ব্যবসায় সাফল্য পেতে একজন ব্যবসায়ীকে নিতে হয় নানা কৌশল। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ব্যবসায়ী আবু বকর প্রামাণিক। কৌশলী না হয়েই যিনি সফল ব্যবসায়ী। ব্যবসা তাঁর কাছে নেশার মতো। পারিবারিক ও রাজনৈতিক পরিচয় থাকায় এলাকাবাসী তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য কেনে সাগ্রহে। সব সময় চেষ্টা করেন সততার সঙ্গে ব্যবসা করতে, মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে। এসব গুণাবলীই তাঁকে করে তুলেছে সফল ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ী আবু বকর প্রামাণিক টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতী থানার পটল বাজারের ‘মেসার্স ওসমান গণী ট্রেডার্স’-এর স্বত্বাধিকারী। বন্ধন-এর নিয়মিত আয়োজন ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে এবার জানব এ ব্যবসায়ীর সফলতার গল্প। সহযোগিতায় ছিলেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির জ্যেষ্ঠ আঞ্চলিক বিপণন কর্মকর্তা এন এম মোবাশ্বর হোসেন।
ব্যবসায়ী আবু বকর প্রামাণিকের জন্ম ১৯৫৪ সালের ৯ জুলাই টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতী উপজেলার দুর্গাপুরে। বাবা মরহুম ওসমান গণী প্রামাণিক ও মা মরহুমা আয়েশা খাতুন। তিনি ১৯৭৮ সালে সাল্লা সমবায় উচ্চবিদ্যালয়, কালিহাতী থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর পড়ালেখার ইতি টেনে শুরু করেন ব্যবসা। যদিও পরিবারের সবার ইচ্ছা ছিল লেখাপড়া চালুক তাঁর। কিন্তু তাঁর আগ্রহ ছিল ব্যবসায়। তাঁর বাবাও ছিলেন নারায়ণগঞ্জের প্রসিদ্ধ পাট ব্যবসায়ী। শিক্ষাজীবনের ইতি টেনে কালবিলম্ব না করে তিনিও একজন ব্যবসায়ী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনে বেশ কিছু ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়েছেন। পেয়েছেন সফলতাও। বর্তমানে তিনি আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির টাঙ্গাইলের কালিহাতী থানার একজন সফল পরিবেশক।
ছাত্রজীবনে আবু বকর ও তাঁর বন্ধুরা মিলে গড়ে তোলেন সমবায় সমিতি। সবাই কিছু টাকাও জমান। ওখানে তাঁদের জমে ৭৩৫ টাকা। সেই টাকা মূলধন ধরে শুরু করেন ধানের ব্যবসা। জামালপুর থেকে ধান কিনে নিজ এলাকায় বিক্রি করতেন। ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ক্রমেই বাড়তে থাকে ব্যবসার পরিসর। উন্নয়নের একপর্যায়ে বড় ভাইয়ের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার নিয়ে ব্যবসার পরিধি আরও বাড়িয়ে তোলেন। যুক্ত হয় চাউল। নওগাঁ-রাজশাহী অঞ্চল থেকে চাউল সংগ্রহ করতেন। চলমান এ ব্যবসার সঙ্গে স্থানীয় পটল বাজারে এক বন্ধুর সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে একটি কাপড়ের দোকান দেন। তখন ওই বাজারে একমাত্র কাপড়ের দোকান ছিল ওটি। বেচাকেনাও হতো ভালো। বাল্যকাল থেকেই তিনি ছিলেন রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ক্রমেই তাঁর রাজনৈতিক ব্যস্ততা বেড়ে যায়। ফলে কাপড়ের ব্যবসায় তেমন একটা সময় দিতে পারতেন না। ব্যবসার হালচাল সম্পর্কে খোঁজখবরও রাখা হতো না। এতে ব্যবসার বেশ ক্ষতি হয়। একপর্যায়ে তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদারও ব্যবসা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেন। এমন ক্রান্তিলগ্নে তিনি ব্যবসাটি বন্ধ করতে বাধ্য হন।
এরপর কেটে যায় কয়েকটা দিন। কী ব্যবসা করবেন তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না আবু বকর। হাতও একেবারে মূলধনশূন্য। তবে দমে যাননি। কম টাকা বিনিয়োগে কী ব্যবসা করা যায় তার উপায় খুঁজতে থাকেন। একপর্যায়ে শুরু করেন ফার্নিচার ব্যবসা। কিন্তু কারিগরদের কাজের অবহেলায় সে ব্যবসাটিতে কাক্সিক্ষত সাফল্য আসেনি। সেই সময়ে এক রাজনৈতিক বন্ধুর পরামর্শে ও সহযোগিতায় শুরু করেন সিমেন্ট ব্যবসা। প্রথম দিকে অন্যান্য সিমেন্ট বিক্রি করলেও পরবর্তী সময়ে শুরু করেন আকিজ সিমেন্ট বিক্রি। গুণগতমানের এ পণ্যটি স্বল্প সময়েই তাঁকে এনে দেয় অভাবনীয় ব্যবসায়িক সাফল্য। তিনি হয়ে ওঠেন অত্র এলাকার অন্যতম সেরা বিক্রেতা। অভূতপূর্ব বিক্রয় সাফল্যে তিনি কোম্পানির পক্ষ থেকে উপহারস্বরূপ পেয়েছেন টেলিভিশন, মাইক্রো ওভেন, স্মার্টফোন, স্বর্ণালংকার, নগদ টাকাসহ নানা পুরস্কার ও সম্মাননা। ব্যবসাটির সম্ভাবনা উপলব্ধি করে তিনি সিদ্ধান্ত নেন বড় পরিসরে ব্যবসা করার। সে ভাবনা থেকেই ২০১৭ সালে পণ্যটির ডিলারশিপ গ্রহণ করেন। নির্মাণপণ্যের ব্যবসা অত্যন্ত সম্মানের। তবে পণ্যটির পরিবেশকের সম্মান আরও বেশি। আর তাই চলমান এ ব্যবসাটি পাথেয় করেই সামনে এগিয়ে যেতে চান।
ব্যবসায়ী আবু বকর প্রামাণিক পারিবারিক সম্পর্কে জড়ান ১৯৮০ সালে। স্ত্রী নাজমা আক্তার। এ দম্পতির তিন মেয়ে এক ছেলে। বড় মেয়ে শিমু আক্তার, মেজো মেয়ে সোমা আক্তার, ছোট মেয়ে শিরিন আক্তার। মেয়েরা সবাই বিবাহিতা। একমাত্র ছেলে ফারুক আহমেদ নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যলয়ের বিবিএ শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। সিমেন্ট ব্যবসার পাশাপাশি তাঁর রয়েছে ইট, বালুর ব্যবসা। ঠিকাদারিও করেন। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংগঠনিক কাজেও জড়িত ব্যবসায়ী আবু বকর। তিনি পটল বাজার বণিক সমিতির সভাপতি। এ ছাড়া তিনি ১৯৯১ সাল থেকে অদ্যাবধি দুর্গাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৯তম সংখ্যা, মে ২০১৯