হুগো আলভার হেনরিক আলটো (৩ ফেব্রুয়ারি, ১৮৯৮-১১ মে, ১৯৭৬), একজন ফিনিশীয় স্থপতি ও নকশাবিদ। স্থাপত্যকলায় ড্রয়িং বা স্কেচের ব্যবহার বহুল প্রচলিত। পৃথিবীর অনেক স্থপতিই চিত্রশিল্পী ছিলেন। ছিলেন ভাস্কর। আলভার আলটোও তেমনি। তাঁর কাজের মধ্যে ছিল স্থাপত্যকলা, পটারি, আসবাব এমনকি পোশাকের নকশাও। কী করেননি তিনি? করেছেন তৈজসপত্রের ডিজাইন। চেয়ার-টেবিল থেকে শুরু করে সবকিছুতেই তিনি রেখেছেন শৈল্পিক ছোঁয়া। আলটোর প্রারম্ভিক কর্মজীবন শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে সময়টা ছিল দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের। শিল্পায়ন ঘটে সমান্তরালভাবে। ওই সময় তাঁর ক্লায়েন্টদের অধিকাংশই ছিলেন শিল্পপতি, যাঁদের অনেকে ছিলেন আসট্রোম গুলিসেন পরিবারের। আলটো তাঁর ৫০ বছরের কর্মজীবনে (১৯২০-১৯৭০) সৃজনশীলতার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন সর্বত্রই। শুরুর সময়ে একটু নজর দিলেই তাঁর স¤পর্কে জানা যায় ১৯৩০ সালেই তিনি কাজ করেছিলেন আন্তর্জাতিক মানের। তাঁর আসবাবপত্রের নকশাগুলো আধুনিক স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ডিজাইন হিসেবে খ্যাত। তাঁর সম্পূর্ণ কর্মজীবনে তিনি গ্যাসামকুনসওয়ার্কের নকশা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। যেখানে তাঁর প্রথম স্ত্রী আইনো আলটোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেছিলেন। শুধু ভবনের নকশা নয় বরং ইন্টেরিয়র ডিজাইন থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ ল্যাম্প, কাচপাত্র ইত্যাদির নকশাও করেন তিনি। মহান এ স্থপতিকে নিয়ে গড়ে ওঠা ‘আলভার আলটো জাদুঘর’, যার নকশা নিজেই করেছেন আলটো, যেটা তাঁর জন্মভূমি জায়ভাস্কালিভিয়ায় অবস্থিত।
আলটোর বর্ণময় জীবন
হুগো আলভার হেনরিক আলটোর জন্ম ফিনল্যান্ডের কুয়োর্টনে। বাবা জোহান হেনরিক আলটো ছিলেন ভূমি তদারককারী আর মা শেলী মাটিলাডা ছিলেন ডাক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। আলটোর বয়স যখন পাঁচ তখন তাঁর পরিবার প্রথমে আলাজারভি এবং পরে জায়ভাস্কালিভিয়ায় স্থানান্তরিত হয়, যা ফিনল্যান্ডের মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত। আলটো জায়ভাস্কিনা লিসিউম বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং পরে আঁকতে শেখেন জোনাস হেইস্কা নামক শিক্ষকের কাছ থেকে। ১৯১৬ সালে তিনি হেলসিংকি ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে স্থাপত্যবিদ্যায় ভর্তি হন। ফিনিশ সামরিক যুদ্ধের কারণে তাঁর লেখাপড়ায় বিঘ্ন ঘটে। চলে যান যুদ্ধে। তিনি সাদা সৈনিকের পক্ষ হয়ে লাংকিপোজা ও টামপেরেতে যুদ্ধ করেন। যখন ছাত্র ছিলেন তখনই আলজারভিতে তাঁর মা-বাবার জন্য বাড়ি নির্মাণ করেন। এরই ভেতর লেখাপড়া চালিয়ে যান এবং ১৯২১ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯২২ সালে গ্রীষ্মে তিনি সরকারি সামরিক সেবা শুরু করেন এবং ১৯২৩ সালে দ্বিতীয় সহকারী কর্নেল পদে উন্নীত হন।
১৯২০ সালে ছাত্রাবস্থায় আলটো প্রথমবারের মতো বিদেশ যান। সুইডেনের স্টকহোম থেকে ডেনমার্কের কোপেনবার্গ। এখানে তিনি কাজ করেন স্থপতি আরভিড জার্কের সঙ্গে। ১৯২২ সালে টামপেরেতে নিজস্ব ভবনের ডিজাইন করেন। ১৯২৩ সালে তিনি জায়ভাস্কালায় ফিরে আসেন, যেখানে তিনি তাঁর স্থাপত্যবিষয়ক অফিস খুলে নাম রাখেন ‘আলভার আলটো স্থপতি ও মনুমেন্টাল আর্টিস্ট’। ঠিক একই সময়ে তিনি জায়ভাস্কালিয়ার সীসা সৌমী পত্রিকায় প্রবন্ধ লেখেন। ওই সময় তিনি জায়ভাস্কালিয়ায় কিছুসংখ্যক একক পরিবারের বাড়ির নকশা করেন এবং ওখানকার দৈনিক কাজকর্মের পরিধিও দিন দিন বাড়তে থাকে।
১৯২৪ সালের ৬ অক্টোবর আলটো স্থপতি আইনো মারসিওকে বিয়ে করেন। ইতালি যাওয়াটাই তাঁদের প্রথম মধুচন্দ্রিমায় যাওয়া; যদিও আইন পড়ার সুবাধে আগেই ইতালি গিয়েছিলেন। পরে তাঁরা ম্যাভিটেরিনোয় একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেন, যা আলটোর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁরা ফিরে এসেই আবার কিছু আঞ্চলিক কাজ করেন। যেমন: জায়ভাস্কালিয়া কর্মচারী ক্লাব; অনুষ্ঠানের ক্লাব, যা করেছেন লিওন বাতিস্তা আলবারটি, ১৯২৭ সালে আলটো তাঁদের অফিস তুরকুতে স্থানান্তরিত করেন শুধু স্থাপত্যের প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হতে। স্থানান্তরিত হওয়ার আগে তাঁরা স্থপতি এরিক ব্রাইগম্যানের সঙ্গে দেখা করেন। আলটোর জীবনীকার গোরান শিল্ট দাবি করেন যে ব্রাইগম্যান ছিলেন একজন স্থপতি, যাঁকে আলটো কাজে সহযোগিতা করেছিলেন, ফিনিশীয় রাজধানীতে কাজের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ১৯৩৩ সালে আলটোর দপ্তর আবারও হেলসিংকিতে স্থানান্তর করা হয়।
১৯৩৫-১৯৩৬ সালের মধ্যে মুনকিনিমিতে আলটো একটি যুগল অফিসের নকশা করে তা নির্মাণ করেন। পরে প্রয়োজনীয় উদ্দেশ্যে দপ্তর নির্মাণ করেন যা আগে গৃহ জাদুঘর এবং পরে আলটোর শিক্ষাঙ্গনে আধুনিকভাবে নির্মিত হয়। ১৯২৬ সালে যুবক আলটো নিজের জন্য আলজারভির, ভিলা ফ্লোরায় গ্রীষ্মকালীন আবাসস্থল ডিজাইন করেন। ১৯৪৯ সালে আয়নো আলটো ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। আয়নো আলটো ও আলভার আলটোর রয়েছে দুটি সন্তান। মেয়ে-জোহান্না ‘হান্নি-এলানেন’ এর জন্ম ১৯২৫ সালে। একমাত্র পুত্র হামিলকার আলটোর জন্ম ১৯২৮ সালে। ১৯৫২ সালে আলটো স্থপতি এলিসা মাকিনিকে বিয়ে করেন, যিনি মারা যান ১৯৯৪ সালে। তিনি আলটোর দপ্তরে তাঁর সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। ১৯৫২ সালে আলটো মিডল্যান্ডের মধ্যবর্তী এলাকায় ঘুরাটসালোতে তাঁর নতুন স্ত্রীর জন্য পরীক্ষামূলক বাড়ির নকশা করেন। ১৯৭৬ সালের ১১ মে হেলসিংকিতে মৃত্যু হয় তাঁর। এবং তাঁকে হেলসিংকির হেতানিমির কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। তাঁর বর্তমান স্ত্রী এবং দপ্তরের চাকরিজীবীরা এখন প্রতিনিয়ত কাজ করছেন, যাতে করে আলটোর দপ্তর আরও ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৮ সালে হেলসিংকির ফিনিশীয় স্থাপত্য জাদুঘরে আলটোর কর্মজীবনের সব কাজ নিয়ে হয় একটি বিশেষ প্রদর্শনী।
কর্মজীবন
প্রথম জীবন নর্ডিক ক্ল্যাসিসিজম
যদিও মাঝে মাঝে মনে হয় স্থাপত্যেকর্মে আলটোই সেরা। নর্ডিকদের মধ্যে প্রভাবশালী স্থপতি কিন্তু খুব গভীর পর্যবেক্ষণে জানা যায়, তিনি সুইডেনের অগ্রজ স্থপতিদের অনুসরণ করতেন এবং তাঁদের সঙ্গে রাখতেন নিবিড় যোগাযোগ। তাঁদের মধ্যে দুজন স্থপতির একজন গুনার আসপান্ড ও অন্যজন সেভেন মার্কিলিউয়াস। ১৯৯৮ সালে পিও তাঁদের ক্ল্যাসিক্যাল আর্কিটেকচারের চর্চা শুরু করেন। যদিও ইতিহাসবিদরা একে নর্ডিক ক্ল্যাসিসিজম বলেন। জায়ভাস্পলিয়ায় ফিরে এসে ১৯২৩ সালে আলটো নিজের দপ্তর গড়েন এবং ছোট্ট বাসার ডিজাইন করতে শুরু করেন। এই নকশাগুলো নর্ডিক ক্ল্যাসিক্যাল আর্কিটেকচার অনুসরণেই তৈরি। যেমন: ম্যানরের ডিজাইনের মতো ১৯২৩ সালে টয়সাতে মায়ের কাজিন টারহো ম্যানার ডিজাইন, ১৯২৩ সালে জায়ভাস্কালিয়ায় গ্রীষ্মকালীন বাড়ি এবং ১৯২৪ সালে টারভালাতে আলাটালো বাগানবাড়ি এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এই সময়ে তিনি প্রথম গণভবন নির্মাণ করেন। ১৯২৫ সালে জায়ভাস্কালিয়ায় শ্রমজীবী ক্লাব, ১৯২৬ সালে জায়ভাস্কালিয়ায় রক্ষণাবেক্ষণ ভবন নির্মান করেন। আলটো বিভিন্ন স্থাপত্য প্রতিযোগিতায় ১৯২৩ ও ১৯২৪ সালে ফিনিশীয় সংসদ ভবন নির্মাণের জন্য প্রতিযোগিতায় নথিভুক্ত হন। এই সময়টা আলটোর জীবনের খুব ভালো সময় যখন তিনি তাঁর লেখা, প্রবন্ধ পত্রিকা এবং সাময়িকীর জন্য ছাপতেন। এই সময়ের তাঁর অনেক লেখা জনপ্রিয়তা পায়। যেমন: ‘আরকান কালচার’ (১৯২৪), টেম্পল বাদ্স অন জায়ভাস্কালিয়া রিজ’ (১৯২৫), ‘ফ্রম ডোরস্টেপ টু লিভিং রুম’ (১৯২৬)।
আলটোর করা ক্ল্যাসিসিজম থেকে মর্ডানিজমের এই পরিবর্তনগুলোকে ভিপুরি লাইব্রেরিতে (১৯২৭-৩৫) সংরক্ষিত আছে। লাইব্রেরিতে তাঁর সব কাজের সাক্ষ্য রয়েছে: অভ্যন্তরীণ নকশায় প্রসাধনী, রং, নানামাত্রিক স্কেচ। অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের পর জায়গা স্থানান্তরিত হয়। ভিপুরি লাইব্রেরির কাজ আট বছর স্থায়ী হয় এবং একই সময় ধরে আলটো তুরকুতে (১৯২৮-২৯ সাল পর্যন্ত) অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের নকশা করেন। যেমন: তুরুন সানোমাট ভবন (১৯২৯-৩০) এবং পায়মিও সানাটোরিয়াম (১৯২৯-৩২)। আলটো ইউরোপের বাইরে ঘুরতে যাওয়ার পর নিজের পরিচিতিকে তুলে ধরতে উৎসুক ছিলেন। অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ক্লায়েন্টরা আলটোকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুযোগ করে দেন। আলটো শুরু করেন নিরীক্ষাধর্মী স্থাপত্যকলা। যেমন পাইমিও সানাটোরিয়াম এবং লাইব্রেরির ভেতরের নকশা। যদিও তুরুর সানোমাট ভবন এবং পাইমিও সানাটোরিয়াম একইভাবে আধুনিক ডিজাইন। তারপরও কাজের গঠনে রয়েছে বিস্তর ফারাক। এই ভবনের কাজ চলাকালীন আলটো সেখানে পরিদর্শনে যান। আলটো ওই সময় প্রখ্যাত স্থপতি লি কর্বুশিয়ের ওয়াল্টার গ্রুপাস দ্বারা প্রভাবিত হন।
১৯২৯ সালে সেভেন মার্কিলিউয়াসের সাহায্যে আলটো ‘কংগ্রেস ইন্টারন্যাশানেকস ড. আর্কিটেকচার মর্ডানের’ সদস্য হন। ফ্রাঙ্কফুর্টের দ্বিতীয় কংগ্রেস সম্মেলনে যোগদান করেন ১৯৩৩ সালে, চতুর্থ সম্মেলনেও যোগ দেন, যেখানে তিনি লাজলো মোহোলি-নাগি, গিগফ্রাইডের এবং ফিলিপ মর্টনের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেন। তিনি স্থপতি লি কর্বুশিয়ের কাছ থেকে আধুনিকতা শিখেন এবং প্যারিসের অফিস পরিদর্শন করেন। এটা শুধু পাইমিও সানাটোরিয়াম এবং ভাইপুরি লাইব্রেরির সম্মান নয় এটি আলটোর জীবনের প্রথম অর্জন, যা বিশ্বের কাছে প্রথমবারের মতন প্রদর্শিত হয়। ১৯৩৮ সালে তাঁর পরিচিতি আরও বেড়ে যায় যখন তিনি নিউইয়র্কের মোমাতে তাঁর নকশাগুলোকে প্রদর্শনীতে প্রদর্শন করেন এবং তাঁর ইউনাইটেড স্টেটে প্রথম ঘুরতে যাওয়া এই প্রদর্শনী ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর পরিচিতি আরও বাড়ে যখন তিনি ১৯৩৯ সালে নিউইয়র্কের আন্তর্জাতিক স্থাপত্য মেলায় ফিনিশীয় উপত্যকার নকশা প্রদর্শন করেন। প্রকৃতপক্ষে আলটোর আন্তর্জাতিক সম্মান প্রতিষ্ঠা পায় যখন তিনি আধুনিক স্থপতি হিসেবে আত্নপ্রকাশ করেন। আলটোর নিজস্ব গবেষণায় দেখা গেছে যে গিডিয়ন সরাসরি কার্যক্রম থেকে তিনি নিজস্বতা, পারিপার্শ্বিকতা এবং মননশীলতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। পরিশেষে বলা যায় ‘ফিনল্যান্ড সব সময় আলটোর সঙ্গেই আছে, উনি যেখানে থাকবেন, ফিনল্যান্ড সর্বদাই তাঁর সঙ্গেই থাকবে’।
কর্মজীবনের মধ্যকাশে: এক্সপেরিমেন্টেশন
১৯৩০ সালে আলভার আলটো পাতলা কাঠ, ভাস্কর্য নির্মাণ এবং আসবাব নিয়ে নানা রকমের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। জ্ঞানের ব্যবহার ঘটিয়ে তিনি বিভিন্ন রকম সমস্যা সমাধান করতেন। যেমন: কাঠের নকশা ও কমনীয়তা। আলটোর নিরীক্ষণ কাঠ নিয়ে এবং তিনি ১৯৩৯ সালে গুনমারে ভিলা মারিয়া ডিজাইন করেন। এই বাড়িটি ছিল শিল্পপতি দম্পতি হ্যারি ও গুলিস্তেনের। ম্যারি গুলিস্তান হলেন আলটোর প্রধান ক্লায়েন্ট, যিনি শুধু আলভারের সঙ্গে কাজ করেননি বরং আইনো আলটোকে নকশা তৈরিতে দারুনভাবে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। প্রকৃত নকশাটি পরে নিজস্ব শিল্প প্রদর্শনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু এটি নির্মাণ করা হয়নি। এই ভবনটি ইউ আকৃতির এবং মধ্যখানে ছিল বাগান। হার্ড সারফেসে কিডনি আকৃতির জলাশয়ের ডিজাইন করেন তিনি। এই বাড়ির নকশা ফিনিশীয় আঞ্চলিকতা থেকে আধুনিকতায় বেরিয়ে এসে ইংরেজ এবং জাপানিজ স্থাপত্য দ্বারা প্রভাবিত ছিল।
এতে তাঁর সুনাম দিন দিন বাড়ছিল এবং ফিনল্যান্ডের বাইরে কমিশন হওয়ার আহ্বান আসছিল। ১৯৪১ সালে আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির পরিদর্শক হওয়ার নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেন। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় তিনি কম খরচে নকশা করার জন্য ছাত্রদের নিয়োগ দেন এবং ফিনল্যান্ডের যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিবারের আবাসন নির্মাণের জন্য কম খরচে আবাসন নির্মাণের কৌশল শেখান। যখন আলটো এমআইটিতে শিক্ষকতা করতেন। তিনি ছাত্রদের জন্য ছাত্রাবাসের নকশা করেন। রুটিঘর সমাপ্ত হয় ১৯৪৮ সালে। ছাত্রাবাসটি হয় চার্লস রি নদীর সম্মুখে এবং এই ভবনটি আলটোর লাল ইটের সময়ের প্রথম ভবন। বাস্তবে রুটিঘর ব্যবহৃত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য ধরে রাখতে। ফিনল্যান্ডে ফিরে এসে আলটো এটিতে ভবনের কাজে ব্যবহার করে নির্দিষ্টভাবে বিভিন্ন ভবনে: যেমন: ‘হেলসিংকি ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি’ (১৯৫০), সাইনাটসপো টাউন হল (১৯৫২), হেলসিংকি পেনসান ইনস্টিটিউট (১৯৫৪), হেলসিনকি হাউস অব কালচার (১৯৫৪)। পঞ্চাশের দিকে আলটো তাঁর নিজের ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ করেন কাঠ, ব্রোঞ্জ, মার্বেল ও মিক্সড মিডিয়া দিয়ে। তাঁর সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ‘বেটল অব সৌমুসালমি’ (১৯৬০) যার অবস্থান যুদ্ধক্ষেত্রে। এটি গঠিত হয় ব্রোঞ্জ স্তম্ভ দিয়ে।
শেষ কর্মজীবন
আলটো ১৯৬০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত কাজ করেন হেলসিংকিতে। হেলসিংকিসংলগ্ন টোলু উপসাগর এবং রেলপথে কাজ করেন। জাতীয় জাদুঘর এবং রেলপথ দুটোই এলিয়েল সারিনেনে নির্মিত। ওই শহরে নকশা করার সময় আলটো উপসাগরের সামনে একটি মার্বেল-ক্লাড ভবন নির্মাণের প্রস্তাব পেশ রাখেন, যেখানে থাকবে বিভিন্ন রকমের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, গানের মঞ্চ, স্থাপত্যের জাদুঘর এবং ফিনিশীয় সংস্কৃতি একাডেমির প্রধান শাখা। এটি হবে কাম্পি জেলায়। আলটো তাঁর প্রথম ঝপযবসব প্রদর্শন করেন ১৯৬১ সালে। সম্পূর্ণ নকশার মাত্র দুটি নির্মিত হয়। যেমন: ১৯৭৫ সালে ‘ফিনল্যান্ডিয়া হল’, যা টোলু উপসাগরের সামনে এবং কাম্পি অঞ্চলে ১৯৭৫ সালে ‘অফিস ভবন;, যা হেলসিংকির বিদ্যুৎ কোম্পানির জন্য তৈরি করা হয়। জ্যামিতিক ভাষা এ ভবনে ব্যবহৃত হয়, যা আলটো কর্তৃক নকশা করা। যেমন: ১৯৬২ সালে এনসো-গুডজেট ভবন, ১৯৬২ সালে একাডেমিক বুক স্টোর এবং ১৯৬৯ সালে সিইপ ব্যাংক ভবন। ১৯৭৬ সালে আলটোর মৃত্যুর পর তাঁর বিধবা স্ত্রী এলিসা অফিস চালান, এরপর যা কাজ করা হয় সব কাজ জায়ভাস্কালিয়া সিটি নাট্যমঞ্চে এবং ইসেন অপেরা হাউসে সংরক্ষিত আছে। এলিসা আলটোর মৃত্যুর পর আলটোর অফিস তাঁর নির্দেশে এবং নিয়মে পরিচালিত হয়।
আসবাব ডিজাইন
যেহেতু আলটো সুপরিচিত ছিলেন তাঁর স্থাপত্যের জন্য, তাই তাঁর আসবাবের নকশা ছিল অত্যন্ত উন্নত, যা বর্তমানেও সমভাবে জনপ্রিয়। তিনি জোসেফ হফম্যান ও ওয়েনার ওয়ের্ক স্ট্যাটে অধ্যয়ন করেন। পরে তিনি কিছু সময়ের জন্য এলিস সারিনেনের অধীনে কাজ করেন। তিনি গেরুডারের কাছ থেকেও অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। ১৯২০ থেকে ১৯৩০ সালে তিনি আয়নো আলটোর সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজে ব্যস্ত ছিলেন এবং আসবাবের নকশা তৈরির ক্ষেত্রে মনোযোগী হন। এসব আসবাবেরও আলাদা আলাদা নকশা প্রণয়ন করেন। চেয়ারে বাঁকা তক্তা বসিয়ে নকশা করার জন্য উদ্ভাবন করেন বিখ্যাত পায়মিওর চেয়ার, যা ক্ষয়রোগীর জন্য উপযোগী। ১৯৩৫ সালে ম্যারি গুলিস্তেন ও ঐতিহাসিক নেইল গুস্তার হেইল আরটেক কোম্পানি নামের প্রতিষ্ঠান দেন, যেখানে প্রকাশ্যে আলটোর সামগ্রীসহ আমদানি করা যাবতীয় কিছু বিক্রি শুরু হয়। আলটোই প্রথম ট্যাডিশনাল চেয়ার-টেবিলের ধারণা থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। ইন্টেরিয়রে যে আর্কিটেক্ট ডিজাইন করতে পারে নিজের খুশিমতো, এটা তিনিই প্রথম দেখিয়েছিলেন। চেয়ার-টেবিল ইচ্ছেমতো বাঁকিয়ে তিনি সেই আমলে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন।
সম্মাননা
অনেক পুরস্কার পান আলটো। যেমন: ১৯৫৪ সালের ‘প্রিন্স ইউগেন মেডেল’, ১৯৫৭ সালে রয়েল ইনস্টিটিউট অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্টসের পক্ষ থেকে রাজকীয় স্বর্ণপদক। ১৯৫৭ সালে তিনি আমেরিকান একাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সের পক্ষ থেকে সম্মানিত বিদেশি সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি একাডেমি অব ফিনল্যান্ডের সদস্য ছিলেন। তিনি ছিলেন ১৯২৫ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত কংগ্রেস ইন্টারন্যাশনাল ডি আর্কিটেকচার মর্ডানের সদস্য। ১৯৬০ সালে তিনি নরওয়ে ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স এন্ড টেকনো থেকে ডিলিট ডিগ্রি লাভ করেন।
আলটোর কাজের ধরন সেই সময়ের আন্তর্জাতিক ও আধুনিকতা থেকে অনেক বেশি নিজস্ব সৃজনশীলতা ও স্বকীয়তায় পূর্ণ ছিল। আলটোর নকশার বিশাল ক্ষেত্র যেমন: শহর পরিকল্পনা এবং স্থাপত্যের অভ্যন্তরীণ নকশা করা ভবন রয়েছে ৫০০টিরও বেশি, যার মধ্যে ৩০০টার মতো ভবন নির্মিত হয়েছে এবং প্রায় ভবনগুলো ফিনল্যান্ডে নির্মিত। ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও আমেরিকায় কিছুসংখ্যক ভবন তাঁর নকশায় নির্মিত।
আলটোর কাঠের নকশা স্কানভেনিভিয়ার স্থপতির দ্বারা প্রভাবিত। যা-ই হোক, তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং কাঠের নকশার কারুকার্য আকর্ষণ করেছে, যার সম্পর্কে তাঁর আগে কারোরই কোনো ধারণা ছিল না। তিনি তাঁর নিজস্ব পদ্ধতিতে বিচগাছ কিনে তিন-পাতবিশিষ্ট কাঠের দ্বারা তক্তা তৈরি করে নান্দনিক এবং গঠনমূলক নকশা তৈরি করেন। দেয়াল ও ছাদ লাল সরল বৃক্ষ দ্বারা তৈরি। ছাদ তৈরিতে তিনি কোনো রকম রড ব্যবহার করেননি। ভিলা ম্যারিয়ার সিঁড়ি তিনি বিচ কাঠ দিয়ে বাঁধাই করেন।
আলটো দাবি করেন যে তাঁর চিত্র পৃথক শিল্পকলা নয়, কিন্তু বরং স্থাপত্যের নকশার কিছু অংশ এবং ছোট ছোট কাঠে তৈরি। এই পরীক্ষাগুলো পেটেন্ট হিসেবে গৃহীত। উদাহরণস্বরূপ ১৯৩২ সালে তক্তা দিয়ে আসবাব তৈরি তাঁর আবিষ্কার। তাঁর পরীক্ষণমূলক পদ্ধতি বুহাস স্কুলের অনেক সদস্যকে প্রভাবিত করেছিল। লাজনো মোহলি নাগি, যিনি ১৯৩০ সালে প্রথম তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। ১৯৩৫ সালে লন্ডনে আলভার আলটোর আসবাব প্রদর্শিত হয়েছিল এবং একই বছর চাহিদার কারণে তাঁর স্ত্রী আয়নো এবং ম্যায়রাগুলিশ্চেন ও নিলস পুস্তার একই সঙ্গে আরটেক কোম্পানিটি চালু করে।
আলটো এমনই একজন স্থপতি, যিনি বলেছিলেন: ‘সৃষ্টিকর্তা স্থাপত্যের নকশা অঙ্কনের জন্য কাগজের সৃষ্টি করেছেন। সবকিছুই কাগজের ওপর করা সম্ভব।’ এবং তিনিই প্রথম তা করে দেখিয়েছিলেন। মানুষের জীবন ও জীবিকায় তিনি সরাসরি প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। তাঁর সময়ে যে আধুনিকতার শুরু হয়েছিল, সেটা এখন পৌঁছেছে অনন্য উচ্চতায়। কাউকে না কাউকে শুরু করতেই হয়। এরপর পুরো দুনিয়া তাঁর পেছনে ছুটতে থাকে। আলটো ছিলেন এমনই একজন দিকনির্দেশক নাবিক। একজন শিল্পী। একজন স্থপতি।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৫তম সংখ্যা, মে ২০১৭।