানে সবকিছু ভগবান বুদ্ধের মতবাদের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ম তৈরি করা হয়েছে। আবার জৈন ধর্মাবলম্বীদের জন্য বাস্তুর রয়েছে বিশেষ কিছু ভাগ। এভাবেই বাস্তুশাস্ত্র অনুসৃত হয়ে আসছে বিশেষ সমাদরের সঙ্গে।
কীভাবে এল বাস্তুশাস্ত্র
বাস্তু শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ বস্তু থেকে, যার অর্থ ভূ বা পৃথিবী। পৃথিবীর যেকোনো স্থান বা সৃষ্টিই হলো বস্তু। বাস্তুকে ভারতীয় স্থাপত্যবিজ্ঞানও বলা যেতে পারে। বাস্তুসম্পর্কিত বিষয়াদি যে শাস্ত্রে আলোচিত হয়েছে তাকে বাস্তুশাস্ত্র বলা হয়। বাস্তুশাস্ত্র মূলত বসবাস-সম্পর্কিত জ্ঞান, যা ভারতবর্ষের এক সুপ্রাচীন-বিষয়ক ফলিত ও স্থাপত্যবিদ্যা। খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে এই শাস্ত্র সারা ভারতবর্ষে আলোড়ন তুলেছিল। উল্লেখিত শাস্ত্রে গৃহনির্মাণ, নগর পরিকল্পনা থেকে শুরু করে মন্দির নির্মাণ, জলাশয়, উদ্যান কীভাবে তৈরি করতে হয় তার নিয়ম উল্লেখ করা হয়েছে। সমাজবিজ্ঞানী বারনেটের মতে, এসব জ্ঞান শুধু গ্রন্থগুলোতে লিপিবদ্ধ ছিল না, বাস্তবেও প্রয়োগ করা হয়েছিল।
বাস্তুশাস্ত্রের ইতিহাস
বাস্তুশাস্ত্র একটি অতিপ্রাচীন শাস্ত্র। প্রাচীন মুনিঋষিদের লেখা ‘বিশ্বকর্ম প্রকাশ এবং ময়মতম’ গ্রন্থকে বাস্তুশাস্ত্রের প্রাচীনতম গ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া স্কন্ধপুরাণ, বায়ুপুরাণ, গরুরপুরাণ ইত্যাদি প্রাচীন গ্রন্থ থেকে বাস্তুশাস্ত্র সম্পর্কে আমরা অনেক কিছু জানতে পারি। রামায়ণ-মহাভারতের মতো মহাকাব্যেও বাস্তুশাস্ত্রের নির্দেশ পাওয়া যায়। রামায়ণকে যদি আমরা প্রাচীন গ্রন্থ ধরি, তাহলে দেখা যায় রামের একটা রাজ্য ছিল। সেই রাজ্যে প্রাসাদ ছিল। আবার সেই প্রাসাদের পাশে সাধারণের বাসের জন্যে ঘরবাড়িও ছিল। মন্দির ছিল। এর মাঝে পুরো একটা শহরই ছিল অযোধ্যা। একটা শহর স্থাপন কিন্তু মুখের কথা নয়। বাস্তবে না থাকলে সেটা কল্পনা প্রসূতভাবে লেখা বেশ কষ্টকর। যদি ধারণা করতে পারা যায় তবেই তো লেখা যায়। রামায়ণের বর্ণনায় ঘরবাড়িগুলো কিছুটা হলেও দৃশ্যমান ছিল, যা কবির রচনায় আরও শৈর্যমণ্ডিত হয়েছে।
স্থাপত্যশৈলী উপবেদের অন্যতম বিষয়। উপবেদ যা হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ বেদের চতুর্থভাগ অথর্ব বেদ থেকে এসেছে। অথর্ব বেদের একটি অংশ হলো ‘স্থাপত্য বেদ’। এই স্থাপত্য বেদ থেকেই বাস্তুবিদ্যা বা স্থাপত্যবিজ্ঞানের অবতারণা। মূলত হিন্দু মন্দির ও ধর্মীয় স্থাপত্যগুলো এই রীতিতে নির্মিত হলেও বিশাল প্রেক্ষাপটে তা বসবাসের গৃহনির্মাণেও ব্যবহৃত হতো। এই শাস্ত্রটি মূলত স্থপতি ঋষিদের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল, আর তাঁদের শিষ্যদের তা অধ্যয়নের ও সংশোধনের অধিকার ছিল। প্রতিটি সংশোধনের জন্য যথার্থ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গভীর পর্যবেক্ষণ করে সর্বসম্মতভাবে সংশোধন করা হতো।
মূলত আর্যরা প্রাচীন ইরান-ইরাক ঘুরে প্রবেশ করেছিল এই উপমহাদেশে। বর্তমান পাকিস্তান-আফগানিস্তান হয়ে ভারত উপমহাদেশে প্রবেশস্থলে তাদের সঙ্গে এই অঞ্চলের দ্রাবিঢ় ও অস্ট্রিক জনগোষ্ঠীর পরিচয় ঘটে। মূলত বাস্তুবিদ্যা এই দ্রাবিঢ়দের বিদ্যা, যা পরে আর্যরা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল। মূর্খ আর্যদের কাছে দ্রাবিঢ়দের ঘরবাড়িগুলো দেখে অবাক লেগেছিল। তত দিনে মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পা সভ্যতা প্রসারিত হয়। আর্যরা নিজেদের ধর্ম আর দ্রাবিঢ়দের ধর্ম মিলিয়ে হিন্দুধর্মের নবতর সংস্করণ তৈরি করে নিজেদের বসবাস সুসংহত করে। দ্রাবিঢ়রাও এই ধর্ম গ্রহণ করে। পুঁথিগত বাস্তুবিদ্যা এভাবেই বিস্তৃত হয়।
প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার বছর আগে ব্রাহ্মণ্যবাদের উত্থানের সময়কালে বাস্তুবিদ্যার প্রসার ঘটেছিল। সে সময় হিন্দু ও বৌদ্ধধর্মের মাঝে বিরোধের সূত্রপাত। লাখ লাখ মানুষ বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তাদের মূল ছিল হিন্দুত্ব। এই দোটানার মাঝে বৌদ্ধধর্মে প্রবেশ করে হিন্দুধর্মের বেশ কিছু আচার-ব্যবহার। বাস্তুবিদ্যাও প্রবেশ করে বৌদ্ধধর্মে। এর বৌদ্ধ সংস্করণের নাম ফেংস্যুই। ফেংস্যুই আর বাস্তুবিদ্যা একই মায়ের পেটের দুই সহোদরের মতো করে নিজেদের মাঝে মিলেমিশে গেছে। বৌদ্ধ চৈত তৈরি হওয়ার সময়কাল এই আমলেই। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে হাজার হাজার চৈত তৈরি হয়েছিল বলে একে বলা হত চৈত গ্রাম। চৈত গ্রাম শব্দ থেকে আজকের চট্টগ্রাম শব্দটি এসেছে বলে অনেক ভৌগোলিকের ধারণা। এই চৈত বা বিহারগুলোর নিয়মকানুন ও বাস্তু বা ফেংস্যুই মতে তৈরি হয়েছিল।
বাস্তুবিদ্যার শ্রেণি
ভারতীয় বাস্তুবিদ্যাকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়।
বাস্তু
কারিগরি, নগর-পরিকল্পনা, সাধারণ, প্রাসাদ অথবা বিলাসবহুল অট্টালিকা নির্মাণ
শিল্প
মূর্তিবিদ্যা, মৃৎশিল্প
চিত্রকলা
বিস্ময়করভাবে বর্তমান যুগেও একই পদ্ধতি অনুসৃত হচ্ছে।
বাস্তুপুরুষের অবস্থান
ভারতীয় উপমহাদেশে কিছু জ্ঞানী পণ্ডিতের জন্ম হয়েছিল, যাঁদের কাজই ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ধর্ম-কর্ম বাদ দিয়ে গবেষণা করা। এসব গবেষণার ফল আজকে আমরা পেলেও অনেক কিছুই অজানা রয়ে গেছে। কিন্তু সেই অজানা অনুশীলনের কর্মফল ভোগ করছি। এর মাঝে একটা অজানা অধ্যায় হলো অঙ্কের বিস্তার। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম জ্যামিতি ও অঙ্কশাস্ত্রের প্রসার ঘটে বলে অনেক ভূতাত্ত্বিক মনে করেন। এই উপমহাদেশেই প্রথম ‘শূন্য’ আবিষ্কৃত হয়, যা পুরো পৃথিবীর গাণিতিক ব্যবস্থাকে আমূল পাল্টে দেয়। তেমনি বিভিন্ন ধর্মীয় কাজের কারণেই আবিষ্কৃত হয় জ্যামিতি। যদিও তত দিনে মেসোপটেমিয়া সভ্যতায় জ্যামিতির উদ্ভব হয়েছিল কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশীয় জ্যামিতিও বেশ গভীরে যেতে শুরু করে, যার প্রমাণ এই বাস্তুপুরুষ। বাস্তুপুরুষ হলো একটি বর্গাকার ক্ষেত্রের ভেতর শুয়ে থাকা একজন মানুষের অবয়ব, যে কোনাকুনি অবস্থান করছে। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ অনুসারে একে নানা নামে অভিহিত করা হয়। মৎস্যপুরাণ অনুসারে বাস্তুপুরুষকে যখন দেবতারা পৃথিবীর বুকে ফেলে দিয়েছিলেন তখন তাঁর মাথা ছিল উত্তর-পূর্ব দিক বা ঈশানে। আর পা ছিল দক্ষিণ-পশ্চিমে। বাস্তুপুরুষের তিনটি অবস্থার কথা জানা যায়।
নিত্যবাস্তু
বাস্তুপুরুষের অবস্থান প্রতি তিন ঘণ্টা অন্তর পরিবর্তিত হয়। নিত্য বাস্তুর ভিত্তিতে বাড়ি তৈরির কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।
চরবাস্তু
চরবাস্তুর অবস্থান প্রতি চান্দ্র মাসে বদলায়। বাড়ি তৈরির কাজ শুরু, প্রধান দরজার ফ্রেম স্থাপন, কূপ খনন এবং গৃহপ্রবেশ ইত্যাদি বাড়ি নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো এই চরবাস্তুর ওপর নির্ভর করে।
স্থিরবাস্তু
বাস্তুপুরুষ পেটের ভারে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকে। মাথা থাকে উত্তর-পূর্ব দিকে, দুটি পা, নিতম্ব দক্ষিণ-পশ্চিমে, হাঁটু ও কনুই দক্ষিণ-পূর্বে এবং উত্তর-পশ্চিম দিকে। বাড়ির দরজা, জানালা বসানো ও বিভিন্ন ঘর তৈরির প্রকৃত কাজই হলো স্থিরবাস্তু।
সনাতন পৌরাণিক কাহিনি মতে, একবার অসুর ও দেবতাদের যুদ্ধে দেবতারা অসুরদের সঙ্গে পেরে না উঠে সবাই নিজ নিজ তেজ থেকে এক দেবতা সৃষ্টি করলেন, যার নাম হলো বাস্তু দেব। উনি জন্ম নিয়েই সব অসুরদের খেয়ে ফেলেন। কিন্তু উনার ক্ষুধা মেটে না। শেষে উপায় না পেয়ে দেবতারা সেই বাস্তু দেবের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে অবস্থান নেন এবং বাস্তু দেবের খিদে নিবৃত করে। এরপর তিনি এই পৃথিবীকে ধারণ করেন। কিন্তু এই ভিত্তিমূলের আরও গভীরে গেলে একজন ঋষির কথা জানতে পারা যায়, যাঁর নাম কণাদ। তিনি একটু পাগলাটে ছিলেন। যিনি প্রথম বলেছিলেন এই পৃথিবীর সবকিছুর একটি নির্দিষ্ট কণায় তৈরি। তাঁর আমলে এই কণার নাম দিয়েছিলেন পরমাণু। এই জ্ঞানের উল্টো কিছু থিওরি সেই আমলে চলে এল। ব্রাহ্মণ্যবাদের চলনসূত্রেই পাওয়া যায় যে যাঁকে ব্রাহ্মণেরা ভয় পায়, তাঁর মতকেই গ্রহণ করেন সবাই। এই মতকে মিশিয়ে ফেলা হলো ধর্মে। মানুষের মাঝে নতুন কিছু জ্ঞানের প্রচলন শুরু হলো। এর মাঝে একটি ভাগ হলো পঞ্চভূতাত্মক পৃথিবী। এই পৃথিবী পঞ্চভূতাত্মক। এতে পঞ্চতত্ত্বের সমাবেশ ঘটেছে। এই পাঁচটি তত্ত্ব হলো ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম বা ভূমি, অগ্নি, বায়ু, পানি ও আকাশ। এই তত্ত্ব অনুযায়ী মানুষের শরীরেও এই পাঁচটি তত্ত্বের মিশ্রণ ঘটেছে। একইভাবে পৃথিবীর ওপর যেকোনো ধরনের নির্মাণ এই পাঁচটি তত্ত্বের ওপর গড়ে ওঠে। স্থূল ও সূক্ষ্ম উভয়ার্থেই এই তত্ত্ব কার্যকরী। এসব বিচার করার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ কিছু বল সম্পর্কে জেনেছে, যাদের মাঝে তড়িৎচৌম্বক বল, চৌম্বকক্ষেত্র ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এসব বলকে কীভাবে কাজে লাগিয়ে স্থাপত্যকলা তৈরি করা যায়, এই নিয়েই হয়তো ভেবেছিল কিছু মানুষ। এভাবেই উৎপত্তি হলো বাস্তুর।
বাস্তুর নিয়ম অথবা সিদ্ধান্তগুলোর পেছনে কিছু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। এর পেছনে রয়েছে কিছু গভীর বৈজ্ঞানিকভিত্তি। পৃথিবীর ওপর সূর্যরশ্মির প্রভাব, পৃথিরীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্র, বাতাসের গতি ও তার প্রভাব ইত্যাদি এমন কিছু বস্তু আছে, যেগুলোর ওপর সম্পূর্ণভাবে নজর দেওয়া হয়েছে বাস্তুশাস্ত্রে।
সূর্যই হয়তো প্রথম জীবনদানকারী বস্তু, যা মানুষ কখনোই অগ্রাহ্য করতে পারবে না। পৃথিবীর অবস্থান এমন এক অবস্থায়, যার খানিক এদিক-সেদিক হলেই প্রাণ জন্মানোর অবকাশ থাকত না। বলতে গেলে সূর্যের রশ্মিই মানুষ তথা জীবজগৎ সৃষ্টির মূল কারণ। সেসব অনেক গভীর বৈজ্ঞানিক কথা। স্থাপত্যে সূর্যের প্রভাব অনেক। দিনের একেক অংশে একেক রকম সূর্যরশ্মি পড়ে মানুষের শরীরে। ঘরের ভেতর আলো প্রবেশ করার সময়-অসময় বিবেচনা করে ঘরের দিক নির্ধারণ করা ইত্যাদি বাছবিচারের নিয়ম প্রবেশ করেছে বাস্তুবিদ্যায়। পৃথিবীর বুকে আসছে আলো, তাপ, চৌম্বক শক্তি এবং নানাবিধ শক্তি, যা হয়তো খালি চোখে দেখা যায় না। শুধু সৌরশক্তির উৎস সূর্য থেকে যে পরিমাণ রশ্মি নির্গত হয় তা বায়ুস্তর না থাকলে সোজা পুড়ে শুঁটকি হয়ে যেত মানুষের শরীর।
মহাকর্ষ শক্তি এসব শক্তির মাঝে উল্লেখযোগ্য। এর জন্যই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল বা সমুদ্রে এবং নদীতে তৈরি হচ্ছে ঢেউ। প্রাণিজগতের ওপরও এসব প্রভাব সদাসর্বদাই পড়ছে। জীবনের ওপর প্রভাব, বিশেষ করে মানবজীবনের ওপর প্রভাব নিয়েই জ্যোতিষশাস্ত্র বা জ্যোতির্বিজ্ঞান গড়ে উঠেছে। বাস্তুশাস্ত্রে প্রবেশ করেছে এই মহাকর্ষ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়। এ ছাড়া শব্দ, চৌম্বকতত্ত্ব, সৌররশ্মির বিভিন্ন প্রভাব এই বাস্তুতে প্রবেশ করেছে।
আমরা জানি, বায়ু হলো বিভিন্ন গ্যাসের সমন্বয়। পৃথিবীতে এই বাতাসে আছে অক্সিজেন ২১ শতাংশ, নাইট্রোজেন ৭৮ শতাংশ আর বাকি অংশে আছে অন্যান্য গ্যাসÑহিলিয়াম, নিয়ন, আর্গন, কার্বন ডাই-অক্সাইড ইত্যাদি।
বাতাস না থাকলে কী হতো? প্রাণের জন্য তখন অন্য কোনো উপায় থাকত হয়তো। কিন্তু যেহেতু বাতাস আছে, সেহেতু এটা আমাদের জীবন রক্ষা করে। ভারসাম্য রক্ষা করে দেহের সঙ্গে পরিবেশের। ঘরের ভেতর বাতাসের চলাচলও বাস্তুবিদ্যার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোথায় কেমন করে কোন ঘর নির্মাণ করলে সেই ঘরে কী পরিমাণ বাতাস প্রবেশ করবে, দিনের কোন সময় কেমন বাতাস প্রবেশ করলে শরীরের কী রকম বোধ হবেÑসবই বাস্তুবিদ্যার অংশ। যেহেতু হাজার বছর আগে ফ্যান বলতে কিছু ছিল না, সেহেতু প্রাকৃতিক বাতাসের চলাচলই ঘরের ভেতর আর্দ্রতা ও তাপসাম্য বজায় রাখার মূল উপায় ছিল। আজকাল সাসটেইনেবল আর্কিটেকচারে আবারও সেই আগেকার বাস্তুবিদ্যাই অন্য রকমভাবে ফেরত এসেছে মাত্র। ব্যবহারটা একই।
ভারত উপমহাদেশের একটি অংশের বাসিন্দারা এককালে কাঁচা মাংস খেতে অভ্যস্ত ছিল। এদের মাঝে আগুনের প্রচলন বিশাল এক পরিবর্তনের সাক্ষী। তা হলো এই অগ্নি বা আগুন প্রবেশ করে বিভিন্ন স্তরে। আগুন থেকে সৃষ্টি তাপ আর আলোর। তাপ এবং আলোবিহীন জীবন আমরা ভাবতেই পারি না। এ জন্য তাপের বিষয়টাও প্রবেশ করেছে বাস্তুবিদ্যায়। রান্নাঘরের পাশে কোন কক্ষ ডিজাইনে রাখতে হবে আর কোন ঘর রাখা উচিত হবে না এসব প্রবেশ করেছে বাস্তুবিদ্যায়। ঘরের মাঝে কোথায় চুলা বসাতে হবে, বাতাসের দিক থেকে কোন দিকে সরিয়ে চুলা অন্য কোথায় বসাতে হবে কি নাÑএসব জিজ্ঞাসার উত্তর পাওয়া যায় বাস্তুবিদ্যায়।
পানি না থাকলে গঙ্গা নদীর তীরে হয়তো গাঙ্গেয় উপত্যকা তৈরিও হতো না। আর হিন্দু সংস্কৃতির ধারক মানুষগুলো সেখানে সভ্যতাও তৈরি করত না। জীবনের অপর নাম পানি। এই পানি ও বাস্তুর একটি অংশ হিসেবে প্রবেশ করেছে এ কারণেই। ঘরের পাশে কোথায় জলাধার তৈরি করতে হবে, সেই জলাধারের আকার-আকৃতি কেমন হবে, এর পাড় কেমন হবে, কীভাবে পুকুরের পাড়ে গাছ লাগাতে হবেÑএসব নিয়মকানুনও আছে বাস্তুবিদ্যায়।
ধরিত্রী বা পৃথিবী হলো বৃহৎ একটি চুম্বক, যার মধ্যে আছে উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরু। সে সময়ের মানুষ দেখতে পেল মাটিই আছে, যার ওপর স্থাপনা তৈরি করা যায়। যা চাপ নিতে পারে। এবং যার ওপর ভিত্তি করে একটি বিশালাকার স্থাপনা তৈরি করে ফেলা যায়, যাতে ঘুমানো যায়। দৈনন্দিন কাজ করা যায়। আবার মন্দির তৈরি করা যায়, যাতে দেবতাদের অধিষ্ঠান করে পূজা-অর্চনা করা যায়। এ জন্য বাস্তুবিদ্যায় অবধারিতভাবেই প্রবেশ করেছে মাটি। আগে মাটি দিয়েই বানানো হতো ইট। লম্বায় দেড় ফুটের অধিক এসব ইট দিয়ে বানানো হতো মন্দির, বাসস্থান, হাট-বাজার ইত্যাদি। এগুলোর ব্যবহারÑকাজ শুরুর সময়কালÑকীভাবে কখন কাজ শুরু করতে হবেÑ এসব বাস্তুবিদ্যার প্রাসঙ্গিক আলোচনা।
পৃথিবীর দুই প্রান্ত সাড়ে তেইশ মধ্যাহ্নিক অবস্থায় আছে, যার জন্য বছরের ছয় মাস উত্তরায়ন আর বাকি ছয় মাস দক্ষিণায়ন। পৃথিবী তার নিজের অক্ষে অর্থাৎ মেরু রেখার পশ্চিম থেকে পূর্বে ঘুরছে। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে দিন ও রাত্রি। আর পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে তার কক্ষপথ ধরে সম্পূর্ণ পরিক্রমণ করতে সময় নিচ্ছে প্রায় ৩৬৫ ১/৪ দিন অর্থাৎ এক বছর। আগেই বলা হয়েছে পৃথিবীর তিনভাগ পানি আর একভাগ স্থল। পৃথিবী প্রতিনিয়ত উত্তর-দক্ষিণ অক্ষে ঘুরছে। ঘূর্ণায়মান অবস্থায় উত্তর-পূর্ব দিকেই কাত হয়ে আছে। ভূমি, পানি, প্রকাশ, বায়ু ও আকাশের সঙ্গে মানুষের সম্বন্ধ। তাই আদিকাল থেকেই মানুষ বিচার-বিবেচনা করে ঠিক করেছিল যে পূর্ব এবং উত্তর দিকে এ রকম কোনো কিছু নির্মাণ বা বৃক্ষরোপণও অনুচিত, যার ফলে সূর্যকিরণ বাধাপ্রাপ্ত হয়। আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে উত্তর দিকে ফাঁকা জায়গা রাখার অর্থ কী, কেননা সূর্যকিরণ তো পূর্ব দিক থেকে আসে।
সূর্য সারা বছর একই পথে পূর্ব থেকে পশ্চিমে পরিক্রমণ করে না। একবার সে যায় উত্তরের পথে আর একবার দক্ষিণের পথে। প্রতি পথেই সে ছয় মাস ধরে নিয়মিত পরিক্রমণ করে। উত্তরের পথে পরিক্রমণ করে ২২ ডিসেম্বর থেকে ২১ জুন পর্যন্ত। এই সময়কে বলে সূর্যের উত্তরায়ন। আবার দক্ষিণের পথে পরিক্রমণ কাল ২১ জুন থেকে ২২ ডিসেম্বর। এই সময়কে বলে সূর্যের দক্ষিণায়ন। সূর্যরশ্মি বিভাজিত হয়েছে সাতটি রঙে। এর মধ্যে লাল রশ্মি ভালো এবং অতিবেগুনি রশ্মি ক্ষতিকর।
আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, এই সৌরজগৎ টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে সূর্য বিরাট এক ভূমিকা পালন করছে। পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব ১৪৯৬ কোটি কিলোমিটার। প্রতি সেকেন্ডে ৩০০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার গতিতে সমানে ঊর্ধ্বগামী হচ্ছে সৌরশক্তির স্রোত। পৃথিবী সৌরশক্তির দুই কোটি অংশের মধ্যে একটি অংশ লাভ করে। সূর্য প্রতি সেকেন্ডে ৩ লাখ ৭১ হাজার ২৬ ওয়াট শক্তি নির্গত করে। সূর্যরশ্মিতে এমন অনেক পদার্থ আছে, যা মানুষ, জীবজন্তু ও গাছপালার বেঁচে থাকার পক্ষে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এই সূর্যের তাপের জন্যই পানি বাষ্প হয়ে মেঘের সৃষ্টি হয় এবং বৃষ্টি হয়। এই রশ্মিই আমাদের শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন তৈরি করে। সৌররশ্মি এমন অনেক ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে দেয়, যা আমাদের শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর ও নানা রকম রোগ সৃষ্টিকারী। আবার সূর্যরশ্মি দিয়ে সানবাথের মাধ্যমে অনেক চর্মরোগের চিকিৎসাও হয়ে আসছে অনেক বছর ধরে। মোটকথা এসব বিষয় আগেকার দিনের সেই আর্য ঋষিদের বিশদ জানা না থাকলেও এগুলো ঠিকই উঠে এসেছে বাস্তুবিদ্যায়।
বাস্তুশাস্ত্রে বাড়িঘর বানানোর নিয়মকানুন
বর্গ বা আয়তক্ষেত্রের বাড়িঘর দিয়ে শুরু হয়েছিল অস্ট্রিক ও দ্রাবিঢ়দের বাড়িঘর বানানো। মনে করা হয়, বর্গক্ষেত্রই হচ্ছে প্রথম জ্যামিতিক বস্তু, যা মানুষ আবিষ্কার করেছিল। প্রাচীন হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো সভ্যতার বাড়িঘরগুলো ও আয়ত বা বর্গক্ষেত্রই ছিল। এই আয়তক্ষেত্র বা বর্গের নিয়মগুলো অঙ্কের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল ভারতজুড়ে। এই বর্গক্ষেত্রের সঙ্গে মিল রেখে বাড়ি বানানোর নিয়মগুলো সন্নিবেশিত হয়েছে বাস্তুশাস্ত্রে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সূর্য ও বাতাসের গতি-প্রকৃতি।
বাস্তুশাস্ত্রে ষোলোটি কক্ষ ও মাঝখানে উঠোনযুক্ত বাড়িকে উত্তম মনে করা হয়েছে। ঘরের পূর্বদিকে গোসলখানা ও জলাধার স্থাপনের নিয়ম লিখিত আছে। অগ্নিকোণে রান্নাঘর, বৈদ্যুতিক সাজসরঞ্জাম রাখার ঘর করতে বলা হয়েছে। উত্তরে দামি বা বহুমূল্য জিনিসপত্র রাখার ভান্ডার ও ধনসম্পদ রাখার ঘর নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অগ্নিকোণে (দক্ষিণ-পূর্ব) ও পূর্বদিকের মাঝখানে ঘি, তেল, দধিমন্থন ঘর হওয়া উচিত বলে উল্লেখিত আছে। এই ধরনের বাড়িকে বসবাসের জন্য উত্তম বলা হয়েছে।
পশ্চিম দিকে খাওয়ার ঘর হবে, যে ঘর রাতের বেলা ঠান্ডা হয়ে যাবে। যা খাদ্যগ্রহণে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এনে দেবে। আবার দুপুরের খাবার গ্রহণের সময়ও ঠান্ডা থাকবে। পশ্চিম ও নৈর্ঋত (দক্ষিণ-পশ্চিম) দিকের মাঝখানে পড়ার ঘর অথবা অতিথি কক্ষ করার কথা বলা হয়েছে যেন পড়াশোনার সময় আলো ও বাতাস উভয়ের সংস্পর্শে আসে। বায়ু দিকে (উত্তর-পশ্চিম) দিকে পশুশালা, রথ বা বাহন রাখার জায়গা করতে হবে। পশ্চিম ও উত্তরের মধ্যে রোদনগৃহ বা শোয়ারকক্ষ তৈরি করা যেতে পারে। নৈর্ঋত দিকে পাদুকা রাখতে হবে। নৈর্ঋত ও পশ্চিম দিকের মাঝখানে শৌচাগার নির্মাণ করা যেতে পারে। পশ্চিম দিকে ছোট ছেলেমেয়েদের থাকার ঘর করতে হবে। বায়ু দিকে কুমারী মেয়েদের থাকার ব্যবস্থা থাকবে। কারণ, এই রকম ঘরে কুমারী মেয়ে থাকলে তার বিবাহে বিলম্ব দোষ কেটে যাবে- এ রকম বেশ কিছু সামাজিক প্রথাসংবলিত নিয়মকানুনও বাস্তুবিদ্যায় প্রবেশ করেছে।
বাস্তু দিকদর্শন
আধুনিক যুগে জমির অভাব, বড় বাড়ি তৈরি করাও প্রায় অসম্ভব। এককালে রাজবাড়ি তৈরি হতো ওভাবে। এখন ছোট্ট একখণ্ড জমির ওপর বিশাল অট্টালিকা। তাতে খোপ খোপ সব অ্যাপার্টমেন্ট। তবে ষোলো ঘরের বাড়ি আজকের দিনে কল্পনা করাও বৃথা। ষোলো কক্ষযুক্ত বাড়ি সম্ভব না হলে এগারো কামরা, নয় কামরা, সাত কামরা, পাঁচ কামরাযুক্ত বাড়ি করা যেতে পারে। তাও যদি সম্ভব না হয়, তাহলে অন্ততপক্ষে তিন কামরার বাড়িও ভালো। এই পরিপ্রেক্ষিতে আধুনিক প্রয়োজনের কথা মনে রেখে আদর্শ বাড়ির জন্য বিভিন্ন অনুকূল দিক ও অন্যান্য পরামর্শের কথা বলা হয়েছে। পরিস্থিতি ও বাস্তুমতে প্রয়োজন অনুসারে এসব দিক ও পরামর্শ অনুসরণ করে অবশ্যই লাভবান হওয়া যায়।
বাড়ি তৈরি: বাস্তুশাস্ত্র মতে, জমির উত্তর-পূর্ব কোণে ভূমির দোষ উদ্ধার করা উচিত। শাস্ত্রমতে দোষ বা ত্রুটি সম্পন্ন করার পরই প্রথম খনন শুরু করা কর্তব্য। চারদিকের জমিকে প্রথমে সমান করে নিতে হবে। এরপর জমির ঢাল রাখতে হবে উত্তর-পূর্বে। ভিত্তিপ্রস্তর চান্দ্রমাস অনুসারে উপযুক্ত দিকে বিশেষ অনুষ্ঠানপূর্বক স্থাপন করতে হবে। নির্মাণকাজ প্রথমে দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে শুরু করতে হবে। পূর্ব ও উত্তরে বেশি জায়গা ছাড় দিতে হবে। দক্ষিণ ও পশ্চিম সীমানার পাঁচিল উত্তর ও পূর্ব দিকের চেয়ে উঁচু আর মোটা করতে হবে। মূল বাড়িটি রাস্তার তল থেকে কমপক্ষে দুই ফুট উঁচু করে করা উচিত। মনে রাখা দরকার যে প্রথম খনন করার সময় শুভ মুহূর্ত অনুসরণ করা অবশ্য কর্তব্য। পর্যায়ক্রমে সর্বপ্রথম উত্তর-পূর্ব, তারপর উত্তর-পশ্চিম, দক্ষিণ-পূর্ব এবং পরিশেষে দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ এভাবে খনন করা উচিত।
ভিত্তিপ্রস্তর: বাস্তু বিশেষজ্ঞ ও জ্যোতিষীর পরামর্শ অনুযায়ী শুভ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা উচিত। প্রথম খননের ঠিক বিপরীত নিয়মে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে হবে। যথা: পর্যায়ক্রমে দক্ষিণ-পশ্চিম, দক্ষিণ-পূর্ব, উত্তর-পশ্চিম ও পরিশেষে উত্তর-পূর্ব। সে আমলে পিলার তৈরির প্রচলন ছিল না। ইট দিয়েই পুরো বাড়ি নির্মাণ হতো। এ জন্যই ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করা হতো। আজকালকার দিনে ভিত্তিপ্রস্তরের স্থানে পিলারের ফুটিং বসানো হয়।
সীমানাপ্রাচীর: বাস্তুবিদ্যা মতে, বাড়ির চারদিকে সীমানাপ্রাচীর হওয়া বাঞ্ছনীয়। সীমানাপ্রাচীর এবং মুখ্য বাড়ির মাঝখানে যেন ছাড় থাকে। সীমানাপ্রাচীরের পশ্চিম দিকের দেয়াল পূর্ব দিকের দেয়ালের চেয়ে যেন বেশি উঁচু থাকে। যদি দক্ষিণ এবং পশ্চিমের দেয়াল উঁচু করা সম্ভব না হয় তবে যেন দেয়ালটিকে তুলনামূলকভাবে একটু মোটা করে তৈরি করা হয়।
সীমানাপ্রাচীরের দ্বার: সীমানাপ্রাচীরের দরজা নির্ভর করছে জমিটি কোনমুখী তার ওপরে। সীমানাপ্রাচীরের দরজা কীভাবে তৈরি করতে হবে সে সম্বন্ধেও প্রামাণিক সূত্রগুলো প্রাচীন বাস্তুশাস্ত্রে বলা আছে। নিচে একটি তালিকার সাহায্যে এ বিষয়ে জানানো হলো।
- পূর্বমুখী জমি: উত্তর-পূর্ব দিকের পূর্বে করতে হবে
- পশ্চিমমুখী জমি: উত্তর-পশ্চিমের পশ্চিম দিকে করতে হবে
- উত্তরমুখী জমি: উত্তর-পূর্বের উত্তর দিকে
- দক্ষিণমুখী জমি: দক্ষিণ-পূর্বের দক্ষিণ দিকে
সীমানাপ্রাচীরের দরজা যে দিকগুলোতে করা কোনো মতেই উচিত নয় তারও একটি তালিকা দেওয়া হলো:
- দক্ষিণ-পূর্ব দিকের পূর্ব দিকে
- দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের পশ্চিম দিকে
- উত্তর-পশ্চিম দিকের উত্তর দিকে
- দক্ষিণ দিকের মাঝখানে
ব্রহ্মস্থান
জমির মাঝখানে অর্থাৎ একেবারে মধ্যস্থলে কোনো রকমের ভারী নির্মাণ কর্ম বাঞ্ছনীয় নয়। যেমন বিম, কলাম, পিলার, দেয়াল ইত্যাদি যেন জমির মাঝখানে না থাকে। একই রকমভাবে কোনো ঘরের মাঝখানে কোনো রকমের ভারী কিছু বসানো বাঞ্ছনীয় নয়। কারণ, মধ্যস্থলটি হলো ব্রহ্মস্থান। এই চর্চাটা এখন অনেকটাই বিলুপ্ত। লিফটকোরের অবস্থান থাকে অনেক সময়ই একদম মাঝে। যদিও বাস্তুমতে এটা নিষিদ্ধ।
বারান্দা: উত্তর ও পূর্ব দিকে করতে হবে বারান্দা। বারান্দার ছাদের স্তর বাড়ির ছাদের স্তরের এক সমান যেন না হয়। বারান্দার উত্তর-পশ্চিম দিকে জুতো রাখার জায়গা করা যেতে পারে।
নলকূপ ও সেপটিক ট্যাঙ্ক: নলকুপ, কুয়ো ইত্যাদি উত্তর-পূর্ব দিকে তৈরি করতে হবে। উত্তর-পূর্ব দিকের কোণসূত্রের ওপর যেন নলকূপ বসানো না হয়। সেপটিক ট্যাঙ্ক দক্ষিণ-পূর্ব বা উত্তর-পশ্চিমে করা যেতে পারে। এটিও যেন কোণসূত্রের ওপর না বসে।
ওভারহেড ট্যাঙ্ক: ওভারহেড ট্যাঙ্ক যেন দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের পশ্চিমে হয়।
আউটহাউস: উত্তর বা পশ্চিম দিকে সীমানাপ্রাচীরের দেয়াল স্পর্শ না করে আউটহাউস তৈরি করতে হবে। আউটহাউসের উচ্চতা প্রধান দেয়ালের উচ্চতার চেয়ে কম হওয়া বাঞ্ছনীয়।
গ্যারেজ: গ্যারেজ হওয়া উচিত দক্ষিণ-পূর্ব বা উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে।
বাইরে যাওয়ার দরজা: প্রধান দরজার চেয়ে ছোট আকারে অন্য দিকে যাওয়ার দরজা তৈরি করা উচিত। এই দরজার উচ্চতা প্রধান দরজার মতো রাখা যাবে, কিন্তু চওড়ায় দরজা যেন তুলনায় ছোট হয়।
খাওয়ার ঘর: খাওয়ার ঘরের অবস্থান নির্ভর করছে রান্নাঘরের অবস্থানের ওপর। আদর্শ রান্নাঘর হিসেবে যদি দক্ষিণ-পূর্বে রান্নাঘরের অবস্থান হয়, তবে পূর্বদিকে খাওয়ার ঘর করা উচিত। এবং যদি উত্তর-পশ্চিমে রান্নাঘর হয় তবে পশ্চিম দিকে খাওয়ার ঘর করা উচিত। খাওয়ার টেবিল অবশ্যই আয়তাকার হওয়া উচিত। গোল বা ছয় কোণযুক্ত টেবিল না হওয়াই বাঞ্ছণীয়। খাওয়ার ঘরের দক্ষিণ-পূর্বে বা উত্তর-পশ্চিমে রেফ্রিজারেটর রাখা উচিত এবং উত্তর-পূর্বে খাওয়ার জল, জলের ফিল্টার ও বেসিন রাখতে হবে।
বসার ঘর: বাড়ির এবং অতিথিদের বসবার ঘর হবে পূর্ব বা উত্তর-পশ্চিম দিকে। বাড়ির কর্তা পূর্ব বা উত্তর দিকে চেয়ে অতিথিকে আপ্যায়ন করবেন। বসার জায়গাগুলো এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে অতিথি পশ্চিম বা দক্ষিণ দিকে তাকিয়ে কথা বলেন এবং বাড়ির কর্তা পশ্চিম বা দক্ষিণ দিকে থাকবেন। এতে বাড়ির কর্তা এবং অতিথি উভয়ের পক্ষে শুভ।
পড়ার ঘর: উত্তর বা পশ্চিম দিকের ঘরে পড়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কিন্তু পড়ার সময় অবশ্যই পূর্ব বা উত্তর দিকে তাকিয়ে পড়াশোনা করা উচিত। পড়ার টেবিলের ঢাকা বা টেবিল ক্লথ যদি হালকা সবুজ রঙের হয় তবে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করতে সাহায্য করে। মনোবিজ্ঞানীদের তথ্য থেকেও এটা প্রমাণিত। পড়ার ঘরের দরজা উত্তর-পূর্ব দিকে হলে ভালো হয়।
বাস্তুশাস্ত্রে এমন হাজারো নিয়মকানুন দেওয়া আছে। বলা হয়ে থাকে- বর্গক্ষেত্র হলো প্রথম আবিষ্কৃত জ্যামিতিক আকৃতি। বাস্তুবিদ্যার জ্যামিতিক নকশাকে অনুকরণ করেই দেড়-দুই হাজার বছর ধরে সহস্র মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে। এখনো ভারত, বাংলাদেশ, নেপালসহ ভারতীয় উপমহাদেশের হিন্দুপ্রধান অঞ্চলগুলোতে বাড়িঘর নির্মাণ করতে বাস্তুবিদ্যার প্রয়োগ ঘটানো হয়। অনেকেই অবৈজ্ঞানিক বলেন এঁকে। কিন্তু মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানকে অবৈজ্ঞানিক আখ্যা দেওয়ার চেয়ে বিজ্ঞানকে অশ্রদ্ধা করাই শ্রেয়। আজকের সভ্যতা এত দূর এগিয়ে যাওয়ার পেছনে সভ্যতা সৃষ্টির প্রথম মানুষটির ও অবদান থাকে অনেক। সেই অবদান আমাদের মহিমান্বিত করে। জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত করে। জ্ঞানের ভান্ডার পরিপূর্ণ করে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯২তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৭।