শহর-গ্রামের মিশেলে অনন্য এক জনপদ ঢাকার অদূরের কেরানীগঞ্জ। কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রবাসী আয়সহ সর্বস্তরের মানুষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সুনাম কুড়িয়েছে এলাকাটি। প্রতিনিয়তই উন্নত হচ্ছে এ জনপদটি। উন্নয়নের এ ধারায় অবদান রাখছেন এলাকার কিছু সফল নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী। এমনই এক সফল ব্যবসায়ী আবু বাখের। কেরানীগঞ্জের খাড়াকান্দি মাদ্রাসা বাজারে অবস্থিত মেসার্স বন্যা ট্রেডার্স-এর কর্ণধার তিনি। বন্ধন-এর ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বের এ সংখ্যায় জানাব সফল এই ব্যবসায়ীর আদ্যোপান্ত। সার্বিক সহযোগিতায় আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম।
ব্যবসায়ী আবু বাখেরের জন্ম ১৯৭০ সালের ৩ মার্চ কেরানীগঞ্জ, খাড়াকান্দির চর ভান্ডারখোলা গ্রামে। পিতা মরহুম আব্দুল বাসেদ ও মাতা ফিরোজা বেগম। ৩ ভাই ১ বোনের মধ্যে সবার বড় তিনি। পরিবারের বড় সন্তান হওয়ায় কিশোর বয়সেই সাংসারিক উন্নয়নে কর্মজীবন বেছে নেন। জড়িয়ে পড়েন কৃষিকাজ, ড্রাইভিং, ব্যবসাসহ বিভিন্ন কাজের সঙ্গে। একপর্যায়ে ১৯৯০ সালে পাড়ি জমান মালয়েশিয়া। সেখানে প্রায় সাড়ে ৪ বছর অবস্থান করেন। দেশে ফিরে কিছুদিন পর আবারও যান সৌদি আরবে। সেখানে কাটে আরও ৩ বছর। কখনো চাকরি, কখনো ব্যবসা করেই জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। কিন্তু বিদেশের মাটিতে ব্যবসা করা মোটেও সহজ ছিল না। ছিল নানা ধরনের বৈধতা-বিষয়ক জটিলতা। উপলব্ধি করেন এভাবে জীবনে উন্নতি করা যাবে না। ফিরে আসেন দেশে। শুরু হয় ভীষণ চ্যালেঞ্জিং এক জীবন। নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে সবশেষে থিতু হন নির্মাণপণ্য ব্যবসায়।
ব্যবসার শুরু থেকেই নিজের বুদ্ধি, জ্ঞান, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও কৌশল দিয়েই তিনি ব্যবসা করেছেন। মুনাফার পিছে না ছুটে প্রথমেই প্রাধান্য দিয়েছেন নিজ ব্যবসাকে, যা সবার কাছে পরিচিত করে তুলছে তাঁকে। চেষ্টা করেন ক্রেতার কাছে পণ্য সম্পর্কিত সঠিক তথ্য তুলে ধরতে, তাঁদের গুণগতমানের পণ্য কেনার ব্যাপারে আগ্রহী করতে। সব সময় সঠিক ওজনে পণ্য বিক্রি করেন। এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটেছে, একই আয়তনের ভবন নির্মাণে যেখানে অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে ক্রয়কৃত রড লেগেছে ৮ টন, সেখানে তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে ক্রয়কৃত ৭ টন রডেই কাজটি সম্পন্ন হয়েছে। এভাবে গুণগতমান ও সঠিক ওজনে পণ্য পেয়ে ক্রেতারা তাঁর প্রতি বিশ্বাস রেখেছে। ফলে ক্রমেই বেড়েছে তাঁর ব্যবসায়িক পরিসর। এ জন্য খুচরা পর্যায়ে সিমেন্ট ব্যবসা করলেও তিনি আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির কেরানীগঞ্জ-২ টেরিটরির সাব-ডিলারের মতো সুবিধা পেয়েছেন। উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পণ্য বিক্রি করায় বিভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকে পেয়েছেন ল্যাপটপ, টেলিভিশন, ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন, মোবাইল, নগদ টাকাসহ নানা উপহারসামগ্রী। এ ছাড়া সুযোগ পেয়েছেন নেপালসহ দেশের দর্শনীয় সব স্থান ভ্রমণের।
ব্যবসায়ী আবু বাখের স্বল্পসময়ে নির্মাণপণ্য ব্যবসায় সফলতা অর্জন করলেও শুরুর গল্পটা ছিল খুবই দুঃসহ। বাল্যকাল থেকে জীবনে যা কিছু অর্জন করেছেন পুরোটা যেন অধরাই রয়ে গেছে। বিদেশেও অনেক অর্থ আয় করেছেন, যার পুরোটাই পাঠিয়েছেন সংসারের কাজে। পরিবারের সদস্যরা তা ব্যয় করেছে। দেশে ফিরে তা থেকে অবশিষ্ট পাননি কিছুই। এমনকি ব্যবসা শুরুর জন্য এক পয়সাও ছিল না! এ পরিস্থিতিতে দিশেহারা আবু বাখের হতাশায় মুষড়ে পড়লেও আবারও শুরু করেন নতুনভাবে। কিন্তু কী করবেন? তিনি যে বংশের সন্তান তাতে যেনতেন কাজ করাও যায় না। তা সত্ত্বেও লোকলজ্জা ভুলে সবার অগোচরে সাধারণ শ্রমিকের কাজ করেছেন। কিছুদিন কাজ করে জমানো টাকা দিয়ে শুরু করেন মাটি বিক্রির ব্যবসা। এই ব্যবসা থেকে আয়কৃত টাকায় শুরু জমি কেনাবেচা। বেশ ভালোই চলছিল তাঁর এই ব্যবসাটি। একটা বাড়িও করেন লাভের টাকায়। কিন্তু ব্যবসাটি নিয়ে নানা লোকে নানা কথা বলায় সিদ্ধান্ত নেন নির্মাণপণ্য ব্যবসা করার। কিছু টাকা জমাতে পারলেও রড-সিমেন্ট ব্যবসা করার মতো পর্যাপ্ত মূলধন তাঁর ছিল না। এ জন্য বাধ্য হয়ে নিজ বাড়ি বিক্রি করে ব্যবসার মূলধন সংগ্রহ করেন। এরপর আর কোনো বাধা রইল না নির্মাণসামগ্রীর এ ব্যবসায়।
ব্যবসায়ী আবু বাখের বিয়ে করেছেন ১৯৯৬ সালে। সহধর্মিণী জোনাকি বেগম। এ দম্পতির দুই ছেলে দুই মেয়ে। বড় মেয়ে বন্যা, ফয়জুল করিম কেরাতুল কোরআন মহিলা মাদ্রাসার ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় ছেলে রিদোয়ান, মদিনাতুল উলুম নূরানি মাদ্রাসায় নার্সারিতে পড়ছে, তৃতীয় মেয়ে ঝর্ণার বয়স আড়াই বছর এবং ছোট ছেলে ইবনে আহাদ তৌহীদ সদ্যই জন্মেছে। রড, সিমেন্ট, বালু ব্যবসার পাশাপশি তিনি মিকচার ও ভাইব্রেটর মেশিনও ভাড়া দেন। ব্যবসার পাশাপাশি সামাজিক ও অন্যান্য সেবামূলক কাজেও রয়েছে তাঁর সরব উপস্থিতি। তিনি নিজ গ্রামের জামে মসজিদের মোতায়াল্লিম ও খাড়াকান্দি ঈদগাহের সভাপতির দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন শিগগিরই।
নদীভাঙন, বিদেশে কর্মসংস্থানের অভাব আর প্রবাসী আয়ে মন্দাভাব বিরাজ করায় নির্মাণপণ্যের ব্যবসায়ও পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। পদ্মা সেতু চালু হলে আর এসব অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারলে আবারও ব্যবসায় সুদিন ফিরবে! এরই মধ্যে তিনি ব্যবসাটিকে আরও কিছুটা গুছিয়ে নিতে চান যেন ভবিষ্যতে সিমেন্টের একজন পরিবেশক হতে পারেন, এমনটাই স্বপ্ন সফল এ ব্যবসায়ীর। তাঁর এ ইচ্ছে পূর্ণতা পাক এই চাওয়া বন্ধন পরিবারেরও।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯২তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৭।