এহসান খান: নগরের সৌন্দর্য যাঁর স্থাপত্যে

স্থাপত্য চর্চা মিশে আছে তাঁর মননে। স্থাপত্য চর্চায় ধারণ করেন দেশীয় ঐতিহ্য; যেখানে থাকে পরিবেশ ও জলবায়ু-বিষয়ক ভাবনা। স্থাপনাটি পরিবেশ নষ্ট না করে হয়ে ওঠে পরিবেশের বন্ধু। সেই সঙ্গে স্থাপনায় যারা থাকবেন, তারাও যেন সহজেই তা আপন করে নিতে পারে। যাতে থাকবে সৃজনশীলতার ছোঁয়া। ব্যবহারকারী পাবে শান্তিময় পরিবেশ। এ জন্য তিনি যতটা সম্ভব জটিল নকশা এড়িয়ে স্থাপনাকে দেন সহজ-সাবলীল রূপ। দেশের বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য প্রকল্প, গণমুখী পরিসর ডিজাইন প্রকল্পের সফল স্থপতি ও পরিকল্পনাবিদ তিনি। নাম যাঁর এহ্সান খান; এহ্সান খান আর্কিটেক্টস লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী ও প্রধান স্থপতি।

এহ্সান খানের জন্ম ১ অক্টোবর ১৯৬৪, ময়মনসিংহ শহরে। বাবা মরহুম মো. ইফসুফ খান ও মা সোবেহ আক্তার। বাবা প্রথম জীবনে শিক্ষকতা করলেও পরে জড়িয়ে পড়েন নির্মাণ ব্যবসায়। ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে ১৯৮০ সালে মাধ্যমিক এবং আনন্দ মোহন কলেজ থেকে ১৯৮৩ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ময়মনসিংহ শহরে বেড়ে ওঠায় শহরটির শিল্প, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ব্রহ্মপুত্র নদীÑএসবই তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যায় অঙ্গাঙ্গিভাবে। বাল্যকাল থেকেই ছিলেন খেলাধুলায় পটু। জাতীয় শিশু ক্রীড়া (??) প্রতিযোগিতায় তৃতীয়ও হন একবার। ছবি আঁকা ছিল তাঁর নেশা। ময়মনসিংহস্থ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালায় যেতেন নিয়মিত। দারুণ উৎসাহ নিয়ে দেখতেন প্রদর্শনী, বুঝতে চেষ্টা করতেন ছবির বিষয়। মন স্থির করেছিলেন একজন চিত্রশিল্পী হবেন। কিন্তু দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় তাঁকে স্থাপত্য বিষয়ে ধারণা দেন স্থপতি কাজী খালেদ আশরাফ, তখন তিনি বুয়েটে স্থাপত্যের ছাত্র। স্থাপত্য বিষয়টি ছবি আঁকা ও ডিজাইনের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় আগ্রহ জন্মে স্থাপত্যে। উচ্চমাধ্যমিকের পর সুযোগ হয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর স্থাপত্য অনুষদে ভর্তির। তখন থেকেই স্বপ্ন দেখতেন একদিন বড় স্থপতি হবেন। লক্ষ্যটি বুকে ধারণ করেই নিয়মিত ক্লাস করতেন, বিশেষ করে ডিজাইন ক্লাসে ছিলেন দারুণ মনোযোগী। তবে এ অঙ্গনের সঙ্গে সম্পর্কিত সৃজনশীল অন্যান্য ব্যাপারেও ছিল তাঁর সমান আগ্রহ। সেমিনার, লেকচার কিংবা প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া ছিল তাঁর পাঠ্যক্রমেরই অংশ। পাশাপাশি চলত খেলাধুলা। তিনি ছিলেন টেবিল টেনিসে বুয়েট চ্যাম্পিয়ন; খেলতেন ক্রিকেট টিমেও। দেশব্যাপী চলা রাজনৈতিক আন্দোলন ও অস্থিতিশীলতার কারণে সেশনজটে স্নাতক সম্পন্ন হয় ১৯৯১ সালে।

এহ্সান খান বিশ্ববিদ্যালয়-জীবন থেকেই ছবি এঁকে, ডিজাইন ও মডেল তৈরি করে নিজের পড়াশোনা ও আনুষঙ্গিক খরচ চালাতেন। স্নাতক শেষে তিনি ও তাঁর কয়েকজন বন্ধুÑ ইশতিয়াক জহির, খন্দকার সাব্বির আহমেদ, ইকবাল হাবিব ও নাজমুল হাসান মিলে একদিন যান প্রথিতযশা স্থপতি; বাংলাদেশের আধুনিক স্থাপত্যের জনক মাজহারুল ইসলামের কাছে। তাঁর পরিচালিত ‘চেতনা’ নামের একটি স্থাপত্য অধ্যয়ন চক্রে অল্প-বিস্তর যেসব শিক্ষার্থী অংশ নিতে পারত, তাঁরা ছিলেন সেই সৌভাগ্যবানদের কয়েকজন। যারা মাজহারুল ইসলামের সঙ্গে স্থাপত্য চর্চায় আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। তখন ওনার বয়স  ৭০-এর কোটায়। স্থাপত্য চর্চাও করেন না ঠিকমতো। হাতে কাজও তেমন ছিল না। তবুও তাদেরকে নিরাশ না করেই বললেন, ‘তোমাদের তো কোনো সম্মানী দিতে পারব না, তবে আমার অফিস, কাজের সরঞ্জাম, ডিজাইন পেপারÑ সবই দিতে পারব! তোমাদের আগ্রহ থাকলে করতে পারো।’ সম্মানী না পাওয়া কোনো সমস্যা নয়, তিনি স্থাপত্যের গুরু, গুরুর সান্নিধ্যে কাজ করা এবং শেখাটাই পরম পাওয়া। তাঁরাও জানিয়ে দিলেন কোনো টাকা লাগবে না, নিজেরা কাজ বা ডিজাইন করে নিজেদের খরচ চালাবেন। ইন্টেরিয়র ডিজাইন, মেলার স্টল, প্যাভিলিয়ন ডিজাইন ও বিভিন্ন প্রকল্পের নকশা করে নিজেদের ব্যয়ভার চালাতে থাকেন তাঁরা। অধ্যয়ন চক্রটির সুবাদে দেশের অনেক খ্যাতিমান স্থপতির সঙ্গে পরিচয় ঘটে, সুযোগ হয় অনেকের কাজে যুক্ত হওয়ার। এহ্সান খান কর্মজীবন শুরু করেন ‘ডায়াগ্রাম আর্কিটেক্টস’ নামে একটি ফার্মে। ফার্মটি থেকে একটি ব্যাংকের ইন্টেরিয়র ডিজাইন এবং স্থপতি সাইফুল হক ও স্থপতি জালাল আহমেদের সঙ্গে যশোরে ‘বাঁচতে শেখা’ নামক কাজে মাটির বাড়ি কমপ্লেক্স তৈরির প্রকল্পে সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট (আইএবি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে ড. মিলন মেমোরিয়ালের ডিজাইন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। প্রধান স্থপতি হিসেবে অংশ নিয়ে তিনি ও তাঁর দল হন প্রথম। স্থাপত্যকর্মের প্রথম বড় এ স্বীকৃতি তাঁদেরকে উৎসাহিত করে দারুণভাবে।

১৯৯৪ সালে এহ্সান খান, ইশতিয়াক জহির ও ইকবাল হাবিব মিলে গড়ে তোলেন ‘ভিত্তি আর্কিটেক্টকস’ নামক স্থাপত্য ফার্ম। পরে যার নাম হয় ‘ভিত্তি স্থপতিবৃন্দ’। শুরুতেই পান বেশ কিছু ইন্টেরিয়র কাজের সুযোগ। অপসোনিন ফার্মা, বেক্সিমকো টেক্সটাইল, এনজিএস গ্রুপের হেড অফিস ডিজাইন ছিল অন্যতম। তরুণ স্থপতিদের দল হওয়ায় প্রতিটি কাজই ছিল দারুন চ্যালেঞ্জিং, যা তাঁরা ভালোভাবে সম্পন্ন করায় পান আরও কিছু কাজ। ডিজাইন করেন মোহাম্মাদপুর প্রিপারেটরি স্কুলের। এসব কাজে সাফল্য পাওয়ায় নিজের মধ্যে এমন আত্মবিশ্বাস জন্মে যে কাজ যেমনই হোক না কেন, তাঁরা তা পারবেনই। নিয়মিত তাঁরা অংশ নিতেন জাতীয় ও আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায়ও, যেগুলোর অধিকাংশেই মিলেছে সাফল্যের দেখা। এই প্রাপ্তিতে স্থপতি কমিউনিটির দৃষ্টি আকৃষ্ট হয় ওদের ওপর। সকলেই ভাবে, তরুণ কিন্তু সম্ভাবনাময় একটি দল স্থাপত্য চর্চা করছে অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে।

উইকিপিডিয়া

বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট (আইএবি) ও বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের মিলিত উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল মিউজিয়াম ডিজাইন প্রতিযোগিতা আয়োজিত করা হয়। বঙ্গবন্ধুর বাড়িকে জাদুঘর করে তা সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করতে নকশা প্রস্তাবনা আহ্বান করা হয়। আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান তরুণ এ স্থপতি দলটি অংশ নিয়ে ছিনিয়ে নেন প্রথম স্থান। প্রকল্পটির মূল ও প্রধান স্থপতি ছিলেন এহ্সান খান। প্রস্তাবনায় ছিল বাড়িটি যেমন আছে, তেমনই থাকবে কিছু আলোকসজ্জ্বা, দর্শনার্থী সমাগম নিয়ন্ত্রণ, ইন্টেরিয়র ডিজাইনের পাশাপাশি বাড়ানো হবে কিছু সুযোগ-সুবিধা। প্রকল্পটির ব্যয়সীমা ছিল মাত্র তিন লাখ টাকা; সময় এক মাস। যদিও প্রকল্পটির মেয়াদ ছিল ছয় মাসের। পরে পরিপূর্ণভাবে করা হবে বলা হলেও তা আর হয়নি। বরং যেভাবে ছিল, হয়েছে ঠিক সেভাবেই।

বঙ্গবন্ধু জাদুঘরের কাজটি সম্পন্ন করায় সুযোগ আসে বঙ্গবন্ধুর সমাধি স্তম্ভের ডিজাইনে। জাদুঘরের কাজের সুবাদে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার সঙ্গে পরিচিতি ঘটে তাঁদের। ১৯৯৫ সালে তাঁদের সঙ্গে নিয়ে টুঙ্গিপাড়ায় যান তিনি। বঙ্গবন্ধুর সমাধি নির্মাণের ব্যাপারে নিজ আগ্রহের কথা জানান। ডিজাইন নিয়ে  চিন্তা করতে বলেন। তিনি নিজেও স্কেচ এঁকে ডিজাইনের ধারণা দেন। তাঁরা তাঁর আগ্রহকে প্রাধান্য দিয়েই ডিজাইন প্রস্তাবনা রাখেন। শেখ হাসিনা নকশার আদ্যোপান্ত শুনে তা অনুমোদন দেন। ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলে সরকার থেকে সিদ্ধান্ত হয় মুজোলিয়াম কমপ্লেক্স করার। প্রকল্পটির প্রধান স্থপতি ছিলেন এহ্সান খান। যেহেতু সমাধি কমপ্লেক্সটি ছিল জাতির জনকের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের, তাই চ্যালেঞ্জও ছিল বেশি। তবুও তিনি চেষ্টা করেছেন শতভাগ পেশাদারিত্বের পরিচয় দিতে। গ্রামের পরিবেশ, মেঠোপথ, মানুষের অবাধ প্রবেশ, জনসমাগমÑএসব মাথায় রেখেই ডিজাইন করেছেন তিনি। রাজধানী থেকে অনেক দূরে বন্যাপ্রবণ নিচু এলাকা, দক্ষ শ্রমিকের অভাব, নির্মাণ উপকরণের অপ্রাপ্যতাসহ নানা কারণে কাজ করতে বেগ পেতে হয়েছে তাঁদের। ১৯৯৮ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটি কিছু অসংগতি নিয়ে ভালোভাবেই শেষ হয় ২০০০ সালে। প্রকল্পটি আর্কিটেক্ট ক্যাটাগরিতে স্বীকৃতিস্বরূপ লাভ করে আন্তর্জাতিক পুরস্কার ‘আর্কিটেক্ট অব দ্য ইয়ার’ যার নাম জে কে সিমেন্ট অ্যাওয়ার্ড।

বঙ্গবন্ধু জাদুঘরের রাজনৈতিক সমাবেশ, রাজনৈতিক কর্মী ও ধানমন্ডি লেকে আগত মানুষের সমাগমের কারণে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে কোলাহল ক্রমেই বাড়ছিল। নেই কোনো বসার জায়গা বা মিলন চত্বর। বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্ট এহ্সান খান ও তাঁর সহকর্মীদের জাদুঘরসংলগ্ন এলাকার ল্যান্ডস্কেপসহ বসার ব্যবস্থা ও কিছু সুযোগ-সুবিধা রেখে ডিজাইন করার প্রস্তাব করে। ধানমন্ডি লেকপাড়ের তখন বেহাল দশা। তাঁরা শুধু জাদুঘর প্রাঙ্গণ নয়, বরং ৩২ নম্বর সড়কে বাগান, বসার ব্যবস্থা, লেকপাড় উন্নয়ন, ফুটপাতসহ অন্যান্য সৌন্দর্যবর্ধন করে একটি প্রস্তাবনা রাখেন। প্রকল্পের ছবি দেখে খুবই মুগ্ধ হন বঙ্গবন্ধু তনয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি পাল্টা প্রস্তাব করেন উন্নয়নটি শুধু ৩২ নম্বর সড়ক নিয়ে নয়, বরং পুরো ধানমন্ডি লেকে হোক। তিনি জ্যেষ্ঠ কিছু স্থপতিকে উন্নয়ন পরামর্শ দিতে বলেন। অবশেষে বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে শুরু হয় লেকের উন্নয়নকাজ। প্রকল্পটির প্রধান স্থপতি ছিলেন ইকবাল হাবিব আর সহযোগী স্থপতি হিসেবে বেশ কিছু স্থাপনার ডিজাইন করেন স্থপতি এহ্সান খান। মানুষের অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দিকে প্রবেশপথ, বসার স্থান, পানি পরিষ্কারকরণ, বাগান, মুক্তমঞ্চ, ব্যায়াম করার সুবিধাসহ নানামুখী উন্নয়নকাজ করা হয় প্রকল্পটিতে। ১৯৯৮ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত চলে উন্নয়নকাজ। প্রকল্প বাস্তবায়নে হতে হয় অনেক বাধার সম্মুখীন। এতে প্রায় ৮৪টা বাড়ির অবৈধ প্রাচীর ভাঙাসহ অনেক বাড়ির পয়োনিষ্কাশন লাইন সরাতে হয়েছিল। তবে কাজ এগিয়ে নিতে এলাকাবাসী ও গণমাধ্যমের সহযোগিতা ছিল অভাবনীয়। প্রকল্পটি যে মানুষের মধ্যে এমন সাড়া ফেলবে; এত মানুষ জড়ো হবে শুরুতে তা ভাবাই যায়নি। আশা ছিল এ রকম আরও প্রকল্প গড়ে উঠবে রাজধানীতে। তবে প্রকল্পটিতে রেস্টুরেন্ট ও কিছু স্থাপনা কম হলেই ভালো হতো বলে মনে করেন এহ্সান খান। মুক্তমঞ্চ আরও ছোট হলে মানুষের বাড়তি চাপ কমত। প্রকল্পটি আসলে পুরো শহরের লোককে টানছে, যা প্রকল্পের জন্য সত্যিই ক্ষতির কারণ।

২০০৬ সালে বন বিভাগ ও নিঃসর্গ নেটওয়ার্কের যৌথ আয়োজনে নেচার এন্টারপ্রেনার সেন্টার নামে একটি ল্যান্ডস্কেপ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নস্থল টেকনাফ, চুনতি, সাতছড়ি, লাউয়াছড়াসহ দেশের কয়েকটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল। বনের আশপাশের বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের বন ও বন্যপ্রাণী সম্পর্কে জানানো ও সচেতনতা তৈরি করতেই আয়োজন প্রকল্পটির। যেখানে থাকবে প্রদর্শনী গ্যালারি, বিশ্রামের জায়গা, হাত-মুখ ধোয়া ও খাওয়ার ব্যবস্থা। তবে তা হতে হবে অবশ্যই পরিবেশবান্ধব। মূল ডিজাইনার হিসেবে স্থপতি এহ্সান খান নকশাটির ডিজাইন করেন, যা জিতে নেয় প্রথম পুরস্কার। ডিজাইনের আগে তিনি সেখানকার গাছপালা, বন্যপ্রাণী, আবহাওয়া, বনের প্রকৃতি, বসতবাড়ি নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেন। এমনভাবে ডিজাইন করেন যেন ইট-কংক্রিটের স্থাপনা বন্য পরিবেশের ক্ষতি কমিয়ে ভূ-প্রকৃতির পরিবর্তন করবে না। পরিবেশের সঙ্গে যা কেনোক্রমেই দ্বন্দে¦ না জড়াবে না, সে জন্য গাছ কেটে স্থাপনা নয়, বরং গাছের জন্য স্থাপনা ডিজাইন করেন তিনি। স্থাপনা তৈরি করলেই ভিটি তৈরি করতে হয়। পাহাড়ি এলাকার কলাম বা খুঁটির ওপর মাচান বাড়ির মতো করে তিনি ভিটি ছাড়া স্থাপনা তৈরি করেন। দেখতে মনে হয়, গাছপালার মধ্যে যেন ভাসমান দুটি তল। দ্বিতল ভবনের নিচটা রাখেন উন্মুক্ত, যাতে যে কেউ চলাফেরা করতে পারে, এমনকি পশুপাখিরাও যেন অবাধে বিচরণ করতে ইতস্তত বোধ না করে। দোতলায় উঠতে সিঁড়ির বদলে করেছেন র‌্যাম্প, যেন প্রতিবন্ধীরাও উঠতে পারে। দোতলায় রেখেছেন প্রদর্শনীর জন্য হলরুম, প্রজেক্ট রুম ও বন দেখার জন্য বসার জায়গা। স্থাপনাটিকে চারদিকে খোলা রাখা হয়েছে সবাইকে নিয়ে সহাবস্থানের জন্য। স্থাপনাটিকে যেন মনে হয় বনেরই অংশ। স্থাপনাটি নির্মিত হয়েছে কংক্রিটে, যেন তা বেশি রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন না হয়। মাত্র দুটো কলামেই দাঁড়িয়ে থাকা কংক্রিটের এ প্রকল্পটি ‘বার্জার অ্যাওয়ার্ড ফর এক্সিলেন্স ইন আর্কিটেকচার ২০০৯’, ‘আইএবি অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচার ২০০৯’, ‘হোলসিম গ্রিন বিল্ট অ্যাওয়ার্ড ২০১০’ জিতে নেয়। ২০১০ সালে প্রকল্পটি মনোনীত হয় ‘আগা খান অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচার’-এর জন্য।

২০০৭ সালে হাতিরঝিল প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। প্রথমে প্রকল্প পরিকল্পনায় ছিল অবকাঠামো, সড়ক, ড্রেন, লেক, পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা, সেতু নির্মাণ ও সঙ্গে এলাকাটির সৌন্দর্য বৃদ্ধি। প্রকল্পটিতে টেন্ডারের মাধ্যমে কাজ পায় ‘ভিত্তি স্থপতিবৃন্দ’, যার মূল স্থপতি ও আরবান ডিজাইনার ছিলেন স্থপতি এহ্সান খান। তিনি সরকারের চাহিদার বাইরেও প্রায় ১০০টি ধারণাসংবলিত একটি কমপ্রিহেনসিভ মাস্টার প্ল্যানের ধারণা পেশ করেন। ৩০০ একর আয়তনের হাতিরঝিলকে ৬০০ একরের আরবান ডিস্ট্রিক করার প্রস্তাবনা দেন। যেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ পরিসরই থাকবে উন্মুক্ত। এ ছাড়া বিবেচনায় ছিল পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন, জীবনমান উন্নয়ন। এত বড় প্রকল্প পরিকল্পনা ও ডিজাইন ছিল সত্যিই চ্যালেঞ্জিং। তিনি চেয়েছিলেন এমনভাবে ডিজাইন করতে যেন নগরবাসী উপকৃত হয়। এ ক্ষেত্রে আগে ধানমন্ডি লেক উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং পানাম নগর, সোনারগাঁর ওপর বুয়েটের ছাত্রাবস্থায় মাঠপর্যায়ে করা গবেষণা তাঁর জন্য বেশ সহায়ক হয়। প্রকল্পটি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নে মাটি, পানি, পরিবেশ, কাঠামো, যানবাহন-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী, নগর পরিকল্পনাবিদ, বুয়েট, রাজউক, এলজিইডি, ওয়াসা ও সেনাবাহিনীর সমন¦য়ে একটি শক্তিশালী দল গঠন করা হয়। এত বড় একটি দলকে নিয়ে কাজ করতে এবং ডিজাইনের তাৎপর্য বোঝাতে অসংখ্যবার সভা করতে হয়েছে, দূর করতে হয়েছে অনেক বাধা। এবং পরিশেষে একটি নান্দনিক প্রকল্প হিসেবে, প্রশংসা কুড়ায় সবার। এমনভাবে প্রকল্পটি ডিজাইন করা হয়েছিল, যা স্পন্দন ছড়াবে সারা নগরে। এর সৌন্দর্য ও উন্নয়ন ধারণা মানুষের মনে জোগাবে ভালো লাগা ও অনন্ত প্রেরণা। অবহেলিত বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে উঠবে এমন আরও দৃষ্টিনন্দন প্রকল্প। অবশ্য প্রকল্পটিতে আরও কিছু দৃষ্টিনন্দন ও শিক্ষণীয় বিষয় ছিল, যা বাস্তবায়ন করা যায়নি। যেমন- বিজেএমইএ ভবন পুরোপুরি না ভেঙে সংস্কার করে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে ওখানে ইকো সেন্টার গড়ে তোলা, পাখি, প্রজাপতি প্রদর্শনী, উইন্ড মিল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বায়োডাইভার্সিটি মিউজিয়ামের প্রস্তাব ছিল, যেখানে জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণের থাকবে অবাধ বিচরণ। এসব বাস্তবে রূপ পেলে হয়তো প্রকল্পটি হতো আরও সমৃদ্ধ।

উইকিপিডিয়া

২০০৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধি ও সমাধি প্রাঙ্গণের পুনঃডিজাইনের উদ্যোগ নেয়। প্রকল্পটির প্রারম্ভিক নকশা করেছিলেন স্থপতি মাজহারুল ইসলাম আর তাতে সহযোগী স্থপতি ছিলেন এহ্্সান খান। শুরুর একপর্যায়ে বন্ধ হয় কাজটি। নতুনভাবে কাজটি সম্পন্ন করতে আহ্বান জানানো হয় স্থপতি এহ্সান খানকে। প্রকল্পটির ডিজাইন রূপরেখা নিয়ে স্থপতি মাজহারুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয় তাঁর। তিনি তাঁকে সুন্দরভাবে কাজটি করতে উৎসাহিত করেন। প্রকল্প প্রস্তাবনায় ছিল পুনর্নির্মাণ, নতুন ডিজাইন, ল্যান্ডস্কেপিং ও সড়কসংলগ্ন একটি স্থাপনা বা প্যাভিলিয়ন নির্মাণ। প্রকল্পটি তিনি এমনভাবে ডিজাইন করেন, যাতে থাকবে স্থপতি মাজহারুল ইসলামের ছায়া, যেভাবে তিনি বাগানের মধ্যে চারুকলা ইনস্টিটিউটের স্থাপনা ও সংলগ্ন এলাকার মাস্টার প্ল্যান করেছিলেন।  সেই ধারণা থেকেই তিনি ডিজাইন করার চেষ্টা করেন। কাঠ ও কাচে অনেকটা বাক্স আকারের একটি প্রদর্শনী কেন্দ্র ডিজাইন করেন, যাকে মনে হবে রাতের আঁধারে আলোকবর্তিকা। প্রদর্শিত হবে কবি কাজী নজরুল ইসলাম, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান ও ভাষাশহীদদের তথ্য ও ছবি।

গোপালগঞ্জ শহরটি গড়ে উঠেছে নদীর পারে। নদীটির দিক পরিবর্তন হওয়ায় আগেই এটি মৃতপ্রায় খালে পরিণত হয়। শহরে আসতে পারত না তেমন নৌযান। ফলে শহরের ঘাটগুলোও থাকত বন্ধ। এলজিইডি অধিদপ্তর স্থপতিদের শহর উন্নয়নে নিয়োগ দেয়। তাঁরা শহরকে ঘিরে এমনভাবে মাস্টার প্ল্যান করেন যেন পুনরুদ্ধার করা যায় খালটি, যেখানে নৌযান চলাচল করতে পারে; গড়ে উঠতে পারে নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্য। আগে খালটির একপাশে ছিল শহর। ডিজাইন পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হওয়ার পর দুই পাশ ঘিরে গড়ে উঠেছে শহর। একদিকে বাজার, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত আর অন্যদিকে বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, স্টেডিয়াম, পার্কসহ নানা অবকাঠামো। এভাবেই খাল ও শহরটি ফিরে পেয়েছে তার নবজীবন।

মিরপুর-ক্যান্টনমেন্ট-বনানী ফ্লাইওভার নির্মাণ শেষে তৎসংলগ্ন ত্রিকোণ অংশটি হয়ে পড়ে উন্মুক্ত। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সেনা সংস্থা অংশটি উন্নয়নের পরিকল্পনা নেয়। ল্যান্ডস্কেপ করার জন্য এহ্সান খান আর্কিটেক্ট লিমিটেডকে এ কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ডিজাইনের প্রাক্কালে স্থপতি এলাকাটির প্রকৃতি, ইতিহাস, ব্যবহারকারী বিষয়ে গবেষণা করে ‘ঢাকা গার্ডেন’ নামক একটি প্রকল্প ডিজাইন করেন। কারণ, ফ্লাইওভার নির্মাণে ব্যবহৃত হয় প্রচুর কংক্রিট। সেখানে যান্ত্রিক যানবাহন ও মানুষ চলাচল বেড়ে যাওয়ায় বেড়েছে শব্দ ও বায়ুদূষণ, কমেছে উন্মুক্ত স্থান, নষ্ট হয়েছে পরিবেশের ভারসাম্য। যেহেতু পাশেই ক্যান্টনমেন্ট ও শহরের গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক, সে কারণে জটিল কোনো স্থাপনায় না গিয়ে এহ্সান খান ও তাঁর দল সবুজ বাগানের ধারণা নিয়ে প্রকল্পের কাজ শুরু করেন যেন পরিবেশের ক্ষতিটা যতটা সম্ভব কমানো যায়। উড়ালসেতুর নিচে করেন বাগান ও খাল উন্নয়ন। এ ছাড়া খেলার জায়গা, স্কেটিং রিং, বসার জায়গাসহ হাঁটার ব্যবস্থা করেন। আগে বনানীতে ‘ঢাকা গেট’ নামে একটি গেট ছিল। শহরে প্রবেশ করতে সবাইকে যেন স্বাগত জানানো যায় এ জন্য মুক্তিযুদ্ধের সাত বীরশ্রেষ্ঠের সম্মানে সেই গেটটিকে পুনরায় স্থাপন করতে সংযোগস্থলে ‘বীর সপ্তক’ নামে একটি সবুজ স্থাপনা তৈরি করা হয়। সবচেয়ে উঁচু স্তম্ভটির দৈর্ঘ্য ৭৫ ফুট এবং নিচুটির ৩০ ফুট। স্টিলে তৈরি কোণ আকৃতির উল্লম্ব টাওয়াগুলোর ক্রিপার দিয়ে উঠে গেছে নানা প্রজাতির গাছ। সবুজ টাওয়ারগুলোর আকর্ষণের মাত্রা বাড়াতে আলোক প্রকৌশলীর সাহায্যে করা হয়েছে আলোকসজ্জা। তাই বিমানবন্দর সড়ক দিয়ে যেতেই রাতের বেলা মানুষের দৃষ্টি কাড়ে পিরামিড আকৃতির সাতটি রঙিন আলো-ঝলমলে স্তম্ভ। যেন জ¦লজ¦ল করছে মুক্তিযুদ্ধের সাত উজ্জ¦ল নক্ষত্র।

এহ্সান খান যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার মূল স্থপতি হিসেবে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন, তার মধ্যে অন্যতম আইএবি সেন্টারের প্রধান ভবন ডিজাইন। বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট (আইএবি)  সেন্টারটির ভবন ডিজাইনে একটি জাতীয় পর্যায়ে ডিজাইন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। এতে অংশ নেন তিনি ও তাঁর সহকর্মী স্থপতিরা। প্রকল্পটির জুরি বোর্ডে ছিলেন স্থপতি ইনস্টিটিউটের তৎকালীন ও সাবেক প্রেসিডেন্টরা। ইনস্টিটিউটের সদস্যদেরও ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল। বিচারক ও সদস্য উভয়ের ভোটেই তাঁর ডিজাইনটি পায় সেরার স্বীকৃতি। প্রকল্পটি তাঁর জন্য ছিল যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং। কারণ, স্থপতিরাই প্রকল্পটির ক্লায়েন্ট। তাঁদের প্রত্যাশা অনুযায়ী যথাসম্ভব পরিবেশবান্ধব, তুলনামূলক কম শক্তির অপচয় হবে এমন স্থাপনা ডিজাইন করেছেন তিনি। ১৫-২০ বছরের স্থায়িত্বকাল চাহিদা মাথায় রেখে স্থাপনার কাঠামো ও ছাদে ব্যবহার করেছেন স্টিল এবং দেয়ালে লাগিয়েছেন হাতে তৈরি ইট, যা খুবই সমসাময়িক স্থাপত্য নির্মাণ অনুষঙ্গ।

বেইলি রোড মানেই নাটক সরণি আর মহিলা সমিতির নাট্যমঞ্চ মানেই নাট্য আন্দোলনের সুতিকাগার। অথচ দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা যোগ না হওয়ায় তা হয়ে পড়ে জৌলুশহীন। মহিলা সমিতির এই প্রকল্পটি উন্নয়নের আহ্বান জানানো হয় তাঁকে। তিনি প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অনুধাবন করে ১০ তলাবিশিষ্ট ভবনটির ডিজাইন করেন। নতুন একটি থিয়েটার হল, অফিস কক্ষ, প্রশিক্ষণ কক্ষ সাজান নতুন আঙ্গিকে। সবাই যেন সহজেই ভবনে প্রবেশ করতে পারে, এ জন্য নিচতলাটি রাখেন উন্মুক্ত। সেখানে নানা প্রদর্শনী, উৎসব ও মেলার আয়োজনের ব্যবস্থা ছাড়াও নাট্যকর্মীরা সমবেত হতে পারবেন। পুরো ভবনময় যেন সবাই এমনকি একজন চলাচলে অক্ষম ব্যক্তিও বিচরণ করতে পারে অবাধে, সে জন্য জুড়ে দেওয়া হয়েছে র‌্যাম। প্রকল্পটি নির্মাণাধীন, যা সম্পন্ন হলে নাট্যমঞ্চ আবারও হয়ে উঠবে প্রাণবন্ত; ফিরে পাবে তার হারানো জৌলুশ।

এ সব স্থাপত্য প্রকল্প ছাড়াও তিনি অসংখ্য প্রকল্পের কাজ করছেন কিংবা শেষ করেছেন। যার মধ্যে কিশোরগঞ্জে নরসুন্দা নদী ও নদীসংলগ্ন হাঁটাপথ তৈরি, পার্ক উন্নয়ন, সড়ক সংযোগ ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পের কাজ, গুলশান-বনানী সেতুর ডিজাইন এবং লেকপাড়ে ওয়াক ওয়ে, পার্ক এবং ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইন ও পরিবেশ উন্নয়ন। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ডিজাইন প্রতিযোগিতায় হয়েছেন দ্বিতীয়। এর মধ্যে অন্যতম ইসলামিয়া আই হসপিটাল, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় কমপ্লেক্স ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। এ ছাড়া করছেন অসংখ্য বাণিজ্যিক ও আবাসিক প্রকল্পের কাজ। বিভিন্ন চলমান প্রকল্পও রয়েছে; এর মধ্যে অন্যতম প্রায় ৭০ একর জায়গা নিয়ে গড়ে ওঠা সুবিশাল এক আবাসন প্রকল্প, চট্টগ্রামে অ্যাপোলোর ৩৫০ শয্যার একটি হাসপাতাল। ঢাকার উত্তরাতে দিল্লি পাবলিক স্কুল (ডিপিএস) ভবন। এ ছাড়া করছেন বিভিন্ন ডেভেলপার ফার্মের বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন।

স্থপতি এহ্সান খান বিয়ে করেন ১৯৯৫ সালে। সহধর্মিণী স্থপতি নুসরাত জাহান। স্থপতি দম্পতির দুই মেয়ে। বড় মেয়ে আন্শিতা সামরিন খান যুক্তরাষ্ট্রের ফিলিপ একজিটার একাডেমিতে পড়ছেন এ লেভেলে আর ছোট মেয়ে সেহিন্তা সাবিন খান পড়ছেন ও লেভেলে। এহ্সান খান স্থাপত্য চর্চার পাশাপাশি জড়িত নানা কর্মকাণ্ডে। ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ভিজিটিং প্রফেসর। ক্লাস নিয়েছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য ডিজাইনের। এ ছাড়া সৌদি আরবের দাম্মান বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য বিষয়ে লেকচার দিয়েছেন। শিক্ষার্থী ও উদীয়মান স্থপতিদের শেখান কাজের প্রতি নিষ্ঠাবান হতে আর কঠোর পরিশ্রম করতে। এ উপদেশগুলোই তিনি পেয়েছিলেন তাঁর প্রিয় শিক্ষক ও গুরু স্থপতি মাজহারুল ইসলামের কাছ থেকে। তাঁর অনুপস্থিতি অনুভব করেন সব সময়। সুইজারল্যান্ডের স্থপতি পিটার জুমথর-এর সাবলীল ও সহজ কাজ ভালো লাগে, অনুপ্রাণিত করে ও মনে হয় দিকনির্দেশনামূলক। স্থপতি কাসেফ মাহবুব চৌধুরীর কাজে তিনি মুগ্ধ হন, সম্মান দেখান। বেঙ্গল ইনস্টিটিউট ফর আর্কিটেকচারের পরিচালক স্থপতি কাজী খালেদ আশরাফ, বন্ধু ও তরুণ স্থপতিদের সঙ্গেও আলোচনা করেন;  শেখেন প্রতিনিয়ত। বর্তমানে ও গত মেয়াদে তিনি বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের প্রফেশনাল অ্যাফেয়ার-বিষয়ক সেক্রেটারি। সে সুবাদে আর্ক এশিয়ায় প্রফেশনাল প্রাকটিস কমিটিরও সদস্য। এ ছাড়া বেঙ্গল ইনস্টিটিউট ফর আর্কিটেকচার ল্যান্ডস্কেপ অ্যান্ড সেটেলমেন্টের নির্বাহী বোর্ড, গুলশান সোসাইটি ও ক্লাবেরও সদস্য তিনি। ১৯৯৫ সালে ছিলেন সাফ গেমসে নগরসজ্জা কমিটির সদস্য। খুবই সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত এ মানুষটি চেষ্টা করেন সৎ থাকতে আর নিরন্তর পরিশ্রম করতে। অবসরে দেখেন সিনেমা, পরিবেশ-বিষয়ক তথ্যচিত্র ও ফুটবল খেলা। সুযোগ পেলেই ভ্রমণ করেন নানা দেশ। কিশোরগঞ্জে তাঁদের পারিবারিক ফাউন্ডেশন থেকে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি উচ্চ মাধ্যমিকবিদ্যালয় ও একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছেন, যেখানে সেবা পায় সমাজের সুবিধাবঞ্চিতরা।

স্থপতি এহ্সান খান তাঁর সৃষ্ট স্থাপনার মূল্যায়নে সেরার তালিকায় প্রথমেই রাখেন নিঃসর্গ প্রকল্প; এরপর নজরুলের সমাধি। নিজের সব স্থাপত্যকর্ম ভালো লাগলেও মনে করেন সেগুলো আরও ভালো হতে পারত। প্রতিনিয়তই চেষ্টা করছেন স্থাপত্যে সৃষ্টিশীল পরিবর্তন আনতে। গণমুখী স্থাপত্য প্রকল্প করতেই ভালো লাগে তাঁর। ভাবেন দেশের নগর নিয়ে। কীভাবে নগর ও ছোট-বড় শহরগুলো অপরিকল্পিকভাবে গড়ে উঠছে; হারাচ্ছে বন, জলাভূমি ও উন্মুক্ত পরিসর। স্থাপনাগুলো পরিণত হচ্ছে কংক্রিটের খাঁচায়। বিষয়গুলো তাঁকে ভাবিত ও ব্যথিত করে। একজন স্থপতি ও পরিকল্পনাবিদ হিসেবে চান নগরে সুস্থ, শঙ্কামুক্ত ও বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হোক। অপরিকল্পিত ও অন্য দেশের আদলে কোনো নগর বা প্রকল্প গড়ে না তুলে দেশের ঐতিহ্যকে ধারণ করে, নদী, খাল ও জলাশয়সমৃদ্ধ নগর প্রতিষ্ঠা করে আমরা বিশ্বের বুকে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারি। অনেকটা দেরি হলেও সরকার ও সংশ্লিষ্ট সবার ঐকান্তিক চেষ্টায় এখনো সম্ভব এর যথাযথ বাস্তবায়ন।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৯তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৬

মাহফুজ ফারুক
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top